আদিবাসী সাঁওতালদের মাতৃভাষায় ww.thesantalstimes.com নামে অনলাইন দৈনিক পত্রিকা বিগত বছর ৯ আগস্ট, ২০২০ খ্রিষ্টাব্দে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে। ২০২১ খ্রিষ্টাব্দের ৯ আগস্ট বছরপূর্তি পালন করেছে। এ দিনের ভাচুর্য়াল আলোচনা সভায় অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম। আমন্ত্রিত হয়েছিলেন ভারতের ‘জুগসিরিজল’ সাঁওতালী পত্রিকার মাননীয় সম্পাদক ড. তনল মুরমু, আদিবাসী সাঁওতাল লেখক ও গবেষক সারদাপ্রসাদ কিস্কু (সভাপতি—ফেডারেশন অব আদিবাসী অর্গানাইজেশন, ইন্ডিয়া)। এছাড়াও ছিলেন দেশের সাঁওতালী বর্ণমালার কবি সামিয়েল মার্ডী, সাহিত্যিক মারকুশ মুরমু, প্রদীপ হেমব্রম; সান্তালীনিউজ২৪ডটকম সম্পাদক সমর মাইকেল সরেন, সমাজকর্মী ও সংগঠক মিসেস সারা মারান্ডী, মি. ষ্টিফেন সরেন, মি. মাইকেল মুরমু বাবলু; আইনজীবী প্রভাত টুডু এবং সংস্কৃতিকর্মী মি. জন হেমব্রম, মি. মানুয়েল মার্ডী, প্রভাষক সামসন হাঁসদা, মিস অন্যনা হেমব্রম ও অন্যান্যরা। আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে সাঁওতাল যুবদের নিয়ে গঠিত ব্যান্ড ‘সেঁঙেল’, ‘আনচার’ এবং ‘হুল’ উপস্থিত ও সরাসরি ফেসবুকে যুক্ত শ্রোতাদের গান দিয়ে মনের আশা পূর্ণ করেছে। সাঁওতালী ভাষায় (রোমান বর্ণমালায়) প্রকাশিত দৈনিকের শ্লোগান হচ্ছে —Sạriak̕ So̠do̠r Re Aboak̕ Aṛaṅ (সত্যি প্রকাশে আমাদের কণ্ঠ)। যুগোপযোগী শ্লোগানকে সামনে রেখে সাঁওতালী বর্ণমালায় দৈনিক পত্রিকা আদিবাসী সাঁওতালদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। এই দৈনিকই আদিবাসী সাঁওতালদের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আনন্দ-উৎসব, বৈষম্য-অধিকার, সচেতন-সক্রিয়তা বৃদ্ধি, বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। প্রত্যাশা—এক ঝাঁক প্রগতিশীল তরুণের হাত ধরে এগিয়ে যাওয়া www.thesantalstimes.com পৌঁছে যাবে বিশ্বের কোণায় কোণায়।
৩০ জুন সাঁওতাল বিদ্রোহের দিনে ভ্রুণের জন্ম হলেও ভূমিষ্ঠ হয়েছে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস দিনে। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানে সর্বাধিক সাঁওতালদের বসবাস রয়েছে। ইতিমধ্যেই অনলাইন পত্রিকাটি নেপাল, ভারত, নরওয়ে, ডেনমার্ক, আমেরিকা, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানী, অষ্ট্রেলিয়ার সাঁওতাল ভাষী ও গবেষকগণ ভিজিট করেছেন। ২০০১ খ্রিষ্টাব্দের আদমশুমারী অনুযায়ী বাংলাদেশে ৩০০,০৬১ সাঁওতাল রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, নওগাঁ, জয়পুরহাট, বগুড়া, গাইবান্ধা, রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, খাগড়াছড়িতে সমাধিক বসবাস করে। তবে বেসরকারি তথ্য মতে, বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে ছয় লক্ষ আদিবাসী সাঁওতাল বসবাস করে। উইকিপিডিয়া অনুযায়ী, ভারতের ঝাড়খন্ডে ২,৭৫২,৭২৩ জন, পশ্চিমবঙ্গে ২,৫১২,৩৩১ জন, উড়িষ্যায় ৮৯৪,৭৬৪ জন; বিহারে ৪০৬,০৭৬ জন; আসামে ২১৩,১৩৯ জন; এবং নেপালে ৪২,৬৯৮ জন সাঁওতাল রয়েছেন। আদিবাসী সাঁওতাল প্রাজ্ঞ ব্যক্তিরা সচেতনভাবে দাবি করে আসছেন যে, গোটা বিশ্বে ১ কোটির অধিক সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর রয়েছে হাজার বছরের ঐশ্বর্যমণ্ডিত সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, প্রথা যা প্রজন্মের পর প্রজন্মরা ধারণ করে আসছেন। সময়ের প্রবাহে এগুলোকে সংরক্ষণ ও চর্চায় আরো আগ্রহী করে তুলতে বহুমুখী কর্মসূচির কথাগুলো বছরপূর্তির আলোচনাতে স্থান পেয়েছে। সত্যিই এরূপ সময়োপযোগী উদ্যোগ ও এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়কে স্বাগত জানাই।
বিগত এক বছরের ফিরে দেখার আলোচনা-সমালোচনায় কয়েকটি দিক উত্থিত হয়েছে —
প্রথমত—সাঁওতাল লেখকদের কাছ থেকে আশানুরূপ লেখার সাড়া পাওয়া যায়নি। হয়ত ভাবনাটি ছিল—thesantalstimes বেশিদিন সারভাইব করবে না! চমকতা হচ্ছে — বৈশ্বিক মহামারিকে উপেক্ষা করেও ভারত, নেপাল এবং বাংলাদেশের প্রথিতযশা লেখকদের লেখায় দৈনিকটি সমৃদ্ধ হয়েছে। তবে হ্যাঁ, সর্বদিক বিবেচনায় দৈনিকটির অগ্রযাত্রা ছিলো ধীরগতিতে। তারপরেও নিঃসন্দেহে বলা যায়, কষ্টিপাথরের যাচাইয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে আদিবাসী সাঁওতালদের অন্যতম দৈনিকটি।
দ্বিতীয়ত — যেখানে বাংলা ভাষায় আদিবাসী সাঁওতালদের লেখালেখি হাতে গোণা, এই জায়গায় সাঁওতালী বর্ণমালায় সাহিত্য চর্চা সত্যিই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। লেখার অনেক কম্পোনেট থাকলেও thesantalstimes উপহার দিতে পারেনি। তবে আমরা আশ্বস্ত হয়েছি, আগামী দিনগুলোতে সাঁওতালদের অনেক লোকায়িত তথ্যাদি, জ্ঞান ও ঐতিহ্যের সমাহার ঘটানো হবে; আদিবাসীরা নিজেদেরকে তুলে ধরতে সমর্থ হবে। আর এভাবেই শুধু আদিবাসী নয়, আদিবাসীদের কাছ থেকে বৃহত্তর জাতিগোষ্ঠীও জ্ঞানে ও তথ্যে সমৃদ্ধ হবে।
তৃতীয়ত — thesantalstimes পাঠক সংখ্যা বৃদ্ধিতে অনেক পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে এটিও ঠিক যে, ভারতের রাজ্যসমূহ বা অঞ্চলে বিভিন্ন বর্ণমালার ব্যবহার প্রচলিত রয়েছে। রোমান বর্ণমালা গুণগ্রাহীরা যে জায়গাগুলোতে অবস্থান করছেন, সে অঞ্চলগুলোতে পৌঁছানোর জন্য উপস্থিত ও স্থানীয়দের সহযোগিতা কামনা করা হবে। ভাষা রক্ষার মধ্যে দিয়েই একটি জাতি, একটি সংস্কৃতি এবং একটি ইতিহাস রক্ষা পাবে। বিষয়ভিত্তিক ও গবেষণামূলক লেখাগুলো প্রকাশিত হতে থাকলেই, প্রয়োজনের তাগিদেই পাঠকরা খুঁজে নিবে, খুঁজে পাবে thesantalstimes কে।
চতুর্থত — নিউজ এলার্ট চালুকরণ। আমাদের জাতীয় দৈনিকগুলোতে এই পদ্ধতি রয়েছে, কোনো নতুন সংবাদ সংযোজিত হলেই যে সমস্ত পাঠকগণ সাস্ক্রাইব করে রেখেছেন, অটোমেটিকভাবেই তাদের কাছে সংবাদ নোটিশ চলে যায়। এটি যেমন সাধারণ পাঠকদের প্রত্যাশা, উপস্থিত আলোচকদেরও পরামর্শ ছিলো।
পঞ্চমত — সলিডারিটি ফান্ড তৈরি। এই ফান্ড তৈরিতে যে যার অবস্থান থেকে সহযোগিতার হাত বাড়ানো একান্ত আবশ্যিক। একটি নবজন্মিত দৈনিককে এগিয়ে নেওয়ার জন্য অর্থের যেমন প্রয়োজন, প্রয়োজন সচেতনতা, সামগ্রিক শক্তি ও সাহসও। আমার বাংলাদেশের সাঁওতালদের নেতৃত্বেই thesantalstimesউপস্থিত হোক সংবাদপত্রের বিশ্ব মঞ্চে।
thesantalstimes -এর অন্যতম নীতিমালা হচ্ছে শুধুমাত্র সাঁওতালসহ আদিবাসীদের সংবাদ সরবরাহ করা। দেশ ও জাতির উন্নয়নে আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিষয়াদিতে আলোচনা অবশ্যই গঠনমূলক হওয়া; কাউকে সমালোচনা কিংবা কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টির কোনো বিষয়াদি প্রকাশ থেকে বিরত থাকে। এটি সাঁওতাল জাতির ভাবনার বহিপ্রকাশের আঁকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হবে। আগামীতে সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চাকে আরো অবারিত করে সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছানোর যে প্রচেষ্টা, স্বপ্ন; নিকট ভবিষ্যতেই তা ধরা দেবে নিশ্চয়ই।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট মতে, আমার বাংলাদেশে ৪১টি ভাষা বেঁচে রয়েছে, এরমধ্যে ৩৯টি ভাষা রয়েছে আদিবাসীদের মাতৃভাষা। আমরা অবলোকন করেছি, ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দের ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ উদযাপন উপলক্ষে তৎকালীন জেলা প্রশাসক, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এ জেড এম নুরুল হক পাশাপাশি ৫টি ভাষায় (বাংলা, ইংরেজি, সাদরী, সাঁওতাল, কোল) আমন্ত্রণ পত্র প্রিণ্ট করে গণ্যমান্যদের পৌঁছিয়েছেন। মাতৃভাষা সংরক্ষণে তার উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা সে সময়ে ব্যাপক আলোচিত হয়েছিলো। ২০২১ খ্রিষ্টাব্দে জুন মাসে দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার মহেশপুর গ্রামে টিএনও মিসেস ছন্দা পাল, উপজেলা প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেনসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থেকে ‘সিদু-কানু-চাঁদ-ভাইরো স্মৃতিসৌধ’ উদ্বোধন করেছেন। স্মৃতিসৌধের গায়ে সাঁওতালী রোমান বর্ণমালাসহ বাংলায় লেখাগুলো শব্দগুলো আমাদের প্রজন্মকে উজ্জীবিত করেছে। এছাড়াও দিনাজপুর, পাবর্তীপুরের সুকানপুকুরে সরকারি স্কুলের মাঠে নির্মিত স্মৃতিসৌধেও সাঁওতালী রোমান বর্ণমালায় লেখাগুলো জ্বলজ্বল করছে। বাংলাদেশের আদিবাসী সাঁওতালদের ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে প্রথমে প্রয়োজন আদিবাসীদের উদ্দীপনা, উৎসাহ এবং আয়োজন করার আবেগী আকাঙ্ক্ষা। প্রত্যেকটি জাতিগোষ্ঠীরই রয়েছে হাজার বছরের সমৃদ্ধ মাতৃভাষা, প্রথা, ঐতিহ্য; এটিকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে জীবনচক্র। রয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস, বিশ্বাসকে ধাবিত করেছে লালিত ঐতিহ্য ও প্রথাকে সংরক্ষণ করতে। আদিবাসীদেরকে বুঝতে প্রয়োজন গভীর উপলব্ধি, ভালোবাসা এবং মমত্ববোধ। বিলুপ্তের দ্বারপ্রান্তে অবস্থিত আদিবাসী ভাষা ও সংস্কৃতিকে যত্নের সাথে বেড়ে ওঠার সুযোগ না দিলে হয়ত নীরবে-নিভৃতেই পৃথিবী থেকে বিদায় জানাতে বাধ্য হবে।
thesantalstimes বেঁচে থাকুক সাঁওতালদের মননে, চিন্তা ও চেতনায়। শুধু সাঁওতাল নয়, দেশকে সমৃদ্ধ করতে অগ্রণী ভূমিকা পালনেও পিছপা হবে না thesantalstimes। সাঁওতালদের কণ্ঠস্বর thesantalstimesএর দীর্ঘায়ু কামনা করি।
মিথুশিলাক মুরমু : আদিবাসী বিষয়ক গবেষক ও লেখক।





Users Today : 15
Views Today : 17
Total views : 184110
