লতিকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চলে এসেছে তের বছর হয়ে গেছে। ১৩ ফেব্রুয়ারি কৃষিবিদ দিবস পালনের জন্য ১২ তারিখ সকালের বাসে রওনা দিয়েছে ময়মনসিংহের উদ্দেশ্য। বাসে তার পাশের সিটে একটি অল্পবয়সী মেয়ে বসে আছে। বাস ছাড়ার পর লতিকা মেয়েটার সাথে কথা বলা শুরু করে। মেয়েটা বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২য় বর্ষের ছাত্রী। তাপসী রাবেয়া হলে থাকে। কথাটা শুনেই লতিকার মনটা ভালো হয়ে যায় কারণ সেও তো একসময় এই হলে থেকেই তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটিয়েছে। মেয়েটার নাম নীরা। নীরার সাথে পুরো রাস্তা লতিকা গল্প করে, একসময় বাস এসে ময়মনসিংহ ব্রিজে পোঁছে। এরপর বাস থেকে নেমে লতিকা হলের উদ্দেশে রওনা দেয়। লতিকার মামাতো বোন সন্ধি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। তার কাছেই লতিকা থাকবে।
বিকালে একটু বিশ্রাম নেওয়ার পর লতিকা চা খাওয়ার জন্য বাইরে যায়। হঠাৎ দেখা হয় লতিকার বন্ধু মিরনের সাথে। মিরন জনতা
ব্যাংকে চাকরি করে। মিরন জিজ্ঞাসা করে, ‘কিরে লতিকা তুই আর বিয়ে করিসনি? কাজটা তুই
একদম ঠিক করিসনি। অন্যের ভুলের জন্য তুই নিজের জীবনটা নষ্ট করলি। ’ লতিকা গত দশ বছরে
অনেকবার এ প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে। কেউ কেউ বলেছে সামান্য একটা ভুল তুমি ক্ষমা করে
দিতে পারতে। লতিকা কারো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আর প্রয়োজনীয়তা মনে করে না। মিরনের সাথে
চা খাওয়ার পর লতিকা হলের দিকে পা বাড়িয়েছিল, হঠাৎ সামনে দেখল নিয়ন তার মেয়ে এবং স্ত্রীকে
নিয়ে হাঁটছে। তৎক্ষণাৎ লতিকা হলের ভেতরে চলে যায়। লতিকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে
যোগদানের জন্য এসেছে। আসার আগে সে অনেকবার চিন্তা করেছে যদি নিয়নের সাথে দেখা হয়ে যায়?
কারণ ওর চেহারা লতিকা এ জীবনে আর কখনো দেখতে চায়নি । কিন্তু আজ তো সে প্রতিজ্ঞা আর
থাকল না। লতিকা জানতো যে নিয়ন সপরিবারে অস্ট্রেলিয়া চলে গেছে। এই অনুষ্ঠানে যোগদানের
জন্য যে নিয়ন সুদূর অস্ট্রেলিয়া থেকে আসতে পারে এটা লতিকা কখনোই ভাবতে পারেনি।
নিয়নের কথা জানতে হলে ফিরে যেতে হবে বিশ বছর আগে। তখন লতিকা প্রথম বর্ষের ছাত্রী। ধনী বাবার একমাত্র আদরের কন্যা লতিকা এবং সুন্দরীও বটে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকে অনেক প্রেমের প্রস্তাব পেয়েছে লতিকা কিন্তু কাউকেই তার ভালো লাগেনি। নিয়ন তখন ৩য় বর্ষের ছাত্র। কালো, হ্যাংলা, রোগা ধরনের দেখতে এবং আর্থিক অবস্থা খারাপ ছিল। এককথায় বলতে গেলে কোনো সুন্দরী মেয়ে তাকে দেখে প্রেমে পড়তে পারে এমন কোনো গুণাবলী তার মধ্যে ছিল না। নিয়নের বাবা-মা ছিল না। মামার কাছে বড়ো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার খরচ দেওয়ার সামর্থ্য নিয়নের মামার ছিল না। নিয়ন ৫টা পর্যন্ত ক্লাস করার পর ৫ টা টিউশনি করাত। মাস গেলে যা পেত তা দিয়ে নিজের খরচ চালিয়ে বাকিটা মামাকে পাঠিয়ে দিত। ভালবাসা দিবসের দিন লতিকা লাল শাড়ি পরে বান্ধবীদের সাথে ঘুরতে বের হয়েছে। তখন রাস্তায় নিয়ন তার বন্ধুদের সাথে ছিল। নিয়নের বন্ধুদের মধ্যে সবাই লতিকার দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছে শুধু নিয়ন একবারও ফিরে তাকাল না। পরে লতিকা তার বান্ধবীদের কাছ থেকে নিয়নের সম্পর্কে সবকিছু জানতে পারে। নিয়নের সংগ্রাম করে বড়ো হওয়া সবকিছু লতিকাকে বড্ড মোহিত করে। এরপর শুরু হয় তাদের সম্পর্ক।
নিয়ন সম্পর্কে লতিকার ছিল অন্ধ বিশ্বাস । অনেকেই নিয়নের চরিত্র নিয়ে লতিকাকে নানারকম
কথা বলত, লতিকা কোনোদিনই কারো কথা কানে তুলত না। লতিকার সবচেয়ে কাছের বান্ধবী ছিল নিশা।
লতিকা আর নিশার বন্ধুত্ব দেখে সবাই বলত এরা মা এর পেটের দুই বোন। নিশার আর্থিক অবস্থা
ভালো ছিল না কিন্তু লতিকার সাথে বন্ধুত্ব হওয়ার পর নিশা একদিনের জন্যও সে অভাব বুঝতে
পারেনি। লতিকা নিজের জন্য যে পোশাক কিনত তা নিশার জন্যও কিনে দিত। একদিন নিশা মজা করে
লতিকাকে বলেছিল, ‘সব জিনিসই তো তুই আমাকে দিয়ে দিস, একই রকম বর কোথায় খুঁজে পাবি!’
লতিকা হেসে বলেছিল, ‘সেটাও ঠিক খুঁজে বের করব।’
মাস্টার্স শেষ করার পর লতিকা চাকরির চেষ্টা করে। তার বাড়ি থেকে চাকরি করতে দিবে না কিন্তু নিয়ন অনেক চেষ্টা করে একটা প্রাইভেট চাকরি পেয়েছে। বেতনও বেশি না। লতিকা তখন বিসিএসের লিখিত পরীক্ষা দিয়েছে। এর মধ্যে জনতা ব্যাংকের চাকরিটা তার হয়ে যায়। নিয়নের সাথে বিয়েতে লতিকার বাবার মত ছিল না। তাই বাধ্য হয়ে মন্দিরে গিয়েই তাদের বিয়েটা করতে হয়। বিয়েতে নিশা এবং মিরন উপস্থিত ছিল। এরপর শুরু হয় তাদের সংসার জীবন।
বিয়ের ছয় মাস পর হঠাৎ করেই একদিন নিয়ন বাসায় এসে বলে তার চাকরিটা আর নেই। সে সময় লতিকা গর্ভবতী। এরপর নিশা প্রায় প্রতিদিনই লতিকার বাসায় আসা শুরু করে। লতিকা ভাবতো আমি সারাদিন অফিসে থাকি, নিশা আসলে অন্তত নিয়নের কথা বলার একটা মানুষ তো থাকে। সচরাচর লতিকা দুপুরে বাসায় আসে না, সেদিন ছিল নিশার জন্মদিন তাই লতিকা ছুটি নিয়ে বাসায় চলে আসে। এসে দেখে দরজাটা খোলা, নিশাও নিয়নকে ঠিক এভাবে লতিকা দেখবে তা কখনো তার কল্পনাতেও আসেনি। এরপর লতিকা দুজনের কারো সাথেই আর কথা বলেনি, সে সোজা বাড়ি থেকে বের হয়ে নওগাঁর বাসে উঠে বসে। ফিরে যায় তার নিজের বাড়িতে। এর ১৫ দিন পর লতিকার বাচ্চাটা মারা যায়। নিয়নের সাথে তার শেষ বাঁধনটাও ছিঁড়ে যায়। এই ঘটনার তিন মাস পর একদিন রিমার কাছে নিয়ন এবং নিশার বিয়ের খবরটা লতিকা জানতে পারে। আবার কোনোদিন যে তাকে এই ভয়ংকর সত্যের সামনে দাঁড়াতে হবে এটা তার জানা ছিল না। লতিকা দ্রুত তার ব্যাগ গোছাতে শুরু করে।





Users Today : 33
Views Today : 36
Total views : 185183
