বাংলাদেশের প্রায় ৭ লক্ষাধিক সাঁওতাল জনগোষ্ঠী ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী দ্রৌপদী মুরমুর নাম ঘোষণায় আনন্দে উদ্বেলিত হয়েছে। ভারতকে পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্তিক দেশ হিসেবে গণ্য করা হয়। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম দেশ ভারতে একজন সাঁওতাল নারী দেশের সর্বোচ্চ পদে আসীন হবে, কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে, সেটি কখনোই কল্পনীয় নয়।
বিগত ৩০ জুন ছিল মহান সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস। ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দে জুনে দেখা স্বপ্নের সত্যতা যেন স্বল্প হলেও রূপায়িত হতে চলেছে। মহান নেতা সিধু-কানু দেখেছিলেন, সাঁওতালরা একদিন রাজ্য চালাবে, রাষ্ট্র চালাবে; ঝাড়খণ্ড রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী একজন সাঁওতাল শ্রী হেমন্ত সরেন, আর পুরো ভারতের রাষ্ট্রপতি হতে চলেছেন শ্রীমতি দ্রৌপদী মুরমু। জুন মাসের স্বপ্ন জুনেই উন্মোচিত হয়েছে। ২১ জুন মঙ্গলবার বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডি’র তরফ থেকে তাকে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হিসেবে দ্রৌপদী মুরমু’র নাম ঘোষণা করা হয়।
ঝাড়খণ্ডের প্রাক্তন রাজ্যপাল দ্রৌপদী মুরমু নাম ঘোষণার পর অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন, ‘আমি যেমন বিস্মিত তেমনই খুশি। প্রত্যন্ত ময়ূরভঞ্জ জেলার একজন আদিবাসী মহিলা হিসাবে আমি দেশের শীর্ষ পদের প্রার্থী হওয়ার কথা ভাবিনি।’ রাষ্ট্রপতি হিসেবে নাম ঘোষণার পরই তাঁকে জেড প্লাস ক্যাটাগরির নিরাপত্তা দিচ্ছে ৬৪ বছর বয়সী শ্রীমতি মুরমুকে। রাষ্ট্রপতি হিসেবে নাম ঘোষণার ৭ দিন পর ২৭ জুন মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। ১৮ জুলাই রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে যশবন্ত সিনহা বিপরতীতে। বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জেপি নাড্ডা জানান, ‘এ দিন সংসদীয় বোর্ডের বৈঠকে ২০টি নাম নিয়ে আলোচনা হয়েছিলো। শেষ পর্যন্ত আদিবাসী নেত্রী মুরমুর নামে শিলমোহর পড়ে।’ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি টুইট করেছেন শ্রীমতি মুরমুকে টুইট বার্তায় লিখেছেন, ‘সমাজের সেবা, গরিব ও পিছিয়ে পড়া মানুষের উন্নয়নে দৌপদী মুরমু তাঁর গোটা জীবন উৎসর্গ করেছেন। প্রশাসনের অংশ এবং রাজ্যপাল হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবেও দারুন কাজ করবেন বলে আমি নিশ্চিত। যাঁরা প্রচণ্ড বাধা ও দারিদ্র্যের সম্মুখীন হয়েছেন তাঁরা দ্রোপদীর জীবন থেকে অনুপ্রেরণা পাবেন। বিভিন্ন সরকারি নীতি নিয়ে তাঁর ভাবনা চিন্তায় উপকৃত হবে দেশ।’
শ্রীমতি দ্রৌপদী মুরমুর জীবন সংগ্রাম সত্যিই অনুপ্রেরণামূলক, তাঁর বেড়ে ওঠা ও রাজনৈতিক জীবনে প্রবেশ এবং সিড়ি বেয়ে শীর্ষে আরোহন নারী, পিছিয়েপড়া ও জনজাতির জন্য হিমালয় জয়ের সম মনে হতে পারে। জন্মেছেন দরিদ্র সাঁওতাল পরিবারে ওডিশার ময়ূরভঞ্জ জেলার বৈদাপোসি গ্রামে। সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত গ্রামের বিদ্যালয়েই পড়াশোনা। ওই সময় থেকেই মাথায় ঘোরপাক করত পড়াশোনা করে এগুতে হবে অনেক দূর। পড়াশোনা করে চাকরি, পরিবারের হাল, সমাজের হাল ধরতে হবে। একদিন ওই অঞ্চলে এক মিটিংয়ে রাজ্যের এক মন্ত্রী এলেন। সদ্য সপ্তম শ্রেণীতে ওঠা মেয়েটি সে সময়ের ম্যাট্রিক পাশ ঠাকুরমার অনুপ্রেরণায় এবং বাবার পরামর্শে নিজের সমস্ত সার্টিফিকেট নিয়ে ছুটে গেল মন্ত্রীর কাছে। মিটিংয়ের মাঝেই দৌড়ে হলে প্রবেশ করে মন্ত্রীর হাতে সার্টিফিকেটগুলো জমা করে কাতর স্বরে বলল, আমি আরও পড়তে চাই। শহরের ভাল স্কুলে পড়াশোনা করতে চাই। মন্ত্রীর উদ্যোগে মেয়েটি প্রথমবার দেখল শহর, ভর্তি হলো শহরের স্কুলে। কলেজের গণ্ডিও পার করলেন। পড়াশোনা শেষ করে ‘সাঁওতাল পরিবারের মেয়ে চাকরি করবে’ সুলভ অজস্র কটুবাক্য নীরবে মাথায় নিয়ে যোগ দিলেন চাকরিতে। ইতিমধ্যেই বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হয়েছেন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের আধিকারিক শ্যামচরণ মুরমু’র সাথে। বাড়ির বউ চাকরি করবে, এতে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের ঘোর আপত্তি। হেরে গেলেন দ্রৌপদী কিন্তু মন থেকে গ্রহণ করতে পারেননি। চাকুরি ছেড়ে দিয়ে ঘরকন্নার কাজ শুরু করলেন, এরই মধ্যে সংসারে পর পর দু দু’টি পুত্র সন্তান ঘরকে আলোকিত করে; জন্ম নেয় আরেকটি কন্যা সন্তান। সন্তান-সন্ততিরা বড়ো হতেই সংসার গুছিয়ে পুনর্বার যোগ দিলেন স্কুলের চাকুরিতে, এটি ছিল একেবারেই স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষক হিসেবে। দ্রৌপদী তার অসীম দক্ষতা, অদম্য ইচ্ছা এবং অজেয়কে জয় করার মানসিকতাকে সম্বল করে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের চোখের মণিতে পরিণত হন। শিক্ষার্থী, অভিভাবকদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে জড়িয়ে পড়েন সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে। ভালো কাজের পুরস্কার আসবেই, ভালো কাজ কারো না কারো চোখে পড়বেই পড়বেই। একদা সেই মন্ত্রীর এক বন্ধু রাজনীতিকের নজরে পড়ে দ্রৌপদীর কাজকর্ম। তিনি ক্রমাগত দ্রৌপদীকে অনুরোধ করতে থাকেন রাজনীতিতে যোগ দিতে যাতে তাঁর জনপ্রিয়তার ওপর ভর করে ভোট বৈতরণী পার হওয়া যায়। দ্রৌপদী নাছোড়বান্দা। রাজনীতির বাইরে থেকেই সমাজের জন্য কাজ করতে চান, ক্রমাগত অনুরোধ-উপরোধ উপেক্ষা করতে না পেরে স্বামী শ্যামচরণ মুরমুর পরামর্শে ১৯৯৭ সালে ময়ূরভঞ্জের নোটিফায়েড এরিয়া কাউন্সিলের পদে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন ভারতীয় জনতা পার্টি ব্যানারে। বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে ওই বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান মনোনীত হন।
শ্রীমতি মুরমু অত্যন্ত সন্তোষজনকভাবে কাউন্সিল মেয়াদ পূর্ণ হতেই দলের অনুরোধে ২০০০ সালে বিজেপি-বিজেডি জোটের হয়ে বিধান সভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তাঁর চিন্তা, পরিকল্পনা, মানব কল্যাণমূলক কাজের সফলতা বিপুল জনপ্রিয়তায় প্রথমবার বিধায়ক হয়েই পরিবহন দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এবার এলো আসল চ্যালেঞ্জ। এক সাঁওতাল নারী মন্ত্রীত্ব সামলাবেন। তাবড় আইএএস অফিসার, দপ্তরের কর্মীদের ভ্রূকুটি উপেক্ষা করে দিনরাত পড়াশোনা করে কিছুদিনের মধ্যেই কাজের গতিপ্রকৃতি বুঝে নিলেন। চার বছরে চারটি দপ্তরের মন্ত্রীত্ব সামলালেন। ২০০৪’র বিধানসভা নির্বাচনে জোট ভেঙে গেল। বিজেপির ভরাডুবি হলো, নবীন পত্তনায়ের বিজেডির কাছে। এই কঠিন সময়েও দ্রৌপদী মুরমু বিজেপির টিকেটেই আবারও বিধায়ক হলেন। কিন্তু হেরে গেলেন ২০০৯’র বিধানসভায়। শহরে পাঠরত দুই ছেলেকে বললেন, তোমরা ভুবনেশ্বরে থেকেই পড়াশোনা করো, আমি আবার গ্রামে ফিরে গিয়ে তৃণমূল স্তরে মানুষের জন্য কাজ করতে চাই আগের মতোই। পুরোনো গ্রামে ফিরে আবার ডুবে গেলেন সমাজসেবার কাজে। কিছুদিনের মধ্যেই এক সকালে খবর পেলেন বড় ছেলে আর নেই। ভেঙে পড়লেন শোকে। সামলে ওঠার জন্য ডুবে গেলেন কাজের মধ্যে আরও বেশি করে। ২০১৪’র এক অভিশপ্ত রাতে ছোটো ছেলেটিও সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই মানসিক অবসাদে ডুবে গেলেন। স্ত্রীর স্নায়বিক শক্তি অসীম হলেও পুত্রশোক নিতে পারেন স্বামী। কিছুদিনের মধ্যেই তিনিও পরলোকগমন করলেন। তার কয়েকদিন পর দ্রৌপদীর মা ও দাদা। একবছরে এতোগুলো মৃত্যু মেনে নিতে পারলেন না। শেষ অবলম্বন হিসেবে জড়িয়ে ধরলেন যোগ এবং আধ্যাত্মিকতাকে, সাথে আরো বেশি করে নিজেকে নিয়োজিত করলেন সমাজের কাজে। স্বামী-সন্তানহারা এক মা হয়ে উঠলেন অনেক অনেক আদিবাসী সন্তানের।
শ্রীমতি দ্রৌপদী মুরমুর কাজের দ্যুতি ও উজ্জ্বলতা ছড়িয়ে পড়ে দিক-দিগন্তে। দৃঢ়চেতা মনোবল, সংকল্পিত চেতনা ও সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছানোর যে শক্তি, এটি যেন শোকেরই অপর পিঠ। শত ঝড়-ঝঞ্ঝাকে আমলে না নিয়ে তর তর করে এগিয়ে গিয়েছেন, এগুলোকে তিনি জীবনের একটি অংশ হিসেবে মনে করেন। ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দে কেন্দ্রীয় সরকার ঝাড়খণ্ডের রাজ্যপাল হিসেবে মনোনীত করেন, আদিবাসী অধ্যুষিত ঝাড়খণ্ডের প্রথম মহিলা রাজ্যপাল এবং ওড়িশা থেকে উঠে আসা প্রথম আদিবাসী রাজ্যপাল হিসেবে যোগ্যতার স্বাক্ষরতা রেখেছেন। ২০২১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত অত্যন্ত সুচারুরূপে দায়িত্ব সম্পন্ন করে অবসরে ফিরে যান। একজন সজ্জন ব্যক্তি হিসেবেই পরিচিত, রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে নেই কোনো কালিমা; বরং রয়েছে প্রাপ্তির ঝুলিতে আদর্শতা, আপোষহীন একজন কর্মবীরের উপাধি। দ্রৌপদীই হতে চলেছেন ভারতবর্ষের প্রথম মূলনিবাসী এবং স্বাধীনতা পরের প্রজন্ম রাষ্ট্রপতি। ভারতের ইতিহাসে দ্রৌপদী মুরমু দ্বিতীয় নারী রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হতে চলেছেন। আর আদিবাসী হিসেবে বোধকরি তিনিই প্রথম। ইতিপূর্বে আরেকজন আদিবাসী গারো জাতিগোষ্ঠীর এবং সাবেক স্পিকার পি.এ সাংমা রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। পি. এ সাংমা প্রথম বাঙালী রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী’র কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে বরাবরই চমক দিয়েছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত—ড. জাকির হোসেন হলেন প্রথম মুসলিম রাষ্ট্রপতি; শিখ জাতিগোষ্ঠী থেকে জ্ঞানী জৈল সিং (Giani Zail Sing) হচ্ছেন প্রথম রাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রপতি কে. আর. নারায়ন হচ্ছেন অবহেলিত দলিত জনগোষ্ঠী থেকে প্রথম, তাঁর হাত ধরেই বর্তমান রাষ্ট্রপতি রামানাথ কোবিন্দ রাষ্ট্রীয় পদে সমাসীন হয়েছেন। এ পি জে আব্দুল কালাম হচ্ছেন প্রথম বিজ্ঞানী, যিনি রাষ্ট্রপতির পদ অলংকৃত করেছেন।
১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দের ২০ জুনে মাসে জন্ম নেওয়া দ্রৌপদী মুরমুর নাম রাষ্ট্রপতি হিসেবে উঠে আসায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শ্রীমতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বিধান্বিত হয়ে বলেছেন, ‘আমাকে আগে থেকে দ্রৌপদীর নাম (বিজেপি) বলেনি। আগে থেকে যদি জানাত যে একজন আদিবাসী মহিলাকে বিজেপি প্রার্থী করছে, তাহলে আমরাও চেষ্টা করতাম। বৃহত্তর স্বার্থে ১৭টি দল মিলে একটা সিদ্ধান্ত ঐক্যমতের ভিত্তিতে হয়ত নেওয়া যেতে পারত।’ আদিবাসী সাঁওতালদের নিয়ে বরাবরই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বেশ সংবেদনশীল। বিগত বছরসহ কয়েকবার বিশ্ব আদিবাসী দিবসে জনসম্মুখেই সাঁওতাল নারীদের সাথে নাচে তাল মিলিয়েছেন। তার মন্ত্রীসভাতে বেশ কয়েকজন আদিবাসী সাঁওতাল নারী দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। এছাড়াও অত্যন্ত গর্বের সাথেই বলে থাকেন, ‘পশ্চিমবঙ্গই ভারতের একমাত্র রাজ্য, যেখানে জনজাতির সাঁওতালি ভাষায় পড়াশোনার ব্যবস্থা রয়েছে।’ এখন দেখার বিষয় হচ্ছে, আগামী ১৮ জুলাই নির্বাচনে ভোটের পাল্লা কোনদিকে ভারী হচ্ছে!
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ফয়সালা হবে লোকসভা ও রাজ্যসভার এমপি-এমএলএদের বিশেষ পদ্ধতির ভোটে। এবার এ রকম ভোটার এমপি আছেন ৭৭৬ জন, প্রদেশ ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল মিলে এমএলএ আছেন ৪ হাজার ১২৩ জন। লোকসভায় জনজাতির জন্য সংরক্ষিত ৬৩ আসন রয়েছে। ভোটের যে সমীকরণ, তাতে বিজেপি প্রার্থীই জিতবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। শ্রীমতি দ্রৌপদী মুরমু রাষ্ট্রপতি পদে জিতলে ভারতসহ বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটানের সাঁওতালদের আত্মবিশ্বাস, দেশকে দেবার মনোভাব বেড়ে যাবে। দ্রৌপদী জিতলে তিনিই হবেন প্রথম ওডিশা রাষ্ট্রপতি।
মিথুশিলাক মুরমু : আদিবাসী বিষয়ক গবেষক ও লেখক।





Users Today : 148
Views Today : 155
Total views : 177558
