গরম এলেই আমাদের দেশে বেশ কয়েকটি রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। অধিক উত্তাপ, পানি দূষিত হওয়াসহ নানাবিধ কারণ যুক্ত এসব রোগব্যধির। আসুন জেনে নিই গরমকালের অসুখ-বিসুখ ও তার প্রতিকার বিষয়ে।
ডায়রিয়া
ডায়রিয়া সারাবছরের রোগ হলেও প্রতিবছর গরমের শুরু থেকেই ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। দেশে মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকেই আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে শুরু করেছে ডায়রিয়া রোগী।
ডায়রিয়া বা উদরাময় মূলত পেটের একটি অসুখ। সাধারণত দূষিত পানি বা পচা খাবার থেকে ডায়রিয়া হয়ে থাকে। ডায়রিয়া হলে খুব দ্রুত শরীর থেকে পানি এবং ইলেক্ট্রোলাইট বের হয়ে গিয়ে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে রোগীদের মৃত্যুর ঝুঁঁকি দেখা দেয়। ডায়রিয়ায় বিশেষ করে শিশুরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সারা বিশ্বে শিশু মৃত্যুর জন্য এটি দ্বিতীয় কারণ।
গরমের সময় পানি দূষিত বেশি হয়। সেটা পান করলে লুজ মোশন, ডায়রিয়া বা কলেরা বেশি হয়।
ডায়রিয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে
• খাওয়া, হাত ধোয়া এবং রান্না থেকে শুরু করে প্রতিদিনের কাজকর্মে বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, বাইরের খাবার, দুষিত বা পচা খাবার এড়িয়ে চলতে হবে।
• ডায়রিয়া হলে রোগীকে নিয়মিত খাবার স্যালাইন দিতে হবে। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে আইভি ফ্লুয়িড স্যালাইন বা ওষুধ দিতে হবে। রোগী দুর্বল হয়ে পড়লে অবশ্যই নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।
রোগী যদি বমি হতে শুরু করে, প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যায় বা জিহ্বা শুষ্ক হয়ে পড়ে, তাহলে কোনোরকম দেরি না করে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।
পেটের পীড়া
ডায়রিয়া ছাড়াও গরমের সময় অনেকে পেটের নানারকম জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে পড়েন। পেটে ব্যথা, হেপাটাইটিসে ভোগেন। গরমের সময় বাইরের খাবারেও জীবাণুর সংক্রমণ বেশি হয়। ফলে হজমে সমস্যা হয়, খাদ্যে বিষক্রিয়া বেশি হয়। আবার গরমের সময় খাবারদাবার খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। এসব পচা খাবার খেলে ডায়রিয়া হতে পারে।
বিশেষ করে খোলা খাবার, বাইরের শরবত, খোলা ফল, আখের শরবত ইত্যাদি খেয়ে বেশিরভাগ মানুষ এসব রোগে আক্রান্ত হন। আবার গরমের মধ্যে মাছির সংক্রমণ অনেক বেড়ে যায়। এসব মাছির মাধ্যমেও খাবার দূষিত হয়ে পড়ে। সেসব খাবার খেয়ে মানুষজন পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হন।
করণীয়
• পেটের পীড়া থেকে রক্ষায পেতে বাইরের খোলা খাবার না খাওয়া, খাওয়ার পূর্বে খাবারটি ভালো আছে কিনা, তা যাচাই নিতে হবে।
• বাইরের শরবত, খোলা ফল খাওয়া একেবারেই খাওয়া যাবে না।
ঠান্ডা-গরম, কাশি ও জ্বর
ঋতু পরিবর্তনের সময় অনেকেই জ্বর, সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। মূলত হঠাৎ ঠান্ডা থেকে গরমে পরিবর্তনের কারণে এটা ঘটে। বাইরে গরম আবহাওয়া, কিন্তু অনেকের বাসা বা অফিস, গাড়িতে এসি থাকে। ফলে ঠান্ডা থেকে হঠাৎ গরমে যাওয়া বা গরম থেকে ঠান্ডা মধ্যে গেলে শরীর মানিয়ে নিতে পারে না। তাই অনেকের সর্দি কাশিতে আক্রান্ত হন, নাক দিয়ে পানি পড়তে থাকে, কারও কারও জ্বর আসে। ঋতু পরিবর্তনের এই সময়টায় বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে।
গরম থেকে আসার পর শরীরকে ঠান্ডা হওয়ার জন্য সময় দিতে হবে। গরম থেকে বা রোদ থেকে এসেই গোসল করতে গেলে ঠান্ডা-গরম লাগা বা জ্বর এসে যেতে পারে। এ কারণে শরীরকে ঠান্ডার সঙ্গে খানিকটা মানিয়ে নিয়ে গোসল করতে হবে। এভাবে তীব্র গরম থেকে এসেই এসির মধ্যে ঢুকে পড়া ঠিক নয়। সেই সঙ্গে তীব্র তাপ থেকে এসে ঠান্ডা পানি বা ফ্রিজের ঠান্ডা খাবার খাওয়া যাবে না।
হিট স্ট্রোক
তীব্র গরমের সময় দেহের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে অসুস্থ পড়ে পড়লে হিট স্ট্রোক বলা হয়ে থাকে। অনেক সময় এতে রোগীর মৃত্যু হয়। মানবদেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৯৮.৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট। কিন্তু কোনো কারণে শরীরের তাপমাত্রা ১০৪ ডিগ্রির বেশি হয়ে গেলে শরীরের রক্তচাপ কমে যায়, মানুষ তখন অচেতন হয়ে পড়তে পারেন। মস্তিষ্কের যে অংশটি শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে, তীব্র তাপমাত্রার কারণে সেটি শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। তখন চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে হিট স্ট্রোক বলা হয়।
হিট স্ট্রোকের কারণ
তীব্র গরমে অনেকক্ষণ থাকলে বা পরিশ্রম করলে সাধারণত গরমে শরীরে পানিশূন্যতার তৈরি হয়। তাতেও শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। তীব্র গরমের সময় শরীর ঘাম বের করে দিয়ে শরীর ঠান্ডা করার চেষ্টা করে। কিন্তু তীব্র গরমে শরীর এত শুষ্ক হয়ে যায় যে, তার ঘামও বের করতে পারে না। তখন শরীরের তাপমাত্রা আরও বেড়ে যায়। তখন শরীর হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়।
লক্ষণ
হিট স্ট্রোকের আগে শরীরের অনেক তাপমাত্রা, মাথাব্যথা, দুর্বলতা, ঝিমুনি, বমি বমি ভাব হতে পারে। এছাড়া চামড়ার রং লালচে হয়ে যাওয়া, মানসিক ভারসাম্যহীনতা, খিঁচুনি, হৃৎপিণ্ডের গতি বেড়ে যেতে পারে।
করণীয়
তীব্র গরমের সময় রোদের মধ্যে বা তাপের মধ্য কাজ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। কিন্তু কোনো কারণে মাঠে বা বাইরে রোদের মধ্যে কাজ করতে হলে অবশ্যই ছাতা ব্যবহার করা উচিত। সেই সঙ্গে গরমের সময় প্রচুর পানি পান করতে হবে। ডায়াবেটিস বা প্রেশার না থাকলে বারবার ওরস্যালাইন খাওয়া উচিত।
সেই সঙ্গে গরমের সময় সাদা কাপড় ও সুতির নরম কাপড় ব্যবহার করা উচিত। এ জাতীয় কাপড় শরীর ঠান্ডা রাখে। মাঠের বা বাইরে কাজ করতে হলে সেটা তীব্র রোদের মধ্যে না করে আগে বা পরে করা যেতে পারে।
গরমে অসুস্থতা থেকে রক্ষায পেতে যা করতে পারেন
• রোদে বের হলে সবসময় ছাতা ও সানগ্লাস ব্যবহার।
• প্রচুর পরিমাণে পানি পান করা। প্রেশার বা ডায়াবেটিস না থাকলে স্যালাইন পান করা যেতে পারে।
• সুতির কাপড়চোপড় ও নরম জুতা পরা।
• ভারী ও ফাস্টফুড না খাওয়া।
• পুরোনো ও বাসী খাবার না খাওয়া।
• ঘরে পানি ভর্তি বালতি রাখা, যা ঘর ঠান্ডা রাখবে।
• প্রতিদিন গোসল করা এবং কয়েকবার করে হাত, মুখ, পা ধোয়া।
• সানস্ক্রিন ব্যবহার করা, যা ত্বক ভালো রাখবে।
তাপদাহে কী করা উচিত?
• গরমে রোদের মধ্যে কাজ না করা এবং বেশি পরিশ্রমের কাজ করা থেকে বিরত থাকা ভালো।
• ঘরে দিনের বেলায় পর্দা টেনে দিন। প্রচুর পানি এবং দুধ পান করুন।
• সাধারণত দিনের বেলাতেই গরমে বেশি হয়। কিন্তু রাতের অতি গরমও শরীরের জন্য ক্ষতিকর।
কাউকে তীব্র গরমে অসুস্থ হয়ে পড়তে দেখলে কী করবেন
অতিরিক্ত গরমে কাউকে অসুস্থ হয়ে পড়তে দেখলে শুরুতেই তাকে আধা ঘণ্টা ঠান্ডায় রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। যদি তাতে তিনি সুস্থ হয়ে যান, তাহলে বুঝতে হবে, অসুস্থতা গুরুতর নয়।
• ঐ ব্যক্তিকে যত দ্রুত সম্ভব ঠান্ডাা জায়গায় নিয়ে যেতে হবে।
• শুইয়ে দিতে হবে, এবং তার পা কিছুটা ওপরে তুলে দিতে হবে।
• প্রচুর পানি বা পানীয় খাওয়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে, পানিশূন্যতা দূর করার পানীয় দেয়া যেতে পারে।
• আক্রান্ত ব্যক্তির ত্বক ঠান্ডা করার ব্যবস্থা করতে হবে, ভেজা কাপড় বা স্পঞ্জ দিয়ে মুছে দেয়া যেতে পারে শরীর। বগলের নিচে এবং ঘাড়ে গলায় ঠান্ডা পানি দেবার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। হেলথ ডেস্ক





Users Today : 187
Views Today : 203
Total views : 177606
