ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতা
সংসার গৃহে নয়, সংসার অন্তরে…
সৈয়দ রশিদ আলম
২৫ আগস্ট, ২০১৫ স্থান বারদী, সোনারগাঁও, নারায়নগঞ্জ। অনেক ভক্তের সাথে সাথে কিছু লেখকও সেখানে উপস্থিত হলেন। সেখানে আমিও ছিলাম। আমার বক্তব্যে বলেছিলাম, সাধক পুরুষ লোকনাথ ব্রহ্মচারীকে যখন স্থানীয় হিন্দু, মুসলিম সেই যুগে প্রশ্ন করেছিলেন, একপাশে মুসলিম বস্তি, একপাশে হিন্দু বস্তি, একপাশে মসজিদ ও আরেক পাশে মন্দির। আপনাকে কখনোও মুসলিম বস্তির দিকে বা হিন্দু বস্তির দিকে তাকাতেও দেখা যায় না, কখনোই দেখা যায় মসজিদ বা মন্দিরে উপস্থিত হতে। আপনি কি মুসলিম-হিন্দু, মসজিদ-মন্দির দেখতে পান না? উত্তরে পরম পুরুষ লোকনাথ ব্রহ্মচারী বলেছিলেন, ‘আমি ডানে বামে সবদিকেই তাকাই কখনোই কোনো মুসলিম, কোনো হিন্দু, কোনো মসজিদ, কোনো মন্দির দেখতে পাই না, যে দিকেই তাকাই শুধু নিজেকেই দেখতে পাই।’ ভক্তরা তারপর প্রশ্ন করলেন আপনি একা মানুষ আপনার কি কোনো সংসার নেই? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘সংসার গৃহে নয়, সংসার অন্তরে। যার অন্তরে প্রভু বিরাজমান তার অন্তরে সংসারের মোহ আসবে কীভাবে?’
সিরিয়ার বিখ্যাত সুফি দরবেশ ইবনুল আরাবী যখন একজন মিসকিনকে কিছুই দিতে পারলেন না তখন তিনি তাঁর শেষ আশ্রয় গৃহটি তাকে উপহার দিয়ে ছিলেন। তারপর তিনি কাবার পথে যাত্রা শুরু করেছিলেন। কাবায় পৌঁছে তওয়াফরত অবস্থায় তিনি আলোকিত ব্যক্তির সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন। তারপর তিনি সে আলোকিত ব্যক্তির হাত ধরে হাকিকি কাবার ভেতর প্রবেশ করেছিলেন। তিনি প্রত্যাদেশ প্রাপ্ত হওয়ার পর কাবার ভেতর বসেই লিখেছিলেন সর্বকালের সর্বসেরা সুফিবাদের পুস্তক ‘ফতিহাতি মক্কী’। এই পুস্তকে সৃষ্টির সব কিছুই বর্ণিত হয়েছে। সুলতানুল আউলিয়া বায়েজীদ বোস্তামী ১২ বছর তাঁর ওস্তাদ ইমাম জাফর সাদেক (র.) সেবা করার পর খেলাফত পেয়েছিলেন। এই মহাপুরুষের কোনো সংসার ছিল না। তাঁর অন্তরজুড়ে ছিল ইমাম জাফর সাদেক (র.) এর ছবি। ইয়েমেন থেকে আগত হযরত শাহ্ জালাল (র.) ও তাঁর ভাগিনা হযরত শাহ্ পরান (র.) মহান আল্লাহর বাণী প্রচার করতে গিয়ে চিরকাল একাই কাটিয়ে দিয়েছেন। তাঁদের কোনো সংসার ছিল না। তাঁদের অন্তরে ছিল আশেকে এলাহি প্রেমের অগ্নিশিখা। হযরত ওয়ায়েস করনী (র.) হযরত মোহাম্মদ (স.) এর একজন দিওয়ানা ছিলেন। কিন্তু তিনি নবীজির সাক্ষাৎ পাননি। তাঁর অন্তরজুড়ে ছিল নুরে মোহাম্মদ (স.) এর নুর। তাঁর কোনো সংসার ছিল না। কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই তিনি প্রিয় বন্ধু হযরত মোহাম্মদ (স.) কে দেখতে পেতেন।
গৌতম বুদ্ধ, বৌদ্ধ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁরও একটি সংসার ছিল। কিন্তু সংসারের মায়জাল পরিত্যাগ করে তিনি গৃহত্যাগী হয়েছিলেন। চলে এসেছিলেন ভারতের বিহার প্রদেশে বৌদ্ধ গয়ায়। এখানে এসে তিনি জন্ম-জন্মান্তরের রহস্য লোক অবলোকন করেছিলেন। এরপর তিনি ‘নির্বাণ’ লাভ করেছিলেন। তিনি জানতেন সংসার মানেই মায়া। মায়া মানেই আত্মা থেকে পরমাত্মার সাথে যোগাযোগ শেষ হয়ে যাওয়া। যেখানে মায়া আছে সেখানে মোহ আসবে। মোহ থাকলেই মানুষ নিজের আপনজনকেই ভুলে যাবে। যে আপনজনকে ভুলে যাবে, সে কি করে পরম করুনাময়কে মনে রাখবে?
নবী করিম (স.) এর প্রিয় ছাহাবী হযরত আবু হুরায়রা (রা.) সব চাইতে বেশি হাদিস বর্ণনা করেছেন। নবীজির অত্যন্ত প্রিয় পাত্র ছিলেন। কখনো খেয়ে থাকতেন, কখনো না খেয়ে থাকতেন। কিন্তু কখনো কোনো অভিযোগ করতেন না। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) এর কোন সংসার ছিল না। ছিল না স্ত্রী সন্তান। তাঁর অন্তরজুড়ে ছিল হযরত মোহাম্মদ (স.) এর প্রেম। যার অন্তরে রসুল প্রেম থাকবে সংসারের মায়ার বন্ধনে কীভাবে সে জড়াবে? এই লেখাটা শুরু করেছিলাম লোকনাথ ব্রহ্মচারী দিয়ে, যারা মোহ মুক্ত হয়েছেন, মায়ামুক্ত হয়েছেন, দুনিয়া মুক্ত হয়েছেন, তাঁদের যদি স্ত্রী, সন্তানও থাকে তারপর তাঁরা মুক্তিপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবেন। একজন সদ গুরু আপনাকে এই পথটি দেখিয়ে দিবেন।
সৈয়দ রশিদ আলম : কবি ও প্রাবন্ধিক।





Users Today : 17
Views Today : 17
Total views : 180716
