৪ নভেম্বর বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানের সুবর্ণ জয়ন্তী। এ দিনে গণপরিষদে জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তৃতার পর দুপুর ০১:১০ মিনিটে বিপুল হর্ষধ্বনির মধ্য দিয়ে সর্বসম্মতিক্রমে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হয়। এদিনে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ সন্তান অত্যন্ত বলিষ্ঠ ও আবেগপ্রবণ হয়েই বলেছিলেন, ‘এই সংবিধান শহীদের রক্তে লিখিত। …এই সংবিধান দেশের সমগ্র জনগণের আশা-আকাঙ্খার মূর্ত প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হবে।’ স্বাধীনতার মহানায়ক আরো বলেন, ‘একটি জাতি হিসেবে বাঙালিরা ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে সংবিধান প্রণয়ন করল।’ তৎকালীন আইন ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী ড. কামাল হোসেন বলেছিলেন, ‘এই সংবিধান গণতান্ত্রিক উপায়ে এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেছে। এই সমাজ ব্যবস্থায় আইনের শাসন, জনগণের মৌলিক অধিকার, স্বাধীনতা, সাম্য এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে।’ গণপরিষদ কর্তৃক গৃহীত এ সংবিধান বিজয় দিবসের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দ থেকে কার্যকর করা হয়।
বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানীদের কারাগারের অর্গল ভেঙে মুক্ত বিহঙ্গের সাদৃশ্য ইউরোপ হয়ে ভারত এবং সোনার বাংলাদেশে পৌঁছিছিলেন। দিনটি ছিল ১০ জানুয়ারি, পরের দিন ১১ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি হিসেবে বাংলাদেশের অস্থায়ী গণপরিষদ আদেশ জারি করেন। এ গণপরিষদ বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন করে। আদেশ অনুসারে ৭ ডিসেম্বর ১৯৭০ এবং ১৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচিত প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদের সদস্যগণ গণপরিষদের সদস্য বলে বিবেচিত হয়। মৃত্যু এবং আইন অযোগ্য ঘোষিত হওয়ার ফলে উভয় পরিষদ মিলে সর্বমোট ৪৬৯ জন (জাতীয় আইন পরিষদের সদস্য ১৬৯ এবং প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ৩০০ জন) সদস্যের স্থলে ৪০৪ জন সদস্য নিয়ে গণপরিষদ গঠিত হয়। এই গণপরিষদের উপর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জন্য সংবিধান প্রণয়নের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। গণপরিষদ তার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একজন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করে। জারিকৃত গণপরিষদ আদেশের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়, ‘গণপরিষদ প্রজাতন্ত্রের লাগিয়া একটি সংবিধান প্রণয়ন করিবে।’ একমাত্র সংবিধান প্রণয়নের দায়িত্ব ছাড়া গণপরিষদের আইন প্রণয়নের কোনো ক্ষমতা অর্পণ করা হয়নি। ইতিপূর্বে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১০ এপ্রিল মুজিবনগরে গৃহীত বাংলাদেশের প্রথম অন্তঃবর্তীকালীন সংবিধান হলো ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র (চৎড়পষধসধঃরড়হ ড়ভ ওহফবঢ়বহফবহপব)। এ ঘোষণাপত্রের বিধান অনুযায়ী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্র আইনগতভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
১০ এপ্রিল, ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন বসে। অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনে আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ৩৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন করা হয়। ১৭ এপ্রিল ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে কমিটি প্রথম বৈঠক করে। এই কমিটি সংবিধান সম্পর্কে মতামত লাভের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে অনেকগুলো বৈঠক করে। খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটি সংবিধান সম্পর্কে বিভিন্ন মহল থেকে ৯৮টি প্রস্তাব ও সুপারিশ পায়। ১০ জুন ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে কমিটির শেষ বৈঠকে সংবিধানের প্রাথমিক খসড়াটি অনুমোদন করা হয়। ১১ জুন, ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে কমিটির সভাপতি প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করে খসড়া সংবিধানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে আলোচনা করেন। ১১ অক্টোবর কমিটি সর্বশেষ আলাপ-আলোচনা করে এবং সেদিনই সংবিধানের পূর্ণাঙ্গ চূড়ান্তভাবে গৃহীত হয়। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে তৈরি দুটি অফসেট মেশিনে সংবিধান ছাপা হয়। মূল সংবিধানের কপিটি বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। বাংলাদেশের সংবিধান শুরু হয়েছে প্রস্তাবনা দিয়ে ও শেষ হয়েছে ৭টি তফসিল দিয়ে। বাংলাদেশের সংবিধানে ১১টি ভাগ আছে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ/ধারা ১৫৩টি। বাংলাদেশের প্রথম হস্তলেখা সংবিধানের মূল লেখক আবদুর রাউফ। বাংলাদেশের সংবিধান কেবল বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইনই নয়, সংবিধান বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের মূল চরিত্র বর্ণিত রয়েছে। এতে বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমারেখা বিধৃত আছে। দেশটি হবে প্রজাতান্ত্রিক, গণতন্ত্র হবে এদেশের প্রশাসনিক ভিত্তি, জনগণ হবে সকল ক্ষমতার উৎস এবং বিচার বিভাগ হবে স্বাধীন। জনগণ সকল ক্ষমতার উৎস হলেও দেশ আইন দ্বারা পরিচালিত হবে। সংবিধানে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। মূল সংবিধান ইংরেজি ভাষায় রচিত হয় এবং একে বাংলায় অনুবাদ করা হয়। তাই এটি বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় বিদ্যমান। তবে ইংরেজি ও বাংলার মধ্যে অর্থগত বিরোধ দৃশ্যমান হলে বাংলারূপ অনুসরণীয় হবে। আমরা ভাগ্যবান যে, অল্প সময়ের মধ্যে একটি যুগত্তীর্ণ সংবিধান পেয়েছি। যুক্তরাষ্ট্রের মূল সংবিধান এক’শ দিনে লিখিত হলেও গৃহীত হতে সময় লেগেছে এক বছরেরও বেশি। ভারতের সংবিধান লিখতে সময় লেগেছে চার বছর। যুক্তরাজ্যে কতগুলো সর্বমান্য বিধান, চুক্তি ও আইনের মাধ্যমে সরকার এবং রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালিত হয়। তাদের লিখিত সংবিধান নেই।
সংবিধান লেখার পর এর বাংলা ভাষারূপ পর্যালোচনার জন্য ড. আনিসুজ্জামানকে আহ্বায়ক, সৈয়দ আলী আহসান এবং মযহারুল ইসলামকে ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসেবে একটি কমিটি গঠন করে পর্যালোচনার ভার দেয়া হয়। গণপরিষদ ভবন, যা বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন, সেখানে সংবিধান প্রণয়ন কমিটির বৈঠকে সহযোগিতা করেন ব্রিটিশ আইনসভার খসড়া আইন প্রণেতা আই গাথরি। সংবিধান ছাপাতে ১৪ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছিল। সংবিধান অলংকরণের জন্য পাঁচ সদস্যের কমিটি করা হয়, যার প্রধান ছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। এই কমিটির সদস্য ছিলেন শিল্পী হাশেম খান, জনাবুল ইসলাম, সমরজিৎ রায় চৌধুরী ও আবুল বারক আলভী।
গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রের দিবস স্মরণে ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ১০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয়। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ। খসড়া প্রণয়ন কমিটির সভাপতি এবং আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন খসড়া সংবিধানটি বিল আকারে সংসদে উপস্থাপন করেন। খসড়া সংবিধান প্রণয়নের জন্য এ কমিটিকে দুই মাস সময় দেওয়া হয়েছিলো। গণপরিষদের একমাত্র বিরোধী দলীয় সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বিলটি জনমত যাচাইয়ের জন্য প্রস্তাব করলে কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়। বিলটির ওপর আলোচনা শুরু হলে মোট ১৬৩টি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপিত হয়, যার মধ্যে ৮৪টি প্রস্তাব গৃহীত হয়। সংবিধানের মূল বাংলা পাঠ এবং ইংরেজিতে অনূদিত একটি অনুমোদন পাঠ স্পিকার কর্তৃক নির্ভরযোগ্য বলে সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়। ১৪ ও ১৫ ডিসেম্বর গণপরিষদের সংক্ষিপ্ত শেষ অধিবেশনে পরিষদ সদস্যগণ সংবিধানে বাংলায় হস্তলিখিত এবং শিল্পকর্মে অলংকৃত মূল কপিতে স্বাক্ষর করেন। সংবিধানে প্রথম স্বাক্ষর করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং এরপর সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দিন আহমদ স্বাক্ষর করেন। হাতে লেখা মূল সংবিধানে মোট ৩৯৯ জন গণপরিষদ সদস্যের স্বাক্ষর রয়েছে এবং চারজন সদস্য স্বাক্ষর করা থেকে বিরত থাকেন। স্বাক্ষর না করা সদস্য হলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, আজিজার রহমান, জালাল আহমেদ ও মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা। ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের বিজয় দিবসের প্রথম বাষির্কীতেই ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান’ নামে অভিহিত দেশের সর্বোচ্চ আইনের এই অমূল্য ঐতিহাসিক দলিলটি বলবৎ করা হয়।
বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানে আদিবাসীদের অধিকার কতোটুকু সংরক্ষিত হয়েছে! সংবিধানে ব্যক্তি মালিকানা, রাষ্ট্রীয় মালিকানা ও সমবায়ী মালিকানা বিষয়টি যুক্ত হলেও যৌথ মালিকানার বিষয়টি অদ্যাবধি এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। আদিবাসীদের অধিকার সূক্ষ্মভাবে অস্বীকার করা হয়েছে। পবিত্র সংবিধানে বসবাসরত আদিবাসীদের মাতৃভাষাকেও স্বীকার করে নেওয়া হয়নি। অনুচ্ছেদ ৩- এ বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। অথচ বাংলাদেশে চল্লিশের অধিক মাতৃভাষা প্রচলিত রয়েছে। আজ অবধি আদিবাসীরা মাতৃভাষার রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, ইতিমধ্যেই দুয়েকটি চরম হুমকির পর্যায়ে পৌঁছিছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট নির্মাণ করার পরও আমাদেরকে হতাশায় নিমজ্জিত হতে হচ্ছে। ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান’ এটি একটি সহজসাধ্য আপ্তবাক্য মনে হয়। দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্য ও অধিকারগুলোকে আরো সুনির্দিষ্টভাবে বাস্তবায়িত করতেই ‘বৈষম্য বিলুপ্ত আইন’ খসড়া বিল আকারে সংসদ উত্থিত হয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধনীতে সংবিধানের ২৩ ক. যুক্ত করা হয়েছে, ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’। অত্যন্ত রহস্যজনক বিষয় হচ্ছে— সরকার এখন পর্যন্ত সাঁওতালরা উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়-এর কোনটি, সেটি স্পষ্ট করে উল্লেখ করেনি। একইভাবে সমতল, দক্ষিণাঞ্চল কিংবা পাহাড়ি এলাকায় বসবাসরত আদিবাসীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য; তবে হ্যাঁ, কেউ-ই শব্দগুচ্ছগুলো গ্রহণ করতে পারেনি। আদিবাসীদের আত্মমর্যাদা, আত্মনিয়ন্ত্রণের বিষয়টি রাষ্ট্র গুরুত্বারোপ করেনি। সংবিধানের সুবর্ণ জয়ন্তীতে আদিবাসীদের অধিকারের বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনা আবশ্যিক।
মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদের রক্তস্নাত সংবিধান বারংবার সংশোধিত হয়েছে কিন্তু আদিবাসীদের প্রাণের দাবি, অধিকারগুলো অধরায় থেকে গেছে। শহীদের রক্তগঙ্গায় প্রবাহিত হয়েছে ইসলাম-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানসহ অন্যান্য ধর্মের জনগোষ্ঠীর; প্রবাহিত হয়েছে সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালী, মুন্ডা, কোল, গারো, খাসি, চাকমা, ত্রিপুরা, মারমা, বমদেরও। বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে শহীদ মিনার থেকে মশাল মিছিল শুরুর পূর্বে ঘোষণা করেছিলেন, ‘…আমরা চাই আমাদের মতোই পাঞ্জাবি, সিন্ধি, বেলুচ, পাঠানরা নিজ নিজ অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকুক।’ সত্যিই বিশাল হৃদয়ের মানুষ ছিলেন জাতির জনক। বেঁচে থাকলে হয়তো তিনি বলতেন, সাঁওতাল, উরাঁও, গারো, চাকমা, পাংখোয়া, মণিপুরী, রাখাইনরা নিজ নিজ অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকুক। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার প্রতি সনির্বদ্ধ অনুরোধ, আদিবাসীদের প্রতি যতœশীল হোক, অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার সুযোগ করে দিন।
মিথুশিলাক মুরমু : আদিবাসী গবেষক ও লেখক।





Users Today : 18
Views Today : 20
Total views : 175464
