মহরম মাসের প্রথম দশ দিন বাড়িতে লোকের ধুম-পড়ে যেত, সব বয়সের নারী-পুরুষ বাড়ির উঠানে আসত, আর বডড়ো জ্যেঠা উচ্চ রবে মধুর সুরে ‘বিষাদ-সিন্ধু’ পড়ত। এই মহরম মাসে নাকি হয়রত মুহাম্মদ (স.) দৌহিত্র ইমাম হাসান-হোসেন শহীদ হয়েছে, যা উপন্যাসে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। আমাদের বাড়ির বিষাদ সিন্ধু বইটা অনেক পুরাতন অন্তত ৫০ বছর আগের। আমাদের পরিবারের এটা একটা ট্রেডিশন ছিল, বাড়ির বড়ো কর্তা, উপন্যাসটি সবার উদ্দেশ্য পড়ে শুনাবে। আমার দাদাও তাই করত নাকি! শুনেছি, যদিও দাদা মারা গিয়েছে আশির দশকে। মহরম মাসে টোপ, গোস্ত, মন্জিল বিশেষ করে এই তিন দিন কোনো কাজ করতাম না, খাওয়া-দাওয়া আর বিষাদ সিন্ধু পড়া শুনতাম, বাল্যকালে আমি নাকি অনেক নরম স্বভাবের ছিলাম, তাই আমাদের সব ভাই-বোনদের চেয়ে জ্যেঠা আমাকে বেশি ভালোবাসত। জ্যেঠার চেয়ারের পাশে আমাকে বসাত। আমার কাজ, একটু পরপর পানি আর পান খাওয়ানো, জ্যেঠা পান অনেক বেশি পছন্দ করত, সবার বসার ব্যবস্থা করে দিতে হতো। যেহেতু অনেক লোকের সমাগম হত নারী-পুরুষ মিলে।
উপন্যাস পড়ার সময় আমি লক্ষ করেছিলাম, ধর্মপ্রাণ মানুষগুলো কিভাবে শুনত, কেউ কেউ আবার কান্না করে দিত, অঝরে চোখ দিয়ে জল পড়ত। জল না পড়বে তো কি করবে! উপায় তো ছিল না ! জ্যেঠার উচ্চরণের ভঙ্গিমা এমন ছিল যে, সবাই ঘটনার ভেতরে চলে গিয়ে হৃদয়ে উপলব্ধি করত। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলত, কিছু সময় বিরতি ছিল, প্রয়োজনীয় কাজ করার জন্য। মহরম মাসে গ্রামের মানুষের কাজের চাহিদা নাই বললে চলে। আমাদের গ্রামটা ছিল কৃষি প্রধান। এই সময় গ্রামের মানুষ অলস সময় কাটাত। গ্রামের মানুষ লুটু-নগুন্ডি (মাটিতে দাগ দিয়ে ৩৬ টা গুটি নিয়ে অঞ্চলিক এক প্রকার খেলা) মেতে থাকত। আমিও নগুন্ডি খেলায় বিশেষ পারদর্শি ছিলাম, যদিও খেলোয়ার দুজন তবে পক্ষে-বিপক্ষে অনেক সমর্থক থাকত। নগুন্ডি খেলতে খেলতে দিন যে কীভাবে পার হতো বলার উপায় ছিলে না।
মহরম মাসে আমাদের বাড়ির পাশে অনেক বড়ো মেলা বসত, অনেক পুরাতন ও ঐতিহ্যবাহী মেলা, যখন ছোট ছিলাম, মা আগে থেকে বলে দিত, মেলার বাকি কতদিন, মেলার জন্য টাকা জমাতাম মাটির ব্যাংকে। টাকা জমানোর কথাশুনে মা টিফিনের টাকা একটু বেশি দিত, ৯০/১০০ টাকার বেশি জমত না। টাকা যা-ই জমাই না কেন মেলার দিন সবার কাছ থেকে বকশিস পেতাম, ছোট-ভাই -বোনদের নিয়ে মেলায় যেতাম, মেলায় কেনা-কাটা করে দিয়ে ভাই-বোনদের বাড়িতে রেখে আবার মেলায় যেতাম বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে, যদিও বা তখন নিজেই বড়ো ছিলাম না, যাই করি না কেন মেলা থেকে সন্ধার আগে চলে আসতে হতো, মেলায় একবার একটা দুর্ঘটনায় পড়ে যাই, আমার চাচাতো ভাইয়ের সাথে পাশের গ্রামের একটা ছেলের মারা-মারি লেগে যায়, ওরা দল ভারী করে আমাদের ঘিরে ফেলে, মারবে বলে। আমরা বুঝতে পেরে পরিচিত এক চাচার দোকানে ঢুকে পড়ি, চাচাকে বুঝতে দেইনি ঘটনাটা, ছোট হলেও সম্মান বলতে কিছু আছে! আমরা ছিলাম তিনজন ওরা ছিল ৮/৯ জন। আমি মারামারি কখনই পছন্দ করতাম না, বিপক্ষ দলের একজন আমার সহপাঠি ছিল, ওর সহাতায় রক্ষা পাই, আমাকে বাড়ি যেতে কোন বাধা দেয় না কিন্তু আমার চাচাতো ভাইদের ওরা কোনোভাবেই ছাড় দিবে না, আমি ছাড়া পাওয়া মাত্র বাড়িতে বাবাকে খবর দেই, তখন মোবাইল ফোনের বেশি প্রচলন ছিল না। বাবা শোনা মাত্র আমাকে বকা দিয়ে ঘটনাস্থলে যায়। তখনকার চেয়ারম্যান বাবার ঘনিষ্ট বন্ধু ছিল, তিনি সমাধান করে দিয়েছিলেন।
আজ আর জ্যেঠা নেই, আমাদের ছেড়ে খুব তাড়াতাড়ি ওপারে চলে গিয়েছেন, হয়ত বাড়িতে আর কেউ বিষাদ-সিন্ধু উপন্যাস পড়ে না, হয়ত বা আগের মতো মহরম মাস নিয়ে মানুষের উৎসাহ নেই। গ্রামের মানুষ বিভিন্ন পেশায় জড়িয়ে পড়েছে, সবাই কর্মব্যস্ত, কর্মহীন লোক খুঁজে পাওয়া যায় না আগের মতো। মানুষ আর আড্ডা দেয় না, লুডু-নগুন্ডি খেলে না, প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদুৎ চলে যাওয়া মানুষ ইলেকট্রকিক্স ডিভাইস নিয়ে ব্যস্ত। এই মহরম মাসে মনে পড়ে যায় হারানো সেই রঙিন দিনের কথা, হয়ত বা আর কোনোদিন ফিরে যেতে পারব না হারনো সেই রঙ্গিন দিনগুলো কোনো কিছুর বিনিময় পাওয়া যাবে না , তবে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে হৃদয়ের অ্যালবামে হারানো সেই রঙিন দিনের স্মৃতি।
নাহিদ বাবু : তরুণ লেখক।





Users Today : 12
Views Today : 15
Total views : 185199
