আমেরিকার মতো কথিত উন্নত ও সভ্য দেশে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানুষ বর্ণ বৈষম্যের শিকার হবে তা অকল্পনীয়। মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যে মিনেপোলিসে পুলিশ কর্তৃক কৃষ্ণাঙ্গ যুবক জর্জ ফ্লয়েডের মর্মান্তিক মৃত্যু বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছে। বোধ করি, এবারই প্রথম এক সাথে চার চারজন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেণ্ট জিমি কার্টার, জর্জ ডব্লিউ বুশ, বিল ক্লিনটন এবং বারাক ওবামা বর্ণ বৈষম্যের বিপক্ষে আন্দোলনকারীদের সপক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন। সমর্থন জানিয়েছেন বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেণ্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তনয়া টিফানি ট্রাম্প এবং দ্বিতীয় স্ত্রী মার্লা ম্যাপলস। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছোট মেয়ে ২৬ বছর বয়সী টিফানি ইনস্ট্রাগ্রাম ও টুইটারে লিখে শেয়ার করেছেন, ‘একা একা আমরা ছোট কিছু অর্জন করতে পারি; একসঙ্গে অনেক কিছু অর্জন করতে পারি—হেলেন কিলার।’ আর সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্টগণ সচরাচর কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কোলাহলকে এড়িয়ে চলেন। সাদা কর্তৃক কালো মানুষের নির্মম হত্যাকাণ্ডের ক্ষুব্ধ প্রতিবাদ এতই প্রবল যে, জনসাধারণ করোনা ভাইরাসের ভয়ংকরতাকেও তোয়াক্কা করেনি। মানুষের প্রতি মানুষের মমত্বাবোধ, দয়া, ভালোবাসা, সম্প্রীতি, অসাম্যতা, বৈষম্যহীনতা দরুণই প্রথা ভেঙে সাবেক রাষ্ট্রনায়করা সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। জিমি কার্টার বলেছেন, ‘নীরবতা ও সহিংসতা থেকে আত্মঘাতী হয়ে উঠতে পারে। ক্ষমতা, সুবিধাজনক অবস্থা আর নৈতিক সচেতনতা ঊর্ধ্বে তুলে ধরে বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।’ বিল ক্লিনটন ক্ষুব্ধতা প্রকাশ করেছেন, ‘জর্জ ফ্লয়েডের মতো মৃত্যু কারো কাম্য নয়। সত্যি কথা হলো, সাদা চামড়ার হলে এমন মৃত্যুর সম্ভাবনা কম।’ জর্জ ডব্লিউ বুশ সমর্থন দিয়ে বলেছেন, ‘এখন বক্তৃতা দেওয়ার সময় নয়, এখন সময় কথা শোনার। যারা আফ্রিকান-আমেরিকান তরুণকে টার্গেট করে হত্যা করেছে, তাদের প্রতি নিন্দা জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে যাঁরা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করছেন, তাঁদের সমর্থনও দিয়েছেন। শেষ বিদায়ী প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আন্দোলনকারীদের ব্যক্তিগতভাবে অভিনন্দন জানিয়েছেন। বলেছেন, আমাদের অল্পসংখ্যক লোক যারা সহিংসতার পথ অনুসরণ করছেন, তাদের নিন্দা করা উচিত। তবে বেশিরভাগ দুর্বার আন্দোলনকারীরা আমাদের শ্রদ্ধা এবং সমর্থন পাওয়ার যোগ্যতা রাখেন। এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য হলো জনসচেতনতা বাড়ানো। অবিচারকে সামনে তুলে আনা। কিন্তু আমাদের এই দাবিকে একটি নির্দিষ্ট আইন এবং প্রাতিষ্ঠানিক চর্চায় পরিণত করতে হবে।
সংবাদপত্রের বদৌলতে জেনেছি, বিগত ২৫ মে জর্জ ফ্লয়েড জাল নোট ব্যবহার করে সিগারেট কেনার অভিযোগে পুলিশের হাতে আটক হয়েছিলেন। টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের হিউস্টনের বাসিন্দা জর্জ ফ্লয়েডকে (৪৬) মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনিয়াপোলিতে ডেরেক চৌভিন নামের পুলিশ কর্মকর্তা ফ্লয়েডের ঘাড় হাঁটু দিয়ে সড়কে চেপে ধরলে তিনি মারা যান। গ্রেপ্তার করতে গিয়ে নির্যাতন করেন শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসার ডেরেক চাওভিন। সাবেক বাস্কেটবল খেলোয়াড় ফ্লয়েডকে দীর্ঘ ১০ মিনিট হাঁটু দিয়ে গলা চেপে ধরেন, বারবার পুলিশ কর্মকর্তাকে জানাচ্ছিলেন ফ্লয়েড— ‘আমি নিশ্বাস নিতে পারছি না’। এক সময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। প্রত্যক্ষদর্শীর ধারণ করা ভিডিওতে ফ্লয়েড নিজেকে আত্মসমর্পণ করেছিলেন, তিনি কোনো রকম আক্রমণাত্বক আচরণ করেননি। ফ্লয়েডের ময়নাতদন্তে বেরিয়ে এসেছে, পেছন থেকে গলা চেপে রাখার কারণে জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যু হয়েছে। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক অ্যালেসিয়া উইলসন জানান, শ্বাসরোধ এবং ঘাড় চেপে রাখার কারণে মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হয়ে জর্জ ফ্লয়েড মারা গেছে। হাতকড়া পরানো অবস্থায় মাটিতে চেপে ধরে ঘাড়ের ওপর হাঁটু দিয়ে সজোরে চাপ দিয়েছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা। ওই সময় ফ্লয়েড বারবার শ্বাস নিতে না পারার কথা বললেও পুলিশ তা কানে তোলেনি। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দে নিউইয়র্কে অনেকটা একইভাবে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছিলো কৃষ্ণাঙ্গ যুবক এরিক গারনাকে। গারানাও সেদিন ফ্লয়েডের মতোই বারবার আকুতি জানিয়েছিলেন, আমি শ্বাস নিতে পারছি না। তার মৃত্যুতে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে কৃষ্ণাঙ্গ অধিকারের দাবিতে শুরু হয় ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলন।
বর্ণবাদ বা বর্ণ বৈষম্যের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। বর্ণবাদ সেই দৃষ্টিভঙ্গি, চর্চা এবং ক্রিয়াকলাপ যেখানে বিশ্বাস করা হয় যে, মানুষ বৈজ্ঞানিকভাবেই অনেকগুলো গোষ্ঠীতে বিভক্ত এবং একই সাথে বিশ্বাস করা হয় কোনো কোনো গোষ্ঠী অন্য গোষ্ঠীর চেয়ে নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্যের জন্য উঁচু অথবা নিচু; কিংবা তার ওপর কর্তৃত্ব করার অধিকারী; অথবা বেশি যোগ্য কিংবা অযোগ্য। তারপরও বর্ণবাদ কখনো গায়ের চামড়ার রং দিয়ে হতে পারে, কখনো আঞ্চলিকতা দিয়ে হতে পারে, কখনো গোত্র দিয়ে হতে পারে, কখনো বর্ণ দিয়ে হতে পারে। কিছু কিছু সংজ্ঞানুসারে, কোনো মানুষের আচরণ যদি কখনো তার জাতি বা বর্ণ দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়, সেটি অন্য কারো জন্য ক্ষতিকর না হলেও তাকে বর্ণবাদ বলা হবে।
অন্যান্য সংজ্ঞায় শুধুমাত্র বর্ণবাদ দিয়ে প্রভাবিত হয়ে শোষণ এবং অত্যাচার করাই বর্ণবাদ। আমেরিকায় বর্ণবাদ এবং বৈষম্যমূলক আচরণ বহুদিনের, তবে বিশ্বাবাসী আশান্বিত হয়েছিলেন যখন আমেরিকার সর্বোচ্চ আসনে আসীন হয়েছিলেন কালো মানুষ বারাক ওবামা; হয়ত এবার স্বপ্নের দেশ থেকে সাদা-কালোর ব্যবধান ঘুচে যাবে কিন্তু সেটি হয়নি! আমেরিকায় বর্ণ বৈষম্যের পরিসংখ্যান আমাদের মতো দেশের মানুষকেও স্তম্ভিত করে তোলে। ২০১৯ সালে সংখ্যালঘু বর্ণ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে পুলিশের নৃশংসতায় কমপক্ষে এক হাজার মানুষ মারা গেছেন। জরিপে দেখা যায়, পুলিশের গুলিতে নিহতদের মধ্যে তুলনামূলক বেশিরভাগই কৃষ্ণাঙ্গ। ম্যাপিং পুলিশ ভায়োলেন্স নামে একটি বেসরকারি সংস্থার চালানো জরিপে দাবি করা হয়েছে, আমেরিকায় পুলিশের গুলিতে শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় তিনগুণ বেশি মারা যান কৃষ্ণাঙ্গরা।
ষাটের দশকে রেভারেন্ড মার্টিন লুথার কিং সাদা-কালোর সম্মিলন ঘটিয়েছিলেন। তাঁর ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’ শীর্ষক ভাষণটি শ্রবণ করলে আজও প্রতিটি মানুষ স্বপ্ন বুনবে; সেটি দেশ-কাল-সময়েও বিবর্ণ করতে পারেনি। ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে ৪ এপ্রিল এই মানবাধিকার আন্দোলনের নেতা হত্যার শিকার হয়েছেন। তাঁর মধ্যেকার যে চেতনা, সাদা-কালো মানুষের বন্ধুত্বের যে সম্প্রীতির বীজ রোপণ করেছিলেন, সেটি আজো যত্নের সাথে দেশটির আপামর মানুষ লালন করে চলেছেন; লালন ও সংরক্ষণ করেছেন বিশ্বাবাসীও। ফ্লয়েড হত্যার বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনই সেটি স্মরণ করিয়ে দেয়। শুধু আমেরিকার শহরগুলোতে নয়, সমগ্র ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, এশিয়ার বিভিন্ন শহরেও বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে মাঠের ক্রীড়াবিদ, অভিনেতা-অভিনেত্রী, গায়ক-গায়িকা থেকে বিভিন্ন পেশাজীবীরা ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন। ল-নের ট্রাফালগার স্কয়ারে শত-সহস্র বিক্ষোভকারীদের শ্লোগান ছিল— ‘যেখানে বিচার নেই, যেখানে শান্তি নেই’, ‘আমাদের হত্যা বন্ধ করো’, ‘জর্জ ফ্লয়েড হত্যার বিচার চাই’। কেউ কেউ প্ল্যাকার্ডে ‘একতা’, ‘সংহতি’ ‘কালোই শক্তি’ লেখা বহন করেছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় তারকারাও সরব হয়েছেন, ভায়োলা ডেভিস লিখেছেন, ‘আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গ হলে যা হয়, এই অপরাধেই মরতে হলো। আমাদেরকে শত বছর ধরে নির্যাতন করা হচ্ছে।’ স্টার ওয়ার্স অভিনেতা জন বয়েগা শেয়ার করেছেন, ‘আমি নিশ্বাস নিতে পারছি না, আমার পেট ব্যথা করছে, ঘাড় ব্যথা করছে। পুরো শরীর ব্যথা করছে। তারা আমাকে হত্যা করবে।’ জাস্টিন বিবার লিখেছেন, ‘এসব অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। এগুলো আমাকে অসুস্থ করে দিচ্ছে। এই মানুষটির মৃত্যুতে ভীষণ রাগ হচ্ছে। বর্ণবাদ খুব খারাপ। আমাদের এর বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা উচিত।’ অভিনেত্রী অ্যান হ্যাথাওয়ে লিখেছেন, ‘জর্জ ফ্লয়েডের বেঁচে থাকার কথা ছিল। বিচার পাওয়ার অধিকার ছিল তার। ফ্লয়েডের হত্যাকারীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।’ ডেমি লোভাটো ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, ‘এটা ঠিক না। সবাই নিজের জায়গায় অবস্থান না নিলে এটা বন্ধও হবে না। বিশেষ করে সাদাদের এগিয়ে আসতে হবে।’ পপ তারকা নিক জোনাস ইনস্টাগ্রামে লিখেছেন, ‘জর্জ ফ্লয়েড ও তার পরিবারের জন্য প্রার্থনা করছি। সাহায্যের চাইতে গিয়ে একটি পরিবার তাদের প্রিয়জন হারাল। এটি অমার্জনীয়।’ গিগি হাদিদ ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘এখন তাদেরকেই আইনের আওতায় আনা উচিত। এমন তো প্রায়ই ঘটে, ক্যামেরায় ধরা পড়েছে বলেই জানাজানি হয়েছে।’ র্যাপার কার্ডি বি লিখেছেন, ‘অনেক হয়েছে। আর কতটা হারালে সব ঠিক হবে? যুদ্ধ লাগবে? নতুন প্রেসিডেন্ট লাগবে? হিংস্র দাঙ্গা লাগবে? আমি টায়ার্ড। এই দেশ টায়ার্ড।’
ক্রীড়াঙ্গনের পুরোধা ফুটবল, টেনিস ও ক্রিকেটাঙ্গনেও বর্ণ বৈষম্যের সুর থেমে নেই। অনেকবারই সাদাদের দ্বারা কালোরা নিগৃহ হয়েছেন। জর্জ ফ্লয়েডের ঢেউ তাদের হৃদয়কেও দোলা দিয়েছে—প্রতিবাদের খাতায় নাম লিখিয়েছেন ফুটবলার লিওনেল মেসি, জ্যাডন সানচো, কিলিয়ান এমবাপে, মার্কাস থুরাম। ৩১ মে ফুটবল মাঠে গোল উদযাপন করেছেন ফ্লয়েডের বিচারের দাবিতে, তিনি মাঠে হাঁটু গেড়ে চেয়েছেন ন্যায় বিচারের। আর জ্যাডন সানচো জার্সি খুলে গায়ে পরা আরেকটি জামার বুকে লেখা ছিল— জাস্টিস ফর জর্জ ফ্লয়েড। অবশ্য শাস্তি হিসেবে খড়গ নেমে এসেছে হলুদ কার্ড। ক্রিকেটার ক্রিস গেইল, টেনিস তারকা সেরেনা উইলিয়ামস, নাওমি ওসাকা, ফরমুলা ওয়ানের লুইস হ্যামিল্টন, বাস্কেটবল লেজেন্ড করিম আব্দুল জব্বার, লেব্রন জেমস। ইউনিভার্সাল বস খ্যাত গেইল ইনস্টাগ্রামে লিখেছেন, ‘অন্যদের মতোই কালোদের জীবন। …কৃষ্ণাঙ্গদের বোকা মনে করাটা বন্ধ করুন। আমি নিজে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছি। বিশ্বাস করুন, শুধুমাত্র গায়ের রং কালো হওয়ার কারণে আমাকেও অনেক বর্ণবাদী মন্তব্য শুনতে হয়েছে। এটা অনেক লম্বা তালিকা। …বর্ণবাদ শুধু ফুটবলেই নয়, ক্রিকেটেও আছে। বর্ণবাদের এই কুৎসিত চিন্তা চেতনা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কালো শক্তির প্রতীক। কালোই গর্ব।’ বর্ণবাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে বিবৃতি দিয়েছে বার্সেলোনা, ‘বর্ণবাদ হলো এক ধরনের বৈষম্য যা মূলত লিঙ্গ, জন্ম, চাড়মার রঙের ওপর ভিত্তি করে মানুষকে হেয় করার কাজে ব্যবহার করা হয়। এটা এমন এক মহামারি যা আমাদের সবাইকে আঘাত করেছে। বার্সেলোনায় সব সময় এই বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা হয়েছে ও হবে। এ লড়াই আমরা থামাব না। এটা আমাদের অঙ্গীকারও বটে।’
ইতিমধ্যেই মিনেপোলিশের সাবেক পুলিশকর্মী ডেরেক চভিনের বিরুদ্ধে থার্ড ডিগ্রি হত্যা মামলা করা হয়েছে, তাকেসহ আরো তিনজনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। ফ্লয়েডের হত্যার পক্ষে পরিবারের নিযুক্ত আইনজীবী বেনজামিন ক্রাম্প বলেছেন, চভিনের বিরুদ্ধে থার্ড ডিগ্রি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে ফ্লয়েডের হত্যাটি ফার্স্ট ডিগ্রি মামলার ঘটনা ছিল। আমরা মনে করি, তার হত্যার উদ্দেশ্য ছিল। তিনি প্রায় নয় মিনিট ফ্লয়েডের ঘাড়ে নিজের হাঁটু চেপে ধরে রেখেছিলেন। ফ্লয়েড হাঁটু সরিয়ে নিতে আকুতি জানাচ্ছিলেন। শ্বাস নিতে দেয়ার জন্য আকুতি জানাচ্ছিলেন। পুলিশ কর্মকর্তা ডেরেক চভিনের ১০ বছর বিবাহিত জীবনেও বিচ্ছেদের রেখা অঙ্কিত হলো। স্ত্রী ক্যালি চভিন তার স্বামী কৃষ্ণাঙ্গ হত্যায় অভিযুক্ত হওয়ায় ডিভোর্স দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তা বলেছেন, গত ২৫ মে ঘটে যাওয়া ঘটনায় মিনিয়াপোলিস কর্মকর্তাদের আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। ফ্লয়েডের এলাকা হিউস্টনের পুলিশ প্রধান আর্ট অ্যাচেভেদো বলেছেন, ‘ফ্লয়েডের মৃত্যুর ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সব সম্প্রদায়ের নিন্দা জানানো উচিত। তাঁর মৃত্যু বুঝিয়ে দেয়, যখন খারাপভাবে পুলিশ তাদের কার্যক্রম চালায়, তখন তা তুলনামুলকভাবে বর্ণ বৈষম্যের শিকার ও দরিদ্র মানুষদের ওপর প্রভাব ফেলে।’ মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ফ্লিন্ট টাউনশিপের থানার শেরিফ ক্রিস সোয়ানসন বিক্ষোভকারীদের সমর্থন দিয়ে বলেছেন, ‘আমরা সত্যিকার অর্থে আপনাদের সঙ্গে থাকতে চাই। আমরা এটিকে (বিক্ষোভ) প্রতিবাদের বদলে প্যারেড হিসেবে তৈরি করতে চাই। আপনারা যা যা করতে চান, বলুন।’
পৃথিবীব্যাপী বর্ণবাদের সমস্যা রয়েছে—এই তালিকায় ইংল্যান্ড, ফ্রান্সসহ সব দেশেই কম-বেশি বর্ণবিদ্বেষের বিষবৃক্ষের পত্তন রয়েছে। যুক্তরাজ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বর্ণবাদের অবস্থা শোচনীয় হতে থাকলে ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে আইন প্রণয়ন করে নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু তারপরও থেমে নেই বর্ণবাদ। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে ব্রিটেনে বর্ণবাদ মাত্রাতিরিক্ত বেড়েছে। বিশেষ করে দেশটির বিদেশীরা মারাত্মক বর্ণবাদের শিকার হচ্ছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার (ব্রেক্সিট) ইস্যু সামনে আসার পর বিদেশিদের প্রতি বৈষম্য বেড়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, এ নিয়ে দাঙ্গা এমনকি খুনের ঘটনাও ঘটেছে। কেউ শিকার হয়েছেন প্রকাশ্যে, কেউ বা গোপনে; বৈষম্যের ভার ক্রমশই অত্যাধিক হওয়াতে নিজ থেকেই শান্তিকামী মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। সাদা-কালো মানুষেরা হাতে হাত রেখেই হৃদয়ে ধারণ করা সাদা-কালো, বর্ণবিদ্বেষকে বিদায় দিতে রাজপথে প্রশাসনের বিরুদ্ধে, সরকারের অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। সত্যিই তো গায়ের রং দিয়ে মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা স্রষ্টার প্রতি আমাদের ঔদ্ধত্যের প্রকাশ।
করোনা ভাইরাস এসেছে মহামারী রূপ নিয়ে, এক সময় চলেও যাবে; মানুষ এটিকে নিয়ন্ত্রণ করবে নিশ্চয়ই। তবে বর্ণবিদ্বেষ, বর্ণ বৈষম্যের যে ভাইরাসটি শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষ হৃদয়ে ধারণ ও লালন করে চলেছেন, সেটির কী হবে! এটি তো কোনো ঔষধ দিয়ে নয়, ভ্যাকসিন দিয়েও নয়; মানুষের হৃদয়কে সুস্থ ও নির্মল করতে প্রয়োজন মানবতা। মানুষকে মানুষ হিসেবে গ্রহণ করা, সাদা-কালো বিচার না করে স্রষ্টার সৃষ্টি হিসেবে মেনে নিলেই অনেকাংশ কমে যাবে। উপলব্ধি করি, হৃদয়কে নিরাময় করতে প্রয়োজন ন্যায্যতা, সত্যকে জানা এবং স্রষ্টার ওপর নির্ভরশীলতা।
● মিথুশিলাক মুরমু : গবেষক ও লেখক।





Users Today : 7
Views Today : 9
Total views : 175513
