প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাঁওতাল শিশুদের জন্য সাঁওতালি বর্ণমালায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নসহ আদিবাসীদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষার দাবিতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ঢকার শাহবাগ জাদুঘর সংলগ্ন সড়কে আজ ২৫ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার সকাল ১০ টায় অনুষ্ঠিত এ মানববন্ধনের উদ্যোক্তা ছিল—উত্তরবঙ্গ আদিবাসী ফোরাম, আদিবাসী সাঁওতাল ফেলোশিপ সমিতি, সান্তাল রানাজোট সমিতি, সাঁওতাল লেখক ফোরাম-বাংলাদেশ, সাঁওতাল সমন্বয় পরিষদ, দি সান্তালস টাইমস ডট কম, সান্তালি নিউজ২৪.কম।
মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন সাঁওতাল লেখক ফোরাম-বাংলাদেশের সভাপতি লেখক ও কলামিস্ট মিথুশিলাক মুরমু। মানববন্বধনে বক্তব্য রাখেন—উত্তরবঙ্গ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. প্রভাত টুডু, মিল্কী সেদেক হাসদা, প্রফুল্ল টুডু, ইনোস হাসদা,শিমন বাস্কে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রোজলিন তিথি মারান্ডী, অনুপমা হেমব্রম প্রমুখ।
মানব বন্ধনে বক্তারা বলেন, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ২০১০ সালের শিক্ষানীতির আলোকে প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আদিবাসী, (নৃ-গোষ্ঠী)’র শিশুরা যাতে তাদের নিজস্ব মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকার এগিয়ে আসলেও সাঁওতালদের ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। ফলে সাঁওতাল শিশুরা মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে বঞ্চিত। ২০১০ সালে প্রাথমিক পর্যায়ে ৬টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে নির্বাচন করা হয় এবং সরকার ইতোমধ্যে ৫টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের কাজ সমাপ্ত করেছে কিন্তু সাঁওতালদের মধ্যে লিপিবিতর্কের অজুহাতে এখনো তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। একটি শিশুর স্বকীয়তা, সৃজনশীলতা, মননশীলতা ও মেধার বিকাশ হয় তার মাতৃভাষার মধ্য দিয়ে। এদিক দিয়ে সাঁওতাল শিশুদের নিজ মাতৃভাষায় অক্ষরজ্ঞান না থাকায় তাদের সংস্কৃতিও হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত। তাই এদেশে প্রত্যেক সাঁওতাল শিশুর নিজস্ব ভাষা ও ভাষার বর্ণমালা শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম।
শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে সর্বস্তরে সাংবিধানিক নিশ্চয়তার প্রতিফলন ঘটানো এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীদের সচেতন করা। সেই জাতিগত, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে আর্থ-সামাজিক শ্রেণী বৈষম্য ও নারী-পুরুষ বৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতা দূর করা। বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য ও মানুষে মানুষে সহমর্মিতা রোধ গড়ে তোলা, মানবাধিকার এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান নির্বিশেষে সবার জন্য শিক্ষালাভের সমান সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে বর্তমান গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ প্রবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশে বসবাসরত আদিবাসী শিশুসহ সব ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সংস্কৃতি ও ভাষার বিকাশ ঘটানো। সেই লক্ষ্যে সরকার জাতীয় শিক্ষানীতির (১৮) অনুচ্ছেদে উল্লেখ করে যে, আদিবাসীরা যাতে নিজেদের মাতৃভাষায় শিখতে পারে সেইলক্ষ্যে আদিবাসী শিক্ষক ও পাঠ্য পুস্তকের ব্যবস্থা করা হবে এবং পাঠ্য পুস্তক প্রণয়নে আদিবাসী সমাজকে সম্পৃক্ত করা হবে। বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের এ ধরনের পদক্ষেপ খুবই প্রশংসনীয় ও সমাদৃত হয়েছে এবং আমরা এই পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছি। আমরা বাংলাদেশ সরকারের এ লক্ষ্যকে বাস্তবায়নের সহযোগিতা করার লক্ষে মাতৃভাষা অ-বিকৃত অবস্থায় রেখে কার্যক্রমের মূলউদ্দেশ্য অর্জনে সহযোগিতা করার জন্য বরাবর প্রথম থেকেই “সাঁওতাল শিশুদের নিজস্ব মাতৃভাষায় প্রাক-প্রাথমিক পাঠ্যপুস্তক রচনার ক্ষেত্রে সাঁওতালি (রোমান) বর্ণমালা” ব্যবহারের জোর দাবি করে আসছি। এই সাঁওতালি (রোমান) বর্ণমালা ছাড়া অন্য কোনো বর্ণমালায় এর সুস্পষ্ট উচ্চারণ ও যথার্থ ভাবপ্রকাশ করা একেবারেই অসম্ভব।
মানববন্ধনে বক্তারা দাবি জানান, বিভিন্ন সময়ে কতিপয় ব্যক্তি ও সংগঠন সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর প্রাণের দাবিকে উপেক্ষা করে তাদের স্বীয় স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে বাংলা কিংবা অলচিকি বর্ণমালায় সাঁওতালি ভাষার বিকৃতি করার অপপ্রয়াসে লিপ্ত রয়েছে। আর সরকারের পক্ষ থেকে বারবার দায়সারা কথা বলা হচ্ছে যে, সাঁওতালদের নিজেদেরকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে কোন হরফ দিয়ে এই পাঠ্যপুস্তক প্রণীত হবে? কিন্তু আমরা মনে করি, যখন একটি বিষয় নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে বিতর্ক সৃষ্টি হয় তখন তৃতীয়পক্ষ যদি না থাকে তাহলে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। বাংলাদেশে সাঁওতাল ভাষা নিয়ে যে সকল ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কাজ করে এবং যে সমস্ত সাঁওতাল শিক্ষক-শিক্ষিকা স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করছেন তাদেও অভিমত নিয়েও সরকার একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারবে। আমরা সরকারের নিকট ভাষার শালীনতা ও যথার্থতা এবং মাধূর্যতা রক্ষায় সাঁওতালি (রোমান) হরফে সাঁওতাল শিশুদের জন্য ২০২২ সালের মধ্যে প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ণের জোর দাবি জানাচ্ছি এবং সরকারের কাছে ২০২২ সালের মধ্যে এ কার্যক্রম শেষ করার জোর দাবি করছি।
বাংলাদেশে বিশেষ করে উত্তরবঙ্গে আদিবাসীরা পুকুর/জলমহাল পাড়ে বসবাস করে এবং তাদের ঐতিহ্য ও পূজা-পার্বণের জায়গা হচ্ছে এই জলমহালের পাড় কিংবা জঙ্গল। অথচ সরকার ২০০৯ সালের প্রজ্ঞাপনের (ভূমি মন্ত্রণালয়) মাধ্যমে মৎস্যজীবীদেরকে আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকার জলমহাল ইজারা দেওয়ার কারণে তাদেও সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য’র ক্ষতি হচ্ছে। বাংলাদেশে স্বাধীনতার অর্ধশত বছরে ক্ষমতার পালা বদল হয়েছে। নতুন নতুন আইন পাশ হয়েছে কিন্তু আদিবাসীদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। সরকারের নিকট মানববন্ধনের উদ্যোক্তারা কয়েকটি জোর দাবি জানিয়েছেন—
১. ২০২২ সালের মধ্যেপ্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাঁওতালদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় সাঁওতাল শিশুদের জন্য সাঁওতালি বর্ণমালায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের কাজ সমাপ্ত করতে হবে।
২. প্রতিটি জেলায় আদিবাসী কালচারাল একাডেমী প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং আদিবাসীদের মধ্য থেকে প্রতিনিধি ও কর্মকর্তা নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
৩. আদিবাসীদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষায় সরকারি উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি পৃথক বরাদ্দের ব্যবস্থা করতে হবে।
৪. টিভি, বেতার ও বিভিন্ন মিডিয়ায় আদিবাসীদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যর সঠিক তথ্য তুলে ধরতে হবে এবং আদিবাসীদের অংশগ্রহণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৫. সরকারিভাবে আদিবাসীদের মধ্যে বিভিন্ন শিক্ষা, সাংস্কৃতিক ও খেলাধুলার প্রতিযোগিতা আয়োজন করতে হবে।
৬. আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে পুকুর/ জলমহালসমূহ আদিবাসীদেরকে ইজারা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
৭. আদিবাসীদের জমি-জায়গা, কবর-শ্মশান এবং পূজা-পার্বণের স্থান দখল বন্ধে আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠণ করতে হবে। ● সংবাদ বিজ্ঞপ্তি





Users Today : 5
Views Today : 5
Total views : 185318
