ঘরে এসে শুনতে পেলাম নন্দিতা আমার জন্য অনেকক্ষণ বসে থেকে চলে গেছে। আমার ৮টার মধ্যে ফিরে আসার কথা ছিল। কিন্তু ঘড়ির কাটা এখন ১২টার ঘর ছুঁই ছুঁই। সকাল ৭টা থেকে ১০টা পর্যন্ত নন্দিতা আমার লেখাগুলো টাইপ করে আমাকে সাহায্য করে । তারপর সে সরাসরি ভার্সিটিতে চলে যায়। তিন বোনের মধ্যে নন্দিতা সকলের ছোট। বড়ো দুটো বোনের বিয়ে হয়ে সংসারী হয়েছে। নন্দিতার মা প্রয়াশই বলে ও আমার পেট-পোছা মেয়ে তাই সহজে ওকে আর বিয়ে দিচ্ছি না। যতদিন পারি ধরে রাখব। তারপরেও ভাল ছেলের সন্ধান যে করছি না এমন নয়, সন্ধান পেলেই দুটো হাত মিলিয়ে দেব। তাহলেই জীবনে আমার দ্বিতীয় বেলা সাঙ্গ হবে। ওর বাবা মুক্তিযুদ্ধে মারা গেছেন। অনেক কষ্টে ওদের মা প্রথমে টিউশনি পরে শিক্ষকতার কাজ করে ওদেরকে মানুষ করেছেন। তবে ওর বড়ো দুটো বোনই যতদিন বিয়ে না হয়েছে ভাইয়ের দায়িত্ব পালন করেছে। এখনো সকাল-সন্ধ্যা দু-বেলাই খবর নেয় এবং সপ্তাহে একটা দিন মা’র সান্নিধ্যে কাটিয়ে যায়। বড়ো মেয়ের ঘরে দুটো নাতি আছে, এলে প’রে একটু জ¦ালাতন করে, তবে সেই জ¦ালাতনের মধ্যে এক অনাবিল আনন্দ আছে। ওরা এলে মা যত খুশি হয় ততটাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে কিন্তু ওরা চলে গেলেই ওদের চঞ্চলতা নিয়ে ওদের অবর্তমানে বকাবকি শুরু করেন। মাঝে মাঝে নন্দিতা বলেই ওঠে, দেখ মা তুমি যদি এভাবে বলতে থাকো তাহলে আমি দিদিকে নালিশ করতে বাধ্য হব। ব্যাস, মার জ¦লন্ত চিতায় জল ঢেলে দেয়ার মতো অবস্থা পরে মা বলত দেখ নন্দিতা অভ্যাসটা বদলা। তুই সব সময় কানাকানি ও কথা চালাচালি করে সংসারে অশান্তি লাগাস। আমি কি তাদের বকেসি তুই বল ওরা আসলে একটু বেশি জ¦ালাতন করে না। সাজানো গোছানো সংসারটা একদিন এসেই সব ল-ভ- করে দিয়ে যায়। তুই তো আমাকে একটু সাহায্য করিস নাÑনন্দিতা মুচকি হাসে। এটা কি সত্যি সত্যি নাতিদের জন্য দরদ, নাকি আদিখ্যেতা। নন্দিতা বুঝতে না পেরেই প্রসঙ্গ পালটিয়ে ফেলে। একবার শ^শুর বাড়িতে যাওয়ার জন্য ওর বড়োদি এ বাসায় আসতে পারেনি। সেই আসতে না পারার জন্য নন্দিতার মার যে কি খেদ ও আপসোস তা স্মরণ করে সে হেসে ওঠে। মনে মনে ভাবে আমার বেলায় মা এমনটি করলে আমার ছেলেদের আর কোন দিন এ বাসায় আনব না। কথাটি মনে মনে স্মরণ করে সে সশব্দে হেসে উঠল। কার সাথে বিয়ে হবে তার নেই ঠিক অথচ ছেলেদের চিন্তা করে মার সাথে খুনসুঁটি করার জন্য সে প্রস্তুত হচ্ছিল। তাই বিয়ে প্রসঙ্গ আসতেই নন্দিতার মন বিষিয়ে যেত কারণ ওর বিয়ে হয়ে গেল পর মা একান্তই একাকী হয়ে পরবেন। তাই সে ঠিক করল বিয়ের পর সে মা কে সঙ্গে করেই শশুর বাড়ি যাবে তা না হলে সে বিয়েই করবে না। পাকাপাকি বিয়ের কথা চিন্তা করতে এখনো বেশ কিছুদিন সময় আছে কারণ সে মাত্র বিএ পাশ করেছেন মাস্টার্স শেষ হতে এখনো তার দেড় বছর বাকি। তাই এই সমস্ত বিষয় চিন্তা করে মনকে ধরে রাখা নিন্তাতই ছেলেমানুষি। সকাল ৭টার মধ্যে নাস্তা করে সে বেরিয়ে পরত দাদার বাড়ি পৌঁছাবার জন্য দাদার বাড়ি অর্থাৎ সৌমেন্দ্র দত্ত। পত্রিকা অফিসে তার সাথে পরিচয় সেই সাথে পার্ট টাইম চাকরি হিসাবে আজ প্রায় দেড় বছর হতে চলল সে কাজটা করে চলে আসছে। যদিও কাজটির মধ্যে তেমন কোন ঝুটঝামেলা নেইÑদাদা, দাদার মতো গল্প করে যান, নন্দিতা তার মতো টাইপ করে। মাসে একটি করে বই তার ছাপা হয়। অনেক সময় অপ্রকাশিত বইও ছাপাবার জন্য তাগিদ হয়। এত দিনে নন্দিতা ঐ বাড়ির মেয়ের মতো হয়ে গেছে। দাদার দুই ছেলে একজন আমেরিকা আর একজন কানাডা থাকেন। এ বছর দুজনেরই আসার কথা দেশে কিন্তু দেখা গেছে শেষ পর্যন্ত অনেক তোরজোর করেও তাদের আর আসা হয়ে ওঠে না। বাধ্য হয়ে গতবার ওরা দুজনই গিয়েছিল ওদেরকে দেখতে।
দাদার খুব ভালো লেগেছে বিদেশ বেড়াতে বৌদির মোটেও ভালো লাগেনি। নন্দিতা স্পষ্ট বুঝতে পারে বৌদি তার সংসারকে যেভাবে আপন করে নিয়েছেন। সেই সংসার ছেড়ে তিনি কোথাও গিয়েও স্বস্তি পাবেন না।
আসতে আসতে সৌমিন বাবুর বেশ দেরি হয়ে গেল। যা ভেবেছিলেন তাই নন্দিতা এসে বসে থেকে চলে গেছে। স্ত্রী বেশ ঝাঁঝালো স্বরেই বলল দেরিই যখন করলে তখন বিকেলের আড্ডাটাও না হয় দিয়ে আসলেই পারতে। সৌমিন বাবু বেশ শান্ত স্বরেই বললেন, তাই ভেবেছিলাম কিন্তু আমি না এলে তোমার দুপুরের ঘুমটা যে হবে না সেটা ভেবেই চলে এলাম। এই কথার পর ঐ পাশ থেকে আর কোনো আওয়াজ পাওয়া গেল না। ক্ষণকাল পরেই কলিং বেলের সৌমিন বাবু দরজা খুলতে গেলেন দেখলেন নন্দিতা দাঁড়িয়ে দরজায়। বললেন কী ব্যাপার আমি যে শুনলাম তুমি এসে চলে গেছ, আবার এলে যে? নন্দিতা বলল আজ আর ক্লাস হবে না তাই গত লেখাটা শেষ করার জন্য চলে এলাম। একধাপ বাড়িয়ে নন্দিতা বলল দাদা, যতটুকু বলেছেন গল্পটা আমার বেশ মনে ধরেছে তাই সেটার শেষ শুনে আজ যাব বলে ঠিক করেছি।
সৌমিন বাবু বুঝলেন, নন্দিতা গল্পের রসে ডুবে গেছে। সে মনে মনে গল্পটা শেষ করার জন্য তৈরি হতে থাকল। গল্পের নায়ক একজন নক্সালি রাজনীতির বাহক। সত্তরের দশকের পেক্ষাপটে লেখা এক স্বদেশি চিন্তায় উদ্ভাসিত যুবেকের কাহিনী। তখন শ্রেণিশত্রু নিধনের মহরা চলছিল। ক্রসফায়ার শব্দটি ইন্দিরা গান্ধীর সময়ে প্রচলন লাভ করে। পশ্চিম বঙ্গে ‘সি.পি.ই.এম ও সি.পি.ই.এম.এল (নক্সাল)Ñএর মধ্যে গড়ে ওঠা দ্বন্দ্বে প্রায় প্রতিদিনই ১০/২০ জন করে মারা যাচ্ছিল। সরকারের জন্য যেটা ছিল এক মোক্ষম সুযোগ। পুলিশের গুলিতে মারা গেলেও প্রতিদিন খবরে প্রকাশিত হত। দুই দলের দ্বন্দ্বে পারস্পরিক গোলাগুলির মধ্যে পরে যুবকরা নিহত হয়েছে। গল্পের নায়ক নিহত হওয়ার পরে জানা গেল, একটি পত্রিকা অফিসে অরিন্দম চক্রবর্তী চাকরি করত। ব্যক্তিগত জীবনে সে লেখাপড়ায় ভালো ছাত্র ছিলেন বিধায় অনেক ভালো চাকরির সুযোগ পেলেও সে করেনি। প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছিল তার চাকরিকে। মাঝে মাঝে তার লেখাও ছাপা হত। বিপ্লবের সুরে সমাজ বদলের অঙ্গীকারের প্রকাশ থাকত তার প্রতিটি লেখায়। লেখার মানদ- তার যথেষ্ট ভালো ছিল, শুধুমাত্র কাজের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক মতাদর্শের জন্যে সে চাকরিটি বদল করেনি তার স্ত্রীর শত অনুরোধ থাকা সত্ত্বেও। বিপ্লবের বাইরে তার তিন কন্যার জন্য ছিল একান্ত ভাবনা ও ভালোবাসায় পরিপূর্ণ প্রার্থনা। এই তিন কন্যা জন্ম দেয়ার জন্য তিনি গর্ব অনুভব করতেন। আর তাঁর স্ত্রীকে এই ভালোবাসার ফল উপহার দেয়ার জন্য একান্তই ভালোবাসত। এই ভালোবাসা মধ্যবিত্তের ভালোবাসা নয় শুধু একজন বিপ্লবি বীরের ভালোবাসা।
কোনোমতেই তার গুলি খাওয়ার কথা নয়। তথাপি সে খেয়েছিল ও একদিন পরে সে মারা গিয়েছিল। পত্রিকা অফিস ও পার্টি অফিস তার পরিবারকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছিল। স্বল্প বেতনে সেই পত্রিকাতে তার মা চাকরি পেয়েছিল। পরবর্তীতে সংসারের তত্ত্বাবধানের খাতিরে তাকে একটা স্কুলের চাকরি যোগাড় করে দেয়া হয়। সেই চাকরি সে অবসর অবধি করে গিয়েছিল। সেই চাকরি দিয়েই তার তিন কন্যা মানুষ করেছিল।
ঘণ্টাখানেক বলার পর সৌমিন বাবু থামলেন তখন প্রায় দুপুর দুটো বাজে। বললেন, ‘আজ এ পর্যন্তই’Ñবলেই নন্দিতার দিকে তাকাতেই বিস্ময়ে তিনি হতম্ভব হয়ে গেলেন। দেখলেন কলমটি খাতার পাশে পরে আছে। নন্দিতা অনির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে যেন তাকিয়ে। দু-চোখ দিয়ে তার অঝরে জল ঝরছে। সৌমিন বাবু সে একই পত্রিকা অফিসে বেশ কিছুদিন কাজ করেছিলেন। তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। একান্ত পিতৃ-¯েœহে সে তার কন্যাকে আদর করবে বলে এগিয়ে গেলেন। দিনটি ছিল ২৬ শে মার্চ।
ড. এলগিন সাহা : এনজিও ব্যক্তিত্ব ও লেখক।





Users Today : 128
Views Today : 165
Total views : 182013
