গুড ফ্রাইডের বঙ্গানুবাদ করা হয়েছে—পুণ্য শুক্রবার; আবার কেউ কেউ সহজ বাংলায় বলে থাকেন ভালো শুক্রবার। তবে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন চলে আসে কেন পুণ্য, গুড বা ভালো দিন বলা হচ্ছে! খ্রিষ্টানুসারীদের কাছে এ দিনটিতে প্রভু যিশু খ্রিষ্টকে মর্মান্তিক যন্ত্রণায় ক্রুশোরোপিত করে হত্যা করা হয়, যদিও রোমান শাসক পন্তিয় পিলাত ও সিজারের বিচারে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছিলেন। বিচারকরা শত-সহস্র বছরের বিচারের ঐতিহ্যকে ভেঙে রাতের অন্ধকারে ষড়যন্ত্রের এজলাস বসিয়েছিলেন, বারবার হাত বদল হয়ে বিচারিত হয়েছেন কিন্তু ধর্মান্ধ ও উগ্রবাদীদের কাছে আত্ম সমর্পণ করেছে বিচারব্যবস্থা। জীবনের অন্তিম মুহূর্তে ঈশ্বর মুখ লুকিয়েছেন, ধর্মাশ্রয়ীদের আস্ফালন যিশু খ্রিষ্টের ক্রুশে বিলম্বিত হওয়া সুনিশ্চিত করেছে। সবচেয়ে দুঃখ ও কষ্ট, অন্তর্ভেদী ও হৃদয় বিদারক ঘটনার অবতারণা হয়েছিলো দিনটিতে।

বিশ্বব্যাপী খ্রিষ্টানুসারীরা অত্যন্ত নম্র্রচিত্তে, ধর্মীয় ভাবগম্ভীর্যে, পবিত্রতার সাথে পালন করে থাকে। এ দিনকে বেছে নেওয়ার কারণ সম্ভবত স্রষ্টা ঈশ্বর এ দিনেই মানুষকে সৃষ্টি করেছিলেন। পবিত্র বাইবেল অনুসারে, ষষ্ঠ দিবসে ‘ঈশ্বর কহিলেন, আমরা আমাদের প্রতিমূর্তিতে, আমাদের সাদৃশ্যে মনুষ্য নির্মাণ করি, … ঈশ্বরের প্রতিমূর্তিতেই তাহাকে সৃষ্টি করিলেন, পুরুষ ও স্ত্রী করিয়া তাহাদিগকে সৃষ্টি করিলেন। পরে ঈশ্বর তাহাদিগকে আশীর্বাদ করিলেন’। সপ্তম দিন সাব্বাথ দিন অর্থাৎ শনিবার; এ দিনে ঈশ্বর বিশ্রাম গ্রহণ করেছিলেন। সৃষ্টির প্রথম মানুষ আদম-হবা’র পদস্খলনে সম্পর্কের দূরত্ব ও বিচ্ছিন্নতা প্রায় স্থায়ীরূপ ধারণ করেছিলো; ভগ্ন সম্পর্কের পুনরুদ্ধার কিংবা দূরত্ব হ্রাসের ব্রিজ নির্মাণে যিশু নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। ক্রুশে দু’হাত প্রসারিত করে ঈশ্বরের সাথে মানুষের মিলন বন্ধন সুদৃঢ়রূপে স্থায়িত্ব দিয়েছেন। শাস্ত্রানুসারে যিশুকে দ্বিতীয় আদম হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়, কেননা তিনি শুক্রবার মৃত্যুবরণের মধ্য দিয়ে স্র্রষ্টার সাথে ভাঙা সম্পর্কের জোড়া লাগিয়েছেন।
যিশু খ্রিষ্ট ছিলেন নিষ্কলঙ্ক, কোনো অন্যায় তাঁর মধ্যে পাওয়া যায়নি; পতিত রক্তের বদৌলতে তাঁকে ধারণকারী মনুষ্য সকলেই শূচি ও পরিষ্কৃত হয়েছে। তিনি যে পথ দিয়ে অনুমগন করেছেন, আমরাও যেন সেই পথই অনুসরণ করি। যিশু মিথ্যার সাথে আঁতাত করেননি, সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে নিঃসঙ্গ হয়েছেন, মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন। সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, রাষ্ট্রীয় অরাজকতাকে দেখিয়েছেন, মৌলিক প্রয়োজনগুলো মেটানোর পাশাপাশি আত্মিক পরিশুদ্ধতার ওপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেছেন। ৩৩ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলিয়েছেন, দূর্বলদের মনোবল বৃদ্ধি পেয়েছে, অসহায় ব্যক্তিরা চেতনায় শাণিত হয়েছে। সত্যিকার অর্থে জীবনের আমুল পরিবর্তন সেটি জাগতিক ও আত্মিকভাবে ঘটিয়েছেন।
একমাত্র তিনিই বলতে পেরেছেন, ‘আমিই পথ ও সত্য ও জীবন; আমা দিয়া না আসিলে কেহ পিতার নিকটে আইসে না’ (যোহন ১৪:৬)।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের এবং অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির জয়কে স্মরণ করতেই গুড ফ্রাইডে। গুড ফ্রাইডেতে ‘গুড’ শব্দটি আদতে চিহ্নিত করে ঐশ্বরিক শব্দটিকে, এটি আদতে গড’স ফ্রাইডের পরিবর্তিত রূপ। অবশ্য কেউ কেউ বলেন, প্রাচীন ইংরেজি ‘গুড’ শব্দটি ব্যবহার হলো পবিত্র বা হোলি হিসেবে—সেই থেকেও এই রকম নামকরণ হতে পারে। গুড ফ্রাইডের পরের দিনটিকে ইস্টার স্যাটারডে বলা হয়। মৃত্যুর পর যিশু খ্রিষ্ট শয়তানের শৃঙ্খলকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করেছে; পরাজিত করে মৃত্যুর শৃঙ্গ ভেঙে দিয়েছেন। শুক্রবার দুপুর ১২টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ৬ ঘণ্টা ক্রুশে লটকে ছিলেন। অতিরিক্ত রক্তরক্ষণের জন্যেই দ্রুত শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে দুপুর থেকে ৩ ঘটিকা পর্যন্ত সমুদয় দেশ অন্ধকারে ঢেকে গিয়েছিল, সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করে জানান দিলেন স্র্রষ্টাকে, অর্পিত দায়িত্ব সমাপ্ত করেছেন। অতঃপর প্রাণ ত্যাগের সঙ্গে সঙ্গেই প্রচণ্ড ভূমিকম্পে প্রাচীন সমাধিপ্রস্তরগুলি ভেঙে যায়, যিরূশালেম মন্দিরের তিরস্করিণী উপর থেকে নিচ অবধি ছিঁড়ে যায়। যে সেঞ্চুরিয়ান ক্রুশবিদ্ধকরণের দায়িত্ব নিয়োজিত ছিলেন, তিনি ঘটনা অবলোকনের শেষান্তে ভয়ার্তভাবেই বলে উঠেছেন, ‘ইনি সত্য সত্যই ঈশ্বরপুত্র ছিলেন’।
গুড ফাইড্রে—পুণ্য শুক্রবার। একজন পুণ্যবান লোকের আত্মহুতি, মৃতুকে স্মরণে খ্রিষ্টানুসারীরা ৩ ঘণ্টা গির্জায় সময় ব্যয় করেন। কালো কাপড় পরিধান করে শোকের আবহ সৃষ্টি করেন। গির্জার সাজসজ্জ্বা কালো কাপড়ে ঢেকে দেওয়া হয়। এদিনে গির্জায় কষ্ট ও শোকের সংগীত পরিবেশন করা হয়। মূলত যিশু খ্রিষ্ট ক্রুশ থেকে যে বাণীগুলো মানব সমাজের জন্য উচ্চারণ করেছেন, আত্মপোলব্ধিতে ধ্যান ও অন্তনির্হিত দিকগুলো প্রচার করা হয়। উপবাস থেকে যীশুর কষ্টের সহভাগী হতে চেষ্টা করে। এ সবগুলোই প্রভু যিশুর মৃত্যুকে স্মরণার্থে, অন্যায়-অন্যায্য, অশুভ-অকল্যাণ পরিহার এবং ঐশ্বরিক দিকগুলোতে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে পুণ্যবান হওয়ার আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত করার চেষ্টা করে। পুণ্য শুক্রবার চেতনাকে উদীপ্ত ও প্রদীপ্ত করার দিন।
মিথুশিলাক মুরমু : গবেষক ও লেখক।





Users Today : 89
Views Today : 90
Total views : 177493
