ঘটনাবহুল বাংলাদেশে যেভাবে ঘটনা ঘটে যাচ্ছে তাতে করে সচেতন মানুষের পক্ষে শিহরিয়ে ওঠা ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর নেই। অবস্থানটা এমন দাঁড়িয়েছে যে এক সম্রাটের কাহিনী শুরু হওয়ার পর প্রায় মাস পেড়িয়ে গেল তবু সংবাদপত্রে সম্রাটের খবর এখনো যেন সম্পূর্ণ স্থিতিয়ে যায়নি। খবরের যখন এপিঠ-ওপিঠ দু-পিঠ থাকে তখন ভাবলাম খবরের অন্যপিঠ কিছুটা আঁচ করা যায় কিনা। সে নিঃসন্দেহে অত্যন্ত চতুর, নিজের উন্নতি কীভাবে করা যায় এই বিষয়ে সে নিজেকে সম্রাটের আসনে বসিয়েছে বৈকি! এক ধনী যুবক জীবনে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য ঈসা নবীর সাথে দেখা করতে আসলেন। ঈসা নবী তার দিকে চেয়ে বুঝলেন ছেলেটি সত্যি একজন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি। যুবকটি প্রশ্ন করেছিল হুজুর নাজাত পাওয়ার জন্য আমার কী করতে হবে? ঈসা নবী তাকে ঘুরিয়ে প্রশ্ন করলেন, তোমার ধর্ম বিশ্বাস এ বিষয়ে কী বলে? যুবকটি যথার্থই উত্তর দিল বলল জ্বী আমাকে কঠিনভাবে শরীয়ত পালন করতে হবে। যুবকটি বলল, আমি তো সেই সমস্তই করেছি। ঈসা নবী বললেন, তাহলে একটি বিষয় বাকি আছে, তুমি তোমার সমস্ত ধন-সম্পত্তি বিক্রি করে গরীবদের মাঝে বিলিয়ে দাও এবং আমার পশ্চাতে এসো। এই কথা শোনার পর যুবকটি খুবই দুঃখিত হয়ে চলে গেল। ঈসা নবীর সাহাবীরা বলল, হুজুর এমনটা হলো কেন? ঈসা নবী বললেন যুবকটি আসলে অনেক ধনবান। একজন মানুষের পক্ষে একই সঙ্গে ধন ও মাবুদের সেবা করা সম্ভব নয়।
সম্রাটের কোথায় ফিরে আসি। প্রচুর ধনে সে ধনীবান ছিল সন্দেহ নেই। এখন কি জেলের ঘানি টানতে টানতেই না জানি তার জীবনটা চলে যায়। ঈসা নবী বলেছিলেন, “মানুষ যদি সমস্ত জগৎ লাভ করে নিজ প্রাণ হারায় তবে তার কি লাভ হলো”। সম্রাটের দিন-কাল তো ভালোই চলছিল, হঠাৎ করে কোথা থেকে কি হয়ে গেল-তাসের ঘরের মতো তার সমস্ত প্রাসাদ ভেঙে পড়ল। মিডিয়াতে এত বেশি লেখালেখি হয়েছে সম্রাটের সম্পর্কে যে কেউ একজন তার জন্য অশ্রুপাত করবে এমন কাউকে পাওয়া একান্তই অভাব। তার বাবা-মা হয়ত করবে কিন্তু শেষ ফল তার সব কিছু শেষ করে দিল।
আমি ভাবছি অন্য কথা। একটু বুদ্ধির সাথে চললে বাংলাদেশে কত সহজে পয়সা বানানো যায়। জুয়া খেলায় যখন নেশা ধরে যায় তখন প্রকৃত জুয়ারিরা সেই খেলা থেকে নিজেদের রাশ ধরে টেনে রাখতে পারে না। আরেকটু আরেকটু করে কত ধন-সম্পত্তি তো সম্রাট বানিয়েছিল এখন সেগুলো উপভোগের জন্য তার জন্য কিছুই অবশিষ্ট রইলো না। এই সমস্ত ধন-সম্পত্তি না বানিয়ে সে যদি নিজের ইচ্ছার লাগাম টেনে ধরতে পারত তাহলে তার জীবন অনেক সুন্দর হয়ে উঠতে পারত। যেখানে থামার কথা ছিল সেখানে সম্রাট থামতে পারেনি। লোভ আমাদেরকে সব সময় ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায় এবং সেই ধ্বংস থেকে যখন আমরা নিজেকে নিরস্ত করতে পারি না তখন অন্যের ঘারে দোষ চাপাই। সম্রাটের দ্বিতীয় স্ত্রী ও তার মা সেই রকম গান গেয়েই যাচ্ছেন।
মহাভারতে একটা সুন্দর গল্পের উল্লেখ আছে। যখন পঞ্চপান্ডবদের অরণ্যের জীবনযাপন করছিল তখন হঠাৎ করে এক ব্রাহ্মণ এসে কেঁদে কেঁদে বলল হুজুর আমি যজ্ঞের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম, এক মায়া হরিণ এসে আমার আরণি নিয়ে গেছে। ব্রাহ্মণদের পূজা রক্ষা করা পান্ডবদের প্রধান কর্তব্য। তাই বড়ো ভাই যুধিষ্ঠীর ছোট ভাই নকুলকে বলল যা ব্রাহ্মণের পূজা রক্ষা কর গিয়ে। নকুল ছুটলো, ছুটতে ছুটতে দেখল মায়া হরিণ তার মুখে সেই আরণি নিয়ে দৌড়াচ্ছে, দৌড়াতে দৌড়াতে সে এক জলাশয়ের মাঝে বক হয়ে ঠোঁটের মধ্যে সেই আরণি নিয়ে অপেক্ষা করছিল। নকুল পৌঁছালে পর বক বলল, “আমি বকরূপী যক্ষ। আমার তিনটা প্রশ্ন আছে, সঠিক উত্তর দিতে পারলে এই আরণি আমি তোমাকে দিব। নতুবা তোমাকে এখানে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। বড় ভাইয়ের আদেশ পালনের জন্য নকুল বলল, ঠিক আছে আমি চেষ্টা করে দেখি। প্রশ্ন তিনটি ছিল এরকম-প্রথম প্রশ্ন, পথের সাথি কে? দ্বিতীয় প্রশ্ন, ঘরের সাথি কে? তৃতীয় প্রশ্ন, পৃথিবীতে সবথেকে আশ্চর্য বিষয় বিষয় কী? নকুল চেষ্টা করল পারল না সঙ্গে সঙ্গে সে পাথর হয়ে গেল। নকুলের দেরি দেখে যুধিষ্ঠীর এরপর নকুলের বড়ো ভাই সহদেবকে পাঠালো। প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে না পাড়ায় সহদেব পাথর হয়ে গেল। একইভাবে ভীম ও অর্জুন সঠিক উত্তর না দেয়ার কারণে পাথর হয়ে রইল। সর্বশেষে ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠীর এলো তার উত্তরগুলো ছিল এই প্রকার-পথের সাথি লাঠি, ঘরের সাথি স্ত্রী আর পৃথিবীতে সব থেকে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে মানুষ। সে প্রতিদিন দেখছে মানুষ অবিনশ^র নয় তাকেও একদিন মরতে হবে। তথাপি এই সত্যটি সে সব সময় ভুলে যায় এইটাই সব থেকে আশ্চর্যের বিষয়।
ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের বেলায়ও একই ঘটনা ঘটেছে। তাকেও যে একদিন মরে যেতে হবে এই কথাটি সে কখনো স্মরণে রাখেনি। তার থেকেও বড়ো সত্য হচ্ছে এই মধ্যগগণে তার ভাগ্যাকাশে যখন সূর্য জ¦ল জ¦ল করছিল তখনি বড়ো অসময়ে তার যবনিকাপাত ঘটতে যাচ্ছে। বিচারধীন বিষয়ে এই বিষয়টি নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না তথাপি সর্বোচ্চ শাস্তি না হলে দেশের মানুষের মন যেভাবে মিডিয়া ঘুরিয়েছে তার থেকে নিস্তার পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
কী কী ঘটেছে? কী কী ঘটা উচিত ছিল না? তাও কেন ঘটল? কারা এই বিষয়ে দায়ী? এই সমদয় বিষয়ে মিডিয়া টকশো ও কাগজে প্রচুর লেখা লেখি হয়েছে। প্রত্যেক বিজ্ঞজনই মতামত দিয়েছেন ‘আপন মনের মাধুরী মিশাইয়ে’ ভবিতব্য রচনা করেছিলেন। ভালোমন্দ যে যাই বলুুুুুুুুুুুুুক না কেন ব্যাপারটা যে সাংঘাতিকভাবে নিন্দনীয় সেই বিষয়ে কারো কোনো সন্দেহ নেই। যদি তাই হয় এই বিষয় থেকে আমাদের শিক্ষণীয় কি কোনো বিষয় নেই। অবশ্যই আছে। যা আমরা বিশ্বাস করতে পারতাম না এখন তা আমরা অবলীলায় বিশ্বাস করছি-যে ছয় হাজার টাকায় বাড়ি ভাড়া থেকে এখন চার কোটি টাকার ফ্ল্যাটে বসবাস করছে। আঙুল ফুলে কলা গাছ কথাটাও এখানে বিবর্ণ হয়ে যায়। কোথায় কোথায় টাকা পাঠিয়েছে শুনলে আমরা ঘোরের মধ্যে পড়ে যাই এবং এই সমস্ত হয়েছে পুলিশের নাকের ডগায়। আমাদের প্রথম শিক্ষাটি হচ্ছে এই আমরা বুঝতে পারলাম এ-ও সম্ভব। সম্ভব এই কারণে যে আমরা কোনোদিনই আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া কোনো বিষয় থেকে কোনো শিক্ষা নেই না অন্যায় দেখেও কোনো প্রতিবাদ করি না। কবির ভাষায়-‘‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে।’’ আমরা মরে যেতও প্রস্তুত আছি তথাপি প্রতিবাদ করতে প্রস্তুত নই। এই প্রতিবাদ করাটা একদিনে হয় না। এই প্রতিবাদ করাটা আমাদের পরিবার থেকে শিক্ষা লাভ করতে হয়। শিক্ষাঙ্গনে গিয়ে এই বিষয়ে আমাদেরকে পরিশীলিত হতে হয়। যখন এই বিষয়ে (প্রতিবাদ করার) আমরা নিজেদেরকে শিক্ষিত করে তুলতে পারি তখন আমাদের প্রতিবাদটা আর ঘৃণার বস্তু থাকবে না পরিশীলিত ও পরিমার্জিত হয়ে আমরা নিজেদেরকে সুনাগরিক হয়ে গড়ে তুলতে পারব সরকারের এই বিষয় করার অনেক কিছু রয়েছে। প্রত্যেকটি শিক্ষাঙ্গনে এই বিষয়ে নির্দিষ্ট করে প্রতিবাদের শিক্ষা প্রদান ও পরিচালনার বিষয় নিশ্চিন্ত করতে হবে। আমরা খুব সহজেই বলি আপনি যা বলেছেন সে বিষয়টা মিথ্যা এই বলে প্রতিবাদ করি। এটা প্রকৃত প্রতিবাদ হলো না যদি বলিÑ‘আপনি যা বলেছেন তাতে করে কি কোনো সত্যের অপলাপ ঘটছে’ তাহলে যার বিরুদ্ধে কথাটি বলা হচ্ছে তাহলে তিনি নিজেকে অপদোস্ত মনে করবেন না। যেকোনো বিষয়ে প্রতিবাদ করতে গেলে বিষয়টি সম্পর্কে সন্দেহাতীতভাবে আমাদের জেনে নেওয়া কর্তব্য। কারণ মিথ্যে কথাটাও ভদ্রভাবে বললে সেটা সত্য হয়ে যায় না কিন্তু সত্য কথাটি ভালোবাসার সাথে বললে ফলদায়ক হয়।
যুবকরা আজ প্রচন্ডভাবে একাকী হয়ে গেছে। পরিবারের মধ্যে বাস করলেও তারা যেন পরিবারের কেউ নন। কৈশোর পেরিয়ে যুবকে পরিণত হওয়ার সময় পর্যন্ত ওরা ইয়ার-বন্ধুদের সাথে সময় কাটায বেশি। অনেক সময় আমরা বাবা-মারা কোনো খবরই রাখি না সন্তানরা কীভাবে সময় কাটাচ্ছে তাদের বন্ধু-বান্ধবরাই বা কারা। পরিবারের বাবা যদি কর্তৃত্বস্থানীয় হয়ে থাকেন তিনি প্রায়শই সন্তানদের সাথে কথা বলেন তাতে তার কর্তৃত্বটাই বেশি প্রকাশ পায়। পিতৃসুলভ স্নেহের পরশ তাতে থাকে না মোটেও। ফলে আস্তে আস্তে যে দূরত্বের সৃষ্টি হয় সেই দূরত্ব ঘোচানো বেশ কষ্টাসাধ্য হয়ে পড়ে। আমার মনে আছে আমার ছেলেরা যখন এমনই পর্যায়ে ছিল তখন তাদের বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে এমন এক রাজনৈতিক আদর্শে তারা প্রভাবিত হতে থাকল যা আমার মোটেই পছন্দের নয়। বহু প্রার্থনা, প্রচেষ্টা ও কৌশলের আশ্রয় নিয়ে ওদেরকে সেই মতাদর্শ থেকে সরাতে পেরেছিলাম। ধন্যবাদ দিই সৃষ্টিকর্তাকে যে চাকুরিজীবনে তারা এমন এক সাহচর্য পেয়ে যায় যাদের রাজনৈতিক দর্শন আমার দর্শনের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। ধৈর্য ও ভালেবাসা দিয়েই আমাদেরকে তাদের জয় করতে হবে। জ্ঞানী শ্রেষ্ঠ সলোমন বলেছেন, তুমি তোমার পুত্রকে শাসন করো পাছে সে বিনষ্ট হয় ও তোমার ভবিষ্যত জীবন কঠিন হয়ে পড়ে (হিতোপদেশ)। আজ যুবকেদের ব্যবস্থা করতে গিয়ে ওদের জন্য ভালো চাকুরি ও ব্যাংক ব্যালেন্সের ব্যবস্থা করতে পারাটাই কৃতকার্যতার মাপকাঠি নয়। আপনার সন্তানের সাথে সময় কাটাতে আপনি কতটুকু আনন্দ পান, তার সাথে আপনার বন্ধুসুলভ রাজনৈতিক আলোচনা কতটুকু চলে এগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চারদিকে যা ঘটছে তাতে এটাই স্পষ্ট হয়ে যে, পরিবারের শাসন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া যুবকেরা সহপাঠী বিপথগামীদের দ্বারাই বেশি প্রভাবিত হচ্ছে। পরবর্তীতে শিক্ষাঙ্গনে যে পরিবেশ সেই পরিবেশ তাদেরকে জীবন থেকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে নিয়ে যায় ক্রমশ। এদের রক্ষা করার দায়িত্ব একমাত্র আপানার।
ড. এলগিন সাহা : কলামিস্ট ও এনজিও ব্যক্তিত্ব।





Users Today : 107
Views Today : 116
Total views : 177367
