‘বুক অব জেনেসিস’-এর মাধ্যমে জানতে পারি স্রষ্টা ঈশ্বর শুক্রবার অর্থাৎ ষষ্ঠদিনে মানুষ সৃষ্টি করেছিলেন। শুক্রবারে ঈশ্বর তাঁর দূত বাহিনীদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আমরা আমাদের প্রতিমূর্তিতে, আমাদের সাদৃশ্যে মনুষ্য নির্মাণ করি।’ সৃষ্টির চমৎকারিত্বের বর্ণনা রয়েছে, ‘আর দেখ, সে সকলই অতি উত্তম’। আকাশ-পাতাল-পৃথিবীর নির্মাণকর্তা ঈশ্বর নিজস্ব অবয়বে, গুণাবলীতে গুণান্বিত করে মানুষকে নির্মাণ ও নাকে ফুঁ দিয়েছিলেন। আমাদেরকে তিনি সৃষ্টির ওপর কর্তৃত্ব ও পরিচালনার দায়িত্বভার অর্পণ করেছেন। কালের বিবর্তনে আমরা আমাদের কক্ষপথ হারিয়েছি, স্রষ্টা থেকে দূরত্ব এবং তাঁর সান্নিধ্য পাওয়ার সম্ভাবনাগুলো ক্রমশই ক্ষীণ হয়ে এসেছিল। প্রভু যিশু খ্রিষ্ট ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যে যে সম্পর্কের ছিন্নতা ও দূরত্বের সীমানাকে ক্রুশকাষ্ঠের দ্বারা পুনরুদ্ধার করেছেন। এই দিনটিও ছিল শুক্রবার। অর্থাৎ শুক্রবারের উত্তমতা আমাদেরকে পুনর্বার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। প্রথমবার ঈশ্বরের অবাধ্য হয়েছে আদম-হবা; কিন্তু দ্বিতীয় আদম প্রভু যিশু খ্রিষ্ট মানবকূলকে ঈশ্বরের বাধ্য থেকে মন্দতা, অন্যায্যতা, হিংস্রতা, ধর্মান্ধতা, ক্ষমতার দাম্ভিকতা ও লোভ-লালসা থেকে উত্তরণের পথের দিশা দিয়েছেন।
উত্তম শুক্রবারে প্রথম প্রহরেই প্রভু যিশুকে ক্রুশকাষ্ঠে ঝুলিয়েছে রোমান সৈন্যরা। ইতিপূর্বে মাথায় তাচ্ছিল্যে রাজার সাদৃশ্য কাঁটার মুকুট পরিয়েছে, মাথা থেকে দর দর করে রক্ত প্রবাহিত হয়েছে। প্রতিটি মানুষের চিন্তা-ভাবনা, দর্শন-পরিকল্পনা কিংবা কোনো সুচিন্তিত মতামত মানুষের মস্তিষ্ক থেকেই উৎসারিত হয়। মস্তিষ্ক যদি কুলষিত হয়, তাহলে সর্বাঙ্গিন একজন মানুষ আর মানুষ হিসেবে আখ্যায়িত হন না; তিনি হয়ে যান সহিংসতা, উদ্ধতপনা, শৃঙ্খলাহীন এক দানবে। মানবসমাজে দৌরাত্বে এদের প্রভাব-প্রতিপত্তি ও প্রবলতা কালে কালেই লক্ষ্ করা গেছে। প্রভু যিশু খ্রিষ্ট প্রতিটি মানুষের চিন্তা, বিবেক, বিচক্ষণতাকে জাগ্রত করতে মাথার রক্ত ঝরিয়েছেন। আমাদের মস্তকের নিষ্কলঙ্কিত চিন্তার প্রতিফলন ব্যক্তি জীবনে, সমাজ, রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রভাব ফেলবে। প্রভু যিশুর প্রত্যাশা আমাদের মস্তক যেন ন্যায়বিচারের মানদণ্ডে অজেয় থাকে।
পবিত্র বাইবেলে বলা হয়েছে, ‘অন্তঃকরণ সর্বাপেক্ষা বঞ্চক, তাহার রোগ অপ্রতিকার্য্যে কে তাহা জানিতে পারে’ (যিরমিয় ১৭:৯)? অন্যত্রে বলা হয়েছে, ‘সমস্ত রক্ষণীয় অপেক্ষা তোমার হৃদয় রক্ষা কর, কেননা তাহা হইতে জীবনের উদ্গম হয়’ (হিতোপদেশ ৪:২৩)। ক্রুশোরোপিত প্রভু যিশু খ্রিষ্টকে পাঁজরে বর্শা দিয়ে আঘাত করলে ‘রক্ত-জল’ বেরিয়ে এসেছিল। বাঁ পাঁজরের দিকেই হার্ট বা হৃদয় থাকে। আদমকে সৃষ্টির পরবর্তীতে স্রষ্টা ঈশ্বর আদমের হৃদয়ের বাসনাকে নিয়ে হবাকে সৃষ্টি করেছিলেন। হৃদয়ের আশা-আকাঙ্ক্ষা, প্রাপ্তি-প্রত্যাশা, ভালো-মন্দ সবকিছুই উৎসারিত হয়ে থাকে। যে কোনো ধরনের অভিলাষকে স্বার্থক করে তুলতে মাথা থেকে হৃদয়ে চিন্তাগুলো ধাবিত হয়। আর এই সময় মানুষ নিজেদেরকে সংযত রাখতে পারে না, হৃদয়ের উৎসাহ-উদ্দীপনা, বিবেকের সম্মতি দ্রুতই আমাদেরকে মন্দতার দিকে ঠেলে নিয়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে আমরা হয়ে যায় নষ্ট বিবেকের শ্রেষ্ঠ সন্তান। শয়তান আমাদেরকে কর্মকাণ্ডে উজ্জীবীত হয়ে নিজেকে স্বার্থক মনে করতে থাকে। পবিত্র শাস্ত্রে আমাদেরকে বলা হয়েছে, ‘তোমার সমস্ত অন্তঃকরণ, তোমার সমস্ত প্রাণ ও তোমার সমস্ত মন দিয়া তোমার ঈশ্বর প্রভুকে প্রেম করিবে’ (মথি ২২:৩৭)। রক্ত ঝরানোর মধ্যে দিয়ে প্রভু যিশু খ্রিষ্ট আমাদের হৃদয়কে নূতনীকরণ করেছেন। হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করতে গিয়ে তিনি হৃদয় থেকে রক্তের ধারা প্রবাহিত করেছেন। আসুন, আমরা আমাদেরকে হৃদয়কে সংরক্ষণ করি।
ক্রুশকাষ্ঠে প্রবম্বিত প্রভু যিশু খ্রিষ্টকে দু’হাতে, দু’পায়ে প্রেরেক দিয়ে গাঁথা হয়েছিল। কী নিদারণ যন্ত্রণা, কষ্ট আর রৌদ্রের খরতাপে তপ্ত মাথার খুলি নামক স্থানটি। গলগাথার আকাশে মেঘ ছিল না, ছিল শকূন ও চিলের দল। রাষ্ট্রীয় আদেশকে অতি উৎসাহে পরিপূরণে নেমেছে একদল খাঁকি পোশাকধারী মানুষেরা। ক্রুশকাষ্ঠে নির্দয়ভাবে প্রেরেকবিদ্ধ করেছে যিশু খ্রিষ্টের শরীরকে। ফিনকি দিয়ে ছুটে বের হয়েছে রক্তের ধারাগুলো। কী ছিল হাতে-পায়ের রক্তের চিহ্নে?
সত্যিই তো আমরা মানুষ হৃদয়ের সংকল্প, বিবেকের সম্মতি, পায়ের দ্রুতগামীতা এবং হাতের পারঙ্গমতায় আমরা সভ্যতাকে অসভ্যতায় পরিণত করি; সৃষ্টির সেরা মানুষকে আহত, গুম, হত্যা, অত্যাচার-নির্যাতন, উচ্ছেদ-নিপীড়ন, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, দেশত্যাগে বাধ্য করি। ধর্মের দোহায় দিয়ে অপরের ধর্মকে আঘাত করি, উপাসনালয়, বিগ্রহ ধ্বংস করতে উচ্ছ্বসিত হই; কোথায় আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব, কোথায় আমরা স্রষ্টার সৃষ্টির আশরাফুল মাকলুকাত! প্রভু যিশু খ্রিষ্ট তাঁর অনুসারীদের উদীপ্ত করেছেন ‘তোমার প্রতিবাসীকে আপনার মত প্রেম করিবে’। হাতে-পায়ের রক্তে আমাদের পা দুটি, হাত দুটিকে ধৌত করে নিতে হবে। হাত এবং পা বিবেক দ্বারা পরিচালিত হয়, আর সেই কাজই করেছেন প্রভু যিশু খ্রিষ্ট। আমরা আমাদের চলন শক্তিকে নিয়ন্ত্রিত করি, হস্ত কর্মকে ন্যায়ত পূর্ণ করে তুলি।
রক্তের মধ্যেই জীবন প্রবাহ থাকে। জীবনের বিনিময়ে তিনি আমাদেরকে দ্বিতীয় মৃত্যু থেকে বাঁচিয়েছেন। নতুন নিয়মের রক্ত আমাদেরকে আদর্শিক করে তোলে, স্মরণীয় করে তোলে। ক্রুশোরোপণের পূর্বে আয়োজিত ‘প্রভুর ভোজ’ অনুষ্ঠানে প্রভু যিশু খ্রিষ্ট আমাদেরকে আদেশ করে গেছেন, আমরা যেন তাঁরই স্মরণার্থে বার বার প্রভুর ভোজ অনুষ্ঠানাদি সম্পাদন করি। অনুষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে রুটি, রক্ত, আদর্শ, ভালোবাসা, ন্যায় ও পবিত্র আত্মার আবেশ। ক্রুশের বহমান রক্ত আমাদেরকে বারং বার মনে করিয়ে দেয়—
তোমার অসাড় বিবেককে জাগ্রত করতে এ আমার রক্ত,
তোমার প্রবঞ্চক হৃদয়কে সৎ কর্মের দিতে ধাবিত করতে এ আমার রক্ত;
তোমার দু’টি হাত মহান ঈশ্বরের গৌরবার্থে উচ্চীকৃত হবে, এ আমার রক্ত;
তোমার দু’টি পা শান্তির পদযুগলে পরিণত হবে, এ আমার রক্ত।।
মিথু শিলাক মুরমু : গবেষক ও লেখক।





Users Today : 22
Views Today : 23
Total views : 177665
