জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগরে অধ্যাপক ড. মিল্টন বিশ্বাসকে উড়ো চিঠি দিয়ে হুমকি দেওয়া হয়েছে। বিগত ২৯ জানুয়ারি, ২০২৩ রবিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ডাকবক্সে চিঠিটি পাওয়া যায়। চিঠিতে অধ্যাপক ড. বিশ্বাসকে ‘মালাউন’ আখ্যায়িত করে হত্যার হত্যার হুমকি দিয়েছে। ড. মিল্টন বিশ্বাসকে চিঠির প্রতিটি লাইনে আক্রমণ করা হয়েছে, অপমানমূলক ও নিন্দনীয় শব্দগুলো ব্যবহার করে মানসিক ও শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত ও বিষাদগ্রস্ত করে তুলেছে। শুধু অধ্যাপক মিল্টন বিশ্বাসকে নয়, জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্পর্কে অসম্মানজনক, অসৌজন্যমূলক শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে দেশদ্রোহীর অপরাধও করেছেন। চিঠির বিষয়বস্তুতে লেখা হয়েছে, ‘বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর, জগৎশেঠ গং পুনর্জন্ম প্রেতাত্মা ড. মিল্টন বিশ্বাসের বিশ্বাসঘাতকতা মুসলমানের উপর গেবর লাগিয়ে হিন্দুস্থানের অংগরাজ্য বানানোর ষড়যন্ত্র’।
এম এ কাশেম, অধ্যক্ষ (অব.) ভাংগাবল্টু কলেজ, গোপালগঞ্জ থেকে প্রেরিত পত্রে অসংলগ্ন কথাবার্তা বর্ণিত থাকলেও ক্ষোভের, আক্ষেপের, হুমকির এবং সাম্প্রদায়িকতার চরিত্র বেরিয়ে এসেছে। ২০১৫ সালের ডায়েরির ৪টি পাতাতে লেখা চিঠির উপরে “হাচিনা কীর্ত্তন! ‘জয় বাংলা, জয় হিন্দ! জয় ভাংগা বল্টু, বন্দে মাতঃরাম বিষকন্যা শিখ হাচিনা’। আখেরী জামানার দজ্জাল হাচিনা এ দেশের মানুষ তাকে কেন চিনল না!” ইত্যাদি। জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে লিখেছে, ‘মীরজাফরের প্রেতাত্মা’ ‘ভয়ংকর সন্ত্রাসী’ ‘চাড়াল’ প্রভৃতি শব্দ ব্যবহার করে রাষ্ট্রদ্রোহীর অপরাধ করেছে। লাইনটানা কাগজে সূক্ষ্ম মস্তিষ্কে খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী অধ্যাপক ড. মিল্টন বিশ্বাসকে তথা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সতর্কীকরণ করেছে; অপরদিকে বর্তমান সরকার প্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর পিতা স্বাধীনতার স্থপতির সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাম্যের আদর্শের প্রতি ঘৃণ্যতার উদ্গীরণ করেছে। চার পৃষ্ঠার চিঠি বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি দিক উন্মোচিত হয় যে, যিনি বা যারা হুমকিমূলক চিঠি দিয়েছেন, নিঃসন্দেহে তাদের কাছে জাতিরজনক অগ্রহণযোগ্য, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকা-ের ঘোর বিরোধী, রাষ্ট্রের মতাদর্শের বিরোধী মতাদর্শের এবং সর্বশেষ ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু বিদ্বেষী।
প্রথমত—চিঠির শেষান্তের নাম-ঠিকানায় বোঝা যায়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পিতৃভূমি ও উন্নয়নের অন্যতম কেন্দ্র ফরিদপুরের ভাঙ্গা’কে ভেংচি দিয়েছে। সাধারণত বিরোধী পক্ষ বা বিরোধী মতের লোকজনই সত্যকে স্বীকার কিংবা সাদাকে সাদা ও কালোকে কালো বলতে পারেন না; দোষত্রুুটি খুঁজে বের করা নৈতিক কতর্ব্য বলে মনে করে। তবে আমাদের কাছে মনে হয়েছে, এরা শুধু বিরোধী পক্ষ নয়, দেশের স্বাধীনতায়, সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসী নন, এরা ছদ্মবেশী।
দ্বিতীয়ত—কম্পিউটার যুগে হাতে লিখে চিঠি পাঠিয়েছে, এটি একটি কৌশল। হাতে লেখা চিঠি গোয়েন্দা সংস্থার অভিজ্ঞদের দ্বারা কর্তৃক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যায়, মানসিকতা বোঝা যায়; অতঃপরও হাতে লেখার দুঃসাহস দেখিয়েছে। একজন ব্যক্তির অভিমত নয়, এটি অবশ্যই কোনো না কোনো গোষ্ঠীর অভিমতকে ব্যক্ত করে। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় লুকিয়ে থাকা রাষ্ট্রদ্রোহীদেরকে খুঁজে বের করা আবশ্যিক।
তৃতীয়ত—চিঠিতে লাল কালি দিয়ে আন্ডারলাইন ও লাল কালি দিয়ে কিছু অংশ লিখে চিঠির গুরুত্বতা বোঝানোর চেষ্টা করেছে। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের সতর্কীকরণ ও মালাউন শব্দ ব্যবহার অন্য ধর্ম ও জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বকে অস্বীকার করে। বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানে বর্ণিত ‘ধর্ম নিরপেক্ষতা’ বা ‘সম-মর্যাদা’ ও ‘সম অধিকারে’ তারা বিশ্বাস করেন না। উল্লেখ করা যেতে পারে, ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের শেষ ভাগে বিখ্যাত লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আপনার বাঙালি জাতীয়তার ভিত্তি কি কেবল ভূগোল আর ভাষা? বঙ্গবন্ধু জবাব দিয়েছিলেন, ‘না, কেবল ভূগোল বা ভাষা হলে তো আপনাদের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, ও বিহার-উড়িষ্যার অংশ বিশেষ দাবি করতাম। সে দাবি আমি করছি না। আমাদের বাঙালি জাতীয়তার ভিত্তি বাংলার সকল ধর্মের সকল বর্ণের মানুষের হাজার বছরের মিলিত সভ্যতা ও সংস্কৃতি। তাতে হিন্দু, বৌদ্ধ ও উপজাতীয় সভ্যতা-সংস্কৃতির যেমন ছাপ আছে, তেমনি আছে মুসলমানদের সভ্যতা-সংস্কৃতির মিশ্রণ। বর্তমানের ভারত একটি “পলিটিক্যাল ইউনিয়ন”। আর আমরা একটি “নেশন কালচার”।
চতুর্থত-বঙ্গবন্ধুর কর্মব্যাপ্তি, দর্শন ও চেতনা জাতিসংঘ ধারণ করেছে। ৬ ডিসেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদরদপ্তরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত ‘ইণ্টারন্যাশনাল ইয়ার অব ডায়ালগ অ্যাজ এ গ্যারাণ্টি অব পিস ২০২৩’ শীর্ষক রেজুলেশনের ১৪তম অনুচ্ছেদে ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’ উক্তিটি সন্নিবেশিত হয়েছে। ড. মিল্টন বিশ্বাস বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গবেষণায় নিমগ্ন হয়েছেন, জাতিকে উপহার দিয়েছেন—‘শিল্প সাহিত্যে বঙ্গবন্ধু’, ‘উপন্যাসে বঙ্গবন্ধু’, ‘কারাগারে বঙ্গবন্ধুর ৪৬৮২ দিন’। শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বাঙালির ওপর তার মেধাদীপ্ত তথ্য ও তথাদি উপস্থাপন এবং আলোচনা সত্যিই দুর্মুখদের অসহনীয় করেছে।
পঞ্চমত—প্রফেসর ড. মিল্টন বিশ্বাস একজন খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী। মেধা ও পরিশ্রমে দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষকতার পেশার পাশাপাশি গবেষণা ও পত্র-পত্রিকায় কলাম লিখে চলেছেন। ২০১১ খ্রিষ্টাব্দের আদমশুমারী অনুযায়ী, মোট জনসংখ্যার ০.৩% শতাংশ হচ্ছে খ্রিষ্টানুসারী। তিনি দেশের বিভিন্ন খ্রিষ্টান প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত থেকে অবদান রেখে চলেছেন, যেমন—‘খ্রিষ্টিয়ান কমিশন ফর ডেভেলপমেণ্ট ইন বাংলাদেশ’ (সিসিডিবি), ‘ইক্যুমেনিক্যাল খ্রিষ্টান ট্রাষ্ট’ (ইসিটি), দিশারী ফাউ-েশন, শ্যালোম ফাউ-েশন প্রভৃতি। একটি ছোট্ট ধর্ম গোষ্ঠী থেকে উঠে আসা জনাব মিল্টন বিশ্বাসকে হত্যার হুমকি সুদুর প্রসারী প্রভাব ফেলবে; মুক্ত চিন্তার ক্ষেত্রকে সীমাবদ্ধ করা ও মতামত প্রকাশে অন্যেরাও নিরুৎসাহিত হবে। নিজস্ব মতামত চাপিয়ে দেবার মনোভাব সরকারের আদর্শের সাথে দূরত্ব রয়েছে। কারা এরা, নিশ্চয়ই ধর্ম বিদ্দেষী!
একটি চিঠি সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দায়িত্বকে বাড়িয়ে দিয়েছে। একজন ধর্মীয় সংখ্যালঘুকে হত্যার হুমকি, জাতিগত সংখ্যালঘুর নিরাপত্তাহীনতা ঘটনাবলীকে ভ্রুণেই বিনষ্ট করা দরকার। প্রশাসনের দক্ষ ও কৌশলী কর্মকর্তাগণ খুঁজে বের করে আমাদেরকে আশ্বস্ত করবেন। দিয়াশলাইয়ের একটি কাঠিই দেশকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করতে পারে। সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষকে উপড়ে ফেলুন, এটিই সামগ্রিক উন্নয়নের প্রধান অন্তরায়। বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা বলেছিলেন, ‘…অস্ত্রের দিন ফুরাইয়া গিয়াছে। এখন ভালোবাসা আর মহব্বতের দিন। অস্ত্রই যদি সব করিতে পারিত, তাহা হইলে এতদিনে বিশ্ব আপনাদের পদানত হইত। কিন্তু হয় নাই’ (আজাদ ৪ জানুয়ারি, ১৯৭১)। আসুন, মানুষকে ভালোবাসি, প্রতিবেশীকে ভালোবাসি, দেশকে ভালোবাসি।
মিথুশিলাক মুরমু : গবেষক ও লেখক।





Users Today : 32
Views Today : 40
Total views : 177925
