বাংলাদেশী হিসাবে আমরা আজ সৌভাগ্যবান। কারণ আমরা মায়ের ভাষায় কথা বলেতে পারি। একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছি। পৃথিবীতে আজও অনেক জাতি আছে যারা তাদের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করে যাচ্ছে, জীবন উৎসর্গ করছে। বর্বরতা-নিপীড়ণের শিকার হচ্ছে। রক্ত ছাড়া কখনই স্বাধীনতা আসে না। আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করেছি। আজ আমাদের দেশ অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে। স্বাধীনতার আগে ও পরে অনেক নাটকীয় পট পরিবর্তন ঘটেছে। যারা সেদিন স্বাধীনতা বিরোধী ছিল তারা আজও ওৎ পেতে আছে, দেশ ও দেশের মানুষকে বিপথে নিয়ে গিয়ে অন্যের হাতে তুলে দিতে। আজকের যুব সমাজ আমাদের মুক্তিযোদ্ধ দেখেনি, দেখেনি পাকিস্তানিদের বর্বরতা, দেখেনি স্বাধীনতা বিরোধীদের যড়যন্ত্র। কিন্তু তারা দেখেছে আমাদের প্রিয় জন্মভূমিকে নিয়ে কিছু লোকের যড়যন্ত্র। তাই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস আজকের যুব সমাজকে অবশ্যই জানাতে হবে।
১৭৫৭ সালের ২৩ শে জুন পলাশীর ময়দানে এক অনাকাক্সিক্ষত যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সেনাপতি মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় ইংরেজ লর্ড ক্লাইভের বাহিনীর কাছে পরাজিত ও পরে নিহত হন বাংলার শেষ নবাব সিরাজ উদ দৌলা।
এ ঘটনার পর থেকে প্রায় ২০০ বছর উপমহাদেশ শাসন করেছিল ইংরেজেরা। ভারত উপমহাদেশের বৈচিত্র্যময় ইতিহাস। এই ইতিহাসের সঙ্গে অনেক ব্যক্তি জড়িত। এঁদের মধ্যে মহাত্মা গান্ধী অন্যতম। তিনি কখনও চাননি হিন্ধু-মুসলমান ভাগ হয়ে যাক। এজন্য তিনি মুসলিম লীগ নেতা জিন্নাহর সাথে আলোচনা করেছিলেন। ভারত ভাগ ঠেকাতে তিনি মুসলিম লীগের নেতাদের সাথে একটানা ১৮ দিন আলোচনা করে ব্যর্থ হন। কারণ মুসলিম লীগের নেতারা মনে-প্রাণে চাইতেন ভারত ভাগ হয়ে যাক। এমন অবস্থায় ব্রিটিশদের ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির প্রতিনিধিরা দিল্লিতে আসেন ভারতের স্বাধীনতার ব্যাপারে কথা বলতে। তারা গান্ধী ও জিন্নাহসহ বড়ো বড়ো নেতাদের সাথে আলোচনা করেন দেশ ভাগের বিষয়ে। এরই ধারাবাহিকতায় ডাকা হয় শিমলার ঐতিহাসিক স্বাধীনতা সভা। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, নেহেরু, আব্দুল গফ্ফার, সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেলের মতো বাঘা বাঘা নেতারা সেখানে উপস্থি ছিলেন। তারা স্বাধীনতা ও বিভক্তির প্রয়াসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন নিয়ে মুসলিম লীগ ও কংগসের মধ্যে দাঙ্গা ও সংঘাত শুরু হয়। শত চেষ্টায়ও পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা যাচ্ছিল না। এরই মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্ব-যুদ্ধের কারণে বিশ্ব রাজনীতির পরিবেশ অনেকটাই পাল্টে যায়। ১৯৪৫ এর আগস্টে জাপানের হিরোসিমা ও নাগাসাকিতে মার্কিন বাহিনী পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে। নিজেদের মধ্যে সহিংসতা ও বিশ্বযুদ্ধের মধ্যেই ১৪ আগস্ট পাকিস্তান ও ১৫ আগস্ট ভারত নামে দু-টা আলাদা রাষ্ট্র গঠন করা হয়। ১১শ মাইল দূরে থাকার পরেও পূর্ব বাংলার মানুষ ভেবেছিল তারা সুখে-শান্তিতে পশ্চিমাদের অধীনে থাকবে। মুসলিম পরিচয় দিয়ে। তাদের এ সরল ধারণ পাল্টে যেতে আর বেশি দেরি হয়নি। পশ্চিম পাকিস্তানিরা প্রথমে কেড়ে নিতে চাইল বাঙালিদের হাজার বছরের মায়ের ভাষা বাংলাকে। ভাষাবিদ শহীদুল্লাহসহ এদেশের বুদ্ধিজীবীরা এর তীব্র প্রতিবাদ ও বিরোধীতা করেন। পাকিস্তানের শিক্ষামন্ত্রী পূর্ব বাংলার প্রতিনিধি তিনি আরবি হরফে বাংলা লেখা প্রচলন করার চেষ্টা করেন। ১৯৪৮ এর ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের গণ পরিষদে বাংলাকে অন্যতম ভাষা হিসাবে দাবি তোলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি, খাজা নাজিম উদ্দিন, গণপরিষদের সহসভাপতি তমিজ উদ্দিন খান দাবি নাকচ করে দেন।
এ ঘটনার প্রতিবাদ গোটা বাংলা ফুঁঁসে ওঠে। ১১মার্চ পূর্ব বাংলায় ১৪৪ দ্বারা জারি করে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের লাঠি চার্জ করে। এতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। পূর্ব বাংলার মূখ্যমন্ত্রী আন্দোলনকারীদের সাথে ৮ দফার একটা চুক্তিস্বাক্ষর করেন। তিনি বলেন উর্দুর পাশাপাশি বাংলাও রাষ্টভাষার মর্যাদা পাবে। ১৯৪৮সালে ২১ ও ২৪ মার্চ পাকিস্তানের গর্ভনর জেনারেল জিন্নাহ আলাদা-আলাদা সভায় বলেন, উর্দু একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। এতে আগুনের মতো ছড়িযে পড়ে ভাষা আন্দোলনকারীরা। লাগাতার আন্দোলনের এক পর্যায়ে ২১ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে ১৪৪ দ্বারা জারি করা হয়। আন্দোলনকারীরা এই কারফিউ ভাঙার সিদ্ধান্ত নেয়। সে মোতাবে আন্দোলনকারীরা ২১ শে ফেব্রুয়ারি দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণপরিষদ ভবনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। বিকাল ঠিক ৩ টা ৩০ মিনিটে পুলিশ হঠাৎ করে গুলি চালায়, সাথে সাথে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সালাম, রফিক, জব্বার, শফিকসহ নাম না জানা অনেক বীর। পরবর্তীতে গণপরিষদ বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়।
পরবর্তীতে মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে গড়ে উঠে আওয়ামী-মুসলিম লীগ। ১৯৫৪ সালে মাওলানা ভাসানী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক মিলে গঠন করে যুক্তফ্রন্ট। তারা ব্যাপক জয় লাভ করলেও ভারতে সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার কারণে যুক্তফ্রন্ট সরকারকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। এবং তাদের পশ্চিম পাকিস্তানের মনমতো গর্ভনর দিয়ে দেশ চালনা হয়। ১৯৫৮ সালে ফিল্ডমার্শাল আইযুব খান সাময়িক আইন চালু করে সংবিধান লংঘন করে তার ক্ষমতা পাকা করে। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের ফলে পশ্চিমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হয়ে যায়। বাঙালির বাঁচার দাবি নিয়ে, শেখ মজিব ১৯৬৬ সালের ২৩ শে মার্চ ৬ দফা দাবি তোলেন। তখন মুজিবসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দেওয়া হয়। আসামিদের জেলে দেওয়া হয়। বিশেষ করে সার্জেন জহরুল হক, ফজলুক হককে ক্যান্টনমেন্টে আটক করে আহত করা হয় এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সামসুজ্জোহাকে সেনাবাহিনী হত্যা করায় পরিস্থিতি অবনতির দিকে চলে যায়। এরই মধ্যে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন সারা বাংলার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৬৯ সালে ২৫ শে মার্চ বেতারে ভাষণের মধ্যে দিয়ে আইয়ুব খান বিদায় নেন।
তার পর আসেন আরেক সেনা শাসক ইয়াহিয়া খান। তিনি এসে শুরু করেন দমন পীড়ন, নির্যাতন, আইন শৃঙ্খলার অবনতি, দ্রব্য মূল্যের ঊর্দ্ধগতি, কৃষি বাণিজ্য চরম অবনতি ঘটে। ১৯৭০ সালের ১১ নভেম্বরে ভয়াভয় সাইক্লোনে লাখ লাখ মানুষ মৃত্যুর ফলে পশ্চিমাদের চরিত্র ফুটে উঠে। বাঙালি মনে করল আর নয় ছদ্মবেশী শত্রুদের সাথে বসবাস আর নয়। ১৯৭০ এর ৭ ডিসেম্বর পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯ টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ লাভ করে ১৬৭ টি। এভাবে তারা সংখ্যা গরিষ্ঠতা লাভ করে। আওয়ামী লীগ নেতাদের অভিনন্দন জানান ইয়াহিয়া খান। ১৯৭১ সালের ২৩ শে জানয়ারি ভোটাদের অভিনন্দন জানিয়ে জাতির উদ্দেশ্যে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি বিভিন্ন ভারসাম্য তুলে ধরেন, বেকার সমস্যা সমাধান, ভূমিহীনদের ভূমিদান, আদিবাসীদের জন্য সমান অধিকার, সংখ্যালঘুদের আর অত্যাচারীত হতে হবে না, খাদ্য নিশ্চয়তাসহ দেশ পরিচালনার বিভিন্ন লক্ষ্য তুলে ধরেন। এমন অবস্থায় ১৯৭১ সালের ২ শে মার্চ নির্বাচনের ২ মাসের পর জাতীয় অধিবেশন আহ্বান করা হলেও সেই অধিবেশন ভেঙে দেওয়া হলে পরিস্থিতি আর ঘোলা হয়।
তখন বঙ্গবন্ধুর মুক্তির কথা বলা ছাড়া আর কিছু বলার থাকে না। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ শেখ মজিবুর রহমান রেসকোর্স ময়দানে লাখ লাখ মানুষের সামনে বাঙালিদের শুনিয়ে দিলেন সেই স্বাধীনতার বার্তা—‘তোমাদের যার কাছে যা কিছু আছে তা নিয়ে শত্রুর বিপক্ষে ঝাপিয়ে পড়, মনে রাখ রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দিব, তবুও এ দেশকে স্বাধীন করে ছাড়ব ইনশআল্লাহ…’।
কিন্তু পশ্চিমাদের নীল নকশা তো তখন থেমে থাকেনি। তারা চিন্তা করেছিল কীভাবে বাঙালিকে দমিয়া রাখা যায়। তাদের গোপন চিন্তা ফল ২৫ শে মার্চ ভয়াল রাতে ঢাকা শহরের ঘুমন্ত নিরস্ত্র বাঙ্গালিদের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে, ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামে হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। ২৫শে মাচ রাতকে এই জাতি চিহ্নিত করেছে ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম রাত হিসেবে। এই কালরাতে এ জনপদের নিরস্ত্র ও নিরীহ সাধারণ মানুষের ওপর পাকিস্তানের প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীর নৃশংসতম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল। বাঙালির ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় অসম যুদ্ধ। সেই কালোরাতে শুধু ঢাকা নগরীতেই প্রায় ৫০ হাজার নর-নারীর প্রাণহানি ঘটেছিল।
২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু বন্দী হওয়ার পূর্বে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর প্রতিনিধি হিসাবে ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ পাঠ করন।
২৬শে মার্চ স্বাধীনতা সংগ্রামের ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে জাতীয় জীবনের বিস্তীর্ণ উপত্যকার অসংখ্য রক্তস্রোতের সৃষ্টি করে, চূড়ান্ত পর্যায়ে তার সম্মিলিত প্রবাহ ১৬ই ডিসেম্বরে সমাজ জীবনের দুকূল ছাপিয়ে একটি নতুন দেশ সৃষ্টি হয়। তার ফলে জন্মলাভ করে স্বাধীনতার স্বর্ণদ্বীপ বাংলাদেশ।
২৬শে মার্চকে বাঙালি জাতি স্মরণ করে আত্মশক্তির প্রতীক রূপে। স্মরণ করে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর দুর্জয় প্রত্যয় হিসেবে।
আজকের এই দিনে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি ওইসব কৃতী সন্তানদের, যাঁরা মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ দিয়েছেন, দেশকে ভালোবেসে জীবনের শেষ রক্তটুকু বিলিয়ে দিয়েছেন। তাঁদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাই, যাঁদের পবিত্র রক্তে সিক্ত হয়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীনতা ।
নাহিদ বাবু : তরুণ লেখক।





Users Today : 19
Views Today : 22
Total views : 185258
