‘আজি হতে শতবর্ষ পরে/ কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি/ কৌত‚হলভরে’Ñরবীন্দ্রনাথ যখন এই কবিতাটি লেখেন তখন তিনি নিশ্চিত জানতেন যে তার কবিতাটি কালজয়ী হবে। শতবছর পরেও মানুষ কৌত‚হল নিয়ে তার কবিতাখানি পড়বে আর বাস্তবতায় এখন পর্যন্ত আমরা তার ‘১৪০০ সাল’ কবিতাটি শত কৌত‚হল নিয়ে পড়ে আসছি। পাখি কেন গান গায়, কবি কেন কবিতা লেখে, লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি কেনই বা এত সব বিখ্যাত ভাস্কর্য সৃষ্টি করে গেছেন?
মানুষ সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ট জীব। এত কিছু অর্জনের পর মানুষ যখন দেখল সে মৃত্যুর কাছে পরাভ‚ত হয়েছে। অমরত্ব লাভ করা তার সম্ভব হয়ে ওঠেনি। সেই থেকে মানুষের প্রাণান্তকার চেষ্টা মৃত্যুকে সে কীভাবে জয় লাভ করে! এই সুন্দর মায়ের স্নেহ, বাবার আদর, প্রিয়জনের প্রেম, আমাদের কতই না বিমুগ্ধ করে রাখে। চিৎকার করে বলি, ‘মরিতে চাহি না আমি এই সুন্দর ভুবনে’। মানুষ যখন ভাবতে শুরু করল এই সুন্দর ভুবন ছেড়ে তাকেও যেতে হবে তখন থেকে অমরত্বের ভাবনা তাকে পেয়ে বসল। সেই থেকে মানুষের প্রাণ-প্রাণন্তকর চেষ্টা এই যে আমি, এই যে আমি ছিলেম তোমাদের পৃথিবীতে, হাসি-কান্না মায়াভরা পৃথিবী ছেড়ে আমার মন যেতে চায় না কিছুতেই। কিন্তু অমগ মৃত্যু তো না ছার। যেকোনো মুহূর্তে সে এসে পড়বে। যেতে না চাইলেও ছেড়ে চলে যেতে হবে এই সুন্দর পৃথিবী। তবু মানুষ থেমে থাকেনি কোনোভাবেই। ভেবেচিন্তে ঠিক করেছে মানুষ যে এই পৃথিবীতে এসেছিল তার চিহ্ন রেখে যাবে চতুর্দিকে। আমি যে আমি, এই আমি যে ছিলাম, এই সত্যটিকে সে প্রতিষ্ঠা করে যেতে চাইল। মানুষ সিদ্ধান্ত নিল আমাকে যেতে হলেও আমার সৃষ্টি তো থেকে যেতে পারে আমার পরেও। কিন্তু কীভাবে সেটা সম্ভব? তাই পাখি যেমন মনের আনন্দে গান গায়, কবি কিন্তু মনের আনন্দে কবিতা লেখেন না। কবি তার চিন্তা ভাবনার সিঞ্চিত ধন দিয়ে রচনা করেন তার কাব্য। সেই কাব্যের মধ্যে দিয়ে কবি মারা গেলেও সে জীবিত থেকে যায়, জীবিতদের দেশে পরম সঙ্গোপনে। উৎসাহী যারা সেই কবিতা পড়ে তারা কবির ভাবনা-চিন্তাকে জীবন্ত করে তোলে। কবির সত্তাকে নতুন করে উপলব্ধি করার চেষ্টা করে। নতুন ভাবে স্মরণ করা হয় তার কবি সত্তাকে। তাই শিল্পী সহিত্যিক মাত্রই তাদের সৃষ্টির মাধ্যমে বেঁচে থাকে আমাদের মাঝে। শুধু শিল্পী সহিত্যিক কেন মানুষ মাত্রই তাঁর সমুদয় জীবন দিয়ে কর্মের মাধ্যমে বেঁচে থাকার প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে সৃষ্টির গোড়া থেকেই। কর্মের মাধ্যমে বেঁচে থাকা এই প্রচেষ্টা মানুষ নামের জীবটির একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। বিশেষ বিশেষ কর্মজীবী মানুষের কর্মকে তার মৃত্যুর পরে বাঁচিয়ে রাখা সভ্যতারই নামান্তর তাই কর্মের কর্মশীলতাকে বাঁচিয়ে রাখার উদ্যোগ নিয়ে মানুষ সব সময় সর্ব প্রচেষ্টায় নিয়ত রয়েছে।
যাপিত জীবনকে স্মরণে রাখার জন্য মানুষ তাঁর কর্মের ওপরেই সদা নির্ভর করেছে। জীবন সকলের জন্য সর্বদা সমান সময় নিয়ে আসে না। অনেকেই আবার তাদের প্রলম্বিত জীবনের মাঝে অনেক কিছু সৃষ্টি করে আমাদের অনেক কিছুই দিয়ে যেতে সক্ষম হয়ে থাকেন। আমরা যতই মহৎ ব্যক্তিদের কর্মজীবন উন্মোচনের খেলায় নিজেদেরকে ব্যাপ্ত রাখতে পারব আমরা ততটাই জীবনকে শুধু উপভোগ নয় জীবনকে আরও কর্মবহুল করে তুলতে সক্ষম হব। সেই কর্ম একদিন আমাদেরকেও বাঁচিয়ে রাখবে।
বাংলাদেশ পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী জাতির পিতার জন্ম শতবার্ষিকী পালন করছে মহা আড়ম্বরে। তিনি রবীন্দ্র নাথের মতো কবিতা লিখে যাননি বটে কিন্তু বাংলাদেশ নামক বিশাল কবিতা আমাদের জন্য রেখে গেছেন। বর্তমান রাজনৈতিক বিশে^ কাব্য গাথা আমাদেরকে যতটা না অমরত্ব দান করে একটি রাজনৈতিক দেশের পরিচিতি আমাদেরকে এই পৃথিবীতে সম্মানের সাথে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা জাগায়। শেখ মুজিবর রহমানের সাথে অন্যান্য বাঙালি প্রথিতযশা লোকদের পার্থক্য এখানেই যে শেখ মুজিবর রহমান পৃথিবীর মানচিত্রে বাঙালিদের জন্য একটি দেশ দান করে গেছেন। যে দেশটি স্বীকৃতি এখন সর্বব্যাপী। রবীন্দ্রনাথের কবিতা হয়ত আমরা প্রতিদিন পড়ি না কিন্তু বাংলাদেশ নামক কবিতা নিয়ে সমস্ত পৃথিবী প্রতিদিন আলোচিত হয়। জাতি হিসাবে আমাদের সম্মান প্রতিষ্ঠা পায়। তাই জন্ম শতবর্ষ উপলক্ষে আমাদের পড়তে হবে ৭ই মার্চের ভাষণ, বুঝতে হবে জয় বাংলা শ্লোগানের অর্জন। বাঙালিদের জন্য বাংলাদেশ অর্জন শুধুমাত্র একটি দেশ নয় এ এক চলমান জাতির অব্যক্ত উচ্ছ¡াসের প্রকাশ। কলমের কালি দিয়ে এই কবিতা লেখা হয়নি কবিতাটি লেখা হয়েছে তরতাজা রক্তে ও জীবন দানের আত্মাহুতিতে। তাই এই জীবন্ত কবিতা টিকে থাকবে শত কোটি মানুষের হৃদয়ে, প্রচার করবে কবিতার কথা ও কবির জীবন দেওয়া কাহিনীর কথকতা। রবীন্দ্রনাথ কোনো নাম, কোনো মানুষকে জাঁকিয়ে তুলতে পারে না বরং মানুষকে তাঁর নামকে জাঁকিয়ে তুলতে হয়। সেই অর্থে বাংলাদেশ নামক কবিতার কবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশকে যেভাবে জাঁকিয়ে গেছেন তার জন্য তার শতবর্ষ জন্মের তিথিটিকে একান্ত ভালোবাসায় স্মরণ করতে চাই সবাই।
ড. এলগিন সাহা : এনজিও ব্যক্তিত্ব ও কলামিস্ট।





Users Today : 30
Views Today : 37
Total views : 177922
