প্রকৃতির নিজের হাতে গড়া ঢাকার নিকটবর্তী উপজেলা ভালুকাকে নিয়ে এবার আমাদের এই আয়োজন। ঢাকা থেকে যারা বৃহত্তর ময়মনসিংহের দিকে ছুটে যান তাদেরকে ভালুকা উপজেলা স্পর্শ করেই অন্যান্য জায়গায় যেতে হয়। ঢাকা থেকে ভালুকা উপজেলার দূরত্ব প্রায় ৮০ কি. মি.। ঢাকার মহাখালী থেকে এনা পরিবহনসহ একাধিক পরিবহন আপনাকে মাত্র দুই ঘণ্টায় ভালুকায় পৌঁছে দিবে। এই উপজেলার আয়তন ৪৪৪.০৬ বর্গ কি. মি.। ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ জাতীয় চারলেন মহাসড়ক পথে রাজেন্দ্রপুর সেনানিবাস (গাজীপুর) ও মাওনা শ্রীপুর হয়ে পথে (প্রায় ৮০ কি. মি.) ভালুকা উপজেলা। উত্তরে ত্রিশাল উপজেলা, দক্ষিণে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলা, পূর্বে গফরগাঁও উপজেলা, পশ্চিমে ফুলবাড়িয়া ও টাঙ্গাইলের সখিপুর উপজেলা এর অবস্থান। এই উপজেলার দর্শনীয় স্থানসমূহের মধ্যে রয়েছে, কাদিগড় জাতীয় উদ্যান, ২০১০ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ৩৪৪.১৩ হেক্টর জমি নিয়ে এই জাতীয় উদ্যানটি গঠিত। এই জাতীয় উদ্যানে গিয়ে আপনার মনে হবে চিরসবুজ এক বাগিচায় চলে এসেছেন। নির্জনতা আপনাকে আরো বেশি নির্জন করে দিবে এই উদ্যানে এলে। এখানে মুখপোড়া হনুমান, বানর, কয়েক শ্রেণির সাপ, বেজি, খরগোশ, প্রায় শতাধিক প্রজাতির পাখি দেখতে পাবেন। এখানে আসলেই আরো দেখতে পাবেন কোচ উপজাতিদের বণাট্য সংগ্রামী জীবন। এই উদ্যানটি ঘুরতেই কমপক্ষে আপনার ২ ঘণ্টা লেগে যাবে।
এরপর আপনি ঘুরে আসতে পারেন উথুুরা ইউনিয়নে হাতিবেড় গ্রামে দেশের প্রথম গড়ে ওঠা কুমির খামার। প্রথমে এখানে প্রায় ৭০০ কুমির থাকলেও বর্তমানে তার সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। প্রতি বছর এই কুমির খামার থেকে প্রায় ১০ কোটি টাকার কুমিরের চামড়া বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে এখান থেকেই কুমিরের মাংস বিদেশে রপ্তানি হবে। তবে বর্তমানে এই কুমির খামার কর্তৃপক্ষ সহজে কাউকে পরিদর্শন করতে দেন না। তারপরও অনুমতি নিয়ে আপনারা এই কুমির খামার পরিদর্শন করতে পারবেন। সৌদি আরব থেকে ফেরত এক শ্রমিক, যার নাম মোতালেব, যিনি সবার কাছে মোতালেব ভাই বলে পরিচিত—তিনি পাড়াগাঁও গ্রামে দেশের প্রথম সৌদি খেজুর বাগান গড়ে তুলেছেন। প্রথম দিকে তাঁর এই উদ্যোগকে অনেকেই বিদ্রুপ করলেও এখন অনেকেই মোতালেব ভাইকে অনুসরণ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সৌদি খেজুর বাগান গড়ে তুলেছেন। এখানে গিয়ে দেখবেন মোতালেব ভাই এখন খেজুর বাগান ছাড়াও গরুর বিরাট খামার গড়ে তুলেছেন। প্রতিদিন দর্শনার্থীরা তাঁর খেজুর বাগান পরিদর্শন করছেন। হাসি মুখে তিনি সবাইকে বরণ করছেন।
এই উপজেলার আরও কয়েকটি দর্শনীয় স্থান হচ্ছে—মেঘ মাটি ভিলেজ রিসোর্ট, ড্রিম ওয়ার্ল্ড রিসোর্ট, পাম বাগান, হবির বাড়িতে গড়ে উঠেছে কোমল পানীয় কোকোকলা-স্প্রাইট তৈরির ফ্যাক্টরি। সারা দেশবাসী যে কোকোকলা ও স্প্রাইট পান করছেন তা মূলত এই ফ্যাক্টরি থেকেই তৈরি। এই উপজেলার কয়েকটি অন্যতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ভালুকা ডিগ্রি কলেজ, ভালুকা মহিলা কলেজ, ভালুকা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, উথুরা বিদ্যালয় ও কলেজ। ওপরের যে দুটি রিসোর্টের বর্ণনা দিয়েছি ঐ দুটি রিসোর্টে বিনোদনের সকল উপকরণ দিয়ে রিসোর্ট দুটিকে সাজানো হয়েছে। একজন পরিবারের কর্তা হিসেবে আপনি যখন ঐ উল্লেখিত দুটি রিসোর্টে আসবেন তখন বিনোদনের সকল উপকরণ এখানে পাবেন। সব ধরনের খাবার ও কোমল পানীয় এখানে পাওয়া যায়।
এবার ভালুকা উপজেলার ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বর্ণনা করছি। ভালুকা গ্রাম ও ভালুকা বাজারকে কেন্দ্র করেই পরবর্তী সময়ে ভালুকা থানা ও ভালুকা উপজেলার নামকরণ করা হয়েছে। ভালুকা নামকরণ বিষয়ে বেশ কয়েকটি জনশ্রুতি প্রচলিত রয়েছে। এই জনশ্রুতিগুলোর মধ্যে তিনটি জনশ্রুতিই সবচেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য। এই তিনটি জনশ্রুতির একটি হলো—বৃটিশ শাসন যখন বাংলাদেশে পাকাপোক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন নীলকর সাহেবগণ তাদের নিজস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্যে বিভিন্ন জায়গায় নীলকুঠি স্থাপন করেন। নীলকুঠি স্থাপনের পর নীলকর সাহেবরা মাঝে মধ্যে শিকার করতে বের হতেন। শিকার করতে বের হয়ে নীলকর সাহেবগন বনে-জঙ্গলে বাঘ, ভাল্লুক দেখতে পেতেন। আর এ কারণেই নীলকর সাহেবদের কাছে এই এলাকা ভল্লুক এলাকা হিসেবে পরিচিতি পেয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে ‘ভল্লুক’-এর অপভ্রংশ হিসেবে উৎপত্তি ঘটে ভালুকা নামের। দ্বিতীয় জনশ্রুতি হচ্ছে বর্তমান ভালুকা বাজারের দুটি অংশ রয়েছে একটি পূর্ব অংশ, অন্যটি পশ্চিমাংশ। পূর্ব বাজারসহ গোটা ভালুকাই ছিল ভাওয়াল পরগণার অন্তর্ভুক্ত। অবশ্য ভালুকার পশ্চিম বাজার ছিল মুক্তাগাছার জমিদার মহারাজ শশীকান্তের জমিদারির আওতাভূক্ত। সেখানে জঙ্গলের ভেতর একটি মাজার ছিল। এর খাদেম ছিলেন ওয়াহেদ আলী ফকিরের পিতা ইন্নত ফকির। মরহুম খান সাহেব আব্দুল্লাহ চৌধুরীর নির্দেশে তাঁর সমসাময়িক বেশ ক’জন বিশ্বস্ত লোক মনসুর আলী খান, জায়েদ আলী ও জয়েদ খানের সহযোগিতায় ভালুকা বাজার সৃষ্টি হয়। পূর্ব বাজারে একটি কাঁচারী ঘর ছিল। সেখানে ভাওয়াল রাজার নামে খাজনা আদায় করা হতো। ভাওয়ালের কাঁচারীর নাম হয়েছিল ভাওয়ালের নাম অনুসারেই। পরবর্তী সময় বাজারসহ গ্রামের নামকরণ হয় ভালুকা। ১৯১৭ সালে গফরগাঁও থানাকে বিভক্ত করে ভালুকা থানা প্রতিষ্ঠিত হয়। তৃতীয় জনশ্রুতি হচ্ছে ভালুক চাঁদমন্ডল ছিলেন আদিবাসী কোচ বংশের সর্দার। ভালুক চাঁদের নামানুসারে ভালুকা নামের সৃষ্টি হয়েছে। উথুরা ইউনিয়নে ও ডাকাতিয়া অঞ্চলে কোচ বংশের লোকজন এখনো বসবাস করছেন।
এই উপজেলার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নদী হচ্ছে—খিরু নদী, সুতিয়া নদী, কাওরাইদ নদী, বাজুয়া নদী, লালতী নদী ও মিয়াবুয়া নদী। ভালুকার চির সবুজ গ্রাম বাংলাকে উপভোগ করতে চাইলে, হারলা বিলে নৌকা ভ্রমণ করতে পারবেন, এই বিলের চারপার্শ্বে গ্রাম বাংলার সংগ্রামী মানুষদের দেখতে পাবেন, এই বিলের মাছের সুনাম রয়েছে। নৌকায় করে এই বিল ভ্রমন করতে পারবেন। নৌকায় উঠার পূর্বে দরদাম করে নিবেন। এই বিলের শাপলা প্রতিবেশী গফরগাঁও ও ময়মনসিংহ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। যারা সাঁতার জানেন না তারা নৌকায় উঠবেন না অথবা লাইফ জ্যাকেটসহ নৌকায় উঠবেন। ভালুকা বাজারে আপনি যখন কোনো হোটেলে বসে খাবার খাবেন তখন খিরু নদীর তাজা মাছের স্বাদ উপভোগ করতে পারবেন। এই ভালুকা উপজেলায় কয়েক প্রজাতির কলা, মুড়িসহ নানা পদের সবজি নিয়মিত উৎপাদিত হয়, যা ঢাকাসহ সারা দেশে পাঠানো হয়।
ঢাকা থেকে সবচেয়ে সহজ হচ্ছে ভালুকায় বাসে করে চলে আসা। এই উপজেলার ১টি থানা, ১টি পৌরসভা, ৯টি ওয়ার্ড, ১৩টি মহল্লা, ১১টি ইউনিয়ন, ৮৭টি মৌজা ও ১১০টি গ্রাম রয়েছে। ঢাকা থেকে প্রথমেই ভালুকা বাসস্ট্যান্ড নেমে সেখান থেকে রিক্সাযোগে অথবা অন্যকোনো যানবাহনে করে ভালুকার দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন করতে পারবেন। একজন মানুষের আসা-যাওয়া-খাওয়াসহ সর্বোচ্চ দেড় হাজার টাকা খরচ হবে। সকালে গিয়ে সন্ধ্যার আগেই আপনি ঢাকায় ফিরে আসতে পারবেন। অন্যান্য জেলা থেকে যারা এই ভালুকায় আসবেন তারাও একই রকম সুবিধা পাবেন। এখানে থাকার মতো একাধিক হোটেল গড়ে উঠেছে। ইচ্ছা করলে উল্লেখিত দুটি রিসোর্টেও থাকতে পারবেন। স্থানীয় হোটেলগুলোতে পরিচ্ছন্ন পরিবেশে মানসম্মত খাবার খেতে পারবেন। বাংলাদেশের অনেক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করেছেন, আগামীতেও করবেন কিন্তু এবার একটি দিনের জন্যে হলেও ময়মনসিংহের সবুজনগরী ভালুকাতে আপনাদের আমন্ত্রণ জানাই।
● সৈয়দ রশিদ আলম : কবি ও প্রাবন্ধিক।





Users Today : 7
Views Today : 9
Total views : 175513
