১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতীয় উপমহাদেশ স্বাধীন হয় এবং ভারত বিভক্ত হয়ে দুটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা নিয়ে গঠিত হয় পাকিস্তান এবং হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে গঠিত হয় ভারত। নবগঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তান ১২ শ’ মাইলের ব্যবধানে অবস্থিত দুটি প্রদেশের সমন্বয়ে গঠিত হয়—পূর্ব পাকিস্তান (অধুনা বাংলাদেশ) ও পশ্চিম পাকিস্তান। ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে যোজন যোজন ব্যবধানে অবস্থিত এ দুটি অংশের মধ্যে মিল ছিল কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মে। পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই এর পূর্ব অংশ পশ্চিম অংশের তুলনায় নানাভাবে বঞ্চিত হতে থাকে এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের আগ পর্যন্ত দীর্ঘ ২৩ বছর ছিল পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ-বঞ্চনার ইতিহাস। পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল। মোট জাতীয় বাজেটের সিংহভাগ বরাদ্দ থাকত পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য। পাকিস্তানের মূল শাসক গোষ্ঠী ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের। পশ্চিমা শাসকদের বিমাতাসূলভ আচরণে পূর্ব পাকিস্তান শিকার হয় চরম অর্থনৈতিক বঞ্চনার । এ কারণে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ পাকিস্তান সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়ে এবং মানুষের মনে ক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ একদিনে শুরু হয়নি। এই সংগ্রাম শুরু হয়েছিল পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই। দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রাম এবং ২৩ বছরের ধারাবাহিক আন্দোলনের ফসল আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধ। এই সংগ্রামের বীজ ১৯৪৭ সালে অঙ্কুরিত হয়েছিল। তারপর ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন, ৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন তথা প্রাদেশিক স্বায়ত্ব শাসন আন্দোলন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন তথা ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলন ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলন এবং ৭০-এর নির্বাচন এর মাধ্যমে বাঙালিরা পাকিস্তানী শোষক শ্রেণীর বিরুদ্ধে নির্বাচনে বিজয়ী হলেও পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী নির্বাচনে বিজয়ী সংখ্যগরিষ্ঠ দলের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান ও তাঁর দল আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর ও পাকিস্তানী রাষ্ট্র শাসনের সুযোগ দিতে অস্বীকৃতি জানালে ১৯৭১-এর মার্চ মাস থেকে শুরু হয় সর্বাত্মক আন্দোলন। মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলের মাধ্যমে শুরু হলো পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাঙালিদের প্রকাশ্য বিদ্রোহ। এ বিদ্রোহের মাধ্যমেই শুরু হয় বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র গঠনের চূড়ান্ত আন্দোলন। বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলন বিশ্বের ইতিহাসে একটি বিরল ও নজিরবিহীন ঘটনা। মহাত্মা গান্ধী ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন করলেও তা সফল হয়নি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসহযোগ আন্দোলন কেবল সফলই হয়নি; এ অসহযোগ আন্দোলনের সিড়ি বেয়েই বাঙালিরা স্বাধীনতা সংগ্রামের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেছিল।
২৫ মার্চ পালিয়ে যাওয়ার আগে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তার হানাদার বাহিনীকে নির্দেশ দিয়ে গেলেন বাঙালি নিধনের এবং বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানে বন্দি করে নিয়ে যাবার জন্য। সেই নির্দেশ মতোই পঁচিশে মার্চের কালরাত্রিতে নিরস্ত্র অসহায় ঘুমন্ত বাঙালিদের ওপর সকল পাশবিক শক্তি নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে পাকিস্তানী বর্বরবাহিনী। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে খান খান করে গর্জে উঠল মেশিনগান সাথে ট্যাঙ্ক ও অটোমেটিক রাইফেলের ঝাঁকে ঝাঁকে গুলির আওয়াজ। দেখতে দেখতে ঢাকার আকাশ লালে লাল হয়ে উঠল আগুনের লেলিহান শিখায়। রাজারবাগে, পিলখানা ও বিভিন্ন বস্তিতে বস্তিতে আগুন জ্বলছে।। হাজার হাজার নারী-পুরুষ-শিশুর মর্মভেদী আর্তচিৎকারে ভরে উঠল ঢাকার আকাশ-বাতাস।
সেই ভয়াল রাতে ঢাকার জনসাধারণের ওপর আক্রমণ চালাবার পূর্ব মুহূর্তে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বেঙ্গল রেজিমেন্টের সমস্ত বাঙালি অফিসারকে গ্রেফতার করা হয়, বাঙালী সৈন্যদের সম্পূর্ণ নিরস্ত্র করে অবরোধ করে রাখা হয়। এইভাবে পাকিস্তানী সৈন্যদের হাতে যে-বাঙালি সৈনিকেরা বন্দি হয়ে পড়েন, তাঁদের অধিকাংশকেই শেষে নির্বিচারে হত্যা করা হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় অবস্থিত অন্যান্য ক্যান্টনমেন্টগুলোতেও একই প্রক্রিয়ায় বাঙালি সৈন্যদের বন্দি করার ও হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া হয়। রাত তখন বারটা বাজেনি। চারদিক স্তব্দ করে ছুটল হানাদারদের রঙ-বেরঙের ম্যাগনেশিয়াম ফ্লাশ। ঘরে ঘরে ওঠল হাহাকার। রাস্তাগুলো ভরে ওঠলো লাশের স্তূপে। কিন্তু এর মধ্যেও গড়ে ওঠল প্রতিরোধ। হানাদারদের প্রতিরোধ করা হল রাজারবাগে, পিলখানায়। ফলে রাজারবাগ পুলিশ, ব্যারাকে জ্বলে উঠল আগুন। সম্পূর্ণ ব্যারাকটি ছাই করে দিয়ে ভোর পর্যন্ত জ্বলল সে আগুন। এই রাতেই ওরা হানা দিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে।
হানাদার বাহিনী পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস্ ও পুলিশ বাহিনীকে শুধু নিরস্ত্র করেনি হত্যা করেছে শত শত ইপিআর ও পুলিশ সদস্যকে। পঁচিশে মার্চ সে কালরাত্রিতেই এমনিভাবে নৃশংসভাবে হত্যা করে লক্ষাধিক বাঙালিকে। এ বর্বরোচিত হামলার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে ওয়ারলেস মেসেজের মাধমে স্বাধীনতার ঘোষণার বাণী প্রচারের ব্যবস্থা করলেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনী পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ অভিযান শুরুর জন্য রাত সাড়ে ১১টায় ছাউনি থেকে বেরিয়ে আসে। ফার্মগেটের মুখে হানাদার বাহিনী প্রথম প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়। এখানে তারা লাউডস্পিকারে গোটা ঢাকার কারফিউ জারির ঘোষণা দেয়। ছাত্র-জনতা সেনাবাহিনীকে বাধা দিলে তারা মেশিনগানের সাহায্যে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের পাখির মতো গুলি করে হত্যা করে। ডিনামাইট দিয়ে ব্যারিকেড উড়িয়ে দিয়ে শহর প্রবেশ করে। রাস্তায় রাস্তায় শুরু হয় খণ্ডযুদ্ধ। সেনাবাহিনী প্রতিরোধকারী বাঙালি যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে ট্যাংক-মর্টার-রকেট ব্যবহার করে। চারদিকে গুলি আর গোলার বিস্ফোরণ। মানুষের আর্তচিৎকার। মধ্যরাতেই সেনাবাহিনী পিলখানা, রাজারবাগ, নীলক্ষেত আক্রমণ করে। সেনারা পিলখানাও নীলক্ষেতে প্রচণ্ড প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়। রাত ২টায় সময় হানাদার বাহিনী ট্যাংক, বাজুকা, মর্টারের মাধ্যমে নীলক্ষেত বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা দখল করে। প্রচণ্ড লড়াইয়ের পর পিলখানা ইপিআর ব্যারাকের পতন হয়। পাকিস্তানি সেনারা নিরস্ত্র বাঙালির বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধ শুরু করলে মধ্যরাতের পর মুক্তিসংগ্রামের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ধানমন্ডির বাসভবনে থেকে ঘোষণা করেন—
“পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আমাদের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে। ছাত্র-জনতা-পুলিশ-ইপিআর শত্রুর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রাম শুরু হয়েছে। আমি ঘোষণা করছি, আজ থেকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। সর্বস্তরের নাগরিককে আমি আহ্বান জানাচ্ছি, আপনারা যে যেখানে যে অবস্থাতেই থাকুন, যার যা আছে তাই নিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। সম্মিলিতভাবে শত্রুর মোকাবেলা গড়ে তুলুন। আপনারা শেষ শত্রুটি দেশ থেকে বিতাড়িত না করা পর্যন্ত সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে যান।”
রাত ১২টায় পর বঙ্গবন্ধুর স্বকণ্ঠে এ ঘোষণা বেতারে একবার শোনা যায়। পিলখানা ইপিআর ব্যারাক ও অন্যান্য স্থান থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার লিখিত বাণী ওয়্যারলেসের মাধ্যমে সারাদেশে বার্তা আকারে পাঠানো হয়। এ ওয়্যারলেস বার্তা চট্টগ্রাম ইপিআর সদর দফতরে পৌঁছায়। চট্টগ্রাম উপকূলে নোঙর করা একটি বিদেশি জাহাজও এ বার্তা গ্রহণ করে। চট্টগ্রামে অবস্থানকারী আওয়ামী লীগের শ্রম সম্পাদক জহুর আহমেদ চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার বাণী সাইক্লোস্টাইল করে রাতেই শহরবাসীর মধ্যে বিলির ব্যবস্থা করেন।
রাত ১টায় দিকে সেনাবাহিনীর একটি দল ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের অদূরে শুক্রাবাদে ব্যারিকেডের মুখোমুখি হয়। এখানে প্রতিরোধ ব্যূহ ভেঙে হানাদাররা রাত দেড়টার দিকে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের সামনে আসে। সেনারা বাসভবনে এলোপাতাড়ি গুলি নিক্ষেপ করে ভেতরে ঢোকে। বঙ্গবন্ধুকে বন্দি করে শেরেবাংলা নগরের সামরিক বাহিনীর দফতরে নিয়ে যায়। পরে সেখান থেকে তাকে সেনানিবাসে নিয়ে আটক রাখা হয় আদমজী কলেজের একটি কক্ষে। এ অবস্থায় ২৫শে মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া সম্পূর্ণরূপে মনুষ্যত্ব বিসর্জন দিয়ে এবং সকল প্রকার মানবিক রীতি-নীতি লঙ্ঘন করে বাংলাদেশের জাগ্রত জনসাধারণের ওপর সর্বাধিক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সর্বাত্বক আক্রমণ ও নির্বিচার গণহত্যা চালাবার জন্য পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেয়। তারপর একদিকে বিশ্বইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকাণ্ড অপর দিকে বাঙালির অভূতপূর্ব বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম। এক পক্ষের আক্রমণ মানবতার বিরুদ্ধে অপর পক্ষের আক্রমণ মানবতার শত্রুদের বিরুদ্ধে। এভাবেই নয় মাস চলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। এই যুদ্ধে প্রতিবেশী দেশ ভারত আমাদের সর্বাত্বক সহযোগিতা করে। পরিকল্পিত গণহত্যার মুখে সারাদেশে শুরু হয়ে যায় প্রতিরোধযুদ্ধ; জীবন বাঁচাতে প্রায় ১ কোটি মানুষ পার্শ্ববর্তী ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করে। পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর), ইস্ট পাকিস্তান পুলিশ, সামরিক বাহিনীর বাঙালি সদস্য এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী সাধারণ মানুষ দেশকে পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর কব্জা থেকে মুক্ত করতে কয়েক মাসের মধ্যে গড়ে তোলে মুক্তিবাহিনী। গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধ চালিয়ে মুক্তিবাহিনী সারাদেশে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে।
ডিসেম্বরের শুরুতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারত সরাসরিভাবে জড়িয়ে পড়ে। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সামরিক বাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণের মুখে ইতিমধ্যে পর্যদুস্ত ও হতোদ্যম পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় সেনারা ঢাকা ঘেরাও করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে আত্মসমর্পণ করার জন্যে আহবান করে। গভর্নর হাউজে (বর্তমান বঙ্গভবন) বোমা ফেলার কারণে গভর্নর মালেকের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানের পদলেহী সরকারও ইতিমধ্যে পদত্যাগ করে হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টাল আশয় নেয়। সময় থাকতে শান্তিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়ে আকাশ থেকে অনবরত লিফলেট ফেলা হতে থাকে। অবশেষে নিয়াজীর অনুরোধে ১৫ই ডিসেম্বর বিকেল সাড়ে পাঁচটা থেকে পরদিন সকাল সাড়ে ন’টা পর্যন্ত ভারতীয় বিমান আক্রমণ স্থগিত রাখা হয়। পরদিন সকালে বিমানাক্রমণ বিরতির সময়সীমা শেষ হওয়ার কিছু আগে মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী জাতিসংঘের প্রতিনিধি জন কেলীর মাধ্যমে ভারতীয় সামরিক কর্তৃপক্ষকে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির সময়সীমা আরও ছ’ঘণ্টার জন্য বাড়িয়ে দিয়ে ভারতের একজন স্টাফ অফিসার পাঠানোর অনুরোধ জানান যাতে অস্ত্র সমর্পণের ব্যবস্থাদি স্থির করা সম্ভব হয়। এই বার্তা পাঠানোর কিছু আগে অবশ্য মেজর জেনারেল নাগরার বাহিনী কাদের সিদ্দিকী বাহিনীকে সঙ্গে করে মিরপুর ব্রিজে হাজির হন এবং সেখান থেকে নাগরা নিয়াজীকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানান। নিয়াজীর আত্মসমর্পণের ইচ্ছা ব্যক্ত হওয়ার পর সকাল ১০:৪০ মিনিটে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে নিয়ে নাগরার বাহিনী ঢাকা শহরে প্রবেশ করে। পাকিস্তানীদের আত্মসমর্পণের দলিল এবং সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাদি চূড়ান্ত করার জন্য ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ডের চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জ্যেকব মধ্যাহ্নে ঢাকা এসে পৌঁছান। বিকেল চারটার আগেই বাংলাদেশ নিয়মিত বাহিনীর দুটি ইউনিটসহ মোট চার ব্যাটালিয়ান সৈন্য ঢাকা প্রবেশ করে। সঙ্গে কয়েক সহস্র মুক্তিযোদ্ধা। ঢাকার জনবিরল পথঘাট ক্রমে জনাকীর্ণ হয়ে উঠতে শুরু করে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে মুখরিত মানুষের ভিড়ে। বিকেল চারটায় ভারতের ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান ও ভারত-বাংলাদেশ যুগ্ম-কমান্ডের অধিনায়ক লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা, বাংলাদেশের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ গ্রুপ ক্যাপ্টেন আবদুল করিম খোন্দকার এবং ভারতের অপরাপর সশস্ত্রবাহিনীর প্রতিনিধিগণ ঢাকা অবতরণ করেন। কিছু পরেই ইন্দিরা গান্ধী পূর্ব ও পশ্চিম উভয় রণাঙ্গনে ভারতের পক্ষ থেকে এককভাবে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন। ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তান ৯৩,০০০ হাজার সৈন্যসহ আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। এরই মাধ্যমে নয় মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের অবসান হয়; প্রতিষ্ঠিত হয় বাঙালি জাতির প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ। পাকিস্তানী ইস্টার্ন কমান্ড সেনাবাহিনীর কমান্ডার, লে জেনারেল এ.এ.কে নিয়াজি, ভারত ও বাংলাদেশ বাহিনীর চিফ, অফিসার পূর্ব থিয়েটার, লে জেনারেল জগজিৎ সিং অররার সামনে আত্মসমর্পণের নির্দশনপত্রে স্বাক্ষর করছেন, ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ । ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করলেও সারা দেশে সকল পাকিস্তানীদের আত্মসমর্পণ করাতে ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত হয়ে যায়।
আত্মসমর্পণ দলিল নিম্নে উদ্ধৃত হলো
‘পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় সেনাপতি বাংলাদেশে অবস্থিত সকল সশস্ত্র সেনাবাহিনী নিয়ে পূর্ব রণাঙ্গনে ভারতীয় ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার নিকট আত্মসমর্পণ করতে সম্মত হয়। পাকিস্তানের সকল স্থল, বিমান ও নৌবাহিনী প্যারামিলিটারি এবং বেসামরিক সশস্ত্র সেনাবাহিনীর এ আত্মসমর্পণের অন্তর্ভুক্ত হবে। এ সকল সৈন্য তাদের অস্ত্র পরিত্যাগ করবে এবং লে. জেনারেল জগজিৎ সিংহের অধীনস্থ নিকটস্থ নিয়মিত বাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করবে। এ দলিলে স্বাক্ষরের সাথে সাথে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় সেনাবাহিনী লে. জেনারেল জগজিৎ সিংহ অরোরার অধীনে চলে আসবে। নির্দেশ ভঙ্গ করলে তা আত্মসমর্পণের শর্ত ভঙ্গকরণ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং তা যুদ্ধেররীতি ও আইন অনুসারে বিচার করা হবে। যদি আত্মসমর্পণের শর্তের সম্পর্কে কোনো সন্দেহ অথবা ব্যাখ্যার প্রয়োজন দেখা দেয় তাহলে জগজিৎ সিংহ অরোরার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে। লে. জেনারেল জগজিৎ সিংহ অরোরা নিশ্চিত আশ্বাস দেন যে সকল সৈন্য আত্মসমর্পণ করবে তাদের সাথে জেনেভা কনভেনশনের বিধির অধীনে সেনাবাহিনীর প্রাপ্যতা অনুসারে পূর্ণমর্যাদা ও সম্মানের সাথে ব্যবহার করা হবে এবং পাকিস্তানের সৈন্য এবং প্যারামিলিটারি যারা আত্মসমর্পণ করছে তাদের নিরাপত্তা ও মঙ্গলের নিশ্চয়তা প্রধান করবে লে. জেনারেল জগজিৎ সিংহ অরোরার অধীনের সেনাবাহিনী বিদেশি নাগরিক, জাতিগত সংখ্যালঘু এবং পশ্চিম পাকিস্তানের নাগরিকদের নিরাপত্তা প্রধান করবে।’
জগজিৎ সিংহ অরোরা আমীর আবদুল্লাহ নিয়াজী লে.জেনারেল
পূর্বাঞ্চলীয় ভারতীয় এবং সামরিক প্রশাসক জোন-বাংলাদেশ সেনাপতি বাহিনীর প্রধান সেনাপতি পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় সেনাপতি ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১
এভাবে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর একটা অসম্ভবকে সম্ভব করা হয়, একটি স্বপ্নকে বাস্তবে রূপায়িত করা হল। এই স্বাধীনতা অর্জেনের জন্য বাঙালি জাতি যে ত্যাগ স্বীকার করে তা অনন্য। লক্ষ প্রাণের তাজা রক্তের বিনিময়ে এ স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব হয়েছে দেশের শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, শিল্পী ও অনেক গুণী ব্যক্তির ত্যাগ ও তিতিক্ষার বিনিময়ে। সীমাহীন নির্যাতনের শিকার হতে হয়ে ছিল এ দেশের মা-বোনকে। তবু জাতি পরাধীনতাকে মেনে নেয়নি, মেনে নেয়নি অগণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে। আপোস করেনি অন্যায়, অবিচারের সাথে। হাসিমুখে হৃদয়ের সমস্ত দৃঢ়তা নিয়ে হাজারো বিপদ ও অত্যাচারের মোকাবিলা করেছে, স্বাধীনতার সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছে। সীমহীন এ ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের এই স্বাধীনতা।
মাহবুবুল আলম : কবি, লেখক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক।





Users Today : 99
Views Today : 101
Total views : 175827
