মেধাকে ঘিরে সত্ব ও মালিকানার দাবি ও বিতর্কটি আজ আধুনিক বিশ্বে খুবই জোরালো। কারণ এর সঙ্গে কর্পোরেট বাণিজ্যে পণ্যের আধিপত্যের লড়াইয়ের বিষয়টি জড়িত। অ¯^ীকার করা যাবে না, মুক্তবাজার, মুক্তবাণিজ্য এবং কর্পোরেট বিশ্বায়নের এই যুগে দুনিয়ায় মানুষের সম্পদ, সম্ভাবনা, জ্ঞান, মেধার একতরফা দখল, নিয়ন্ত্রণ এবং মালিকানাধীন করার বৈধতা তৈরি করছে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। সোজা কথায়, প্রচলিত আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকে ক্ষমতা ও বিত্তশালীরা মেধাবীদের মেধা ও বুদ্ধি প্রসূত সব ধরনের উদ্ভাবনকে প্যাটেন্টের নামে একতরফা দখল¯^ত্ব নিচ্ছে, নিজের পুঁজিতে পরিণত করছে, যা আমার দৃষ্টিতে এক ধরনের ডাকাতি। বাংলাদেশে মেধা¯^ত্ব আইনের প্রয়োগ নেই। ফলে মেধা¯^ত্ব অধিকার লক্সঘনের অভিযোগ পাওয়া যায় প্রায়ই। এতে বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন সৃজনশীল নির্মাতারা। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির যেমন অভাব নেই, তেমনি অভাব নেই অভিযুক্তের। মেধা¯^ত্ব কী এ সম্পর্কে মানুষের ধারণা নেই বলেই এ আইনকে প্রতিনিয়ত লক্সঘন করা হচ্ছে। সামরিক, অর্থনৈতিক, গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের সাথে নতুন যুক্ত হয়েছে মুনাফামুখী – প্যাটেন্ট আগ্রাসন। যার শিকার বাংলাদেশসহ এশিয়া-আফ্রিকার বহু দরিদ্র দেশ। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শোষণের হাতিয়ার হিসেবে প্যাটেন্ট আইনটি ব্যবহার করে সাম্রাজ্যবাদীরা দরিদ্র দেশগুলো থেকে মুনাফা লুটছে। ভদ্রবেশী এই লুটতরাজের সুযোগ করে দিচ্ছে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার বাণিজ্য সম্পর্কিত মেধা¯^ত্ব অধিকার বা ট্রিপস চুক্তি-যেখানে দুনিয়ার সব প্রাণ ও প্রকৃতির উপর সত্ব বা মালিকানা প্রতিষ্ঠার অধিকার রাখা হয়েছে। এ আইনের বলে পণ্য উৎপাদন না করেই কেবল প্রযুক্তি বা ফর্মুলা আবিষ্কার করে অবাধে মালিকানা ¯^ত্ব নিয়ে নিচ্ছে সাম্রাজ্যবাদীরা, যা বায়োপাইরেসির সামিল।
বর্তমান বিশ্বের একটি সর্বাধিক আলোচিত বিষয় ইন্টালেকচুয়াল প্রপার্টি এ্যাক্ট বা মেধা¯^ত্ব আ ইন। বাংলায় বহুল প্রচলিত ‘মেধা¯^ত্ব’ কথাটি পাল্টে ‘মনন-¯^ত্ব’ বলা যেতে পারে। কেননা, ‘ইন্টালেকচুয়াল’ শব্দটির অর্থ ও ব্যঞ্জনা ‘মেধা’র চেয়ে ‘মনন’-এর অধিকতর নিকটবর্তী বলে মনে হয়। মেধা বা মননই হোক, এটা হচ্ছে মানুষের সৃষ্টিশীলতার প্রধান উৎস ও প্রক্রিয়া। যা-হোক, এখানে ‘মেধা’ শব্দটিকে ধরেই আলোচনা করছি।
মেধা¯^ত্ব আইনের আগ্রাসনের শিকার দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল, মেক্সিকোসহ এশিয়া, আফ্রিকার শতাধিক সংগঠন এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছে। প্রাণ এবং জীবনের প্যাটেন্ট অনৈতিক ও অন্যায়। আইনজ্ঞদের মতে, জীব-বৈচিত্র্যকে পণ্য ও বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে বহুজাতিক কোম্পানিকে তৃতীয় বিশ্বের লোকায়ত জ্ঞান ও ঐতিহ্যবাহী সম্পদ লুটের বৈধতা দেয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক জীব-বৈচিত্র্য সনদ ১৯৯২ অনুযায়ী, প্রতিটি দেশ তার জীব-বৈচিত্র্যের অন্তর্ভুক্ত জেনেটিক সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারবে।এতে বলা হয়েছে, মেধা¯^ত্বের অধিকার যেন জীব-বৈচিত্র্যের টেকসই ব্যবহারকে বাধাগ্রস্ত না করে।
ধারণা করা হয়, প্রাচীন গ্রীসের কোনো কোনো নগরে প্যাটেন্ট প্রথা চালু ছিলো। এদিকে, ১৪৭৪ সালে প্রথম ইটালিতে আধুনিক প্যাটেন্ট ব্যবস্থা শুরু হয়। ভেনিস প্রজাতন্ত্রের একটি ডিক্রিতে বলা হয়, নতুন আবিষ্কারের তথ্য প্রজাতন্ত্রকে জানাতে হবে, যাতে আবিষ্কারক তাঁর আবিষ্কারের প্যাটেন্ট রাইট বা মালিকানা ¯^ত্ব পেতে পারেন। ১৬২৩ সালে রাজা জেমস-ওয়ান নতুন আবিষ্কারের জন্য প্যাটেন্ট অধিকার প্রদানের বিধান ঘোষণা করেন। আর ১৭৯০ সালে পটাশের প্যাটেন্ট প্রদানের মাধ্যমে আমেরিকায় মেধা¯^ত্ব প্রদান অধ্যায়ের সূচনা হয়। বাংলাদেশের প্যাটেন্ট আইনটি ১৯১১ সালের, ব্রিটিশদের করা। শত বছরেও এ আইনে কোন পরিবর্তন হয়নি। ট্রেডমার্ক আইনটিও ৭৫ বছরের পুরোনো। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ মেধা¯^ত্ব আইন মেনে চললেও বাংলাদেশে এ আইন নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথাই নেই। অপর্যাপ্ত আইন, অসচেতনতা এবং প্রচার-প্রচারণাার অভাবে মেধা¯^ত্ব আইনের চর্চাও নেই।
প্যাটেন্ট না থাকায় অরক্ষিত হয়ে পড়েছে আমাদের বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের অর্ধশতাধিক উদ্ভাবিত প্রযুক্তি। জ্ঞানের অভাব ও প্যাটেন্ট সংক্রান্ত দুর্বল আইনি অবকাঠামোর কারণে দেশের অনেক প্রযুক্তি এখন প্রতিবেশী ভারতের নামে বরাদ্দ। এদিকে গবেষণার জন্য ১৯৫৫ সালে বন গবেষণা ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা হলেও, উদ্ভাবিত প্রযুক্তি প্যাটেন্ট করার পদ্ধতি জানা নেই তাদের। ৫৮ বছরে ধরে ৫৩ রকমের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে বনশিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশন। গুরুত্বপূর্ণ এসব প্রযুক্তির মালিকানা ¯^ত্ব বা প্যাটেন্ট না থাকায় এসব যেকোনো সময় চলে যেতে পারে বিদেশিদের হাতে। অনেকে বলছেন, এভাবে একের পর এক উদ্ভাবনী প্রযুক্তি, ঔষধি গাছ ও কৃষিজ শস্যের মালিকানা হাতছাড়া হয়ে গেলে দেশের বিজ্ঞানী ও গবেষকরা একদিকে উদ্ভাবনের প্রতি আগ্রহ হারাবে অন্যদিকে, উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য প্যাটেন্ট বা ¯^ত্ব পাওয়া দেশ ও ব্যক্তিকে রয়্যালটি দিতে হবে।
আশা জাগানো ওষুধ শিল্পের বিকাশ অব্যাহত রাখতে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর অবৈধ মেধা¯^ত্ব দাবিকে প্রতিহত করতে উদ্যোগও নেয়া উচিত। নিজেদের প্রযুক্তিতে তৈরি ওষুধের প্যাটেন্ট গ্রহণ ও সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া জরুরি। অন্যথায় বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মানুযায়ী ওষুধ শিল্পসহ বিভিন্ন মেধা¯^ত্ব আইন হলে অনেক ওষুধ তৈরিই করতে পারবে না বাংলাদেশ। অথচ ওষুধ বিজ্ঞান শিল্পে গেলো কয়েক বছর ধরেই ভালো করছে বাংলাদেশ। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা যেভাবে ওষুধ শিল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মেধা¯^ত্ব অধিকার আইন কার্যকর করতে মরিয়া, তাতে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোর জন্য এই শিল্প নিয়ে সুখের কোনো বার্তা নেই। মেধা¯^ত্ব আইন কার্যকর হলে বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো অনেক ওষুধই তৈরি করতে পারবে না। ফলে কয়েকগুণ বেশি দামে বিদেশি কোম্পানির প্যাটেন্ট করা ওষুধ খেতে হবে। আর এতে রপ্তানি সম্ভাবনা হারাবে এই শিল্প। মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে জন¯^াস্থ্যে।
কথিত আছে, ১৭৫৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে দেশের শাসনভার চলে যাওয়ার সময়ে মসলিন শিল্পের বিলুপ্তি শুরু। ব্রিটিশরা মসলিন কারিগরদের বৃদ্ধাঙ্গুলি কেটে দেয়ায় এ শিল্প ছেড়ে দূরে চাষবাসে যুক্ত হয় তারা। ধ্বংস হয়ে যায় হাজার বছরের পুরনো বাঙালি ঐতিহ্য্ত মসলিন। তবে মসলিনের বিপরীতে জামদানি হয়ে ওঠে বাংলার প্রধান বস্ত্রশিল্প। প্রাচীনকাল থেকেই এই বাংলায় সূ² বস্ত্রের খ্যাতি ছিলো দুনিয়াজোড়া। ইতিহাস বলে, আনুমানিক ৩০০ খ্রিস্টাব্দে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র ‘পেরিপাসস অব দ্য এরিথ্রিয়ান সি’ গ্রন্থে এবং আরব, চীন ও ইতালির পর্যটকদের র্বর্ণনাতে জামদানির প্রমাণ মেলে। বাংলার সেই প্রাচীন ঐতিহাসিক জামদানির মালিকানা এখন অনেকটাই হাতছাড়া।
তথ্য বলছে, ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের পূর্ব গোদাবরী জেলার কয়েকটি গ্রামের তাঁতী এবং দুটি সংগঠন ‘কালনা’ ও ‘উপ্পাদা’ জামদানি নামে শাড়ির নিবন্ধন করেছে। এভাবে রাজশাহীর ফজলি আমকে মালদহ জেলার আর ফরিদপুরের ঐতিহ্যবাহী নকশি কাঁথাকে পশ্চিম বাংলার নিজ¯^ সম্পদ হিসেবে মালিকানা ¯^ত্ব নিয়েছে ভারত। মেধা¯^ত্ব মালিকানা হারানোর ফলে আগামীতে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ট্রিপস চুক্তি বাস্তবায়ন শুরু হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশ। এমনকি জামদানি, নকশি কাঁথা ও ফজলি আম রপ্তানির ক্ষেত্রেও ভারত সরকারকে রয়্যালটি দিয়ে রপ্তানি ছাড়পত্র নিতে হবে। তবে ভারতের সাথে আলোচনার মাধমে জামদানি শাড়ি, ফজলি আম ও নকশি কাঁথার হারানো মালিকানা ¯^ত্ব ফিরে পাওয়া সম্ভব। নয়তো উপযুক্ত প্রমাণের ভিত্তিতে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মাধ্যমে ভারতের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। কেননা, এরআগে মেক্সিকো ও ভারত আমেরিকার বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে তাদের পণ্যের ¯^ত্ব ফিরে পায়।
আমাদের দেশে জন্মের পর চোখ খুলেই যেসব গাছ দেখা যায়, তাদের অন্যতম হলো নিমগাছ। প্রতিদিন বহুমুখী কাজে আসে এই ঔষধি গাছটি। একবার ভাবুন তো, আপনার বাড়ির আঙিনার নিমগাছটি আপনার নয়। এমনকি ওই গাছের ডাল ভেঙে মেসওয়াক করলেও টাকা দিতে হবে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতকে। আপাত ধাক্কা খেলেও, হয়েছে তেমনটাই। এখন আর দাবি করার উপায় নেই যে, অতি প্রাচীন এই নিমগাছটি বাংলাদেশের। কেন-না, প্যাটেন্ট আগ্রাসীরা প্রাকৃতিক এই সম্পদের প্যাটেন্ট বা মালিকানা ¯^ত্ব নিয়ে নিয়েছে। প্রথমে যুক্তরাষ্ট্র, এর পর ভারত এই নিমগাছের প্যাটেন্টের অধিকারী। এখন ৫৪টি নিম পণ্যের প্যাটেন্ট আমেরিকার, ৩৫টি জাপানের, ২৩টি অস্ট্রেলিয়ার, এবং ১৪টি ভারতের। অথচ ৫০টি দেশে গ্রীষ্মকালে নিমগাছ জন্মে। বাংলাদেশও আছে এই তালিকায়।
উদ্ভাবককে তার উদ্ভাবনী পণ্য বা সেবাকে কমপক্ষে ২০ বছর পর্যন্ত এককভাবে নির্মাণ, বিতরণ ও সংরক্ষণের অধিকার দেয় প্যাটেন্ট। এতে করে অন্য কেউ ওই বস্তু বা সেবা প্রস্তুত করলে তা অ¯^ীকৃত ও নকল হিসেবে চিহ্নিত হয়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক-দুভাবেই প্যাটেন্ট নিতে হয়। আন্তর্জাতিকভাবে প্যাটেন্ট নিলে ওই উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ও ঐতিহ্য অন্য কোনো দেশ নিজের বলে দাবি করতে পারে না।
কেবল প্যাটেন্ট না থাকায় মার্কনির বহু আগে রেডিও আবিষ্কার করেও এই যন্ত্রটির আবিষ্কর্তা হতে পারেননি স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু। এমন অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচলিত দুটি আন্তর্জাতিক আইন হলো- ইন্টেলেকচ্যুয়াল প্রপার্টি রাইট-আইপিআর ও ইন্টেলেকচ্যুয়াল প্রপার্টি প্রটেকশন বা আইপিপি। বিধি অনুযায়ী প্রত্যেকটি দেশে সুনির্দিষ্ট আইন এবং তদারকি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান থাকে যা নতুন উদ্ভাবিত বস্তুর উপর ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ¯^ত্ব প্রতিষ্ঠা করে।
একটি বস্তু প্যাটেন্টের জন্য অন্তত পাঁচটি শর্ত পূরণ করতে হয়। প্রথমত, অভিনব হতে হয়। এছাড়া সামাজিক উপযোগিতা, পুনরুৎপাদন ক্ষমতা, ¯^ত্ব রক্ষার যোগ্যতা এবং প্রকাশ্য অস্তিত্ব থাকলেই প্যাটেন্ট আবেদনের যোগ্য বলে ধরা হয়। মেধা¯^ত্ব নির্ভর করে তিনটি আইনের উপর। কপিরাইট এরমধ্যে একটি। এর বাইরে প্যাটেন্ট ও ডিজাইন আইন এবং ট্রেডমার্ক আইন রয়েছে। দুর্ভাগ্যক্রমে প্যাটেন্ট ও ডিজাইন আইনটি ১৯১১ সালে ব্রিটিশদের করা। ভারত সেই আইনটি সংশোধন করেছে ১৯৭০ সালে।
পাকিস্তানে ২০০০ ও ২০০২ সালে প্যাটেন্ট আইন করা হয়। উভয় দেশে বদলানো হয় ট্রেডমার্ক আইনও। কিন্তু বাংলাদেশে প্যাটেন্ট আইনে সংশোধনের ছোঁয়া লাগেনি। ট্রেডমার্ক আইনটিও ৭৫ বছরের পুরনো। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য তত্ত¡াবধান ও উদারিকরণের লক্ষ্যে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার ২৩টি চুক্তির একটি হচ্ছে-বাণিজ্য সম্পর্কিত মেধা¯^ত্ব বা ট্রিপস চুক্তি। এর আওতায় ভৌগলিক নির্দেশক বা জিআই এর মাধমে একটি পণ্য কোনো দেশের ঐতিহ্যবাহী পণ্য হিসেব পরিচিতি পায় যা প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববাজারে অবস্থান ধরে রাখতে পারে। ভারত ১৯৯৯ সালে ভৌগলিক নির্দেশক আইন করে পণ্য প্যাটেন্ট করা শুরু করে।
জিআই ও সিবিডি অনুযায়ী- নিম, বাসমতি চাল, হলুদ, রয়েল বেঙ্গল টাইগার ও ইলিশের মেধা¯^ত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য বায়োপাইরেসির মাধ্যমে বাংলাদেশে জীব-বৈচিত্র্য ধ্বংসের অভিযোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি এবং ভারতের প্রতিষ্ঠানগুলির বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে যেতে পারে সরকার। বিশ্ববিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার- যা কিনা বাংলার বাঘ হিসেবেই সুপরিচিত। এই প্র্রাণীটির ¯^ত্ব নিতে চলেছে ভারত। দেশটির দাবি- এর অরিজিন ভারতে, আর সেভাবেই আন্তর্জাতিক প্যাটেন্ট করানো হয়েছে। নিজেদের প্রাণি হিসেবে সংরক্ষণের নামে ‘আন্তর্জাতিক প্রাণি সংরক্ষণ সংস্থা’ থেকে মিলিয়ন ডলারের প্রকল্পও নিয়েছে দেশটি। বাংলাদেশ যেখানে বাঘ সংরক্ষণে এক ডলারও পাচ্ছে না, উল্টো তখন দেশটির জাতীয় পশু পরিচিতি পাচ্ছে ‘ভারতীয় বাঘ’ হিসেবে। আজীবন ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’ হিসেবে পরিচিত প্রাণীকে তথাকথিত আইনের মারপ্যাঁচে এখন ডাকতে হবে- রয়েল ইন্ডিয়ান টাইগার! এ সংক্রান্ত জ্ঞানের অভাব, আর প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে শিথিলতার কারণে পদ্মার ইলিশও কিছুদিন আগে পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী ভৌগলিক সম্পদ হিসেবে ভারতের ¯^ত্বে যুক্ত হতে যাচ্ছিল। কেবল নিজেদের নজরদারির অভাবে ধান-চাল-পাটসহ বগুড়ার দই, টাঙ্গাইলের শাড়ি, নাটোরর কাঁচা গোল্লা, কুমিল্লার খাদি, সুন্দরবনের মধু, তিলের খাজা, সোনালী আঁশ পাটের তৈরি চটের ব্যাগ, মাটির কলসি, হারিকেন, শীতলপাটি, তাঁতের কাপড়, রংপুরের শতরঞ্জি, মিরপুরের কাতান কিংবা একতারা-দোতরা, ভাওইয়া-ভাটিয়ালি গান- ঐতিহ্যবাহী সম্পদের ¯^ত্ব চলে যাচ্ছে অন্যের দখলে।
তবে, আশার কথা মেধা সম্পদ সংরক্ষণে বাংলাদেশ প্যাটেন্ট আইন ২০১৬ তৈরি করতে সরকার উদ্যোগী হয়েছে। গত বছরের ২৯ মে বর্তমানে কার্যকর শতবর্ষের পুরনো পেটেন্টস অ্যান্ড ডিজাইন অ্যাক্ট ১৯১১ কে ভাগ করে নতুনভাবে দুটি আইন তৈরি করতে যাচ্ছে। এই আইনটি হলে নতুন উদ্ভাবনকে ¯^ীকৃতি দেয়ার মাধ্যমে এটা যে দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
[অশোক চৌধুরী : বার্তা প্রধান, বৈশাখী টেলিভিশন]




Users Today : 38
Views Today : 48
Total views : 177933
