বাংলাদেশের ছোট একটি শহর নিকুঞ্জপুর। সেখানেই অনুপমা থাকে। তার মা এবং বড়ো এক ভাই-এ নিয়েই সংসার। জন্মের পর মাত্র তিন বছর বয়সে অনুপমার বাবা মারা গেছেন। তখন অনুপমার বড়োভাই অখিলেশের বয়স ছিল ছয় বছর। অনুপমার বাবা রমেশ দাস প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। দুই ছেলে-মেয়ে নিয়ে তার ছিল সুখের সংসার। অল্প আয় হলেও অনুপমার মা সুলোচনা ছিলেন একজন আদর্শ গৃহিণী। তাই এই অল্প আয় দিয়েও তিনি সংসারটা ধরে রেখেছিলেন। এলাকার মধ্যে সুরঞ্জন পালের ছিল ৩ টা বাড়ি। তারমধ্যে একটি বাড়িতে রমেশ দাস তার পরিবার নিয়ে বাস করতেন। তবে বাড়ি বললে ভুল বলা হবে কারণ একই বাড়িতে আরো চার পরিবার বাস করে। রমেশ একটি ঘর ভাড়া করে থাকতেন। তাদের পৈতৃক বাড়ি ছিল অঞ্জনা গ্রামে। রমেশ ছেলে-মেয়েকে ভালো স্কুলে ভর্তি করানোর জন্যই চাকরি নিয়ে শহরে চলে আসেন। রমেশ একদিন সকালে স্কুলে যান, তারপর শরীরটা খারাপ হলে হাসপাতালে ভর্তি করে কিন্তু শেষ রক্ষা আর হয়নি। রমেশ আর ফিরে আসেন না।
রমেশের মৃত্যুর পর ছোট ছেলে-মেয়ে নিয়ে সুলোচনা বেশ বিপদের মধ্যে পড়ে যান। পাড়া-প্রতিবেশীরা সবাই বলে, তুমি এদের নিয়ে গ্রামে ফিরে যাও। এত খরচ শুধুমাত্র পেনশনের টাকা দিয়ে তুমি চালাতে পারবে না। সুলোচনা তার স্বামীর শেষ ইচ্ছের কথা ভেবে ছেলে-মেয়েকে নিয়ে নিকুঞ্জপুরেই থেকে যান। পাশের বাড়ির টুনির মায়ের চেষ্টায় সুলোচনা সুরঞ্জন পালের বাড়িতে রান্নার কাজ পেয়ে যান। এভাবেই লোকের বাড়িতে রান্না, কাপড় সেলাই এসব করেই সুলোচনা অনুপমা এবং নিখিলেশকে বড়ো করে তুলতে থাকলেন। নিখিলেশ লেখাপড়ায় বেশ ভালো। ইন্টারমিডিয়েট পাস করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। নিখিলেশ টিউশনি করেই তার নিজের খরচ চালিয়ে নিতে পারে। সুলোচনার সব চিন্তা এখন অনুপমাকে নিয়ে। মেয়ে ভালো রেজাল্ট করলে তাকে ভালো জায়গায় ভর্তি করাতে হবে। তারপর তার ভালো একটা বিয়ে দিতে হবে। নিখিলেশের বন্ধু বিশেষ কেউ ছিল না। গরীবের ছেলে। এত সময় ছিল না যে বন্ধু নিয়ে মেতে থাকবে। তবুও রাকেশের সাথে নিখিলেশের ভালো বন্ধুত্ব ছিল। রাকেশ অবশ্য নিখিলেশের মতো এত ভালো ছাত্র ছিল না। মাঝে মাঝে নোট নিতে নিখিলেশের কাছে আসত। রাকেশের পারিবারিক অবস্থা বেশ ভালো। রাকেশের বড়ো দাদা রতিকান্ত তার সাত ভাই এবং পাঁচ বোনের মস্ত সংসার একাই চালিয়ে নিচ্ছেন। এমনকি রতিকান্তের নিজের আছে ছয় ছেলে-মেয়ে। ব্যবসা করে সংসার চালিয়ে এতজনকে মানুষ করা সত্যিই তার জন্য কঠিন। তবুও প্রতিনিয়ত তিনি কাজ করে চলেছেন। চার ভাইয়ের মধ্যে বিয়ে করে পৃথক হয়ে গেছে। রতিকান্তর বড়ো আশা রাকেশকে নিয়ে। তার বিশ্বাস যে রাকেশ অন্য ভাইদের মতো তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। এজন্য রাকেশের পড়াশোনা এমনকি অন্য সুযোগ সুবিধার কোনো কমতি রাখেননি। রতিকান্ত নিজে পড়াশোনা জানতেন না। তাই ভাই কলেজে পড়ছে বলে সংসারের যেকোনো সিদ্ধান্ত এমনকি তার ছেলে মেয়েদের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হলেও রাকেশের ওপর নির্ভর করতেন। তার ধারণা ছিল শিক্ষিত ভাই তার নিজের ছেলে মেয়েদেরকেও শিক্ষিত করে তুলবে। কিন্তু এর ফলাফল ছিল উল্টো। অল্প বয়সে পরিবারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হয়ে উঠেছিল রাকেশ। দাদার ব্যবসার সকল হিসাব যেহেতু রাকেশ দেখত একারণে অল্প অল্প করে ব্যবসা থেকে টাকা সরাতে শুরু করেছিল, কারণ তার নিজের ব্যবসা করা এবং অল্প সময়ে ধনী হওয়ার একটা স্বপ্ন ছিল। রতিকান্ত সরল মনের মানুষ। তাই রাকেশের চালাকি ধরার ক্ষমতা তার ছিল না। রতিকান্তের বড়ো মেয়ে মালবিকা খুব বুদ্ধিমতী ছিল। অনেকবার সে তার বাবাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে। রতিকান্ত বরং মেয়েকে বকাবকি করেছেন।
এদিকে রাকেশ নিয়মিত নিখিলেশদের বাড়িতে যাতায়াত করত। অনুপমার সাথে রাকেশের কথা খুব কমই হতো। দাদার বন্ধু বলে রাকেশ এলে অনুপমা তার পাশের বাড়ির বন্ধু নীলাঞ্জনার কাছে চলে যেত। অনুপমাদের একটি মাত্র ঘর। নিখিলেশ যখন রাজশাহী বিশবিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে চলে গেল তারপর থেকে রাকেশের অনুপমাদের বাড়িতে আসা বন্ধ হয়ে গেল। অনুপমার খুব খারাপ লাগত। অনুপমা তখন কলেজে পড়ছে। হঠাৎ একদিন কলেজ থেকে বাসায় ফিরছে তখন রাস্তায় রাকেশের সাথে তার দেখা হয়ে গেল। রাকেশ অনুপমাকে ডেকে নিয়ে বলল, তুমি আমার সম্পর্কে কী ভাবো আমি জানি না, তবে আমি তোমাকে ভালোবাসি আর তোমাকেই বিয়ে করতে চাই। অনুপমা লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছিল। আর কোনো কথা না বলে তার বান্ধবী নীলাঞ্জনাকে সাথে নিয়ে বাড়ি ফিরে এলো। এই ঘটনার কয়েকদিন বাদেই ছুটিতে নিখিলেশ বাড়িতে এলো। রাকেশও এলো তার বন্ধুর সাথে দেখা করতে। রাকেশকে দেখে নিখিলেশ বলল, ‘রাকেশ তুই প্রতিদিন এসে অনুপমাকে ইংরেজিটা পড়িয়ে যাবি। আমি না থাকার জন্য বেচারা খুব সমস্যায় পড়েছে। ভালো মাস্টারও তো আমরা দিতে পারি না।’ রাকেশ এক কথায় রাজি হয়ে গেল। অনুপমাও মনে মনে খুশি হলো। নিখিলেশ চলে যাওয়ার পর থেকে রাকেশ প্রতিদিন বিকেলে চলে আসত অনুপমাদের বাড়িতে। পড়ার টেবিলে বসে ইংরেজি সাহিত্যের চর্চা কতটুকু হতো তা বলা কঠিন কারণ ইতিমধ্যেই পাঠক রাকেশের মেধা কতটুকু তা জেনে গেছেন। তাই শিক্ষক হিসেবে সে কতটা সফল হতে পারে তার ব্যাখ্যা দেওয়া অনাবশ্যক বলেই মনে করি। তবে মন দেওয়া নেওয়ার কাজটি বেশ ভালোভাবেই চলছিল।
এসময় হঠাৎ একদিন খবর এলো, গ্রামে অনুপমার এক পিসি খুব অসুস্থ। অনুপমার মা একাই চলে গেলেন কারণ সামনে অনুপমার পরীক্ষা ছিল। রাকেশ সেদিনও বিকেলে এসেছে অনুপমাকে পড়াতে। বেশ বৃষ্টি হচ্ছে। রাকেশ খুব ভিজে এসেছে। অনুপমা তার দাদা নিখিলেশের জামা দিল রাকেশকে পরার জন্য। সেদিনই রাকেশ আর অনুপমা দুজনেই কাছাকাছি চলে আসে। রাকেশ বলেছিল, আমি কয়েকদিনের মধ্যেই দাদার সাথে কথা বলে তোমাকে বিয়ে করে নিব। তুমি একদমই চিন্তা করো না। কিন্তু বাস্তবে এটা আর ঘটলো না। এর কিছুদিন পরই অনুপমা বুঝতে পারলো যে, সে গর্ভবতী। ইতোমধ্যে কোনো এক অজানা কারণে রাকেশ আর অনুপমাদের বাড়িতে আসত না। অনুপমা সব কথা তার মাকে খুলে বলল। সুলোচনার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। স্বামীকে হারিয়েও তাকে এতো কষ্ট পেতে হয়নি। সুলোচনা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারলেন না কী করবেন। সেদিনই নিখিলেশকে চিঠি লিখলেন বাড়ি আসার জন্য। দুইদিন পর নিখিলেশ বাড়ি এলো, সব কথা শুনে সে তার মাকে চিন্তা করতে বারণ করে দিল। তার ধারণা ছিল, রাকেশ তার বন্ধু তাই অনুপমার ক্ষতি সে চাইবে না। নিখিলেশ তার বাড়িতে আসার জন্য রাকেশকে ডেকে পাঠালো। রাকেশ এলো না। এরপর নিখিলেশ নিজে গেল রাকেশের বাড়িতে। রাকেশের ঘরে বসে তাকে অনুপমার কথা খুলে বলল। রাকেশ যেন তাড়াতাড়ি অনুপমাকে বিয়ে করে সেটার জন্য অনুরোধ করল। রাকেশ সবকিছুই অস্বীকার করল। বলল তোমার বোন খুব খারাপ মেয়ে, হয়ত অন্য কারো সাথে সম্পর্ক আছে। আমাদের টাকা দেখে তোমরা আমার সাথে বিয়ে দেওয়ার জন্য এসব মিথ্যা রটনা করছো। আর আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। সামনের মাসেই আমার বিয়ে। নিখিলেশ বাড়ি ফিরে এলো, মাকে সব জানালো। নিখিলেশ ঠিক করেছিল, সব কথা গিয়ে রাকেশের দাদাকে বলে দিবে। কিন্তু সুলোচনা তার ছেলেকে বারণ করল। প্রতিবেশীরা কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই রাতের অন্ধকারে সুলোচনা তার পরিবার নিয়ে গ্রামের বাড়ি চলে গেলেন। সেখানে গিয়েই ডাক্তার দেখিয়ে অনুপমার গর্ভপাত করার ব্যবস্থা করা হলো।
এরপর অনুপমার জন্য ছেলে দেখা শুরু করে দিলেন। এতো বড়ো ঘটনার পর কোনো ভালো ছেলে তো আর অনুপমাকে বিয়ে করতে রাজি হবে না। রক্তিম মজুমদার ছিল অনুপমার চাইতে বয়সে ১৫ বছরের বড়ো। আগে একটা বিয়েও করেছে পাঁচ বছরের এক মেয়ে রেখে তার বৌ মারা গেছে। পরে অনুপমার মা তার সাথেই অনুপমার বিয়ে দিয়ে দিল। বয়সে বড়ো হলেও রক্তিম খুব ভালো মনের মানুষ ছিল এবং অবস্থাপন্ন ছিল। তাই অনুপমা ভালোভাবেই সংসার করা শুরু করে দিল। এরমধ্যে রাকেশ বেছে বেছে এক ধনী ঘরের মেয়েকে বিয়ে করেছে। বিয়েতে নগদ বেশ কিছু টাকাও পেয়েছে। যদিও রাকেশের পরিবারের কারো এই বিয়েতে মত ছিল না। কারণ বৌ দেখতে মোটেও সুশ্রী ছিল না। তবে রাকেশের নজর তো টাকার দিকে। বিয়ের পর থেকেই রাকেশ তার পৃথক ব্যবসার কথা চিন্তা করা শুরু করল। তার দাদাকে না জানিয়ে একটা বড়ো দোকানও কিনে নিল। আস্তে আস্তে রতিকান্ত তার ছোট ভাইকে জানতে শুরু করল। রাকেশ যে বাড়িতে থাকে সেটা ছিল রতিকান্তের বাড়ি। রাকেশের বাবার মাটির ঘর ছিল। তবে রাকেশের ইচ্ছা ছিল রতিকান্তের সব সম্পত্তি নিজের নামে করে নিবে। একদিন একটা দলিল রেডি করে নিয়ে এলো রতিকান্তের টিপসই নিবে বলে। রতিকান্তের বড়ো মেয়ে দলিল পড়ে তার বাবাকে টিপসই দিতে বারণ করল। সব জেনে রতিকান্ত আর ঠিক থাকতে পারলেন না। সেদিনই রাকেশকে বাড়ি থেকে বের করে দিলেন। রাকেশ তার বৌকে সাথে নিয়ে মাটির ঘরে উঠল। ভেবেছিল নতুন বাড়ি করবে। রাকেশের ছিল জুয়ার নেশা। তাই আস্তে আস্তে সব টাকা এমনকি স্ত্রীর গহনাও বন্ধক রাখল। ধার শোধ করার জন্য দোকান পর্যন্ত বিক্রি করে দিল। রাকেশের বৌ নলিনী ছিল বেজায় মুখরা। প্রতিনিয়ত প্রতিবেশীদের সাথে তার বিবাদ লেগেই থাকত। নিঃস্ব হয়ে রাকেশ সংসার চালানোর জন্য অন্যের দোকানে কর্মচারীর কাজ নিল।
এদিকে অল্প আয় তার চার ছেলেমেয়ে আর ঘরে মুখরা বউ। এভাবেই প্রতিনিয়ত অশান্তিতে জীবন কাটাতে শুরু করল রাকেশ। রাকেশের বড়ো মেয়েটার বিয়ের বয়স হয়েছে কিন্তু রাকেশের কাছে টাকা নাই যে মেয়ের বিয়ে দিবে। অবশেষে নলিনীর গালিগালাজে থাকতে না পেরে সকল আত্মীয়ের কাছে সাহায্য নেওয়ার জন্য রাকেশ বের হলো। একদিন রূপপুর গেল। সেখানে রাকেশের এক পিসতুতো ভাই থাকে। তাদের বাড়িতে যাওয়ার পর সবাই বলল, এখানে রক্তিম মজুমদার নামে একজন বড়ো ব্যবসায়ী থাকে, খুব ভালো মানুষ। তার স্ত্রী অনুপমা সব মানুষের বিপদে সাহায্য করে। আপনি তার কাছে গিয়ে বলতে পারেন। তারা আপনাকে ফেরাবেন না। রাকেশ তখনও জানে না যে, এই সেই অনুপমা। তারপর মামাতো ভাইয়ের সাথে গেল রক্তিম মজুমদারের বাড়ি। অনেক বড়ো বাড়ি। অনুপমা বেরিয়ে এলো। রাকেশকে দেখে সে চিনতেই পারছিল না কিন্তু গলা শুনে চিনতে পারল। রাকেশ কিন্তু তখনও অনুপমাকে চিনতে পারেনি। হাত জোড় করে অনুপমার সামনে তার দুঃখের কথা বলল। অনুপমা সব শুনে বলল এভাবেই হাত জোড় করে কেউ কি একদিন আপনার কাছে ভিক্ষা চেয়েছিল? আপনি তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, তবে আমি আপনাকে ফিরিয়ে দিবো না, অনেক দান করবো। রাকেশ ভালো করে দেখলো, বুঝতে পারলো এই সেই অনুপমা। অনুপমা তার ঘরে গিয়ে আলমারি থেকে বিশ হাজার টাকা আর গহনা বের করল। বাইরে এসে দেখে রাকেশ আর নেই, চলে গেছে। অনুপমা তার পথের দিকে একবার তাকালো। তারপর ঘরে এসে তার স্বামীকে প্রণাম করল। রক্তিম অবশ্য এই প্রণামের কারণ জিজ্ঞাসা করেনি। অনুপমাকে প্রাণভরে আশীর্বাদ করল ।





Users Today : 5
Views Today : 5
Total views : 186480
