সম্প্রতি পরমাণু অস্ত্র এবং পরমাণু অস্ত্রের বিরুদ্ধে বিশ্বের ৫টি দেশ তথা বিশ্বের ক্ষমতাধর পরমাণু অস্ত্র তৈরিতে সক্ষম রাষ্ট্র জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী ভেটো প্রদান ক্ষমতা সম্পন্ন সদস্য-যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্স যৌথভাবে বিবৃতির মধ্য দিয়ে ঘোষণা করেছে যে, পরমাণু অস্ত্রযুদ্ধ আর নয়। তাদের মধ্যে বোধগম্য হয়েছে যে, এই পরমাণু অস্ত্র যুদ্ধ হলে কোনো পক্ষেরই জয়-পরাজয় হবে না। বরং এই ধরনের ভয়ংকর অস্ত্র ব্যবহার হলে বিশ্ব মানব ও জীববৈচিত্র্যের ওপর ভয়াবহ প্রভাব পড়বে। শুধু তাই নয় পৃথিবী নামক গ্রহটিকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে দুটি পারমানবিক বোমা ফেলা হয়েছিল জাপানের হিরোসিমা ও নাগাসাকি নামক শহরে। যার করুণ পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন অবসানের মধ্যে দিয়ে। আর অসংখ্য মানুষকে চিরদিনের জন্য পঙ্গুত্ব¡ বরণ করতে হয়েছে। যা উনবিংশ শতকে মানব সভ্যতার একটি বিশাল ট্রাজেডি।
বিশ্বশান্তি ও বিশ্বরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিশ্বে ক্ষমতাধর ৫টি রাষ্ট্রের এটাকে একটি মহৎউদ্যোগ এবং বিশ্ব মানবতাবাদী কাজের প্রচেষ্টা। এই বিষয় নিয়ে একটি বৈঠক হওয়ার কথা ছিল জাতিসংঘের সদর দপ্তরে কিন্তু বিভিন্ন কারণে তা হয়ে উঠেনি। অবশেষে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক বিবৃতিতে বলেছেন যে, কোনো দেশ যাতে এই অস্ত্র ব্যবহার করতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। এবং পরমাণু অস্ত্র প্রদর্শন বন্ধ করতে হবে। চীনের পররাষ্টমন্ত্রীর এই মানবতাবাদী বক্তব্যে বিশ্বের শান্তিকামি মানুষ কৃতজ্ঞচিত্তে ধন্যবাদ জানাই। তবে বক্তব্য ও বিবৃতির মধ্যে দিয়ে যেন দায় সারা না হয় তার জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে এই উদ্যোগকে কার্যকরী করতে হবে। কারণ লিখিতভাবে চুক্তিপত্র হলে নিশ্চিত হওয়া যাবে যে, চুক্তি থেকে কেউ সরে দাঁড়াবে না। আবারও দেখা যায় এই ধরনের চুক্তিপত্র থেকে সরে আসার নজির কোনো কোনো পরাশক্তি রাষ্ট্র পূর্বে দেখিয়েছেও। এ প্রসঙ্গে তুলে ধরতে চাই যে, ১৯৬৮ সালে ১৯১টি দেশের সম্মতিতে একটি চুক্তিপত্র হয়েছিল। কিন্তু উত্তর কোরিয়া সেই চুক্তিপত্র থেকে সরে যায়। আবার যুক্তরাষ্টের সাথে ইরানের পরমাণু অস্ত্র নিরস্ত্রকরণের বিষয় নিয়ে বিশ্বে ৫টি পরমাণু অস্ত্র তৈরি ক্ষমতা সম্পন্ন দেশ চুক্তি করেছিল কিন্তু দেখা গেছে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে সেই চুক্তি থেকে সরে যায়। এর ফলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সামরিক উত্তেজনা শুরু হয়। যার ফলশ্রুতিতে আমরা লক্ষ্য করলাম ২০২০ সালের প্রথম মাসের দিকেই ট্রাম্প ক্ষমতা থাকাকালিন সময় ইরানের এক সামরিক জেনারেল কাসেম সুলাইমানি সহ ৮ জন সামরিক অফিসার যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ড্রোন হামলায় নিহত হয়। ইরানও সেই ঘটনার প্রেক্ষিতে দারুণভাবে ক্ষুদ্ধ হয়। কিন্তু আজ ২০২২ সালে সময়ের বিবর্তনে ও বিশ্বকে পরমাণু অস্ত্রযুদ্ধ মুক্ত করার লক্ষে যখন পরাশক্তি রাষ্ট্রগুলো নিজেদের মধ্যে একটি বিষয়ে ঐক্যমত হয়েছে।
তারই প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ২০১৫ সালের চুক্তিটি পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সম্ভাবনার আলো আমরা দেখতে পাচ্ছি। তবে ভবিষ্যৎ বিশ্বমানবতা তথা বিশ্ব প্রজন্মকে রক্ষা ও নিরাপত্তার স্থায়ী সমাধান হলো পরমাণু অস্ত্র ধ্বংসের উদ্যোগ গ্রহণ। অতীতের ইতিহাস থেকে উল্লেখ করা যায় যে, সাউথ আফ্রিকা রাষ্ট্রটি পরমাণু অস্ত্র তৈরি করেছিল এবং চুক্তির মধ্যে নিজেকে প্রবেশ করিয়েছিল।এবং দৃষ্টান্ত হিসাবে তার দেশ পরমাণু অস্ত্র সম্পূর্ণ ধ্বংস করেছে। সেই সাউথ আফ্রিকার মতো নজির সৃষ্টির পথ ধরে আজ বৃহৎ শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো যদি সেই পথ অনুসরণ করে তাহলে বিশ্বে অন্যান্য পরমাণু অস্ত্র তৈরিতে সক্ষম রাষ্ট্রগুলো একদিন বিশ্ব মানব কল্যাণের উদাহরণ সৃষ্টি করবে। তারই প্রেক্ষাপট রচনা সর্বাগ্রে বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোকে এই মহান গুরুদায়িত্ব পালন করতে হবে।
কিন্তু বড়োই দুঃখের বিষয়, সম্প্রতি বিশ্বের দুটি পরাশক্তি রাষ্ট্রের মধ্যে ক্ষুদ্র রাষ্ট্র ইউক্রেনকে নিয়ে চরম সামরিক উত্তেজনা শুরু হয়েছে প্রায় মাসাধিককালের ঊর্র্ধ্বে।
এদিকে ইউক্রেন সীমান্তে বিপুল সৈন্য সমাবেশ করেছে রাশিয়া। এই দুটি পরাশক্তির দাবি ইউক্রেনকে তাদের নিয়ন্ত্রণ নিতে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ইউক্রেনকে ন্যাটোভুক্ত করতে। আর রাশিয়া বরাবরই বলছে ইউক্রেনকে ন্যাটোভুক্ত করা যাবে না। আর এর ফলশ্রুতিতে ইউক্রেনের সীমান্তে বিরাট সৈন্য সমাবেশ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেডিডেন্ট জো বাইডেন গভীরভাবে আশঙ্কা করছেন যে ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেনে আক্রমণ করবে নিশ্চিতভাবে তার বক্তব্যে প্রকাশ পাচ্ছে। তবে রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রে এই দাবির কথা অস্বীকার করছে। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, নিজেদের ভৌগলিক ও আঞ্চলিক প্রশ্নে রাশিয়া কোনো ছাড় দিবে না। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ ও বিশ্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আশা করে জাতিসংঘ তথা তৃতীয় পক্ষের কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্র কর্র্তৃক ইউক্রেনকে নিয়ে একটি আলোচনার টেবিলে দ্রুত সমাধানে যেয়ে সমস্যার সমাধান করা।
ইউক্রেন ১৯৯০ সালের দিকে রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্ভাচেভের আমলে রাশিয়া থেকে বের হয়ে একটি স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। বিশ্বের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করে যে, ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ, তারা কোনো বলয়ের সাথে মিত্রতায় আবদ্ধ হবে, না নিজেরা স্বাধীন স্বত্ত্বা নিয়ে থাকবে এই সিদ্ধান্ত তাদের নিজেদের কেই নিতে হবে। পাশাপাশি নিজেদের টিকে থাকতে ও নিরাপত্তার স্বার্থে প্রতিবেশি রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্বের প্রয়োজন তেমনই বহুদূরের বন্ধু রাষ্ট্রের সাথেও মিত্রতার প্রয়োজন আছে বৈকি।
আমরা বিশ্ববাসী মনে করি ইউক্রেনকে নিয়ে রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোকে কোনোভাবেই সামরিক সংঘাতে যাওয়া যথার্থ হবে না আজকের এই বিশ্বায়নের যুগে। কারণ যুদ্ধ হলে রাশিয়া এবং ইউক্রেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং এটা গোটা বিশ্বে এর প্রভাব আসতে পারে। এমনকি তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধের মতো ভয়ংকর মানব বিধ্বংসীর ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। তাই আমরা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ আশা করব এই মহাসংকট নিরসনকল্পে জাতিসংঘের দুই পরাশক্তির মধ্যে যে বাক-বিত-া চলছে তা থেকে বেরিয়ে এসে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছতে হবে। বিশ্বের শান্তিকামী রাষ্ট্রনায়করা আর যাতে যুদ্ধ নয় শান্তির জন্য যুদ্ধ প্রতিরোধে সহযোগিতা করবেন এটাই বিশ্ববাসীর একান্তই কামনা। অত্যন্ত আনন্দের বিষয় যে ইতিমধ্যে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ও জার্মানীর চ্যান্সেলর এই চলমান সংকট নিরসনে রাশিয়া ও ইউক্রেন সফরে যাবেন বলে খবরে জানা গেছে। আমরা আশা করবো ইউক্রেন নিয়ে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে সামরিক উত্তেজনা ও স্নায়ু যুদ্ধ চলছে তা আশু নিরসন হবে এবং ইউক্রেনবাসীর তথা বিশ্ববাসীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা দূর হবে।
হাক্কি মাহমুল হক : যুদ্ধ, পরমাণু অস্ত্রমুক্ত ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উজ্জীবিত সংস্কৃতি প্রেমি।





Users Today : 21
Views Today : 24
Total views : 185260
