উত্তরাঞ্চলের প্রাচীন শহর রাজশাহী। রাজশাহীর বরেন্দ্রভূমিতে বসবাস করছে সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালী, মুণ্ডা, রাজোয়াড়, মালপাহাড়িয়া, কডা, কোল, ভূঁইয়া, ভূঁইমালী, কর্মকার, তেলী, তুরি, পাহানসহ আরো অনেক জনগোষ্ঠী। এই ভূমিপুত্রের মাতৃভাষা আলাদা আলাদা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং রীতিনীতিও স্বতন্ত্রতা রয়েছে। প্রত্যেকের টেরিটোরিও আলাদা। গোষ্ঠীবদ্ধ আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোর জীবনচক্রে বৈশি^ক আর্থ-সামাজিক প্রভাব প্রবলভাবে প্রতীয়মান হয়েছে। হয়ত এই বৈশি^ক প্রেক্ষাপটেই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষাগুলো সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে যেতে অক্ষম বা সেটিকে যুগোপযোগী করা আবশ্যিক। নিজ জনগোষ্ঠী থেকে কেউ-ই ভাষা রক্ষার মতো কঠিন ব্রত নিয়ে বেরিয়ে আসেনি, আসাও সম্ভব নয় কারণ ভাষাকে বোঝার মতো, বিজ্ঞানভিত্তিক করে জাতির সম্মুখে হাজির করা সরকারের সহযোগিতা ব্যতীত সম্ভব নয়।
ভাষা হৃদয়ের কথাগুলো ব্যক্ত করে। মৌখিক ভাষার লিখিতরূপ না হলে এক সময় ভাষার মৌলিকত্বতা হারিয়ে যায় এবং সেটির সম্ভাবনাই সর্বাধিক। বরেন্দ্রাঞ্চলের এই আদিবাসী জাতিগোষ্ঠগুলোর দুয়েকটি ব্যতীত কোনোটিরও বর্ণমালা নেই। তাহলে সহজেই অনুমিত হয় যে, মৌখিক মাতৃভাষায় বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি ইত্যাদির অনুপ্রবেশ ঠেকানো থেকে গ্রহণের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ছে। নিজ মায়ের ভাষার প্রতি অবহেলা এবং পারিপাশির্^কতায় না চাইতেই ঘরের অন্দরমহল পর্যন্ত মাতৃভাষার নির্বাসনই পাকাপোক্ত হচ্ছে। ভাষার মৃত্যুকে ঠেকাতে আদিবাসী জাতিসত্ত্বার আগ্রহ, ইচ্ছা,আকাক্সক্ষার থেকেও বেশি অগ্রণী ভূমিকা রাখা দরকার সরকারের। বাংলাদেশসহ বিশে^র মাতৃভাষাগুলোকে রক্ষার, সংরক্ষণ ও লালন-পালনের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট’। ইনস্টিটিউটের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ইত্যাদি পর্যালোচনা করলে সুস্পষ্ট হওয়া যায়, ইনস্টিটিউট সরকারের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে পারে নাই।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুুজিবুর রহমান তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে মাতৃভাষা সম্পর্কে সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, ‘…পাঞ্জাবের লোকেরা পাঞ্জাবি ভাষা বলে, সিন্ধুর লোকেরা সিন্ধি ভাষায় কথা বলে, সীমান্ত প্রদেশের লোকেরা পশতু ভাষায় কথা বলে, বেলুচরা বেলুচি ভাষায় কথা বলে। উর্দু পাকিস্তানের কোনো প্রদেশের ভাষা নয়, তবুও যদি পশ্চিম পাকিস্তানের ভায়েরা উর্দু ভাষার জন্য দাবি করে, আমরা আপত্তি করব কেন?… যেকোনো জাতি তার মাতৃভাষাকে ভালোবাসে। মাতৃভাষার অপমান কোনো জাতিই কোনোকালে সহ্য করে নাই।’ স্বাধীনতার স্থপতি বাংলার সাথে উর্দুকেও পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে দাবি করেছিলেন। মাতৃভাষার জন্যে বাংলার দামাল ছেলেরা বুকের রক্ত দিয়ে মাতৃভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, সেই বাংলা আজ আমাদের রাষ্ট্রভাষাই নয়, অন্যান্য রাষ্ট্রের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে।
বাংলাদেশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে প্রতীয়মান হয়েছে, প্রথম শহীদ মিনার নির্মিত হয়েছে রাজশাহীর প্রাণকেন্দ্র ‘রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় কলেজ’ অভ্যন্তরে। ভাষা শহীদের স্মরণে এটিই প্রাণিধানযোগ্য কিন্তু এখন পর্যন্ত ইতিহাসটি পরিস্ফূটিত হয়নি। রাজশাহীবাসী অপেক্ষার পালা ক্রমশই দীর্ঘায়িত হচ্ছে, আজ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারটি শারীরিকভাবে দৃশ্যত হয়নি। ঊষরভূমির শহীদ মিনার যেমন অত্র এলাকার আশা-আকাক্সক্ষা, ইতিহাসকে জীবন্ত করে তোলার ভূমিকা রয়েছে; অনুরূপভাবে বরেন্দ্রাঞ্চলের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা রক্ষারও দায়িত্ববোধকে অস্বীকার করা যায় না। মাতৃভাষা রক্ষার দাবিতে রাজশাহীর সোচ্চারিত কণ্ঠ ভাষা আন্দোলনকে আরো বেগবান করেছিলো। সময়ের কালক্রমে সেই চেতনা, উদ্দীপনা ও উচ্ছ্বলতায় যেন ভাটা পড়েছে। বোধ করি, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মাননীয় মেয়র, স্থানীয় সাংসদ ভাষা শহীদের প্রতি যর্থাথ সম্মান প্রদর্শনে দ্রুতই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণে ভূমিকা গ্রহণ করবেন। সেই সাথে বরেন্দ্রভূমির কেন্দ্রস্থল রাজশাহীর মেয়র, সাংসদদের নৈতিক দায়িত্বও রয়েছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষা সংরক্ষণের ও প্রচলনের।
বিলুপ্ত প্রায় মৌখিক মাতৃভাষাকে লিখিতরূপ দিতে ব্যর্থ হলে কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে ভাষার ঐশ^র্যতা, শৈল্পিক চেতনা, সংস্কৃতির সমৃদ্ধ ভা-ার। সাঁওতাল ব্যতিত প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর সংখ্যাও দ্রুতই হ্রাস পাচ্ছে, এটিই হচ্ছে সবচেয়ে রেড সিগন্যাল। অপরদিকে সংখ্যাধিক্য সাঁওতালদের মাতৃভাষার বর্ণমালা নিয়ে বির্তক নিজের পায়ে কুড়াল মারার সামিল। আভ্যন্তরীণ কোন্দলে নিজ থেকেই মাতৃভাষার মৃত্যুকে নিশ্চিত করতে চলেছে। ভাষা শহীদের মাটির সন্তানদের মাতৃভাষা রক্ষায় আসুন ঐক্যবদ্ধ হই, সচেতনতা গড়ে তুলি এবং সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিই।
মিথুশিলাক মুরমু : আদিবাসী বিষয়ক গবেষক ও লেখক।





Users Today : 67
Views Today : 68
Total views : 177471
