মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল প্যালেস্টাইন বিরোধ-সংঘর্ষ বিশ্ব শান্তির জন্য একটি বড়ো ধরনের অন্তরায় এবং বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তপ্ত মরুভূমি আদম সন্তানের রক্তের হলি খেলা মধ্য দিয়ে যুগ যুগ ধরে মানবতা মাথা ঠুকে মরছে। নির্যাতিত-নিপীড়িত সৃষ্টিকর্তার এই সৃষ্টি পৃথিবীর বুকে বসবাসরত একটি জাতি গোষ্ঠি ফুঁপে ফুঁপে কেঁদে বলে, ‘হে বিশ্ব বিবেক! আর কতকাল আমরা নিজ ঘর পরবাসের মত জীবন কাটাবো, আর কত কাল রক্ত ঝরবো, আর কত কাল স্বাধীনতার জন্য লড়াই করে যাব। আমাদের আর্তি আহাজারি তোমরা কি শোন না।’ প্রিয় পাঠক সত্যি তাই? আজো বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রের শাসক শ্রেণী প্যালেস্টাইনবাসীর অধিকার স্বাধীনতার বিষয়ে ঐক্যমত হয়ে এর সমাধানের প্রয়োজনীয় ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসতে পারেনি।
পরস্পর শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো যদি আন্তরিক হয়ে এগিয়ে আসত তবে হয়ত কবে এর একটা সমাধান হয়ে যেত। কথিত বৃহৎ শক্তি রাষ্ট্রগুলো ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় এই বিরোধ জিইয়ে থাকার কারণে ইজরাইল প্যালেস্টাইন সংঘর্ষে রক্তপাতের ধারাবাহিকতা আজও বয়ে চলছে। গত ঈদ-উল-ফিতেরর আগে থেকেই জেরুজালেম মসজিদকে কেন্দ্র করে ও ইসরাইলের নতুন বসতি স্থাপন নিয়ে প্যালেস্টানদের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে ইসরাইল। এই ঘটনায় প্যালেস্টানদের বিরুদ্ধে একটি অসম যুদ্ধ শুরু করে যা বিশ্ববাসী উদ্বিগ্ন ও উৎকণ্ঠাভরে অবলোকন করেছে। টানা ১১ দিনের এই সময় যুদ্ধে প্যালেস্টাইনের ২৩২ জন নিহত ও বিপুল সম্পদের ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্য দিকে ইসরাইলের মাত্র ১২-২০ জন্য নিহত হয়।
প্যালেস্টাইনের তুলনায় ইসরাইলের ক্ষতির পরিমাণ কম যদিও উভয় পক্ষে তাদের জয় হয়েছে বলে দাবি করেছে। অবশেষে মিশরের মধ্যস্থতায় এবং একটি শক্তিধর রাষ্টের হস্তক্ষেপে ইসরাইল প্যালেস্টাইন যুদ্ধ বিরতি হয়। চলমান ওই যুদ্ধে শক্তিশালী আমেরিকার প্রেসিডেন্ট তাদের পূর্বসুরীদের মতো বলে থাকেন ইসরাইলের আত্মরক্ষার অধিকার আছে। আর যার কারণে লক্ষ করা গেছে ইসরাইল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যভাবে তাদের অস্ত্র সরবরাহ করে থাকে। পাশাপাশি প্যালেস্টইনেরও যে আত্মঅধিকার আছে একথা বলে কেউ প্যালেস্টাইনকে প্রকাশ্যে অস্ত্র দিতে দেখা যায় না। আর যার ফলে আমরা বিশ্ববসী দীর্ঘকাল ধরে দেখে আসছি ইসরাইল-প্যালেস্টাইন যুদ্ধ যেন একটি প্রহসনমূলক যুদ্ধ, যা বিশ্বের মানচিত্রে অব্যাহত হয়ে চলছে। বড়োই পরিতাপের সাথে বলতে হয় যে, বিশ্বের শাক্তিশালী ও নেতৃত্বধারী ও মোড়ল হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্র গত বছরেও ইসরাইলকে ৩৮০ কোটি ডলার দিয়েছে।
সত্যি কথা বলতে কি ১৯৪৮ সাল থেকে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে তাকে আর্থিক ও অত্যধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত করেই চলছে। এবারও জো বাইডেন ক্ষমতাই এসেই পূর্বসুরীদের মতো অস্ত্র বিক্রির প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। যদিও স্থগিত করার দাবি তুলেছিলেন সিনেটর স্যান্ডারসসহ কংগ্রেসের কয়েকজন নেতা। এতে প্রতিয়মান হয় যে, যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে চুক্তিভিত্তিক ক্রয়করা অত্যধুনিক অস্ত্রে ইসরাইলকে দিয়ে আসছে, পূর্বসুরীদের মতোই জো বাইডেন যার ধারবাহিকতা রক্ষা করে চলেছেন। যার কারণে কংগ্রসের সিনেটররা এই অভিযোগ তুলেছেন। এটা অত্যন্ত আশ্চর্য মনে হয় বিশ্ব শান্তিকামী মানুষের এবং বিশ্বের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের যে-বিগত জানুয়ারি মাসের জো বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন হয়ে পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্যালেস্টাদের জন বন্ধ করা অনুদান সেটা তিনি পুনর্বহাল করেছেন। এছাড়া সাকেক প্রেসিডেন্ট ট্যাম্পের আমলে যে সমস্ত অভিবাসীকে আমেরিকা থেকে বহিস্কারাদেশ দিয়েছিলেন তিনি ক্ষমতায় এসে তাৎক্ষণিকভাবে ওই আদেশ প্রত্যাহার করেন।
অভিবাসী বিষয়ে তিনি এক উদার নীতি অনুসরণ করেন। যার কারণে অভিবাসীরা এ ব্যাপারে তাঁর নিকট কৃতজ্ঞ। কিন্তু প্যালেস্টাইনদের ব্যাপারে তাঁর পররাষ্ট্র নীত পূর্বসুরীদের থেকে কিছু হলেও ব্যতিক্রম হবে এটাই বিশ্ববাসী আশা করেছিলেন। কিন্তু তার আমলেও নতুনভাবে ইসরাইলকে অস্ত্র অনুমোদন করে ইসরাইল প্যালেস্টাইনের মধ্যে শান্তির পরিবর্তে উত্তেজনা সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। যদিও যুদ্ধ বিরতির পর প্যালেস্টাইনে যুদ্ধ বিদ্ধস্ত পরবর্তী পুনর্গঠনে আর্থিক সহায়তা করার জন্য অনুদান ঘোষণা করেছেন। পাশাপাশি দুটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে সব সমস্যার সমাধান হবে বলে ঘোষণা করেছেন অর্থাৎ ইসরাইল রাষ্ট্রের বাস্তবতা মেনে এই সমাধানের কথা ব্যক্ত করেছেন। যদিও শান্তির পথে দুটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতাকে এর পথ খুঁজছেন এবং বাইডেনের এই বিবৃতি দুটি রাষ্ট্রে স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে মধ্য প্রাচ্যের ইসরাইল-প্যালেস্টাইন বিরোধের চির অবসান ঘটানো। যদিও বিশ^বাসী মনে করে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থীতিশীলতার জন্য সংঘর্ষে লিপ্ত এই দুটি জাতির মধ্যে এ ধরনের উদ্যোগ হওয়া প্রয়োজন।
তবে কতটুকু এই সমস্যা সংকটের পথ পেরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নির্যাতিত প্যালেস্টাইন জাতি তাদের ইসরাইল কর্তৃৃক দখলকৃত ভূমি ফিরিয়ে নিয়ে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম নিয়ে ফিলিস্তিনি জনগণের দুঃখ-দুর্দশার মুক্তি হবে। এটাই সারা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের কামনা। যদিও আমেরিকার ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট বাইডেন বলেছেন, দুটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতার কথা কিন্তু বাস্তবে কতটুকু প্রয়োগ হবে। ইসরাইল তো জবরদখলের মাধ্যমে তাদের রাষ্ট্রের গোড়া পত্তন করেছে বহু পূর্ব থেকেই। কিন্তু প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র বিষয়টি ইসরাইল ও তার আশীর্বাদপুষ্ট শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো কি আদৌও মাথা ঘামাবে, নাকি মুখোরোচক সস্তা বিবৃতির মধ্য দিয়ে সব শেষ করবেন। এই কারণে এই প্রসঙ্গটা তুলতে হচ্ছে যে অতীতে মধ্যপ্রাচ্যে ঘটে যাওয়া ইসরাইল-প্যালেস্টাইন নাটকের অভিজ্ঞতা দেখে। তাহলে পিছনের ইতিহাসের দিকে ফিরে যায়, ইসরাইল প্যালেস্টাইন দ্বন্দ্ব অবসানে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সময় আমরা দেখেছি তিনি এক মহৎ উদ্যোগী হয়ে এই সংকট উত্তরণের জন্য বিবদমান দুুটি জাতির মধ্যে শান্তি স্থাপনে তৎকালীন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক রবিন ও পি.এল.ও নেতা ইয়াসির আরাফাতের মধ্যে সৌহার্দ স্থাপনের ইসরাইল রাষ্ট্র ও পাশাপাশি স্বাধীন প্যালেস্টাইন গঠনে যাবতীয় ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার জন্য পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই দেখা গেল বড়ো দুঃখপূর্ণ ঘটনা আইজ্যাক রবিন এক আততীয়ের গুলিতে নিহত হয়েছেন।
সম্ভবত তার পরের ঘটনা পি.এল.ও নেতা এবং দীর্ঘকালের প্যালেস্টাইনের আন্দোলন সংগ্রামের বয়ঃজ্যেষ্ঠ নেতার রহস্যজনক মৃত্যু। তার পর থেকে বিল ক্লিনটনের সেই শান্তি চুক্তি হিমঘরে পড়ে রইল এবং পি.এল.ও’র নিষ্ক্রিয়তার মধ্যে দিয়ে হামাসের উত্থান ঘটানো। তারপর থেকেই হামাস ও ইসরাইল বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধলে ইসরালের কাছে যুগপযাগী অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত থাকায় হামাস অনুন্নত অস্ত্র নিয়ে ইসরাইলের সাথে টিকে থাকা দুরূহ হয়ে পড়ে। হামাস কেবল মনোবল ও শক্তি নিয়ে টিকে আছে। আর সেই কারণে বিশ্ববাসী এ পর্যন্ত দেখে আসছে এক অসম যুদ্ধের খেলা। যার পরিণতি প্যালেস্টাইনদের রক্তে ভাসে ধূসর মরুভূমি। ইসরাইল খুব কৌশলে বিশ্ব রাজনীতিতে হামসকে সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যা দিয়ে প্যালেস্টাইনবাসীর স্বাধীনতা ও অধিকারের আন্দোলনকে সুকৌশলে আড়ালের মধ্য দিয়ে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলার মনোভাব সৃষ্টি করে প্যালেস্টাইনবাসীর অবশিষ্ট ভূ-খণ্ড দখলদারিত্ব নিতে চায়। তা না হলে ইসরাইলের আশীর্বাদ পুষ্ট যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শাসনামলের শেষের দিকে জেরুজালেমকে ইসরালের রাজধানী করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন কেন? যদিও ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের অনেক দেশ তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন। পাশাপাশি এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে প্যালেস্টাইনদের রক্ত ঝরাতে হয়েছে।
এতে প্রতিয়মান হয় যে, ইসরাইল কতটুকু আন্তরিক প্যালেস্টাইনদের অধিকার বুঝিয়ে দিতে তাদের স্বাধীনতায় বিশ্ববাসী হয়। এদিকে সম্প্রতি জাতিসংঘ ২১ মে যুদ্ধ বিরতির পর গাঁজায় ইসরালের আইন বহির্ভূত হামলা ও সেখানে সহিংসতার কারণে আন্তর্জাতিকভাবে তদন্তের পদক্ষেপ নিয়েছে। আমরা আশা করবো বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো নিরপেক্ষ তদন্তের মধ্য দিয়ে যুদ্ধপরাধের বিচারের সম্মুখীন করবে। যদিও জাতিসংঘের অধিকাংশ রাষ্ট্রের সদস্য গাজায় এই গণহত্যার বিরুদ্ধে ভোটাভুটি দ্বারা নিজেদের মতামত প্রকাশ করেছেন। আমরা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ তাদের এই মহান উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। পাশাপাশি আমরা আরও আশা করব দীর্ঘদিন ধরে জিইয়ে থাকা এই প্যালেস্টাইন-ইসরাইল বিরোধের সমাধান হওয়া। তা না হলে প্যালেস্টাইন-ইসরাইলকে কেন্দ্র করে বিশ্বেরএকটি রাজনৈতিক মেরুকরণ সৃষ্টি হতে পারে। আর তার আলামত যে শুরু হয়নি তা নয়।
আমাদের সকলকে বুঝতে হবে এই বিশ্ব কারও একক শক্তির নয়, যে কারও দম্ভ শক্তির আধিপত্তে যা ইচ্ছে তাই করবে এবং একক সিদ্ধান্তে কারও প্রতি একপেপেশে মনোভাব দেখাবে। এমন হলে বিশ্ব মহাবিপর্যয়ে নিপতিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তথা বিশ^ শান্তি ব্যাঘাত ঘটানোর মধ্য দিয়ে হিংসা প্রতিহিংসার জন্ম হয়। একে কেন্দ্র করে ভবিষ্যৎ বৃহৎ শক্তিদের মধ্যে ক্রমান্বয়ে দূরত্ব সৃষ্টি হবে। পরবর্তীতে একে অপরের বিরূদ্ধে মারমুখী হয়ে উঠতে থাকে। তখন বৃহৎ শক্তিদের মধ্যে দুটি মেরুকরণের পথ সৃষ্টি হয়ে যায়। যার পরিণতি বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেয়।বিশ্বের সচেতন রাজনৈতিক মহল মাত্রই জানে যে, বিগত দুটি বিশ্বযুদ্ধে মানব সভ্যতার কী কলঙ্ক বয়ে এনেছিল।
তাই বৃহৎ শক্তিদের প্রতি বিশ্ব শান্তিকামী মানুষের একান্ত কামনা, ইসরাইল-প্যালেস্টাইন বিরোধকে অবিলম্বে মিটিয়ে মানব সভ্যতাকে আমরা রক্ষা করি। পাশাপাশি বিশ্বের যেকোনো স্থানে নিপীড়িত মানুষের পাশে সংশ্লিষ্ট হয়ে যায়। বিশ্বের সকল মানুষ এবং ভবিষ্যৎ তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে মানব জাতি যেন রক্ষা পায়। সেই লক্ষে যেন বৃহৎ রাষ্ট্রগুলো পরস্পর বিশ্ব শান্তির জন্য যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।
হাক্কি মাহবূল হক : এক বিশ্ব, ভিসা, পরমাণু অস্ত্র, যুদ্ধমুক্ত ও এক অসাম্পদায়িক চেতনায় উজ্জিবিত মানবাধীকার কর্মী ও লেখক।





Users Today : 58
Views Today : 69
Total views : 177954
