মিডিয়া জুড়ে ভেসে বেড়াচ্ছে এ কে খন্দকারের মাফ চাওয়ার খবর। এনিয়ে নতুন করে বলাও আসলে এক ধরনের পাপ। এই ভদ্রলোক আমাদের ইতিহাসের একটি বড়ো ঘটনার অন্যতম সাক্ষী। আত্মসমপর্ণের ঘটনায় সেনাকর্মকর্তাদের মধ্যে কেবল তিনিই হাজির ছিলেন আমাদের হয়ে। ‘মেলবোর্ন এইজ’ পত্রিকার সাংবাদিক ব্রুস উইলসনকে একবার আমি ইন্টারভিউ করেছিলাম। তিনি তখন লন্ডনের এক হাসপাতালে শয্যাশায়ী। জানি না এখনো বেঁচে আছেন কিনা! ভদ্রলোক মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে সাথে থাকতেন। কষ্ট করে শ্রম দিয়ে কাভার করতেন খবর। মেলবোর্নের এই সাংবাদিক বাংলাদেশকে ভালোবাসতেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাজউদ্দীন আহমদ এবং এ কে খন্দকার একই সাথে ছিলেন। এ কে খন্দকার এসেছিলেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। সারেন্ডার পর্বের প্রতিনিধি হয়ে। ব্রুস উইলসন বিএনপি ও এরশাদ জামানার ইতিহাস বিকৃতি নিয়ে ভীষণ বিরক্ত ছিলেন। তিনি আমাকে বলছিলেন, এ কে খন্দকার পারেন অনেক বিতর্কের উত্তর দিতে। এই খন্দকারই কিনা মোশতাকের পথ ধরে ‘বেঈমানি’ করতে ভুল করলেন না! শেষ বয়সে একটি বই লিখে নিজেকে তো বিতর্কিত করলেনই, আমাদের ইতিহাসেরও বারোটা বাজানোর সংকেত দিয়ে রাখলেন। কেন তারা এমন করেন কে জানে? এখন তো মনে হয় কোথাও কি কোনো ভুল ছিল আসলে?
বিচারপতি সাত্তারকে মনে পড়ে? বিএনপি আমলের প্রেসিডেন্ট। মরার আগে বলেছিলেন, ‘ইতিহাস বিকৃতির জন্য দুঃখিত।’ তাদের আরেক রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস। জীবনভর অবিশ্বাসের কাজ করলেও শেষ সময় টুঙ্গিপাড়া গিয়ে মাফ চেয়ে বলেছিলেন, ‘ভুল হয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবই স্বাধীনতার মূল নায়ক!’ এমন কি মোশতাক, সেই খুনিও বারবার বলতো, তার হাতে নাকি রক্তের কোনও দাগ নাই! এরা সবাই শেষ বয়সে মানসিক রোগী হয়ে গিয়েছিল। মোশতাক নাকি মলও খেয়ে ফেলতো ভুলে। এবার সে তালিকায় যোগ হলেন এ কে খন্দকার। সাংবাদিক ব্রুস উইলসন কম করে হলেও তিন-চারবার এ কে খন্দকারের প্রসঙ্গ টেনে বলেছিলেন, ‘সে বেঁচে থাকতে এত বিকৃতি হয় কি করে? সে তো ষোল ডিসেম্বরের জীবন্ত সাক্ষী!’
সেই ‘খন্দকার’-ও এক সময় প্রমাণ করে দিলেন মোশতাকই একমাত্র নন। আরও আছেন। এ কে খন্দকার মুক্তিযোদ্ধা সেক্টর কমান্ডারদের নেতা ছিলেন। জিয়ার দূত, এরশাদের মন্ত্রী- সবসময় ভোগীদের দলে। তারপর আওয়ামী লীগের এমপি এবং মন্ত্রী। পরের দফায় বাদ পড়ার পরই বই লিখে ফেললেন। জানালেনÑমুক্তিযুদ্ধ নাকি জনযুদ্ধ ছিল না! সব কৃতিত্ব সেনাদের! বঙ্গবন্ধুর ভাষণের শেষে ‘জিও পাকিস্তান’ আছে বলার মতো ধৃষ্টতাও দেখালেন। এসব কি একদিনে হয়?
সারাজীবন আওয়ামী ভাত খেয়ে নিমক হালালির জন্য বেছে নিলেন জিয়াকে। যে মানুষ- ‘একাত্তরের মানুষ’, তিনি কী করে এমন ভুল করেন?
একটি প্রকাশনী আর একজন সম্পাদক বললেই তিনি সব ফেলে তাদের কথা মতো এমন করবেন? তাও এই বয়সে? যে কারণেই করুক না কেন, এর পেছনে নিশ্চয়ই দেশি-বিদেশি হাত ছিল। তখন আমরা প্রতিবাদ করলাম, লিখলাম। টনক নড়লো না। দুনিয়া থেকে চলে যাবার আগে এখন নব্বই বছর বয়সে বৌ-কে সাথে নিয়ে বলাচ্ছেন দোষ নাকি ‘প্রথমা’-র!
দায়ী অন্য কেউ। কেউ লিখিয়ে নিলেই আপনি লিখে ফেলবেন? আহা খোকাবাবু- যে হাউজ, যে লোকগুলোর নাম এসেছে, তারা যেমন চলে, ডালে ডালে আপনার মতো ‘বেঈমান’-রাও চলে পাতায় পাতায়। এখন এটা অনেকেই বিশ্বাস করে টাকা পয়সার ঝামেলা ছিল। যে পরিমাণ রয়্যালটি পাবার কথা তা মেলেনি বলেই নাকি এই রাগ! এই পাগলের অভিনয়। এ কে খন্দকারের স্ত্রীর ভাষ্যে সাংঘাতিক একটা সত্য আছে। এই যে বললেন, ‘তিনি মানসিক রোগী, প্রায় উন্মাদ’-এর মানে বোঝা কঠিন? আবার সময় সুযোগ মতো যেন বলা যায়, পাগল বলে তখন মাফ চেয়েছিলেনÑআসলে যা লিখেছেন তাই সত্য। আর একটা কথা আপনাকে দেখে কি মনে হচ্ছে আপনি পাগল হয়ে গেছেন?
জানি না এ কোন অভিশাপ। এ কোন পাপ। এদেশে এই সমাজে ইতিহাসে খন্দকারের দল মীরজাফর হয়েই থেকে যায়। খন্দকারের পর খন্দকার ইতিহাসের অন্ধকারে জাতিকে ফেলবে আর আমরা ক’দিন হৈ হৈ করে ঠান্ডা হয়ে যাবো। এর নাম চেতনা? এ কে খন্দকারকে আমরা ক্ষমা করলেও এই দেশ, এই মাটি জীবনেও ক্ষমা করবে না। মরণেও মীরজাফর হয়েই থাকতে হবে তাকে।
অজয় দাশগুপ্ত : কলামিস্ট।




Users Today : 12
Views Today : 12
Total views : 177415
