ইতিহাসের সাথে অনিবার্যভাবে জড়িয়ে আছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম। বয়োজ্যেষ্ঠ অনেককে বলতে শুনেছি, ‘বঙ্গবন্ধু না থাকলে আমরা স্বাধীন দেশ পেতাম না, এখনো হয়ত আমাদের পাকিস্তানের গোলামি করেই জীবন কাটাতে হতো।’
বলার অপেক্ষা রাখে না, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অবিসংবাদিত নেতা। যাঁর সাথে বাঙালির রয়েছে আত্মার সংযোগ, যাঁর কাছে বাঙালি খুঁজে পেয়েছে আত্মপরিচয়ের ঠিকানা। ইতিহাস বলে, হাজার বছর ধরে এই জাতি ও জনপদের অস্তিত্ব টিকে থাকলেও তা কখনোই স্বাধীন সার্বভৌম একক রাষ্ট্র ছিল না। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের হাত ধরে বাঙালি জাতির স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখার সূচনা। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বেই জনগণের সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন। স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার পেছনে স্থপতির ভ‚মিকায় যিনি ছিলেন এবং আপামর জনগণের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে যিনি শোষক ও স্বেচ্ছাচারী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছিলেন তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর জন্মশতবার্ষিকী অবশ্যই এদেশের মানুষের কাছে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। এ উপলক্ষে ২০২০ ও ২১ সালকে মুজিববর্ষ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এদিকে, ইউনেস্কোও বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথভাবে বঙ্গবন্ধুর জন্ম বার্ষিকী উদ্যাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করায় ঘটনাটি একটি আর্ন্তজাতিক মাত্রা পেয়েছে। বঙ্গবন্ধু কন্যা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই আয়োজনে সব বয়স ও শ্রেণি পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করার আহŸান জানিয়েছেন। দেশে বিদেশে মুজিববর্ষ উদযাপনের জন্য একটি সমন্বিত পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে বলেও জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই পরিকলপনায় বর্তমানে ২৯৮টি কর্মসূচি অর্ন্তভ‚ক্ত রয়েছে।
গত ১০ জানুয়ারি বিজয়ীর বেশে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিবসে উৎসবমুখর বর্ণাঢ্য আয়োজনে মুজিব বর্ষের ক্ষণ গণণার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। সেই অনুষ্ঠানে আরো অনেক পর্বের পাশাপাশি লেজার রশ্মির মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর প্রতীকী প্রত্যাবর্তনের আলোকোজ্জ্বল চিত্রটি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছিল। যদিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে এই ইভেন্টটির সমালোচনা করেছেন এই বলে যে, এতে দিনটির ভাব-গাম্ভীর্য ক্ষুণœ হয়েছে। কেননা এর এনিমেশন পর্বটিকে অনেকের কাছেই অপরিপক্ক কাঁচা হাতের কাজ বলে মনে হয়েছে। সে যাই হোক, একটি বিশাল আয়োজনের সব অংশই যে নিখুঁত হবে বা সবার মনঃপূত হবে তা নয়।
সত্য হচ্ছে, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ অবিচ্ছেদ্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের নায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এমনই এক উজ্জ্বল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যিনি নেতা তো ছিলেনই তার চাইতেও বেশি ছিলেন কোটি মানুষের মনের কাছাকাছি এক প্রাণের মানুষ, আপন মানুষ। সেই মহান বিশাল মানুষের জন্ম শতবার্ষিকী উদ্যাপন নিয়ে মানুষের প্রত্যাশাও কম নয়। ক্ষমতায় থেকে জাতির পিতার শতবর্ষ পালনের মুহূর্তকে জীবনের বড়ো প্রাপ্তি হিসেবেই মনে করছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। তাঁর এই প্রাপ্তির আনন্দ নিশ্চয়ই দেশবাসীর মধ্যেও সঞ্চারিত হয়েছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে শেখ মুজিবের অবদান নিয়ে কারো কোন প্রশ্ন আছে বলে মনে হয় না। যদিও তার স্বল্প শাসনকাল নিয়ে রয়েছে নানা মুনির নানা মত। সত্যি বলতে, এই জনগোষ্ঠির মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মত-পার্থক্য আছে, মতভিন্নতা আছে, বিভিন্ন রকমের চিন্তার দূরত্ব আছে, মানুষ ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর না হলে চিন্তার এই ভিন্নতাকে গণতান্ত্রিক সমাজের সৌন্দর্য বলেই চিহ্নিত করা হয়।
গণতন্ত্রে মতবিরোধ থাকবে, মতবৈচিত্র্য থাকবে, সেটা খুবই স্বাভাবিক কিন্তু তারপরও কিছু কিছু বিষয়ে ঐক্যমত্য হতেই পারত। যাকে আমরা মহান নান্দনিক ঐক্যমত্য হিসেবে বিবেচনা করতে পারতাম। যেমন, এই দেশের জন্য, স্বাধীনতার জন্য বঙ্গবন্ধুর অবদান। দলীয় বিভাজন থেকে বেরিয়ে এসে ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আজ যদি আমরা সবাই মিলে দলমত নির্বিশেষে জাতির জনকের জন্ম শতবার্ষিকী পালন করতে পারতাম তবে তা কত আনন্দেরই না হতো! নতুন প্রজন্মের সামনে উদারতা ও ঐক্যের দৃষ্টান্ত তৈরি হতো। এই উদ্যাপনের মধ্যে দলমত নির্বিশেষে এ জাতির প্রতিটি মানুষ সম্পৃক্ত হতে পারত। বৃহত্তর ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে এই দেশ, এই জাতি তাঁর প্রতি উপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন করতে পারত। কারণ, আমরা সবাই জানি, বঙ্গবন্ধু কোনো বিশেষ দল বা গোষ্ঠীর নেতা নন, তিনি এদেশের সকল মানুষের হৃদয়ের নেতা, জনতার নেতা। শত বিপদ, নির্যাতন, নিপীড়ন, জেল-জুলুম, ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে তিনি জাতিকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করেছেন। একটি স্বাধীন দেশ উপহার দিয়েছেন। তাঁর কাছে এই দেশের সবাই কৃতজ্ঞ। জন্মশতবার্ষিকী একত্রে উদ্যাপনের মাধ্যমে পুরো জাতি এই মহান নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাদের কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে পারত। কিন্তু দুর্ভাগ্য জনকভাবে আমাদের ঘৃণা ও বিভেদের শেকড় এত দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে যে এই ঐক্যমত্যে আমরা সহসা পৌঁছাতে পারবো বলে বিশ্বাস হয় না।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই নানাভাবে তাদের জাতির মহান নেতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করা হয়। এই উদযাপনের অন্যতম লক্ষ্য থাকে কৃতি মানুষটির জীবনাদর্শ জনমানে ছড়িয়ে দেওয়া। নতুন প্রজন্মকে তার গুণে গুণান্বিত হতে উদ্বুদ্ধ করা। আমাদের এখানে অনেকেই ঢালাও ভাবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ অনুসরণের কথা বলেন, কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে তার রাজনৈতিক চিন্তাধারা ও মূল্যবোধ বুঝতে গেলে শেখ মুজিবুর রহমান রচিত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পড়তে হবে। এই গ্রন্থের ছত্রে ছত্রে তার জীবন দর্শন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তিনি জনগণের জন্য রাজনীতি করেছেন, সাধারণ মানুষের কল্যাণের কথা বলেছেন। অসা¤প্রদায়িক, শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার পক্ষেই লড়াই করেছেন। এই অনন্য মানুষটি চেয়েছেন, বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত খাক, সুখী হোক, প্রাণ ভরে হাসুক, হেসে খেলে বেড়াক। আপাতদৃষ্টিতে এই চাওয়াগুলো হয়ত সামান্যই, কিন্তু গভীর ভাবে ভাবলে এই চাওয়াগুলির তাৎপর্য অসামান্য। দেশের সাধারণ মানুষদের কথা ভেবেছেন তিনি, তাদের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছেন। কিন্তু এই হাসি তখনই ফুটবে যখন সামগ্রিক ভাবে দেশের আর্থ সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন হবে, দেশে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে, সর্বস্তরে সবধরনের দুর্নীতি দূর হবে।
সরকার দেশের জ্ঞানী-গুণিদের মতামত ও পরামর্শ নিয়ে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী বিশ্বমানের আনুষ্ঠানিকতায় উদযাপন করছেন, করুন। শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনের জন্য সুন্দর, রুচিশীল ও পরিকল্পিত অনুষ্ঠানেরও প্রয়োজন আছে। পাশাপাশি তাঁর আজীবনের চাওয়া পূরণ করতেও সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন, আন্তরিকতার সাথে তাঁর আদর্শ বাস্তবায়ন করবেন, এমনটাই অনেকের প্রত্যাশা। কেননা তার স্বপ্নের বাংলা গড়াই চ‚ড়ান্ত অর্থে তাঁকে সম্মান জানানোর শ্রেষ্ঠ উপায়।
শাহনাজ মুন্নী : কবি-কথা সাহিত্যিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব।





Users Today : 38
Views Today : 47
Total views : 177932
