প্রভু যীশুর জন্ম কোনো ঐতিহাসিক পটভ‚মিতে লেখা নয় বরং আধ্যাত্মিক, যখন আমরা তাঁকে আমাদের হৃদয়ে ধারণ করি, যখন তিনি আমাদের জীবনে বাস্তব হয়ে উঠেন। যখন আমরা ভালোবাসা মানুষের মাঝে, অকারে বিলিয়ে দেই তখনই তিনি আমাদের হৃদয়ে জন্মগ্রহণ করেন। অদৃশ্য ঈশ^র ইম্মেনুয়েল নাম ধারণ করে এই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছেন।
পৃথিবীতে যীশুর আসার কারণ
ঈশ্বর অনেক ভালোবেসে মানুষ সৃষ্টি করেছিলেন, আধ্যাত্মিকভাবে তাঁরই মতো করে। ঈশ্বর মানুষকে বংশবৃদ্ধি করার ক্ষমতা দিয়েছিলেন এবং পৃথিবীর সব কিছুর উপর রাজত্ব করতে বলেছিলেন। মানুষ স্বর্গীয় সুখে-শান্তিতে এদোন বাগানে ছিলেন, কিন্তু তখনি ঘটল অঘটন, মানুষ ও ঈশ্বরের শত্রু শয়তান, আর স্থির থাকতে পারল না। সে মানুষ ও ঈশ্বরের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করল, সে মানুষকে অবাধ্য করল ঈশ^র থেকে। এতে ঈশ্বর অনেক কষ্ট পেলেন তাঁর প্রিয় মানুষের অবাধ্যতায়। যেহেতু ঈশ্বর শতভাগ পবিত্র তাই তাঁর পক্ষে পাপযুক্ত মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা সম্ভব না। অবাধ্যতার মাধ্যমে মানুষ পাপে পতিত হয়েছিল। আর এ জন্যই পূর্বের সম্পর্ক ফিরিয়ে আনার জন্য মানুষের পবিত্র হওয়ার দরকার। যুগে যুগে মানুষ পাক-পবিত্র হবার জন্য কুরবাণী দিত, কিন্তু এটা ছিল ক্ষণস্থায়ী। তাই ঈশ^র সিন্ধান্ত নিলেন তাঁর প্রিয় পুত্র (রূপক অর্থে) এই পৃথিবীতে পাঠাবেন-‘‘আমি তোমার ও স্ত্রীলোকের মধ্যে এবং তোমার বংশ ও স্ত্রী লোকের মধ্যে দিয়ে আসা বংশের শত্রুতা সৃষ্টি করব। সেই বংশের একজন তোমার মাথা পিষে দেবে আর তুমি তাঁর পায়ের গোড়ালীতে ছোবল মারবে। (তৌরত কিতাব-পয়দায়েশ ৩:১৫)
হয়রত ইউসুফের সঙ্গে যীশুর মা মরিয়মের বিয়ের ঠিক হয়েছিল, কিন্তু তাঁরা একসঙ্গে বাস করার আগেই পাক-রুহের শক্তিতে মরিয়ম গর্ভবতী হয়েছিলেন। মরিয়মের স্বামী ইউসুফ সৎ লোক ছিলেন, কিন্তু তিনি লোকের সামনে মরিয়মকে লজ্জায় ফেলতে চাইলেন না। এজন্য তিনি গোপনে তাকে তালাক দিবেন বলে ঠিক করলেন। ইউসুফ যখন এই সব ভাবছিলেন তখন ঈশ^রের এক ফেরেস্তা স্বপ্নে তাঁকে দেখা দিয়ে বললেন, “দাউদের বংশধর ইউসুফ মরিয়মকে বিয়ে করতে ভয় কর না, কারণ তাঁর গর্ভে যিনি জন্মিছে তিনি পবিত্র আত্মার শক্তিতে জন্মিছে। তাঁর একটি ছেলে হবে। তুমি তার নাম যীশু রাখবেভ (ইনজিল শরীফ মথি ১ : ১৮-২১)
যীশুর জন্মের পূর্বে স্বর্গদূত ফেরেস্তা সেই নবজাতকের কী নাম হবে বলে দিয়েছেন (মথি ১:২১)। ঈসা শব্দের অর্থ নাজাত বা পরিত্রাণদাতা। যিনি মানুষকে পাপ থেকে পরিত্রাণ বা মুক্তি দেন। আর খ্রীষ্ট শব্দটি গ্রিক ভাষা থেকে এসেছে ইব্রীয় ভাষায় খ্রীষ্টকে মসীহ বলা হয়েছে (ইনজিল শরীফ, ইউহোন্ন ৪ : ২৫) মসীহ মানে যাঁকে অভিষেক করা হয়েছে (জবুর শরীফ ২ : ২) প্রভু যীশুকে খ্রীষ্ট বা মসীহ বলা হয়েছে ( মথি ১;১) কারণ ঈশ^র একটি বিশেষ কাজের জন্য অর্থাৎ মানুষকে পাপ থেকে উদ্ধার করার জন্য প্রভু যীশুকে এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন।
নবীদের ভবিষ্যৎবানী
আমরা পূর্বে দেখেছি যে, ঈশ^র ওয়াদা করেছেন, স্ত্রীলোকের মধ্যে দিয়ে একজন ব্যক্তি আসবেন যিনি শয়তানের মস্তক পিষে দিবেন (তৌরত শরীফ পয়দায়েশ ৩:১৫)। তাহলে এখন প্রশ্ন স্ত্রী লোকের মধ্যে দিয়ে এ পৃথিবীতে কে এসেছেন। প্রধান দুই ধর্মীয়গ্রন্থ বাইবেল ও কুরআন এক কথায় স্বীকার করে নেয় একমাত্র যীশু খ্রীষ্ট এই পৃথিবীতে বাবা ছাড়া শুধু মায়ের মধ্যে দিয়ে এসেছেন। এটা ঈশ^রের অলৌকিক কাজ। এই পৃথিবীর ইতিহাসে এটাই অদ্বিতীয়। হয়রত মুসা নবীর মধ্যে দিয়ে ঈশ^র বলেছেন, “তোমার ভাইদের থেকে তোমার মতো একজন দাঁড় করাব, যার কথায় তোমাদের চলতে হবে, তার মুখ দিয়ে আমি আমার কথা বলব, সে আমার বাধ্য থাকবে, তাঁর কথা যদি কেউ না শোনে তাকে দোষী বলে গণ্য করা হবে ”(তৌরত শরীফ দ্বিতীয় বিবরণ ১৮ : ১৬-১৬)-পদটি বিশ্লেষণে দেখি, কার মধ্যে দিয়ে ঈশ^র তাঁর মুখের কথা বলেছেন নিশ্চই যীশু খ্রীষ্টের মধ্যে দিয়ে। হয়রত দায়ুদ নবীর মধ্যে দিয়ে ঈশ^র ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন তাঁকে ক্রুশে হত্যা করা হবে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় দায়ুদের সময় তো লোককে ক্রুশে দিয়ে হত্যা করার নিয়ম ছিল না তাহলে তিনি কীভাবে জানলেন? নিশ্চয় তিনি যীশুর সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। প্রায় ৭০০ বছর পূর্বে ঈশ^র ইশাইয়া নবীর মধ্যে দিয়ে ভবিষৎবাণী করেছিলেন খ্রীষ্ট একজন সতী অবিবাহিত কুমারী গর্ভে জন্মিবেন তাঁর নাম রাখা হবে ইম্মানুয়েল ( ইশাইয়া নবীর কিতাব ৭:২) আর সেই ভবিষ্যৎবাণীর পূর্ণতা আমরা দেখতে পাই (মথি ১ : ১৮-২৫) মির্কাহ নবীর মধ্যে দিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, “এহুদিয়া দেশের বেথেলহেম এহুদিয়ার মধ্যে তুমি কোনোমতেই ছোট নও, কারণ তোমার মধ্যে থেকেই এমন একজন শাসনকর্তা আসবেন, যিনি আমার ইসরাইল জাতিকে পরিচালনা করবেন এই ভবিষ্যদ্বাণীটি করেছিলেন ঈশ^র মির্কাহ নবীর মধ্যে দিয়ে মির্কাহ ২ : ৫ আর এর পূর্ণতা আমরা দেখতে পাই (মথি ২ : ১)। এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মরিয়ম ও ইউসুফ কিন্তু গালীল প্রদেশে নাসরতের অধিবাসী ছিলেন। কিন্তু যীশুর জন্মের পূর্বে সম্রাট অগাস্টাস সিজার ঘোষণা করলেন সবাইকে নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে তার নাম লেখাতে হবে (এটাকে আমরা আদমশুমারী বলতে পারি)। মরিয়ম ও ইউসুফ ছিল নবী দায়ূদের বংশের লোক তাই তাদেরকে জেরুশালেমে গিয়ে নাম লেখাতে হবে। তাই তারা গালীলের প্রদেশের নাসরত থেকে ্এহুদিয়া প্রদেশের জেরুশালেমে গেলেন আর ঠিক তাখনেই যীশুর জন্ম হলো। এ দ্বারা সেই নবীর ভবিষ্যদ্বাণীর পূর্ণতা লাভ করে। এখানে মির্কাহ নবী ভবিষ্যদবাণী করে বলেছিলেন তিনি ইসরাইল জাতির রাজা হবেন। আর এ কথা এহুদিয়া প্রদেশের বাদশা হেরোদ জানতেন। যখন সেই পণ্ডিতেরা রাজার কাছে এসে যীশুর বিষয়ে বললেন এবং জিজ্ঞেস করলেন সেই মসীহ কোথায় জন্মগ্রহণ করেছেন। পন্ডিতরা হয়ত বা ভেবেছিলেন তিনি কোনো রাজ প্রসাদে জন্মগ্রহণ করবেন। যখন রাজা মসীহের বিষয়ে জানতে পারলেন তখন তিনি অস্থির হয়ে উঠলেন তিনি সকল আলেম-ইমাদের ডাকলেন এবং বললেন সেই মসীহ কোথায় জন্মিবেন? তখন তারা তাকে বললেন বেথেলহামে জন্মিবেন। আর কৌশলে রাজা পণ্ডিতদের বললেন আপনারা গিয়ে সেই শিশুটিকে দেখে এসে আমাকে বলেন, যাতে আমি গিয়েও সেই শিশুকে মাঠিতে উপুড় হয়ে সেজদা করতে পারি। কিন্তু স্বর্গদূত রাখালদের সাবধান করে দিলে পরে তারা আর রাজার কাছে ফিরে গেল না। ভিন্ন পথে দেশে চলে যান, আর রাজা হেরোদ এ বিষয় জানার পর ভীষণ রেগে যান, পণ্ডিতেরা তাকে ঠকিয়েছে বলে। তাই তিনি পণ্ডিতদের কথা অনুয়ায়ী সে সময় হতে ২ বছরের নিতে যত শিশু ছিল সবাই কে হত্যা করার নির্দেষ দেন। কেননা ঈশ^র হয়রত ইয়ারমিয়া নবীর মাধ্যমে এই ভবিষ্যদবাণী করেছিলেন “রামায় ভীষণ কান্নাকাটির শব্দ শোনা যাচ্ছে; রাহেলা তার সন্তানদের জন্য কাঁদছে, কিছুতেই শান্ত হচ্ছে না, কারণ তারা আর নেই” ( ইয়ারমিয়া ৩১ : ১৫)। এই ঘটনার আগে স্বর্গদূত ইউসুফকে ভবিষ্যদবাণী করেছিল তারা যেন শিশু যীশুকে নিয়ে মিশরে চলে যায়। মিশরে চলে গিয়ে শিশু যীশু রাজা হেরোদের হাত থেকে রেহাই পায়। রাজা হেরোদ মারা গেলে পরে তারা মিশর দেশ থেকে ফিরে এসে গালিল প্রদেশের নাশরত গ্রামে বাস করেছিলেন কেননা নবীদের মধ্যে দিয়ে এই কথা বলা হয়েছিল তাকে নাসরতীয় বলা হবে। “কাল পূর্ণ হলো” (গালাতীয় ৪ : ৫), হয়রত মালাখী নবীর পর প্রায় ৪০০ বছর পর্র্যন্ত কোনো নবী ছিল না। তখনকার লোকেরা মসীহের আশায় ছিল। রোমীয়রা তখন প্রায় সারা পৃথিবী শাসন করছিল। ইহুদিরা রোমীয়দের দ্বারা অত্যাচারিত ও নির্যাতনে নিপীড়িত। তারা আশা করেছিল মসীহ আসবেন এবং তাদের উদ্ধার করবেন। আর এ কারণে রাজা হেরোদ সেই সময়ের সেই সব অবুঝ ও নিরাপরাধ শিশুদের ওপর এই হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল। সত্যিই যীশু এসেছিলেন তবে রাজা বেশে নয় দারিদ্র বেশে, পাপীদের মুক্তি দিতে।
“মনে রেখে, ইবনে আদম সেবা পেতে আসেনি বরং সেবা করতে এসেছেন এবং অনেক লোকের মুক্তির মৃল্য হিসাবে নিজের প্রাণ দিতে এসেছেন”(ইনজিল শরীফ, মার্ক১০ : ৪৫) এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা, মুক্তির মূল্য কিসের মুক্তি? একজন কয়াদীর কাছে তার কাছে আনন্দের দিন হচ্ছে, যে দিন সে মুক্তি পাবে, এ দিনের অপেক্ষায় সে থাকে, তার মুক্তির দিনই হচ্ছে তার কাছে বড় দিন।
রোমানদের মধ্যে জন্মদিন পালনের কোনো রীতি ছিল না। আর এ কারণে যিহুদীরা জন্মদিন পালনে বিশ্বাসী ছিল না। তারা শুধু রাজা যেদিন সিংহাসনে বসবে সেদিন পালন করত। যীশুর প্রথম জন্মদিন পালন করেন আর্মেনিয়ান খ্রীষ্টানেরা। তারা যখন দেখলেন যীশুর স্বীকৃত কোনো জন্মদিন নেই তখন তারা ৬ই জানুয়ারি যীশুর জন্মদিন হিসাবে পালন করতে শুরু করলেন। এর পর ৩৩৬ খ্রীষ্টাব্দে রাজা কনস্টাইন যখন যীশুকে গ্রহণ করলেন, তখন থেকে ২৫ ডিসেম্বর যীশুর জন্মদিন হিসাবে স্বীকৃতভাবে পালিত হয়ে আসছে। সারা পৃথিবীর খ্রীষ্টানরা অনেক আনন্দে এই দিন পালন করে আসছেন। খ্রীষ্টানেরা এই দিনটিতে শুধু আনন্দ উপভোগ করে না বরং সবার প্রতি সহানুভ‚তি ও ভালোবাসা দেখায়।
যীশু এই পৃথিবীতে মাত্র ৩২/৩৩ বছর বেঁচে ছিলেন, তাঁকে ঈশ^রের বিশেষকার্য সাধনের জন্য ক্রুশে জীবন দিতে হয়েছিল, যদিও বা তাঁকে ক্রুশে দেওয়ার মতো কোনো দোষ খুঁজে পাননি রোমীয় স¤্রাট পন্তিয় পীলাত, তারপরেও তাঁকে এই শান্তি ভোগ করতে হয়েছিল। যীশু অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করতেন, তিনি পেশায় ছিলেন একজন ছুতার মিস্ত্রি, তিনি ন্যায়, আদর্শবান ও কর্মঠ পুরুষদের আদর্শ। তিনি ছিলেন ঈশ^রের মেশশাবক ও চ‚ড়ান্ত কোরবানি-“ঈশ^র মানুষকে এত ভালোবাসলেন যে তাঁর প্রিয় পুত্রকে দান করলেন, যে কেউ সেই পুত্রের ওপর বিশ^াস আসে সে বিনষ্ট না হয় কিন্তু অনন্ত জীবন পায় (ইনজিল শরীফ ইউহোন্না ৩ : ১৬)।
প্রতি বছর বড়দিন আসে আমাদের এই বারতা দিয়ে যায়, মানুষ্যপুত্র দারিদ্রবেশ ধারণ করে এসেছিলেন এই ধরণীতে, তিনি মানুষকে ভালোবাসে অন্যন্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। এবার বড় দিনের এই বারতা হোক, প্রভু যীশু এই পৃথিবীতে যে শান্তি স্থাপন করার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করিয়েছিলেন তা ফিরে আসুক পৃথিবীতে। ভালোবাসা দিয়ে থামাতে হবে হানাহানি। পৃথিবীতে আসবে শান্তি, এটাই হোক বড় দিনের বারতা।
নাহিদ বাবু





Users Today : 75
Views Today : 80
Total views : 177331
