প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ বাংলাদেশ। বন্যা, খরা, মঙ্গা, ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদির উপর্যুপরি আঘাতে মানুষ যেমন দুর্যোগকে আর তেমন পরোয়া করে না; তেমনি একে-অপরের কষ্টে যতদূর সম্ভব সাহায্যের হাত বাড়িয়ে থাকে। শ্রেষ্ঠ জীব মানুষের এটি একটি ঈশ্বর প্রদত্ত গুণাবলী। সত্যিকার অর্থে চরম বিপদেই মানুষের প্রকৃত বৈশিষ্ট্যাবলীর প্রকাশ মেলে। করোনা ভাইরাসের এই দুর্যোগে বিশ্বব্যাপী মানুষ দিশেহারা, ঘর থেকে বের না হওয়ার জন্য পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে; এমনকি নামাজ, গির্জা, পূজা, প্রশংসার সর্ব প্রকার ধর্মীয় আচারাদি ঘরেই সম্পাদনের জন্য ধর্মীয় বেত্তারাও একমত হয়েছেন। এরূপ সংকটকালেই ধর্মীয়-রাজনৈতিক-সামাজিক-গোষ্ঠীগত কিংবা সাহিত্যের সম্প্রীতি চর্চা সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের সব ধর্মাবলম্বীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের শত্রুর মোকাবেলায় সর্বাত্মক অংশগ্রহণ যেমন ছিল, মহামারী করোনা ভাইরাস বিরুদ্ধেও জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে উৎসাহিত করেছেন। নভেল করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, দেশ ও জাতির শত্রু; এককভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব নয়; প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, সহযোগিতা এবং অংশায়ন।
পার্শবর্তী দেশ ভারতে এক মুসলিম নারী ইমরানা সাইফি এমনই একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পেরেছেন। করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছেন স্যানিটাইজার হাতে নিয়ে, সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে; আর ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছেন মসজিদ, মন্দির, গুরুদুয়ারাকে (প্রথম আলো ৮.৫.২০২০)। স্থানীয় আবাসিক সমাজকল্যাণ সংস্থার বরাদ্দকৃত স্যানিটাইজারে উত্তর দিল্লির জাফরাবাদ, মুস্তফাবাদ, চান্দবাগ, নেহেরু বিহার, শিব বিহার, বাবু নগরের অলিগলিতে থাকা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও এলাকার সর্বস্তরের মানুষ তার এই উদ্যোগে চমৎকৃত হয়েছে। অত্র এলাকার মসজিদ, মন্দির, গুরুদুয়ারার জীবাণুমুক্ত রাখার স্বতঃপ্রণোদিতভাবে দায়িত্ব গ্রহণ ধর্মীয় মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ। একজন আদর্শ নারী হিসেবে বোরকা পরেন, চলমান রোজায় রোজা রেখে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে জীবাণুনাশক স্প্রে করে জীবাণুমুক্ত করার প্রচেষ্টা মন্দিরের পুরোহিতরা সাইফি’র উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে যতসম্ভব সাহায্য করে থাকে। সাইফি’র মতে, ‘জীবাণুনাশকের কাজ করতে গিয়ে মন্দিরের কোনো পুরোহিত তাঁদের বাধা দেননি।’ নবদুর্গা মন্দিরের পুরোহিত প-িত যোগেশ কৃষ্ণের অভিব্যক্তি, ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য এ ধরনের পদক্ষেপকে আমরা সবসময় স্বাগত জানাই। আমাদের অবশ্যই একে-অন্যকে সহাযতা করতে হবে। আমাদের ঘৃণা থেকে দূরে থাকতে হবে। এক-অন্যকে ভালোবাসতে হবে। একে-অন্যের শুভ কামনা করতে হবে।’ হয়ে ইতিপূর্বেও বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (সিএএ) নিয়ে সহিংসতার প্রাক্কালেও বিপর্যস্ত মানুষকে জীবনের ঝুঁকি নিয়েও সহায়তা করেছিলেন। ইমরানার দর্শন হচ্ছে—‘আমি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতি তুলে ধরতে চাই। আমি বিশ্বকে এই বার্তা দিতে চাই আমরা সবাই এক। আমরা একসঙ্গে থাকব।’ ৩২ বছর বয়সী সাইফি একটি স্বেচ্ছাসেবী দল গঠন করে কাজ করে যাচ্ছে। সম্প্রীতির উল্টো পিঠ হচ্ছে সহিংসতা। সহিংসতার সূত্রপাত হচ্ছে ধর্মান্ধতা। বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক কাজী নূরুল ইসলাম এক গোলটেবিল বৈঠকে বলেছিলেন (১৮.৭.২০১৩), ‘…বিভিন্ন দেশের ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁদের ধর্মকে জানা ও উপলব্ধির চেষ্টা করেছি। আমার অভিজ্ঞতা হচ্ছে, এক বিরাট সংখ্যক মানুষ নিজ ধর্ম সম্পর্কে জানে না এবং ৯৯ শতাংশ মানুষ অন্য ধর্ম সম্পর্কে জানে না। সত্যিকার অর্থে মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও হিন্দু হতে পারলে বাংলাদেশে কেন বিশ্বে কোনো সহিংসতা থাকত না।’
করোনা ভাইরাসের থাবাতে জর্জরিত আমেরিকার নিউইর্য়ক রাজ্যের গভর্নর এন্ড্রু কুমো বলেছেন, ‘আমরা লড়ে যাব। প্রতিটি জীবন রক্ষার জন্য আমরা লড়ে যাব। নগরীর হোটেল ও নার্সিং হোমকে অস্থায়ী হাসপাতালে রূপান্তরিত করার প্রয়াস নেওয়া হচ্ছে’ (প্রথম আলো ২৮.৩. ২০২০)। আমার বাংলাদেশে রাজনীতির বিস্তার ঘটেছে, রাজধানী থেকে গ্রামের সাধারণ মানুষও ভোটের রাজনীতিতে সক্রিয় এবং প্রত্যাশা-প্রাপ্তির খাতাকেও সীমানাভুক্ত করেছে। দুর্যোগকালে দেখেছি, মানুষ-বাঘ, সাপ-বেজিও বাঁচার লড়ায়ে ব্যস্ত, সহবস্থানে থেকে দুর্যোগকে মোকাবিলা করতে উদ্যত হয়। রাজনৈতিক সম্প্রীতি, সৌজন্যবোধ, ভ্রাতৃত্ব এবং কঠিন পরিস্থিতিকে সামাল দিতে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সবার মাঝে সহযোগিতার হাত বাড়ানো, সাহস ও সমূহ পরিস্থিতিতে ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগের দৃষ্টান্ত স্থাপনে এগিয়ে আসতে হবে। দলীয় পরিচিতি, ধর্মীয় গোষ্ঠী, অচ্ছুৎ জাতি গোষ্ঠীর ব্যবধানকে পরিহার করতে সক্ষম হলে; সত্যিকার ভালোবাসা, মহত্বতার দিকে আমাদেরকে ধাবিত করে। প্রত্যেকটি ব্যক্তির ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যতা রয়েছে, রয়েছে ‘ভয়েস ও চয়েস’র অধিকারও। হয়ত স্রষ্টা ঈশ্বর এইজন্যেই যত মত, তত পথকে অনুমোদন করেছেন। রাজনৈতিক সম্প্রীতি জাতির চরিত্রকে প্রকাশ করে, ভবিষ্যতকে হাতছানি দেয়; নতুন প্রজন্মকে আকৃষ্ট ও সম্পৃক্ত হয়ে সম্ভাবনার দিকগুলো উন্মোচন করে থাকে। আমরাও করোনা ভাইরাসের মতো সর্বপ্রকার দুর্যোগের বিরুদ্ধে বলতে পারি, ‘আমরা লড়ে যাব। প্রতিটি জীবন রক্ষার জন্য আমরা লড়ে যাব।’
করোনাকালীন সাহিত্যেও সম্প্রীতির ছোঁয়া রয়েছে। আয়ারল্যান্ডের ধর্মযাজক রিচার্ড হেন্ডারিক লিখেছেন ‘লকডাউন’ নামে কবিতা। কবিতার বঙ্গানুবাদ করেছেন আনিসুল হক। কবিতার পঙক্তিগুলোর কিছু অংশ—
‘…তারা বলছে, পশ্চিম আয়ারল্যান্ডের একটা হোটেল বিনি পয়সায় খাবার সাধছে এবং তা পৌঁছে দিচ্ছে বাড়ি বাড়ি;
আজ আমি জানি, একজন তরুণী তার নম্বরসমেত লিফলেট বিলি করছে ঘরে ঘরে, যাতে করে প্রবীণেরা তাকে ফোন করতে পারেন।
আজ মসজিদ মন্দির গির্জা প্যাগোডা সিনাগগ প্রস্তুত হচ্ছে
ঘরহীন অসুস্থ দুস্থ মানুষকে স্বাগত জানাতে;
পৃথিবীজুড়ে মানুষ চলার গতি কমিয়ে দিয়ে ভাবতে শুরু করেছে
পৃথিবীজুড়ে মানুষ তার প্রতিবেশীর দিকে তাকাচ্ছে নতুনভাবে
পৃথিবীজুড়ে মানুষ উঠছে জেগে এক নতুন বাস্তবতায়।
… … …’
আমরা ব্যক্তি জীবনে প্রার্থনা করে চলেছি নিজের জন্য, পরিবার, প্রতিবেশী, সমাজ, দেশ, দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি জন্য। প্রার্থনা করছি বিশ্বব্যাপী আক্রান্ত দেশসমূহের জন্য; করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচার পথ যেন স্বর্গীয় ঈশ্বর বাতলে দেন। বিশ্বাস করি, তাঁরই সৃষ্টি মানুষের মধ্যে দিয়ে প্রতিষেধক উদ্ভাবনে সহায়তা করে করুণা, মমতা ও ভালোবাসা প্রকাশ করবেন।
মিথুশিলাক মুরমু : আদিবাসী বিষয়ক গবেষক ও লেখক।





Users Today : 5
Views Today : 6
Total views : 175510
