১২০৬ থেকে ১২১০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দিল্লির প্রথম সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবেকের শাসনামলে ডাক ব্যবস্থার ক্রমোন্নতির একটা ধারাবাহিক বিবরণ পাওয়া যায়। সুলতান আলাউদ্দিন খলজী, যিনি জানামতে সর্বপ্রথম ডাকচৌকি স্থাপন করেন। তিনি ১২৯৬ সালে ঘোড়ায় চড়া এবং পায়ে হাঁটা ডাকবাহকের সাহায্যে তথ্য পরিবহণের ব্যবস্থা চালু করেন।
মোহাম্মদ বিন তুগলকের শাসনামলে (১৩২৫-১৩৫১) ডাক বিভাগের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান সূচিত হয়। ইবনে বতুতার ভ্রমণ কাহিনীতে লিপিবদ্ধ আছে যে, তিনি সে সময় দুই ধরনের ডাক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছেন, তার একটি হলো ঘোড়সওয়ার ডাকবাহক এবং অন্যটি পায়ে হাঁটা সাধারণ ডাকবাহক।
শেরশাহ’র শাসনামলে (১৫৩৮-১৫৪৫) ডাক ব্যবস্থার সার্বিক সংস্কার সাধন করা হয়। তিনি পূর্বের ডাক রানার ব্যবস্থার পরিবর্তে পুরোপুরি ঘোড়ার সাহায্যে ডাক পরিবহণ ব্যবস্থা চালু করেন এবং বাংলাদেশের সোনারগাঁও থেকে সিন্ধুনদের তীর পর্যন্ত গ্রান্ট ট্রাঙ্ক রোড নামে খ্যাত ৪,৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এক রাস্তা তৈরি করেন। তিনি প্রতি দুই মাইল অন্তর একটি করে চৌকি তৈরি করেন যেগুলি সরাইখানা এবং ডাকচৌকি রূপে ব্যবহৃত হতো। শেরশাহ ১,৭০০টি ডাকঘর নির্মাণ করেন এবং ঘোড়াসহ প্রায় ৩,৪০০ জন বার্তাবাহক নিযুক্ত করেন। এই সময় মীর মুন্সি অর্থাৎ রাজকীয় ফরমান, যোগাযোগ ও ডাক বিভাগের সচিব দারোগা-ই-চৌকি পদধিকারী কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে কাজ করতেন। বিপুল সংখ্যক কর্মচারীর সমন্বয়ে সম্প্রসারিত ডাক ব্যবস্থাকে বলা হতো দিওয়ান-ই-ইনসা। বাংলা শাসনকালে মুগলরা দারোগা-ই-ডাকচৌকি ব্যবস্থা বহাল রাখেন। সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসন আমলে ১৬১০ সাল থেকে বাংলার রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দিল্লির ডাক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ডাক গ্রহণ ও প্রেরণের জন্য ডাকচৌকির দারোগা বা সুপারিনন্টেন্ডেন্ট নিয়োগ করা হয়। সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময়ে বাংলা থেকে উড়িষ্যা এবং রাজমহল থেকে মুর্শিদাবাদের মধ্যে কবুতরের সাহায্যে ডাক যোগাযোগ স্থাপিত হয়।
প্রাথমিক পর্যায়ে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (১৬৩০-৮৮) মুগলদের তুলনায় অনেক সংক্ষিপ্ত এলাকায় ডাক পরিবহণ ব্যবস্থা চালু রাখে। কলকাতার সঙ্গে ঢাকা, চট্টগ্রাম, দিনাজপুর, রাজশাহী, রংপুর, রাজমহল এবং মুর্শিদাবাদের বাণিজ্যিক দপ্তরগুলির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার জন্য এ ব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল। ১৭৬৬ সালে রবার্ট ক্লাইভ প্রথমবারের মতো ডাক ব্যবস্থার সংস্কার করেন। কলকাতায় একজন পোস্টমাস্টার নিয়োগ দেয়া হয়, কলকাতার সঙ্গে ৬টি ডাক যোগাযোগ কেন্দ্রের সংযোগ স্থাপন করা হয়, তবে প্রধান সংযোগ ছিল ঢাকা ও পাটনার সঙ্গে। এই ব্যবস্থাকে বলা হতো ক্লাইভের ডাক।
ওয়ারেন হেস্টিংস্’র সময় ১৭৭৪ সালের ১৭ মার্চ তারিখে কলকাতায় জিপিও বা জেনারেল পোস্ট অফিস স্থাপন করা হয়। পূর্ববঙ্গের ডাকঘরগুলি কলকাতার জেনারেল পোস্ট অফিসের তত্ত¡াবধানে ছিল। ১৭৯৮-৯৯ সালে কলকাতা জিপিও’র ৯টি শাখা অফিস ছিল যথাক্রমে ঢাকা, চট্টগ্রাম, দিনাজপুর, রংপুর, নাটোর, কুমারখালী, রঘুনাথপুর, সিলেট এবং রামুতে।
১৭৮১ সালে কলকাতা থেকে চট্টগ্রাম ৪০ টাকা, সময় লাগতো ৬০ দিন আর ঢাকা পর্যন্ত মাশুল ছিল ২৯ টাকা, সময় লাগতো সাড়ে ৩৭ দিন। ১৭৮৫ সালে পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলের ডাক চৌকিগুলির মাধ্যমে পার্সেল প্রেরণ ব্যবস্থা চালু করা হয়। এখান থেকেই বর্তমান পোস্টাল পার্সেল সার্ভিসের যাত্রা শুরু।
১৭৯১ সালে ডাক বহনের মাশুল পুনর্বিন্যাস করা হয় এবং কলকাতা থেকে ঢাকা তিন আনা, চট্টগ্রাম পর্যন্ত ছয় আনা মাশুল ধার্য করা হয়। ১৭৯৩ সালে এক বিধি জারির মাধ্যমে ডাক ব্যবস্থা আরও সংগঠিত ও নিয়মতান্ত্রিক রূপ লাভ করে। ১৭৯৮ সালে একটি আইন পাস করার মাধ্যমে লর্ড ওয়েলেসলি ডাক ব্যবস্থার আরও সংস্কার সাধন করেন।
১৮৫৪ সালে সমন্বিত আধুনিক ডাকব্যবস্থার অধীনে দূরত্বভিত্তিক চিঠি পাঠানোর মাশুলের পরিবর্তে ওজনভিত্তিক মাশুল আদায়ের ব্যবস্থা চালু করা হয়। এ সময়ে প্রথম সর্বভারতীয় ডাকটিকিট প্রবর্তন করা হয়। দ্রæত ডাক পরিবহণের মাধ্যম হিসাবে রেল পরিবহণ ব্যবস্থার সহায়তা গ্রহণ করা হয় এবং রেলওয়ে মেইল সার্ভিস (আরএমএস) চালু হয়। ১৮৮০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে নিয়মিত রেল মেইল সার্ভিস চালু হয়। ১৮৭৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকায় সদর দপ্তর স্থাপন করে পোস্ট অফিসের পূর্বাঞ্চলীয় শাখা চালু করা হয় এবং চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা ও নোয়াখালীতে বিলি বা ডেলিভারি অফিস স্থাপন করা হয়। ১৮৫৬-৫৭ সালে প্রথম চিঠি ফেলার বাক্স বা লেটার বক্স চালু হয় এবং এই বক্সের সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে।
১৮৮০ সালের পহেলা জানুয়ারি থেকে ভারতের সকল ডাকঘরে মানিঅর্ডার ব্যবস্থা চালু হয়। একজন প্রধান পরিদর্শকের অধীনে ১৮৭৩ সালের ১ এপ্রিল থেকে আসাম পোস্টাল সার্কেল স্থাপিত হয় এবং কুঁচবিহার, সিলেট ও কাছাড় জেলাকে এই সার্কেলের আওতাভুক্ত করা হয়। ঢাকা এবং নারায়ণগঞ্জ আরএমএস ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল কেবল নারায়ণগঞ্জ ও ফেঞ্চুগঞ্জের মধ্যে ডাক যোগাযোগ স্থাপনের জন্য। খুলনা ও বরিশালের মধ্যেও আরএমএস সার্ভিস চালু করা হয় ১৮৯৯ সালে, কিন্তু তা আবার ১৯০২ সালে বন্ধ করে দেওয়া হয়। টেলিগ্রাফ সার্ভিস চালু করা হয় পোস্ট অফিসের সঙ্গেই সংযুক্ত অফিসের মাধ্যমে ১৮৮৩ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে এবং এক্সপ্রেস টেলিগ্রাম সার্ভিস চালু হয় ১৯০৯ সালে। ১৯০৫ সালে বাংলাকে বিভক্ত করে পূর্ববঙ্গ ও আসামের সমন্বয়ে ঢাকাকে রাজধানী করে একটি নতুন প্রদেশ গঠন করা হয়। ১৯০৭ সালে পূর্ববঙ্গ ও আসাম ডাক সার্কেল গঠিত হয় এবং তৎকালীন সার্কেলের যেসব অঞ্চল এই নতুন সার্কেলের এলাকাভুক্ত ছিল ঐসব অঞ্চলই নতুন সার্কেলের অর্ন্তভুক্ত হয়। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হলে এই নতুন সার্কেল আবার আগের পূর্ববঙ্গ ও আসাম সার্কেলের সঙ্গে একীভ‚ত করা হয়। ১৯২০ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি চিঠিপত্রে মাশুল দেয়ার কাজে দ্রুততা আনার লক্ষ্যে মিটার ফ্র্যাঙ্কিংয়ের মাধ্যমে ডাকমাশুল প্রদানের ব্যবস্থা চালু হয়। ১৯৩০-এর দশক ছিল বিমানে ডাক পরিবহণের যুগ। ১৯৩৩ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে ঢাকা-কলকাতার মধ্যে বিমানে ডাক পরিবহণ শুরু হয়। একই দিনে চট্টগ্রাম হয়ে কলকাতা-রেঙ্গন রুট চালু করা হয়।
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষ পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি পৃথক স্বাধীন রাষ্টে বিভক্ত করা হয়। এতে বাংলাও বিভক্ত হয়ে যায় এবং অবিভক্ত বাংলার পূর্বাঞ্চলের বেশির ভাগ এলাকা নিয়ে পূর্ববাংলা প্রদেশ গঠিত হয়। ১৯৪৮ সালে সাবেক বাংলা ও আসাম সার্কেলের একটি এলাকা (সিলেট) নিয়ে নতুন পূর্ববাংলা সার্কেল গঠন করা হয়।
১৯৪৮ সালের ৯ জুলাই তারিখে পাকিস্তানের নিজস্ব ডাকটিকিট এবং একই সালের ১৪ আগস্ট নিয়মিত ডাকটিকিট সিরিজ চালু করা হয়। ১৯৫৬ সালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর ডাকটিকিট ও অন্যান্য কাগজপত্র বাংলা হরফে মুদ্রিত হয়। ১৯৫৯ সালে ঢাকা খুলনা এবং চট্টগ্রামে নতুন জেনারেল ডাকঘর স্থাপন করা হয়। ১৯৬৩ সালে ঢাকা জেনারেল পোস্ট অফিসের জন্য নতুন কমপ্লেক্স স্থাপন করা হয়। ১৯৬৯ সালে কমলাপুর রেলস্টেশন স্থাপিত হলে রেলওয়ে মেইল সার্ভিস সেখানে স্থানান্তর করা হয়।
নতুন ধরনের ফ্র্যাঙ্কিং মেশিন, ডাকটিকিট ও স্টেশনারি মুদ্রণের স্বয়ংক্রিয় মেশিন চালু হওয়ার ফলে ১৯৭০ সাল থেকে ডাক ব্যবস্থার আধুনিকীকরণের ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন সাধিত হয়।
১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল কুষ্টিয়া জেলার মুজিবনগরে বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার গঠনের সঙ্গে সঙ্গেই বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় ৫০টি ফিল্ড পোস্ট অফিস চালুর মাধ্যমে এবং মুক্তিবাহিনীর সার্বিক বা আংশিক পরিচালনায় ডাক ব্যবস্থা চালু করা হয়। ফিল্ড পোস্ট অফিস স্থাপন এবং সেগুলি পরিচালনার জন্যে স্কাউট নিয়োগ করা হয়। মুজিবনগর সরকার ১৯৭১ সালের ২৯ জুলাই তারিখে একইসঙ্গে মুজিবনগর সচিবালয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন ক‚টনৈতিক মিশন এবং লন্ডনস্থ হাউজ অব কমন্স-এ আটটি স্মারক প্রচারণামূলক ডাকটিকিট চালু করে।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের পর মুজিবনগর সরকারের ফিল্ড পোস্ট অফিসগুলি বন্ধ করে দেশের স্থায়ী ডাকব্যবস্থার সঙ্গে একীভ‚ত করা হয়। ১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বর পাকিস্তান ডাকবিভাগের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (স্টাফ ও সংস্থাপন) আবু মোহাম্মদ আহসানউল্লাহকে ডাক বিভাগের মহাপরিচালক নিয়োগ করা হয়।
১৯৭১-৭২ সালে সমগ্র বাংলাদেশে মোট ডাকঘরের সংখ্যা ছিল ৬,৬৬৭টি এবং লোকবল ছিল ২৪,৯৮৩ জন। প্রাথমিক পর্যায়ে ডাকবিভাগকে পূর্ব ও পশ্চিম এই দুইটি প্রশাসনিক সার্কেলে বিভক্ত করা হয়। ১৯৭৯ সাল থেকে সার্কেলগুলি পুনর্বিন্যাস করে কেন্দ্রীয় (ঢাকা), দক্ষিণাঞ্চলীয় (খুলনা), উত্তরাঞ্চলীয় (রাজশাহী) এবং পূর্বাঞ্চলীয় (চট্টগ্রাম)-এই চারটি সার্কেলে বিভক্ত করা হয়। প্রথম দশকে ডাক বিভাগকে আধুনিক ও যান্ত্রিকীকরণের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। ১৯৭৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়নের (ইউপিইউ) সদস্যপদ লাভ করে।
ডাক বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ প্রদানের লক্ষ্যে ১৯৮৬ সালে রাজশাহীতে একটি পোস্টাল একাডেমি স্থাপন করা হয়েছে।
১৯৮৯ সালের ৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশের নিজস্ব নিরাপত্তা ছাপাখানা স্থাপনের পর থেকে দেশের সকল ডাকটিকিট ও স্টেশনারি এখান থেকেই ছাপানো হয়। ২০০০ সালের ১৬ আগস্ট ডাক বিভাগ ইলেকট্রিনিক মেইল সার্ভিস চালু করে। ডাকবিভাগের সাম্প্রতিক সংযোজন দ্রুত সময়ে গ্রাহক টাকা আদান-প্রদানের জন্য ‘নগদ’।
(বাংলাপিডিয়া থেকে সংগৃহিত ও ঈষৎ সংক্ষিপ্ত)
ইসতিয়াক আহমেদ খান





Users Today : 36
Views Today : 43
Total views : 178005
