আমাদের দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার কথা বলতে গেলে প্রাচীনকালের সেই টোল ব্যবস্থা থেকে শুরু করতে হয়। টোল ব্যবস্থাগুলো গড়ে উঠেছিল জমিদারদের বদন্যতায়। শিক্ষিত জমিদারগণ নিজ জমিদার অংশের উন্নয়নের জন্য টোল ব্যবস্থা প্রচলন শুরু করেন। নিজ নিজ সন্তানদের জন্য তারা ভালো ভালো শিক্ষক জোগাড় করে নিয়ে আসতেন। তাদের অধীনে প্রাথমিক দিকে সেই টোলগুলো বেশ প্রসার লাভ করেছিল। ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড’ এই জাতীয় স্লোগান সম্ভবত সেই সমস্ত দিন থেকে শুরু হয়ে থাকবে। উদ্দেশ্য ছিল একটাই যেন শিক্ষাকে গণমুখি করা যায়। বাঙালি সচেতন সমাজবেত্তারা শিক্ষার আলোকে সমাজে বিকশিত করার লক্ষ্যে যে সকল প্রচেষ্টা নিয়েছিলেন সেই সকল প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ জমিদারদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত টোলসমূহ বিকেন্দ্রীকরণ শুরু হয় অর্থাৎ একটা প্রধান টোলের অধীনে আরও ছোট ছোট টোল গড়ে উঠে। এইভাবেই সমাজে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বিস্তার লাভ করেন। পরবর্তীতে ইংরেজরা যখন এই দেশ শাসন করতে শুরু করে প্রাথমিক পর্যায়ে ছোট ছোট টোলসমূহ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করতে শুরু করে। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যেকোনো বিয়ের পাকা দেখা কথার অনুষ্ঠানে বর কনের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে সুনির্দিষ্ট আলোচনা হয়ে থাকত। বর পক্ষের শ্বশুর গর্ব করে বলতে পারতেন বউ মা আমার ৫ম শ্রেণি পাশ যেন আমার পরবর্তী প্রজন্ম শিক্ষিত হতে পারে। একইভাবে কনে পক্ষের শ্বশুর জামাই আমার ম্যাট্রিক পাশ বলে গর্ব করতেন। এই ভাবেই শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সমাজে ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। বর্তমানে ডিগ্রি মাস্টার্স ও পিএইচডিতে এসে হয়ত সেই ব্যাপকতা কিছুটা থেমেছে তথাপি যারা পিএইচডি করতে পারে না তারা ডাবল এম.এ বলে সামাজিক মানদণ্ডে নিজেদের মর্যাদা বৃদ্ধি করতে প্রয়াস পান।
আমার এক দূর সম্পর্কীয় আত্মীয়া ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে ডাবল এম.এ পাশ করেছিলেন, আকৃতিতে তিনি কিছুটা খর্বকায় ছিলেন বলে যারা জানতেন না তারা তাকে প্রায়শই প্রশ্ন করতেন এই খুকি তুমি কোন ক্লাসে পড়? এই সমস্ত প্রশ্নের প্রতি উত্তর দিতে গিয়ে সে নিজেকে খুবই অসম্মানিত বোধ করতেন। ফলে একদিন সে বলেই ফেলল যে, ‘আমি যে ডাবল মাস্টার ডিগ্রি হোল্ডার একটা সাইনবোর্ডে লিখে গোলায় চেপে ঘুরে বেড়াব’। ব্রিটিশ আমলেই সার্টিফিকেট কথাটা সবচেয়ে প্রচলন হয় বেশি, এখন পর্যন্ত বেশিরভাগ চাকরি দাতারাই কী পাশ করেছেন? সার্টিফিকেট আছে তো? তারা সার্টিফিকেট দেখতে চান। দু’শ বছর রাজত্বের ফলে ব্রিটিশরা যে অবদান রেখে গেছে সমাজ তার সুফল ও কুফল দুটিই বহন করছে। তার মধ্যে হচ্ছে একটা সার্টিফিকেট বহনের ব্যাপকতা। যেখানেই যাও তোমাকে তোমার সার্টিফিকেট বহন করতে হবে, এইটাই জীবনের মহামূল্যবান সম্পদ। সযত্নে রক্ষা করতে হবে। মূল সার্টিফিকেট হারিয়ে যাবার পর সম্যক বিপদে পড়তে হবে। তাই সার্টিফিকেটের সাথে অনেকে সত্যায়িত সার্টিফিকেটের কপি রাখে। এখন তো সকলেই মূল সনদের ওপর ম্যাজিসট্রেট অথবা প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তাদের সত্যায়িত সনদের কপি দিয়েই কাজ চালিয়ে থাকেন। আমি কি জানি বা না জানি সেইটা বড় কথা নয় আমার সার্টিফিকেট আছে কিনা সেটাই বড় কথা। তাই এই সার্টিফিকেটের ধকল সামলাতে গিয়ে পাশ না করে অনেকে নকল সনদ দিয়ে চাকরির বাজারে ভাগ্য শিকারে নেমে পড়েন। ফলে নকল সনদের ছড়াছড়ি সমাজে বেশ অন্যায্যতা সৃষ্টি করেছে। নকল সনদ যে একটি ক্ষমহীন পাপ সমাজে এই সত্যটা প্রতিষ্ঠিত হবার পরেও অনেকেই নকল সনদ নিয়ে চাকরির বাজারে জয় লাভ করার চেষ্টা করছেন। যখন অল্প সময়ের মধ্যে একটা লোকের জ্ঞানের পরিমাপ প্রচেষ্টা সফল হয় না তখন আমরা অনেকেই সার্টিফিকের ওপরে নির্ভরশীল হয়ে পড়ি।
টোল ব্যবস্থা থেকে শুরু করে আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পর্যন্ত সব জায়গায় সার্টিফিকেটের ব্যাপকতা রয়েছে এবং এর ওপরে নির্ভরশীল হওয়ার জন্য আমরা অনেকেই প্রকৃত জ্ঞানীকে চিহ্নিত করতে পারি না। তাই প্রতিটি পরিবারেই দেখা যাবে যথাযথ সনদের অভাবে অনেক জ্ঞানী লোকই তাদের জ্ঞানের যথাযথ মর্যাদা না পাওয়ার রোগে ভুগছেন। বর্তমান বিশে^ শিক্ষাক্ষেত্রে ব্রিটিশ ও আমেরিকানরা রাজত্ব করছেন। তাদের এই রাজত্বের পাশাপাশি প্রধানত দুটো পদ্ধতিই এখন আমাদের দেশে প্রচলিত। একটি সার্টিফিকেট নির্ভর অপরটি দক্ষতা নির্ভর। আপনি খুব জ্ঞানী ও ভদ্রলোক। কাজটি আপনাকে দিলে আপনি করতে পারবেন বলে আমাদের বিশ্বাস আছে। কিন্তু আপনার জ্ঞানের প্রকাশ ও দক্ষতার প্রমাণসহ কোনো সনদ রয়েছে? সনদ ছাড়া আমরা কোনো ব্যবস্থা করতে পারব না। অপর পদ্ধতি হচ্ছে সার্টিফিকেটের খুব বেশি দরকার নেই, তুমি যে, কাজটি করতে পারবে তা করে দেখাও। তাহলেই তোমাকে কাজটি দিতে পারি। অর্থাৎ আমি কি করতে পারি আর না পারি সেইটা প্রমাণের জন্য আমার একটি সার্টিফিকেট দরকার। নিয়োগকর্তারা নিয়োগকালীন সময়ে এই বিষয়ে নিশ্চিত হতে চান তাই শিক্ষাগতার সনদের সাথে সাথে অভিজ্ঞতার সনদ চেয়ে থাকেন। অনেক সময় সনদটি যে আসলেই সত্য মিথ্যে নয় সেই বিষয়ে তারা যথাপোযুক্ত পরীক্ষা করে থাকেন। আমার জীবনে নকল সনদের মাধ্যমে চাকরি পাওয়ার অনেক বছর পরেও অনেকের চাকরি হারাতে দেখেছি। তাই আমরা চাই আর না চাই প্রয়োজন অনুভব করি আর নাই করি সনদের প্রয়োজনীয়তা আমাদের সমাজ থেকে এখনো দূর হয়ে যায়নি। বরং সমাজের প্রকারভেদে সেই সনদের অবয়ব দিন দিন আরও বস্তুনিষ্ট হয়ে উঠেছে।
ব্যক্তিগত জীবনে চাকরির বদান্যতায় আমি শত শত চাকুরি অন্বেষিদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগ পেয়েছি। আমার নিজ অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি এই যে, একটি লিখিত পরিক্ষার মাধ্যমে চাকুরি অন্বেষিদের সনদ বহির্ভূত অনেক বিষয়ে জানা যায় তারপর ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে আধা ঘণ্টার মধ্যেই যেকোনো লোককেই শত ভাগ না হলেও আশি ভাগ জেনে নেওয়া যায়। শুধুমাত্র প্রশ্ন ও প্রতি প্রশ্নের মাধ্যমে চাকুরি অন্বেষিদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের বিষয়ে প্রায় স্পষ্টভাবেই বোঝা সম্ভব হয়ে থাকে। কারণ মানুষ যতই ছল-চাতুরি করুক না কেন নিজের সম্পর্কে বলতে গেলে তাকে সত্য কথাটি বলতেই হবে আর সে কোনটি সত্য বলছে আর কোনটি নয় যেকোনো সাধারণ পরীক্ষক একটু খেয়াল করলেই তা সহজেই ধরতে পারবেন। আজকাল প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে অনেক মনস্তাত্বিক প্রশ্নের জোগাড় করা সহজ। গবেষণাসিদ্ধ সেই সমস্ত মনস্তাত্বিকভাবে সিদ্ধ সেই সমস্ত প্রশ্নপত্র সহজেই লাভ করা যায়। অতএব চাকুরিদাতা চাইলেই সহজে উপযুক্ত প্রার্থীদের লিখিত পরীক্ষা ও মৌখিক সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে জেনে নেওয়া সম্ভব। সনদেরও প্রয়োজন রয়েছে তবে তা প্রধান বিষয় নয়।
চাকুরি অন্বেষিরা একইভাবে একটু চালাক চতুর ও চৌস্ত হলে সহজে নিজেদেরকে চাকুরি অন্নেষিদের মনমতো উত্তর দিয়ে চাকুরি জোগার করতে পারেন। কোথায় বলে চাকুরি পাওয়া সহজ কিন্তু ধরে রাখা কঠিন। সেই কঠিন কাজটি স্বার্থকতার সাথে করতে পারলে জীবনে সফলতা আসবেই আসবে। অনেকেই চাকরি করছেন কিন্তু অনেকেই জানেন না যে, যে চাকরিটি তিনি করছেন সেই চাকুরিটি কি তার জন্য যথার্থ? এর থেকে ভালো চাকুরি কি তিনি জোগাড় করতে পারেন না? তাই হয় তাহলে কীভাবে তা সম্ভব? চাকুরি অন্বেষণের ক্ষেত্রে সব সময় নিজেকে একজন প্রতিযোগীরূপে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। প্রকৃত প্রতিযোগীমনসম্পন্ন যেকোনো প্রতিযোগীই নিজেকে তৈরি করতে সক্ষম হলে উন্নততর চাকুরি জোগার অথবা একই সংস্থায় প্রমোশন লাভের ব্যবস্থা করতে পারেন। সেই ক্ষেত্রে দুটো বিষয়ে আবশ্যকীয়। প্রথমত, সংস্থা প্রধানকে বুঝাতে হবে যে কাজটি তিনি করছেন সেই কাজের থেকে বেশি, কাজ বড়ো কাজ ও ভালো কাজ তিনি দায়িত্ব নিয়ে করতে সক্ষম। এটা জানাবার জন্য ঢাক-ঢোল পিটিয়ে জানাবার কোনো প্রয়োজন নেই। ঈসা নবীর একটি শিক্ষাই এ বিষয়ে যথেষ্ট। “ Walk an extra mile” যারা সংস্থার উন্নতি বিধানের লক্ষ্যে এক্সট্রা মাইল হাঁটতে ইচ্ছুক তারা অবশ্যই একদিন না একদিন তার ইসপিত লক্ষ্যে পৌঁছাবেনই।
ড. এলগিন সাহা : এনজিও ব্যক্তিত্ব ও কলামিস্ট।





Users Today : 121
Views Today : 132
Total views : 177383
