খ্রীষ্ট অনুসারী তথা খ্রীষ্টানদের অবদান এই উপমহাদেশে অতুলনীয়। তাঁরা প্রতিটি ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন, সেটা হোক শিক্ষা কিংবা চিকিৎসা, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন কুসংস্কার বিরোধী আন্দোলন। খ্রীষ্টান মিশনারীরা প্রথম ছাপাখানা স্থাপন করেছিলেন, বাংলাভাষায় প্রথম ব্যাকরণ লিখেছিলেন। জনসংখ্যায় তুলনায় তাঁরা ১%এর কম। কিন্তু এ দেশের ২০% চিকিৎসা সেবা তাঁরা দিয়ে আসছে। আর যদি শিক্ষার কথা বলি তাহলে হাতে গোনা যে কয়টি ভালো কলেজ আছে তাঁরা পরিচালনা করে আসছে। বাংলার স্বাধীনতার ইতিহাস অনেক পুরাতন। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিদেশি শাসকেরা নির্যাতন নিপীড়ন, শোষণ করেছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, বাংলায় মোগল শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন সুবেদার শাসন পরিচালনা করতেন। ১৭৪০ খ্রীষ্টাব্দে সুবেদার তসফরাস খানের হত্যার সুযোগে, বাংলার বিহার আলীবাদ খান দখল করে। আলিবাদ খাঁর মৃত্যুর পর তাঁর দৌহিত্র নবাব সিরাজ উদ-দৌলা বাংলার বিহার, উড়িশ্যা ক্ষমতার উত্তরসূরী হন। রাষ্ট্র পরিচালনার অনভিজ্ঞতা, পারিবারিক শত্রুতাকে পুঁজি করে ইংরেজরা দখল করে নেয় বাংলার শাসন ভার।
১৭৫৭ সালে ২৩ শে জুন বৃহস্পতিবার অপরাহ্নে পলাশীর রঙ্গমঞ্চে এক নিদারুণ প্রহসনাত্মক ট্র্যাজেডি অভিনীত হয়। যার পরিণতিতে বাংলা তথা ভারতবর্ষে জীবনে নেমে আসে পরাধীনতার শৃঙ্খল। বাংলায় ইংরেজিদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। শাসককূলের সাথে পাদ্রীরা এদেশে আসতে শুরু করে। শুরুতেই তারা নিজেদের জন্য একজন করে পাদ্রী নিয়ে এসেছিলেন, মুক্তির উপায় হিসাবে খ্রিষ্টধর্ম দীক্ষা দেবার জন্য ব্রতি হয়েছিলেন ইংল্যান্ডের কিছু ব্যাপ্টিশ মিশনারী। ১৭৯৩ খ্রীষ্টাব্দে এই মহৎ উদ্দেশ্য বাংলায় এসে হাজির হলেন দুই ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি ডাক্তার টমাস ও বিদ্যানুরাগী উইলিয়াম কেরি। তাঁদের আসাটা এত সহজ ছিল না। কেননা কোম্পানি, মিশনারীদের প্রতি কিছুটা বিরূপ ছিল। ১৭৮৩ সালে কেরি বাপ্তিস্ম গ্রহণ করেন এবং ১৭৮৫ সালে তিনি নর্থহ্যস্পটনের ব্যাপ্টিস্ট সংঘের পুরোহিত হিসাবে নিযুক্ত হন। তিনি ধর্মতত্ত্ব লেখাপড়া করতেন ফাঁকে ফাঁকে। তিনি টমাস কুকের কাছ থেকে উপমহাদেশের মানুষের দুঃখ- কষ্টের কথা ও সুসমাচার প্রচারের সম্ভবনার কথা শুনে মন স্থির করেন ভারতবর্ষে আসার। কিন্তু পথটা এত সহজ ছিল না। ১৭৮৬ খ্রীষ্টাব্দে নর্থহামটন শহরে পাদ্রী সম্মেলনে তিনি প্রস্তাব করেন অখ্রীষ্টানদের মধ্যে সুসমাচার প্রচারে কথা, কিছুটা ধমক দিয়ে তাঁকে বসিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ১৭৯৩ সালে ৯ জানু উইলিয়াম কেরি ও টমাস তাঁদের পরিবার নিয়ে ডেনিস জাহাজে করে যাত্রা করেন এবং ১১ নভেম্বর কলকাতার কাছে তাঁদের জাহাজ নোঙ্গর করে। বেশ কিছু সমস্যার কারণে তাঁদের এক সঙ্গে থাকতে পারেননি। জীবনও জীবিকার তাগিদে কেরি কলকাতা থেকে ব্যান্ডেল, ব্যান্ডেল থেকে নবদ্বীপ এবং নবদ্বীপ থেকে কলকাতার দক্ষিণ-পশ্চিম সুন্দরবনে গিয়েছিলেন। সময়টা কেরির ভালো কাটেনি। টমাসের একজন বন্ধু কেরির কাজের ব্যবস্থ্য করে দেনÑতিনি ছিলেন সরকারি কমকর্তা। মালদহ জেলার মদনাবতী স্থানে তাঁর একটি নীল কুঠি ছিল; সেখানে ২০০ টাকা বেতনে ম্যানেজারে চাকরি দেন। কাজের ফাঁকে ফাঁকে তিনি সুসমাচার প্রচার করতেন।
১৮০০ সালের ১০ জানুয়ারি ব্রিটিশ বিরোধীতার পরেও উইলিয়াম কেরি যোহোশ্তয় ম্যার্মম্যান ও উইলিয়াম ওর্য়াড মিলে শ্রীরামপুর মিশন সৃষ্টি করেন। তাঁদেরকে ত্রয়ী বলা হতো। ওর্য়াড ইংল্যান্ডে একটা পত্রিকার সম্পাদক ছিল, ম্যাশম্যান্ড ছিলেন একজন প-িত এবং টমাস ছিলেন একজন ডাক্তার। তাঁরা সবাই মিলে তাঁদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে সুসমাচার প্রচার করেছিলেন। মালদহ জেলার মদনাবতী নীল কুঠিতে চাকরিরত অবস্থায় নীল সাহেবের উওনি তাঁকে একখানা মুদ্রণযন্ত্র কিনে দেন। পঞ্চনন কর্মকারের কাছে থেকে বাংলা হরফ সংগ্রহ করে প্রতিষ্ঠিত করে উইলিয়াম প্রেস। এর ফলে বাংলা গদ্যর ইতিহাসে এক প্রত্যয় সঞ্চারিত হয়। উইলিয়াম কেরি ছিলেন একজন প-িত ব্যক্তি, অনেক ভাষায় পা-িত্য অর্জন করেন। ১৮০০ সালে তিনি মঙ্গল সুসমাচার নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন। কেরি বাংলা, হিন্দি, মারাঠি, সংস্কৃতি ভাষায় বাইবেল অনুবাদ করেন ১৮০৯ সালে। কিছুটা জড়তা থাকলেও বাইবেলের এই অনুবাদ বাংলাগদ্য সাহিত্য এক অন্যান্য বিবর্তন ঘটায়, শ্রীরামপুর মিশন থেকে মোট ৩৬টি ভাষায় বাইবেলের অনুবাদ প্রকাশ করা হয়। ম্যার্শম্যান ও কেরি সম্পাদিত বাল্মীকি রামায়ন মুদ্রণ করে হিন্দু সমাজে অনেকখানি সম্মান অর্জন করেন। এছাড়া শ্রীরামপুর মিশন থেকে দিগদর্শন ও সমাচার দর্পন নামে বাংলা ভাষায় দুটি পত্রিকা প্রকাশিত হতো। বাংলাভাষায় মুদ্রিত প্রথম পত্রিকা।
আর এদিকে ব্রিটিশ সরকার দেশ শাসনের জন্য সিভিলিয়ানদের নিয়ে আসেন। তাদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য গভর্নর জেনারেল ওয়েলেনসি ১৮০০ খ্রীষ্টাব্দে মে মাসে কলকাতার লালবাজার একটি কলেজ স্থাপন করেন দি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ। সেখানে বাংলা ও সংস্কৃতির প্রধান করা হয় কেরি সাহেবকে। পরে কেরি সাহেবকে মারাঠি বিভাগেরও দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে কেরি সাহেব দেখলেন বাংলা সাহিত্যে কোনো গদ্য নেই। তিনি গদ্য সাহিত্য রচনা শুরু করলেন। কেরি-সহ ১০জন লেখক ১৪টি গদ্য রচনা করেন। যা সিভিলিয়ানদের প্রশিক্ষণে অনেক বেশি সহায়ক হয়। যা বাংলা গদ্য বিকাশে অনেক বেশি সহায়ক।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘‘যতদিন বাংলা সাহিত্য থাকবে ততদিন উইলিয়াম কেরি বেঁচে থাকবেন বাংলা সাহিত্যে। তিনি বাংলাকে ভদ্র ও শিক্ষিত জনের আলোচ্য ভাষার মর্য়াদা দান করেছেন।’’
কেরির অন্যান্য কীর্তি
কেরি শুধু একজন খ্রীষ্টান মিশনারী ছিলেন না, তার আরও অসংখ্য গুণাবলী ছিল। কেরি কেবল খ্রীষ্টান ম-লি প্রতিষ্ঠা নয় বরং অসংখ্যক স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন, সমাজ উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন। ভারতবর্ষে রাজকীয় সনদপ্রাপ্ত সর্বপ্রথম বিশ্ববিদ্যালয় শ্রীরামপুর, যার প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন জেনারেল লর্ড হেস্টিংস। এটি উইলিয়াম কেরীর হাতে তৈরি ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ ধর্মতত্ত্ব কলেজ। কেরি হিন্দু সমাজের শাস্ত্রবিরোধী কু-প্রথাগুলির মূলোৎপাটন বাংলা ভাষা উন্নতি সাধন, বাংলা ভাষায় প্রথম সংবাদপত্র প্রকাশ তাঁরই কীর্তি। তাঁর পত্রিকায় সতিদাহ প্রথা, মানতপূরণ করতে সাগরদ্বীপের খেলায় শিশুদের সাগরে বিসর্জন, কুষ্ঠরোগীদের পুড়িয়ে মারাÑএ সব বিষয়ে সচেতনমূলক প্রবন্ধ লিখতেন। তিনি রাজা রামমহন রায়ের সহযোদ্ধা ছিলেন। আজকের এই ভাষার মাসে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি ওই সব কৃতী সন্তানদের, যাঁরা বাংলা ও ভাষার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে, প্রাণ দিয়েছেন, ভাষাকে ভালোবেসে, জীবনের শেষ রক্তটুকু বিলিয়ে দিয়েছে, তাঁদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাই, যাঁদের পবিত্র রক্তে সিক্ত হয়ে আমাদের স্বাধীনতা। আমাদের সার্বভৌমত্ব আর বাংলাদেশ জন্মলাভ করেছে যেন আমরা পরাধীনতার গ্লানি মুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে মাথা উঁচু করে বাংলা ভাষায় কথা বলে পথ চলতে পারি।
তথ্যসূত্র : ইন্টারনেটে প্রকাশিত প্রবন্ধ, উইকিপিডিয়া।
নাহিদ বাবু : তরুণ লেখক ও খ্রীষ্টিয় ধর্মতত্ত্বে অধ্যয়নরত।





Users Today : 30
Views Today : 36
Total views : 184520
