পরিবহণ সংশ্লিষ্ট মালিক, নেতা বা গণশুনানি না করে হঠাৎ করেই ডিজেল ও কেরোসিনের মূল্যবৃদ্ধিতে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে জ্বালানি মন্ত্রণালয় তথা বর্তমান শেখ হাসিনার সরকার। এর প্রেক্ষিতে সরকার বলছে অক্টোবরে বিশ্ববাজারে হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে তেলের দাম। প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ৭০ ডলার থেকে বেড়ে হয়েছে ৮৩ ডলার। এতে করে কয়েক মাস বড়ো ধরনের লোকসান গুনছে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
সরকার ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বাড়িয়েছে লিটারপ্রতি ১৫ টাকা করে। দাম বাড়ানোর কারণ দেখানো হয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে।
দেশের বাজারে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। ভোক্তা পর্যায়ে ডিজেল ও কেরোসিনের মূল্য প্রতি লিটার ৬৫ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৮০ টাকা কার্যকর হয়েছে। তবে অকটেনের দাম ৮৯ টাকা ও পেট্রোলের দাম আগের মতোই প্রতি লিটার ৮৬ টাকা থাকছে। দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধিকে। বিশ্ববাজারে ঊর্ধ্বগতির কারণে পাশের দেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশ জ্বালানি তেলের মূল্য নিয়মিত সমন্বয় করছে।
দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে আরও বলা হয়েছে, বর্তমান ক্রয়মূল্য বিবেচনা করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ডিজেল লিটারপ্রতি ১৩.০১ এবং ফার্নেস অয়েল লিটারপ্রতি ৬.২১ টাকা কমে বিক্রি করায় প্রতিদিন প্রায় ২০ কোটি টাকা লোকসান দিচ্ছে। চলতি বছরের অক্টোবর মাসে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বিভিন্ন গ্রেডের পেট্রোলিয়াম পণ্য বর্তমান মূল্যে সরবরাহ করায় সংস্থার মোট ৭২৬.৭১ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। সর্বশেষ ২০১৬ সালের ২৪ এপ্রিল গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জ্বালানি তেলের দাম কমানো হয়েছিল। সেই সময় ডিজেলের দাম ৬৫ টাকা, কেরোসিনের দাম ৬৫ টাকা, অকটেনের দাম ৮৯ টাকা ও পেট্রোলের দাম ৮৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এর আগে ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে মূল্য সমন্বয়ের সময় বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছিল। তখন প্রতি লিটার অকটেন ৯৯ টাকা এবং পেট্রোল ৯৬ টাকা, কেরোসিন ও ডিজেল ৬৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
সরকার ডিজেল এবং কেরোসিনের দাম লিটার প্রতি ২৩ শতাংশ বা ১৫ টাকা বৃদ্ধি করায় ভোক্তারা তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, এই দাম বৃদ্ধি তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেবে। এদিকে সরকার ঠিক এমন এক সময়ে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, যখন দেশের মানুষ করোনাভাইরাস মহামারির সংকট থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করছে।
এমতাস্থায় লোকসান কমাতে কয়েক মাস আগে বিপিসি ডিজেলের দাম বাড়াতে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছিল। দুদিন আগে সেই প্রস্তাব কার্যকর করতে জ্বালানী মন্ত্রণালয় যুক্তি দিয়ে বলেছে, প্রতিবেশী দেশ ভারতের তেলের দাম কমানোর পরও মূল্য দাঁড়িয়েছে ১০২ টাকা লিটার। বাংলাদেশে দাম বেড়েও হয়েছে ৮০ টাকা লিটার। এখনো বাংলাদেশের চাইতে ভারতের বাজারে প্রতি লিটার ডিজেলে ২২ টাকা বেশি।
৬৫ টাকা থেকে বেড়ে দেশে যখন ডিজেলের লিটার হলো ৮০ টাকা, তখন ভারতের বাজারে ডিজেলের দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রতি লিটার ১২৪ টাকা।
দেশের বাজারে ডিজেলের দাম কম থাকায় বহু ডিজেল ভারতে পাচার হয়েছে। কেননা ভারতের চেয়ে বাংলাদেশের ডিজেলের দাম অর্ধেক ছিল। আর ভারত সরকারের চাইতে বাংলাদেশ বরাবরই বেশি ভর্তুকি প্রদান করে আসছে।
বিপিসির এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমে বলেছেন, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন ডিজেল ও ফার্নেস তেল বিপণনে বিপিসির ২০ থেকে ২২ কোটি টাকা লোকসান হচ্ছিলো। কিন্তু বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরো বাড়ায় লোকসানের পরিমাণও বাড়ে। তাই লোকসান কিছুটা কমিয়ে আনার জন্যই এই মূল্যবৃদ্ধি। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে বলা হচ্ছে, সারাবিশ্বে জ্বালানি তেলের দাম কয়েকগুণ বেড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এর দাম সমন্বয় করতে হবে। সেই সঙ্গে তেলের পাচারও রোধ করতে হবে।
ডিজেলের দাম বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে গণপরিবহণ ও পণ্যবাহী যানবাহনের ভাড়া বাড়ানোর দাবি এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য এসব পরিবহণ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের পর সরকারের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক শেষে গণপরিবহণের ভাড়া পরবহণ মালিকদের ইচ্ছেমতোই বাড়ানো হয়েছে।
বিশিষ্টজনেরা বলছেন দেশে জ্বালানি তেলের দামের বিষয়টি সরাসরি জনস্বার্থ ও ব্যবসা-বাণিজ্য তথা সামগ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। ডিজেলের দাম বাড়লে বিদ্যুৎ, পানি ও পরিবহণ ব্যয় বেড়ে যায়। বেড়ে যায় কৃষিক্ষেত্রে সেচের খরচ। ফলে বৃদ্ধি পায় উৎপাদন মূল্য। বাজারে এর প্রভাব পড়ে সরাসরি। একইসঙ্গে দ্রব্যমূল্য, পরিবহণ ব্যয় ও সেবা খাতের মূল্যবৃদ্ধি জনগণের জন্য বড়ো ধরনের বোঝা হয়ে দেখা দেয়। সবচেয়ে যেটা উদ্বেগের বিষয় তা হলো, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে পণ্য উৎপাদন ব্যয় ও পরিবহণ ব্যয় যতটা না বাড়ে, তার চেয়ে পণ্য ও সেবার দাম বেশি বাড়িয়ে দিয়ে ফায়দা নেয় সুযোগসন্ধানীরা। কাজেই সরকারের উচিত এদিকটিতে জরুরি ভিত্তিতে দৃষ্টি দেওয়া।
ক্যাব দাবি করছে দাম বৃদ্ধির বিজ্ঞপ্তিতে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধি এবং ভর্তুকি কমানোর যে কারণ দেখানো হয়েছে তা অযৌক্তিক। গত ৮ বছর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কম ছিল। অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি মাত্র ৪০ ডলারেও নেমে এসেছিল। কিন্তু তখন দেশে তেলের দাম কমানো হয়নি। প্রতিবেশী অনেক দেশেই জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমানো হয়েছিল। কিন্তু দেশের বাজারে না কমিয়ে সরকার বিপুল অর্থ লাভ করেছে। ফলে দেশীয় তেলের বাজার আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তুলনা করা অযৌক্তিক।
এ ব্যাপারে ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা শামসুল আলম সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘এইভাবে এত দাম বাড়ানো মোটেও যৌক্তিক হয়নি। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব বাংলাদেশে পড়তে তিন মাস সময় লেগে যায়। প্রতিদিনের তেল তো আর বিপিসি প্রতিদিন কিনে আনে না। একইভাবে এলপিজি ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিয়েও দাম বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে যখন দাম কমে তখন তারা কিন্তু সহজে দাম কমান না। লোকসান পোষানোর কথা বলতে থাকেন। এটা এক ধরনের লুণ্ঠনমূলক আচরণ।’
করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি যেমন থমকে গিয়েছিল, একইভাবে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের আয়ের ওপরও এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। বহু মানুষ কাজ হারিয়েছেন, অনেকের ব্যবসাও বন্ধ হয়েছে। ফলে আয় কমে এসেছে দেশের একটি বড়ো অংশের মানুষের। এর বিরূপ প্রভাব কাটিয়ে ওঠার চেষ্টার মধ্যেই জ্বালানি তেলের এই দামের প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর বিপর্যয় নেমে আসবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
জ্বালানির দাম বাড়ার ক্ষেত্রে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের গণশুনানির যে আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে তাও অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠছে। জনগণের কোনো মতামত না নিয়ে এভাবে এক তরফা অযৌক্তিক পরিমাণে দাম বৃদ্ধি একটা হঠকারী সিদ্ধান্ত। আমরা তেলের এ অযৌক্তিক দাম বৃদ্ধির বিষয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করছি এবং যেকোনো দ্রব্যের দাম নির্ধারণের পূর্বে দেশের সিংহভাগ জনগণের ক্রয়ক্ষমতার চিন্তাটা মাথায় রাখতে হবে।
বর্তমানে তেলের মূল্য বৃদ্ধিতে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে এ বিষয়ে বলেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন। তিনি বলেন ‘এর সবচেয়ে বড়ো প্রভাব পড়বে পরিবহণ খাতে। তারা তো রাতারাতি পরিবহণ ব্যয় বাড়িয়ে দেবে। এই দাম বৃদ্ধি যদি ধাপে ধাপে করত, তাতে হয়ত সবাই কিছুটা মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেত। এত বেশি বাড়ানো দেশের অথনীতির ওপর ব্যাপক বিরূপ প্রভাব ফেলবে। পরিবহণ ব্যয় বাড়ায় আমাদের নিত্যদিনের ব্যয় যেমন বাড়বে পাশাপাশি এই অজুহাতে বেড়ে যেতে পারে বিদ্যুতের দামও।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সঙ্গে শুধুমাত্র এই পণ্যটির দামই ওঠা-নামা করে না,বরং তেলের সঙ্গে পরিবহণ ভাড়া, বিদ্যুৎ, পানি, জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্য এবং সেবার মূল্যও বেড়ে যায়? সরকার একটি পণ্যের দাম বাড়ালেও ভোক্তাকে বহু পণ্যের দাম বাড়ার ভার সইতে হয়। জ্বালানির দাম বাড়ায় পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। এতে করে দেশীয় পণ্য রফতানি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।
জ্বালানি তেলের পাচার রোধ করা জরুরি, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে পাচার রোধে তেলের দাম বাড়ানোর পরিবর্তে সীমান্তপথে চোরাচালান বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াটাই যৌক্তিক। দেশে ঘনঘন জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে। ক্ষতি হবে অর্থনীতির।
এভাবে না কয়ে না বলে এক লাফে তেলের দাম লিটার প্রতি ১৫ টাকা বাড়ানো গণমানুষের সরকারের নীতির সাথে কিছুতেই মেলানো যায় না। কাদের পরামর্শে সরকার হঠাৎ করে তেলের দাম বৃদ্ধি করল এ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এটা সরকারকে সাবোটাজ করে জনবিচ্ছিন্ন করার আমলাতান্ত্রিক কোনো ষড়যন্ত্র কিনা তা ভেবে দেখতে হবে বলে অনেকেই মনে করছেন।
করোনা-পরবর্তী অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে এবং জনস্বার্থে এ সময় জ্বালানি তেলের দাম স্থিতিশীল থাকা দরকার। বিষয়টি দেশের নীতিনির্ধারকরা বিবেচনা করবেন, এটাই কাম্য।
মাহবুবুল আলম : লেখক, গবেষক ও কলামিস্ট।




Users Today : 199
Views Today : 215
Total views : 177618
