বিগত ২রা আগস্ট বিকেল ৫টায় ঢাকার আর্চবিশপ বিজয় এন ডি’ ক্রুশ ওএমআই, ‘বাংলাদেশ খ্রীষ্টান এসোসিয়েশন’র প্রেসিডেন্ট নির্মল রোজারিওসহ একদল প্রতিনিধি বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনের মিনিস্টার রাজেশ কুমার অগ্নিহোত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। ৭ সদস্যের প্রতিনিধিরা এ সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মার বরাবরে বাংলাদেশের খ্রিষ্টান চার্চ এবং বাংলাদেশ খ্রিষ্টান এসোসিয়েশনের পক্ষে দুটি প্রতিবাদ লিপি হস্তান্তর করেছেন। প্রতিনিধি দলটি আশা প্রকাশ করেছেন, ভারত সরকার মনিপুরে সংঘটিত বেদনাদায়ক হত্যাকাণ্ড, গির্জায় অগ্নিকাণ্ড, নির্যাতন-নিষ্পেষণের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করবেন এবং সকল পক্ষকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদানের মাধ্যমে সেখানে শান্তি ও সহবস্থান নিশ্চিতে কার্যকর উদ্যোগ এবং ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। অপরদিকে রাজেশ কুমার অগ্নিহোত্রী বলেছেন, ‘আপনাদের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠার কথা আমরা দিল্লীকে জানাবো। দিল্লী এ বিষয়ে অবশ্যই কার্যকর উদ্যোগ এবং ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। আমরা চাই ভারতে সকল ধর্ম, বর্ণ এবং জাতিগোষ্ঠীর মানুষ সহঅবস্থান ও সম্প্রীতির মধ্যে বসবাস করুক। আমাদের সরকার এই বিষয়ে সর্বদাই সতর্ক এবং সচেতন রয়েছে।’
ভারতের অন্যতম রাজ্য মনিপুর। ১৬টি জেলা নিয়ে ১৯৭২ সালের ২১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে রাজ্যটির যাত্রা শুরু হয়। আয়তন ২২, ৩২৭ বর্গ কিলোমিটার (৮,৬২১ বর্গ মাইল), মেইতেই, কুকি, নাগা ও পাঙ্গাল জনগোষ্ঠী নিয়ে জনসংখ্যা ৩০ লাখ, যাদের ভাষা চীনা-তিব্বতি। মণিপুরের জনসংখ্যার ৫৮.৯ শতাংশ উপতক্যায়, বাকি ৪১.১ শতাংশ বাস করে পার্বত্য অঞ্চলে। পার্বত্য অঞ্চলে প্রধানত কুকি, নাগা ও জোমিরা বাস করে। উপত্যকায় ক্ষুদ্র উপজাতীয় সম্প্রদায় এবং প্রধানত মেইতেই, মণিপুরি ব্রাহ্মণ ও পাঙ্গাল (মণিপুরি মুসলমান)দের বসবাস। উপতক্যা এলাকায় বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী, নাগা ও কুকি বসতি স্থাপনকারীদের দেখা যায়। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী মণিপুরে হিন্দু ৪১.৩৫ শতাংশ, খ্রিষ্টান ৪১.২৫ শতাংশ, মুসলমান ৮.৩৯ শতাংশ, সনমাহিবাদী ৮.১৮ শতাংশ, বৌদ্ধ ০.২৪ শতাংশ, শিখ ০.০৫ শতাংশ, জৈন ০.০৫ শতাংশ, ধর্মহীন মানুষ ২.৯৮ শতাংশ বসবাস করে।
ব্রিটিশ শাসনামলে মণিপুর ছিল রাজা শাসিত। ১৯১৭ থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত মণিপুরের জনগণ ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে তাদের অধিকার নিয়ে আন্দোলন করে। ১৯৩০-এর দশকের শেষের দিকে মণিপুরের রাজা বার্মার চেয়ে ভারতের সঙ্গে যুক্ত হবার অভিপ্রায়ে ব্রিটিশ প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বেঁধে যাওয়ায় আলোচনা থেমে যায়। ১৯৪৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর মহারাজা বুধচন্দ্র ভারতে যুক্ত হবার জন্য চুক্তিবদ্ধ হন। জনমতের তোয়াক্কা না করে ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় সেখানে প্রায় ৫০ বছর ধরে জনবিদ্রোহ চলে। সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার পরও মেইতেইরা সরকারিভাবে সংখ্যালঘু তফসিলি জাতি হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার দাবি উত্থাপন করে আসছে। মে মাসে মণিপুরের হাইকোর্ট মেইতেইদের তফসিলি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি সরকারকে বিবেচনা করার নির্দেশ দেয়। অপরদিকে কুকিরা প্রতিবাদ জানায়। তাদের বক্তব্য হলো—এমনিতেই মণিপুরের রাজ্য সরকার ও সমাজ ব্যবস্থায় মেইতেইরা প্রভাবশালী অবস্থানে আছে। এখন কেন্দ্রীয় সরকার তাদের তফসিলি মর্যাদা দিলে তাদের সুবিধা আরও বাড়বে। কুকি অধ্যুষিত এলাকাও মেইতেইরা আরও সহজে জমি-বাড়ি কিনতে পারবে। রাজ্যের মেইতেই সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নাম করে আগে থেকেই কুকিদের উচ্ছেদ করছে বলেও দাবি করে তারা। ফলে বিক্ষোভে নামে কুকিরা। কুকিরা অপেক্ষাকৃত অনগ্রসর, তাদের ভূমি সুরক্ষার জন্য সুনির্দিষ্ট আইন রয়েছে। বিদ্যমান আইন অনুসারে মেইতেইসহ আদিবাসী নয় এমন কেউ পাহাড়ে ভূমি কিনতে পারে না। তথ্যানুযায়ী, মণিপুরের ৬০ বিধানসভার আসনের মধ্যে ৪০টি নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা মেইতিদের। মণিপুরের মেইতেই সম্প্রদায়ের দাবি, তাদের মণিপুরের অন্যান্য উপজাতির মতোই সংরক্ষণ দিতে হবে। কারণ সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের সংরক্ষণের সুবিধা না থাকায় তারা পিছিয়ে পড়ছে এবং এগিয়ে যাচ্ছে উপজাতি সমাজ। এ প্রেক্ষাপটে ১৪ এপ্রিল মণিপুরের হাইকোর্ট এক নির্দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মেইতেই সম্প্রদায়ের দাবি খতিয়ে দেখতে মণিপুর সরকারকে নির্দেশ দেন। ৩ মে থেকে মণিপুরে চলা সহিংসতায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন, আদালত একটি আদেশ দিয়েছেন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। মণিপুর সরকারের সঙ্গেও পরামর্শ করা হবে। তারপরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ইতিমধ্যেই বিজেপি’র এক বিধায়ক মেইতেই সম্প্রদায়ের জন্য তফসিলি উপজাতির মর্যাদা সম্পর্কিত মণিপুর হাইকোর্টের আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে একটি আবেদন করেছেন।
মেইতেই জনগোষ্ঠী মূলত হিন্দু। মণিপুরি হিন্দুরা বৈষ্ণব মতাবলম্বী। এখানে বৈষ্ণববাদের প্রসার ঘটে রাজা গরিব নিবাস (এধৎরন ঘরধিং) এর সময় (১৭০৮-৪৮) থেকে। তিনি একে রাষ্ট্রীয় ধর্ম ঘোষণা করেন। মণিপুর উপতক্যার বিষ্ণুপুর, ঠোম্বল, ইম্ফল (পূর্ব ও পশ্চিম) জেলা হিন্দু অধ্যুষিত। এরপরেই মণিপুরি খ্রিষ্টানদের অবস্থান। ঊনবিংশ শতাব্দীতে মণিপুরে খ্রিষ্টান মিশনারীদের হাত ধরে খ্রিষ্টধর্মের প্রসার ঘটে। বিংশ শতাব্দীতে ইম্ফলে পশ্চিমাধারার লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল, ডন বস্কো হাইস্কুল, সেন্ট জোসেফস্ কনভেণ্ট ও নির্মলাবাস হাইস্কুল প্রতিষ্ঠার ফলে পাবত্য জেলাগুলোতে খ্রিষ্টধর্ম ও শিক্ষার প্রসার ঘটে। স্বাধীনতার পর থেকে খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী কুকি সম্প্রদায় তফসিলি উপজাতির হিসেবে মর্যাদা পেয়েছে, অন্যদিকে মেইতেইরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী। মণিপুরের ইতিহাস হলো মেইতেনরাই নাগা ও কুকি সম্প্রদায়কে রাজার প্রশাসনিক কাজে জায়গা করে দিয়েছিল। এখানকার মানুষের হিন্দু হওয়ার ইতিহাসটাও আলাদা। মণিপুরের মানুষের মধ্যে কখনই ধর্মীয় উগ্রতা ছিল না। তবে ঊনবিংশ শতকে যখন এখানে রাজার শাসন ছিল, সেই সময়ে হিন্দুধর্ম চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেটাও খুব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি।
মণিপুরের ইতিহাসে এই প্রথম ধর্মীয় স্থানগুলো জাতিগত সহিংসতার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও স্বীকার করেছেন, চার্চ আর মন্দির দুই-ই পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কুকি সম্প্রদায়ের প্রার্থনা করার স্থল গির্জাঘর এবং মেইতেই সম্প্রদায়ের মানুষ তাদের বাড়িতে যে উপাসনা স্থল বানায়, উভয়ই ক্ষতি করা হয়েছে। বিবিসি’র ভাষ্যমতে, ইতোমধ্যেই মণিপুরের প্রায় আড়াই শতাধিক চার্চ পোড়ানো হয়েছে এবং দুই হাজারের বেশি কুকি সম্প্রদায়ের ঘরবাড়িতে হামলা করা হয়েছে। হাওকিপ থাংখোস বলছিলেন, ‘কুকি সম্প্রদায় গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। গির্জাঘর, মানুষ এবং তাদের সম্পত্তিতে হামলাকারী জনতাকে থামায়নি সরকার, তাই এই সরকারের ওপরে আমরা আস্থা হারিয়ে ফেলেছি। …এটা জাতিগত সহিংসতা তো বটেই, একই সঙ্গে ভারতীয় হিন্দুদের খুশি করার জন্য গির্জার ওপরে এই হামলাগুলো চালানো হয়েছে।’ সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১০০টি মন্দির আর হাজার দুয়েক মেইতেই বাড়িতে হামলা হয়েছে। কুকি ও নাগা সম্প্রদায়ের সম্পর্ক একেবারে তলানিতে পৌঁছেছে, বেড়েছে হতাশাও। চলমান জাতিগত সহিংসতায় শতাধিক মানুষের মৃত্যু চার শতাধিক আহত হয়েছেন উভয় পক্ষেরই।
২০২২ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এক হিসেবে দেখা গেছে, ভারতীয় খ্রিষ্টানদের ওপর প্রায় চার শতাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। বিজেপি’র পক্ষ থেকে কঠিন অভিযোগ তোলা হয়, খ্রিষ্টিয়ানরা ধর্মান্তকরণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ভারত জনতা পার্টির লোকজন প্রায়ই খ্রিষ্টিয়ান আচার-অনুষ্ঠান ভুণ্ডুল করার প্রচেষ্টায় থাকে, এরকম একটি হরিয়ানা রাজ্যের গুরুগ্রামে ঘটেছিলো। দলের লোকেরা অনুষ্ঠানে ঢুকে পড়ে সর্দপে ঘোষণা করে, ‘আমরা যিশুকে অসম্মান করি না। কিন্তু ভারতীয় সংস্কৃতিকে এরা ধ্বংস করছে। এদের রুখতে আপনারা সাহায্য করুন। সবাই চিৎকার করে বলুন জয় শ্রীরাম, সনাতন ধর্মের জয়।’ বিষয়টি সত্যি-মিথ্যার অনেক মিথ রয়েছে। তবে পিউ রিসার্চের গবেষণায় দেখা গেছে, ‘প্রতি ১০ জন খ্রিষ্টানের মাত্র ১জন বিজেপিকে ভোট দেন। তার মানে দাঁড়াচ্ছে অবিজেপি রাজনৈতিক দলগুলো পাচ্ছে ৯ গুণ বেশি খ্রিষ্টান ভোট। গির্জা ভাঙচুরের পরোক্ষ উত্তর এখানেই লুকিয়ে আছে।’
উপমহাদেশের সংখ্যালঘু খ্রিষ্টানরা হামলার শিকার হলে আত্মরক্ষার চেষ্টা করে। মণিপুরের খ্রিষ্টানরা সংখ্যা, ক্ষমতা, অর্থ-বিত্ত সবদিক থেকেই পিছিয়েপড়া, পিছিয়েপড়া খ্রিষ্টানরা অন্যের উপাসনালয় ক্ষতিগ্রস্ত করবে; এটি অকল্পনীয়। বিজেপি সরকার মেইতেইদের সুবিধাদি দিয়ে খ্রিষ্টানদের শেকড় উপড়ে ফেলার নীলনক্সা প্রণয়ন করছে কি না, সেটি দেখার বিষয়। খ্রিষ্টানদের ওপর ধারাবাহিক আক্রমণ সম্পর্কে একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে আমেরিকার দৈনিক ‘নিউইয়ক টাইমস’ বলেছে, ‘খ্রিষ্টান বিরোধী বাহিনী ভারতের গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াচ্ছে, গির্জায় হামলা চালাচ্ছে, ধর্মীয় পুস্তক পোড়াচ্ছে, স্কুল আক্রমণ করছে, প্রার্থনাকারী ব্যক্তিদের হেনস্তা করছে। সরকারি নথি ও একাধিক সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে বলা যায়, অনেকে ক্ষেত্রেই ক্ষমতাসীন দলের সদস্য ও পুলিশ আক্রমণকারী ব্যক্তিদের সাহায্য করছে।’ এক্ষেত্রেও দেখলাম, পুলিশ প্রশাসনের উপস্থিতির মধ্যেও শতাধিক মানুষের প্রাণ হরণ হয়েছে; গির্জা, মন্দির অগ্নিদগ্ধ হয়েছে। প্রার্থনা করি, মণিপুরের মানুষের মধ্যে শান্তি ফিরে আসুক, ভ্রাতৃত্ব বিরাজ করুক;
স্রষ্টা প্রত্যেককে সুমতি দান করুন।






Users Today : 35
Views Today : 43
Total views : 177928
