অপ্রিয় হলেও সত্য আমাদের লেখাপড়ার পুরো ব্যাপরাটাই হচ্ছে পরীক্ষা নির্ভর। সারা বছর শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিচ্ছে। বারো বছর লেখাপড়া করার সময় তারা চার চার বার পাবলিক পরীক্ষা দিচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের লেখাপড়া বা পরীক্ষার ওপর সমাজের প্রায় সব শ্রেণির কিংবা অভিভাবকদের আর তেমন ভরসা, আস্থা উঠে গেছে। তাই ধনী, দরিদ্র সবাই তার সন্তানকে কোচিংয়ে দিচ্ছে। সেখানে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার পর পরীক্ষা দিচ্ছে। ‘সাপ্তাহিক পরীক্ষা’, ‘ক্লাস টেস্ট পরীক্ষা’ ‘মাসিক পরীক্ষা’ ইত্যাদি বিভিন্ন নামে শুধু পরীক্ষা। দেশের অধিকাংশ শিক্ষক, অভিভাবক মনে করেন লেখাপড়ার মানেই হচ্ছে পরীক্ষা। আর আরও একটা বিষয় প্রায় সবার মধ্যে ঢুকে গেছে যে, ভালো লেখাপড়া মানে পরীক্ষায় ভালো গ্রেড পাওয়া। জিপিএ-৫ পেতেই হবে। অনেকে আবার বাড়িয়ে বলে ‘গোল্ডেন’ জিপিএ-৫। ফলাফলের সনদে কোনদিন গোল্ডেন শব্দটি ছিল না, আর থাকবেও না। আমিও চাই আমার সন্তান ভালো ফল করুক পরীক্ষায়। কিন্তু যারা জিপিএ-৫ পাবে না, তারা কি বঙ্গোপসাগরে ভাসিয়ে যাবে? তাঁরা কি মানুষ হবে না?
যতদূর জানি শিক্ষানীতির খসড়াতে দুইটি পাবলিক পরীক্ষার কথা বলা হয়েছিল। তাই লেখাপড়ার প্রথম তিন বৎসর কোনো পরীক্ষা থাকবে নাÑএই সিদ্ধান্তটি এখন চ‚ড়ান্তভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে মনে হয়। শুনতে কষ্ট লাগবে তবু বাস্তবতা হলো, এ দেশের একেবারে দুধের বাচ্চাটিকেও পরীক্ষা দিতে হয় এবং সেই পরীক্ষায় একটু উনিশ-বিশ হলে অভিভাবকেরা বাচ্চাদের জীবনটিকে উলট-পালট করে ফেলেন। সবার মতো আমিও চাই আমাদের সন্তানরা মানসম্মত লেখাপড়া করে ভালো মানুষ হবে, চাকরি করবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে। জীবনে প্রতিষ্ঠা পেতে, মেধাবি হতে গেলে জিপিএ-৫ না পেলেও চলে।
বর্তমান শিক্ষা যেহেতু পরীক্ষানির্ভর, তাই শিক্ষার্থীরা কেবল পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট নির্বাচিত সীমিত বিষয়ের উত্তর মুখস্থ করেই শিক্ষাজীবন কাটিয়ে দিচ্ছে। তাই মানুষ হয়ে ওঠার পথে জরুরি অনান্য বিষয়ের চর্চা সম্পূর্ণ উপেক্ষিত থাকছে। অথচ ছাত্রোত্তর জীবনে তো একজন ব্যক্তির কাছ থেকে তাঁর পিএসসিতে গণিতের মান বা জেএসসিতে ইংরেজির গ্রেড, এসএসসিতে ইতিহাসের স্কোর কত এসব কেউ জানতে চায় না, দেখতে চায় তার ভাবপ্রকাশে লিখিত-মৌখিক দক্ষতার মান, দেখতে চায় আত্মবিশ্বাস, ন্যায়বোধ, বিচক্ষণতা, দুরদর্শিতা, নেতৃত্বগুণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, সংবেদনশীলতা ইত্যাদি মানবিক গুণাবলির মান কেমন। সমাজে নানা ঘটনায়, সমাজের দিকে তাকালে, খবরের কাগজে চোখ রাখলে এসব গুণাবলির ঘাটতিই দেখা যাচ্ছে বেশি। বুয়েটে ঘটে যাওয়া আবরার হত্যাকাÐের ঘটনায় অভিযুক্ত সবাই তো মেধাবি ছাত্র, তাহলে কেন তাঁরা সেই বর্বর ঘটনা ঘটালো? কোথাও যেন ঘাটতি আছে। পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা থেকে কেমন ফলাফল আসছে চলুন দেখা যাক। ২০১৫ সালের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের শতকরা ৩৫ ভাগই যেটুকু বাংলা পড়ার কথা, সেটুকু সে বাংলা পড়তে পারে না, শতকরা ৬০ ভাগই যেটুকু গণিত শেখার কথা, ততটুকু সে শেখে না। যখন তারা পঞ্চম শ্রেণিতে উঠছে, তখন আগের সমস্যা কাটিয়ে ওঠার বদলে সমস্যা আরো বেড়ে যাচ্ছে। তখন শতকরা ৮০ ভাগ শিক্ষার্থী যেটুকু জানার কথা, সেটুকু সে জানছে না। কিছুদিন আগে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের বের হওয়া এক রিপোর্ট হিসেবে, আমাদের ছেলেমেয়েদের জীবনের প্রথম ১১ বছরের লেখাপড়ার মাঝে সাড়ে চার বছর পরিমাণ সময় লেখাপড়া হয় না। অর্থাৎ আমরা তাদের ১১ বছরে সাড়ে ছয় বছরের সমান পড়িয়েছি।
আমার সাথে একমত হবেন কিনা জানি না, আমাদের সন্তানেরা পড়াশুনা নিয়ে অত্যন্ত চাপের মধ্যে আছে। তারা শুধু পড়তে বসে পাতা উল্টাচ্ছে, পাতা উল্টাচ্ছে, তাদের ভালো ঘুম হয় না, তারা খেলা ভুলে যাচ্ছে, গান ভুলে যাচ্ছে। ভোর বেলা আমরা তাদের জোর করে ঘুম থেকে ডেকে তুলে টেনে হিচড়ে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছি। পিঠে সেই শিশুর ১০/ ১২ কেজি ওজনের ব্যাগ। স্কুলে বা কেজি স্কুলে ছোট্ট একটা বেঞ্চে চাপাচাপি করে বসছে। অপরিষ্কার ওয়াশ রুমে যাওয়ার ভয়ে সে টয়লেট ছাড়ছে না। সেখানেই সে নাস্তা করছে। তারপর একটার পর একটা ক্লাস, পরীক্ষা দিচ্ছে। এর মধ্যে কোনো বিরতি নেই। বাসায় গিয়েই সে হোম ওয়ার্ক নিয়ে বসছে। বাইরের পৃথিবী কে সে ভুলে যাচ্ছে। তারপর তার একটার পর একটা গৃহশিক্ষক আসছে। শিশুটি একটা সময় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ছে। হঠাৎ ঘুম ভাঙলে সে উঠে টিভিতে হিন্দি ‘ডোরেমন’ দেখছে। আমরা অনেক অভিভাবক আমাদের সন্তানকে শিশু বয়সেই আইনস্টাইন বানাতে চাইছি। পরিশেষে বলা দরকার, রাজনীতি, প্রশাসন, পরিবার,সমাজ সর্বত্র একদিকে নৈতিকতার ভিত্তি স্বচ্ছ ও দৃঢ করতে হবে অন্যদিকে স্কুল থেকে ছেলেমেয়েদের সৃজনশীলতা ও মানবিক গুণাবলির বিকাশে সহায়ক কার্যক্রম হাতে নিতে হবে।
রবিউল ইসলাম : অধ্যাপক ও কলামিস্ট।





Users Today : 114
Views Today : 125
Total views : 177376
