ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের একটি পর্দা ৩৭ লাখ টাকা দিয়ে কেনার খবরের বিষয়ে দুদককে তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।
শুধু এ পর্দা নয়, কলেজের বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনাকাটায় প্রায় ৪১ কোটি টাকার দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর সব তথ্য উঠে এসেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক তদন্তে। ২০১২ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে এসব সরঞ্জাম কেনাকাটা করা হয়। গত ২০শে অগাস্ট এ বিষয়টি ছয় মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে উচ্চ আদালত। দুর্নীতির এমন অভিযোগ ওঠার পর সরকারি কেনাকাটার বিষয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে জনগণের মধ্যে। এর আগে পাবনায় রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের গ্রিন সিটিতে বালিশ কিনতে খরচ দেখানো হয় ৬ হাজার টাকা। পরে তা গড়ায় আদালতে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের কেনাকাটায় এ ধরনের অভিযোগ বারবার আসছে কেন?
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, ‘‘পাবলিক মানি বা সরকারি অর্থ নিয়ে এ ধরনের দুর্নীতি আসলে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়। কারণ এ অর্থ উন্নয়ন কিংবা জনগণের কাজে ব্যয় হওয়ার কথা থাকলেও দুর্নীতির কারণে তা ব্যক্তি পর্যায়ে কুক্ষিগত করা হয়। এর ফলে পর্যাপ্ত অর্থ সংশ্লিষ্ট খাতে ব্যয় না হওয়ার কারণে হয় সেই উন্নয়ন কাজটি বাধাগ্রস্ত হয়, না হলে নিম্নমানের কাজ করা হয় অথবা যে কাজে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করার কথা ছিলো তার চেয়ে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় হয়। প্রথমত কর হিসেবে জনগণ অর্থ দিয়ে দেয় বলে তাদের কাছে সেই নগদ অর্থ থাকে না। ফলে সে এই অর্থ নিজের কাজে ব্যবহার করতে পারে না। আর দ্বিতীয়টি হলো, করের অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার হলে মানুষ যে সুযোগ-সুবিধা পেতো তা থেকেও বঞ্চিত হয় তারা। এই একই কারণে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো খাতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ দেয়া সম্ভব হয় না। ’’
সরকারি কেনা-কাটায় দুর্নীতি কীভাবে হয়?
সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি ও পণ্যদ্রব্য কেনার ক্ষেত্রে দুর্নীতি করাটা সহজ বলে প্রায়ই এ খাতে দুর্নীতির অভিযোগ আসে। তবে এখাতে দুর্নীতি ধরাটাও সহজ বিধায় এ খাতের দুর্নীতির খবর সামনে আসলেও অন্যান্য খাতের খবর বাকি থেকে যায়।
এ বিষয়ে সাবেক মহাহিসাব নিরীক্ষক এবং দুর্নীতি বিরোধী প্রতিষ্ঠান টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, ‘‘বহু ধরনের কাজের গ্রাউন্ড আছে যার দ্বারা কেনাকাটার সময় দুর্নীতি হয়ে থাকে। এটা নতুন নয়। বরং বহুদিন ধরে চলে আসছে এবং সময়ের সাথে এটি বেড়েই চলেছে।” কেনাকাটার ক্ষেত্রে দুর্নীতির এ খবর সরকারের অজানা নয়। আর এ কারণেই এ খাতে দুর্নীতি বন্ধে সরকার পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট এবং ই-টেন্ডারিংয়ের ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু এ ধরনের ব্যবস্থা নিয়েও কোন লাভ হচ্ছে না।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘শত রকমের উপায় আছে কেনাকাটার ক্ষেত্রে দুর্নীতি করার। টেন্ডারিং প্রসেসের মধ্যে কাউকে টেন্ডার পাইয়ে দিতে চাইলে তাকে সব থেকে কম খরচের দেখানো, আগে থেকেই টেন্ডারের তথ্য ফাঁস করে দেয়া, দামের রেট বা হার বলে দেয়া, এগুলো তো আছেই।” “এছাড়া টেন্ডারের বৈশিষ্ট্য বা শর্ত এমনভাবে সাজানো হয় যাতে নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তিই ওই সুযোগটি পায়। এধরণের আরো অনেক রকমের পদ্ধতি রয়েছে। এ ধরনের দুর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব নয় যদি না কেনাকাটা প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত ব্যক্তিরা সৎ হয়।’’
দুর্নীতি কেন বন্ধ করা যায় না?
দুর্নীতি বিষয়ে বহু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একাধিক রিপোর্ট করেছে টিআইবি এবং তার প্রকাশও করা হয়েছে। এসব প্রতিবেদন প্রাথমিকভাবে ওই প্রতিষ্ঠানগুলো স্বীকার করে নিলেও পরে তা অস্বীকার করে করা হয়।
এ বিষয়ে টিআইবি’র ট্রাস্টি এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, ‘‘প্রকিউরমেন্ট প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত সব কর্মকর্তা টপ-টু-বোটম সবাই দুর্নীতির সাথে জড়িত। যার কারণে এ খাতে দুর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব হয় না।’’ তিনি আরো বলেন, ‘‘যেহেতু দুর্নীতি করলে পার পাওয়া যায় আর এই ধরণের নিরাপত্তা নিয়ে অর্থাৎ দুর্নীতি করার পর ধরা পরা ও শাস্তির ভয় ব্যতিরেকে দুর্নীতি করা সম্ভব হচ্ছে বলেই দুর্নীতি হচ্ছে এবং তা বন্ধ হচ্ছে না। কারণ সবাই মিলে যোগসাজশে এই দুর্নীত করে।’’
টিআইবি’র ট্রাস্টি সদস্য এম হাফিজ উদ্দিন খান দুর্নীতি দমনে বেশ কয়েকটি পদক্ষেপের কথা বলেছেন। সুপারিশগুলো হলোÑ
দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে প্রথমত এর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। মানুষকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতন করতে হবে। তাদের মধ্যে দুর্নীতি বিরোধী মনোভাব গড়ে তুলতে হবে।
দুর্নীতির অভিযোগ বিশেষ বিচারিক আদালত গঠন করতে হবে। কারণ বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে বিচার থেকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। দুর্নীতি বন্ধে কঠোর সাজা কার্যকর করা দরকার।
সংসদকে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে ‘ওয়াচ ডগ’ হিসেবে ভ‚মিকা পালন করা।
সাংবিধানিক কমিটির মধ্যে অন্যতম পাবলিক আকাউন্টস কমিটি। এই কমিটি থেকে যে প্রতিবেদন দেয়া হয় এবং সুপারিশ দেয়া হয় তা মন্ত্রণালয়গুলোকে ঠিকমতো পালন করতে হবে।
মহাহিসাব নিরীক্ষকের দপ্তরের বিভিন্ন ঘাটতি পূরণ করা।
দুর্নীতি আগের চেয়ে কমেছেÑদুদক
দুর্নীতি দমন কমিশনের সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার বখত বলেন, দুর্নীতিকারীরা দুর্নীতি করতে ভয় পায় না বলেই আসলে দুর্নীতি ঠেকানো সম্ভব হয় না। আইন যারা মানে, যারা ভয় পায় তারা পরবর্তীতে কোনো অপরাধ করবে না। কিন্তু যারা মনে করে যে তারা আইনের শাসনের ঊর্ধ্বে তারা আইন ভয় করে না, তারা অপরাধ করে, আবার ধরা পড়ে।’’
তবে তিনি দুর্নীতিকে ঠেকানো যাচ্ছে না এমনটা অভিযোগ স্বীকার করছেন না। তার দাবি, “আগের চেয়ে দেশে দুর্নীতির পরিমাণ কমেছে। কোনো একটি দেশে কি একদিনেই দুর্নীতি বন্ধ হয়ে যাবে? পর্যায়ক্রমে হয়তো হবে। যেসব অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে সেগুলোর তদন্ত করা হচ্ছে। ধীরে ধীরে হয়তো কমছে। তুলনা করলে দেখা যাবে যে, আগে যে দুর্নীতি ছিলো তা এখন কমবে।’’
দুর্নীতি নির্মূলে সুধীজনের মতামত
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দুর্নীতির কারণ
জাতীয় অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দুর্নীতির কারণ। প্রশাসনের লোকের মন্ত্রী পর্যায়ের লোকদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। আধুনিক প্রযুক্তিকে ধন্যবাদ, দেশে দুর্নীতি যদি কমে থাকে তাহলে সেই কৃতিত্ব প্রযুক্তির। দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রযুক্তি নানাভাবে ভ‚মিকা রাখতে পারে।
প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা সৃষ্টি করতে হবে
ইফতেখারুজ্জামান, প্রধান নির্বাহী টিআইবি
দুর্নীতি রোধ করতে হলে চারটি জিনিসের উপর গুরুত্ব দিতে হবে। সেগুলো হলো প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা সৃষ্টি করতে হবে, রাজনীতিবিদদের স্বদিচ্ছা থাকতে হবে, দুর্নীতি নিয়ে কাজ করে এমন প্রতিষ্ঠাণগুলোকে কার্যকরী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করতে এবং সুশাসনের চাহিদা সৃষ্টি করতে হবে।
ভালো সিস্টেমের পেছনে খারাপ মানুষ থাকলে ভালো সিস্টেমটি খারাপ হয়ে যায়
ড. ইব্রাহিম খালেদ, সাবেক ডেপুটি গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক
ভালো সিস্টেমের পেছনে খারাপ মানুষ থাকলে ভালো সিস্টেমটি খারাপ হয়ে যায়। পক্ষান্তরে খারাপ সিস্টেমের পেছনে ভালো মানুষ থাকলে সিস্টেমটি ভালো হয়ে যায়।
দুর্নীতি প্রতিরোধে একটাই কৌশল হওয়া উচিত, তা হচ্ছেÑরাজনৈতিক সদিচ্ছা
শাহদীন মালিক, বিশিষ্ট আইনজীবী
দুর্নীতি প্রতিরোধে একটাই কৌশল হওয়া উচিত, তা হচ্ছেÑরাজনৈতিক সদিচ্ছা। ক্ষমতাসীন দলের দোষী দু-চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করাটাই এখন একমাত্র প্রয়োজনীয় কৌশল। দুদক আছে, আইন আছে। কিন্তু দৃঢ় রাজনৈতিক ইচ্ছা নেই। অথচ বিশ্বের যেসব দেশ থেকে দুর্নীতি দূর হয়েছে, সেখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছার কারণটিই ছিল সবার আগে। ইদানীং দুর্নীতি দমন কমিশন হাসপাতাল, স্কুলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি খুঁঁজে বেড়াচ্ছে। এটা তাদের কাজ নয়। তারা এটা করছে দুর্নীতি দমনে তাদের রাজনৈতিক সমর্থন নেই বলেই।’’
দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে সাফল্যের ওপর আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ বহুলাংশে নির্ভরশীল
ড. বদিউল আলম মজুমদার, সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)
সঠিক আইনি কাঠামো এবং আইনের গলদগুলো দূর করতে পারলে দুর্নীতি প্রতিরোধ সম্ভব। আইন নির্মোহভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। যাতে দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়। দলীয় পরিচয় বা ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা থাকলে আইন বাস্তবায়নে যেন বাধা না হয়ে দাঁড়ায়, যাদের বিরুদ্ধে বড়ো বড়ো দুর্নীতির অভিযোগ এসেছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার করা হলে দুর্নীতি প্রতিরোধের কাজ এগিয়ে যাবে। দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে সাফল্যের ওপর আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ বহুলাংশে নির্ভরশীল।
[দুর্নীতি বিরোধী বিভিন্ন সেমিনার-গোলটেবিলে প্রদত্ত বক্তব্য, বিবিস বাংলা’র তথ্যসূত্র অবলম্বনে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন শাহেদ কায়সার।]





Users Today : 13
Views Today : 13
Total views : 177416
