মাওলানা জাহিদ হোসেন
পবিত্র শবে বরাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিশেষ মহিমান্বিত রাত্রি। শবে বরাতকে আরবিতে ‘লাইলাতুল বারাআত’ নামে অভিহিত করা হয়। ‘শব’ ফারসি শব্দ। এর অর্থ রজনী বা রাত, আরবিতে একে ‘লাইলাতুন’ বলা হয়। আর ‘বারাআত’ শব্দের অর্থ মুক্তি, নাজাত, নিষ্কৃতি ইত্যাদি। ‘লাইলাতুল বারাআত’ মানে মুক্তির রাত বা নিষ্কৃতির রাত। এ রাতে আল্লাহর প্রকৃত বান্দারা স্রষ্টার কাছ থেকে ক্ষমা পেয়ে থাকেন। এজন্য এ রাতকে ‘লাইলাতুল বারাআত’ বা শবে বরাত বলা হয়।
ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের কাছে শাবান মাসের ১৪ তারিখের দিবাগত রাত খুবই বরকতময় ও মহিমান্বিত হিসেবে বিবেচিত। মহান আল্লাহ মানবজাতির জন্য তাঁর অসীম রহমতের দরজা এ রাতে খুলে দেন। পরম করুণাময়ের দরবারে নিজের সারা জীবনের দোষ-ত্রুটি, পাপকাজ ও অন্যায়ের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনার রাত। এ রাতে সর্বশক্তিমান আল্লাহ পরবর্তী বছরের জন্য বান্দার রিজিক নির্ধারণ করে সবার ভাগ্যলিপি লেখেন এবং বান্দার সব গুনাহ মাফ করে দেন। এ রাতের গুরুত্ব সম্পর্কে হাদিস শরিফে বলা হয়েছে, পরবর্তী বছরের যাবতীয় ফয়সালা হায়াত, মউত, রিজিক, দৌলত, আমল ইত্যাদির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত আদেশ-নিষেধসমূহ ওই রাতে লওহে মাহফুজ থেকে উদ্ধৃত করে কার্যনির্বাহক ফেরেশতাদের কাছে সোপর্দ করা হয়।
লাইলাতুল বরাতে ঈমানদার বান্দাদের প্রতি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ বর্ষিত হয়। মানুষের ভালো-মন্দ কর্মের আমলগুলো আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়।
শবে বরাতে মহান আল্লাহ ক্ষমাপ্রার্থনাকারীদের ক্ষমা করেন এবং বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিদের উত্তরণের পথ দেখান। তাই মুসলমানদের কাছে শবে বরাত বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘যখন মধ্য শাবানের রাত্রি উপস্থিত হয়, তখন সেই রাত্রি জাগরণ করে তোমরা সালাতে নিমগ্ন হবে এবং পরদিন রোজা রাখবে। কারণ আল্লাহ তাআলা এ রাতে সূর্যাস্তের পর পৃথিবীর আসমানে অবতরণ করেন এবং তাঁর বান্দাদের ডেকে ঘোষণা দিতে থাকেন—আছে কোনো ক্ষমাপ্রার্থী? যাকে আমি ক্ষমা করব, আছে কোনো রিজিকপ্রার্থী? যাকে আমি রিজিক দেব? আছে কোনো বিপদাপন্ন? যার বিপদ আমি দূর করে দেব? আছে কোনো তওবাকারী? যার তওবা আমি কবুল করব। এভাবে নানা শ্রেণীর বান্দাকে সুবহে সাদেক পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা আহ্বান করতে থাকেন।’ (ইবনে মাজা, মিশকাত)
নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘শাবানের ১৪ তারিখের রাতে আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষী ব্যক্তি ব্যতীত সবাইকে ক্ষমা করে দেন।’ (বায়হাকি)।
পাপীরা যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের নিজ নিজ পাপকাজ পরিত্যাগ করে তওবা না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত শবে বরাতেও তাদের জন্য ক্ষমার দ্বার উন্মুক্ত হবে না। অতীত অন্যায়ের জন্য অনুতাপ এবং ভবিষ্যতে তা না করার সংকল্প গ্রহণ করে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করলে তিনি অবশ্য আমাদের সকলকে মাফ করতে পারেন। তাই মুক্তির রাত হিসেবে লাইলাতুল বরাতের আগমন আমাদের সকলের জন্য নিয়ামতের ভান্ডার।
এ রাতে ইবাদত-বন্দেগির মধ্যে নিমগ্ন থাকা প্রতিটি ধর্মপ্রাণ মুসলমানের প্রধান কাজ। এ রাতে তওবা-ইস্তেগফার করা, আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন মেটানোর জন্য আকুতি জানানো এবং জীবিত ও মৃতদের পাপরাশি ক্ষমা লাভের জন্য প্রার্থনার উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। এ রাতে নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, কবর জিয়ারত ও পরদিন নফল রোজা রাখার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে সক্ষম হয় এবং ব্যক্তিজীবনে এর বাস্তব প্রতিফলন ঘটে। নবী করিম (সা.) নিজেও এ রাতে কবর জিয়ারত করতেন এবং ইবাদতে নিমগ্ন হতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি শাবান মাসের ১৫ তারিখে রোজা রাখবে, দোজখের আগুন তাকে স্পর্শ করবে না।’ (আবু দাউদ)
শবে বরাতে করণীয় আমলের সঙ্গে কতগুলো বর্জনীয় বিষয়ও সম্পৃক্ত আছে। এ রাতে অপব্যয় না করে এবং শরিয়তগর্হিত আলোকসজ্জা করা, তারাবাতি জ্বালানো, আতশবাজি পোড়ানো, পটকা ফোটানো থেকে বিরত থেকে মানবতার কল্যাণকর কাজে বা দরিদ্র-মিসকিনের মধ্যে দান-সাদকা করা অনেক সওয়াব ও বরকতের কাজ। শবে বরাতের বৈশিষ্ট্য অনুষ্ঠানের আড়ম্বরতার মধ্যে নয়, বরং চরিত্রবলের সাধনার মাধ্যমে দয়াময়ের করুণা লাভের আন্তরিক প্রয়াসই এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য।
শবে বরাতের নফল নামাজ ও ইবাদত
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যখন শাবানের মধ্য দিবস আসবে, তখন তোমরা রাতে নফল ইবাদত করবে ও দিনে রোজা পালন করবে। (ইবনে মাজাহ)। ইবাদতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো নামাজ। সুতরাং নফল ইবাদতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো নফল নামাজ। প্রতিটি নফল ইবাদতের জন্য তাজা অজু বা নতুন অজু করা মোস্তাহাব। রাতের নিয়মিত নফল ইবাদতের মধ্যে রয়েছে; বাদ মাগরিব ছয় থেকে বিশ রাকাত আউওয়াবিন নামাজ। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত: যে ব্যক্তি মাগরিবের নামাজের পর ছয় রাকাত নামাজ আদায় করবে; এসবের মাঝে কোনো মন্দ কথা না বলে, তার এই নামাজ ১২ বছরের ইবাদতের সমতুল্য গণ্য হবে। হজরত আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত: যে ব্যক্তি মাগরিবের পর বিশ রাকাত নামাজ আদায় করবে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য জান্নাতে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করবেন। (তিরমিজি, মিশকাত, ফয়জুল কালাম, হাদিস: ৪৪৯-৪৫০)। রাতের শ্রেষ্ঠতম ইবাদত হলো তাহাজ্জুদ নামাজ। (আল কোরআনুল করিম, পারা: ১৫, সুরা-১৭ ইসরা-বনি ইসরাইল, আয়াত: ৭৯)। এ ছাড়া সালাতুস তাসবিহ এবং অন্যান্য নফল নামাজ আদায় করা যায়। রজব শাবান মাসের রাতের নফল নামাজ তারাবিহ নামাজ বা কিয়ামুল লাইলের প্রস্তুতি।
তাৎপর্য
এই রাত্রি সম্পর্কে হযরত মোহাম্মদ (সা:) বলেন, এই রাত্রিতে এবাদত-কারিদের গুনাহরাশি আল্লাহ তা’আলা ক্ষমা করে দেন। তবে কেবল আল্লাহর সাথে শিরককারী, সুদখোর,গণক, যাদুকর, কৃপণ, শরাবী, যিনাকারী এবং পিতা-মাতাকে কষ্টদানকারীকে আল্লাহ মাফ করবেন না।
অন্য এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে হুজুর (সা.) বলেছেন, “জিব্রাইল (আ:) আমাকে বলেছেন, আপনি আপনার উম্মতদের জানাইয়া দেন যে, তারা যেন শবে বরাতের রাতকে জীবিত রাখে।” অর্থাৎ, সারারাত তারা যেন ইবাদতের মাঝে কাটিয়ে দেয়।
আরেকটি হাদীসে রাসূল (সা:) বলেছেন, এই রাত্রে আসমান থেকে ৭০ লক্ষ ফেরেশতা যমীনে এসে ঘুরে-ফিরে এবাদতকারীদের পরিদর্শন করেন এবং তাদের এবাতদ সমূহ দেখতে থাকেন।
মধ্য শাবানের নফল রোজা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যখন শাবানের মধ্য দিবস আসে, তখন তোমরা রাতে নফল ইবাদত কর ও দিনে রোজা পালন কর। (সুনানে ইবনে মাজাহ)। এ ছাড়া প্রতি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ আইয়ামে বিজের নফল রোজা তো রয়েছেই, যা আদি পিতা হজরত আদম (আ.) পালন করেছিলেন এবং আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদও (সা.) পালন করতেন, যা মূলত সুন্নত। সুতরাং তিনটি রোজা রাখলেও শবে বরাতের রোজার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। তা ছাড়া, মাসের প্রথম তারিখ, মধ্য তারিখ ও শেষ তারিখ নফল রোজা গুরুত্বপূর্ণ; শবে কদরের রোজা এর আওতায়ও পড়ে। সওমে দাউদি বা হজরত দাউদ (আ.)-এর পদ্ধতিতে এক দিন পর এক দিন রোজা পালন করলেও সর্বোপরি প্রতিটি বিজোড় তারিখ রোজা হয়; এবং শবে কদরের রোজার শামিল হয়ে যায়। সর্বোপরি রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজান মাসের পর রজব ও শাবান মাসে বেশি নফল ইবাদত তথা নফল নামাজ ও নফল রোজা পালন করতেন; শাবান মাসে কখনো ১০টি নফল রোজা, কখনো ২০টি নফল রোজা, কখনো আরও বেশি রাখতেন। রজব ও শাবান মাসের নফল রোজা রমজান মাসের রোজার প্রস্তুতি।
একটি রোজার মাসআলা
হাদিস শরিফে আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনা শরিফে হিজরতের পরে দেখতে পেলেন মদিনার ইহুদিরাও আশুরার একটি রোজা পালন করেন। তখন তিনি সাহাবিদের বললেন, আগামী বছর থেকে আমরা আশুরার আগে বা পরে আরও একটি রোজা রাখব, ইনশা আল্লাহ! যাতে তাদের সঙ্গে মিল না হয়। তাই আশুরার রোজা অর্থাৎ মহররম মাসের দশম তারিখের রোজার সঙ্গে তার আগে বা পরে আরও একটি রোজা রাখা মোস্তাহাব। শবে বরাতসহ বছরের অন্য নফল রোজাগুলো একটি রাখতে বাধা নেই; বরং এক দিন পর এক দিন রোজা রাখা হজরত দাউদ (আ.)-এর সুন্নত বা তরিকা; যা নফল রোজার ক্ষেত্রে উত্তম বলে বিবেচিত এবং সওমে দাউদি নামে পরিচিত। অনুরূপভাবে শাওয়াল মাসের ছয়টি রোজাও আলাদা আলাদা বা একত্রেও রাখা যায়।
যাদের গুনাহ ক্ষমা হবে না
হাদিস শরিফে আছে, শবে বরাতে আল্লাহ তাআলা সবাইকে মাফ করবেন, তবে শিরককারী (অংশীবাদী) ও আত্মীয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নকারীকে ক্ষমা করবেন না। অন্য বর্ণনায় এসেছে, শবে বরাতে আল্লাহ তাআলা সবাইকে মাফ করবেন। তবে শিরককারী (অংশীবাদী) ও হিংসাকারীকে ক্ষমা করবেন না। অহংকার পরিত্যাগ করুন; অহংকারীকে আল্লাহ পছন্দ করেন না। (বায়হাকি, শুআবুল ইমান)।
গুনাহ মাফ পাওয়ার সহজ পথ
বান্দার হক বা সৃষ্টির পাওনা পরিশোধ করে দিন; আত্মীয়স্বজনের হক আদায় করুন; মহান প্রভু আপনাকে ক্ষমা করে দেবেন। পিতা-মাতার হক আদায় করুন; আল্লাহ আপনার প্রতি করুণা করবেন। সৃষ্টির প্রতি দয়াশীল হোন; আল্লাহ আপনার প্রতি দয়ালু হবেন। আপনি সবাইকে ক্ষমা করে দিন; নিশ্চয়ই আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করে দেবেন। খাঁটি তওবা করুন; তওবাকারীকে আল্লাহ ভালোবাসেন। বেশি বেশি ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করুন; আল্লাহ ইস্তিগফারকারীকে পছন্দ করেন। (বুখারি ও মুসলিম)।
শবে বরাতের নামায
শবে বরাতের রাতে এশার নামাযের পর থেকে সুবেহ্ সাদিক অর্থাৎ ফজর পর্যন্ত নফল নামায ও বিভিন্ন এবাদত পবিত্র কুরআন পাঠ, যিকির-আযকার, তসবিহ-তাহলীল করা যায়। এই রাতে কমপক্ষে ২ রাকাত করে ১২ রাকাত নফল নামায ও ৪ রাকাত ছালাতুত্ তাছবীহ্ নামায পড়া অতি উত্তম।
শবে বরাতের নামায দু‘রাকাত করে যত বেশি পড়া যায় তত বেশি ছওয়াব। নামাযের প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহার পর সূরা ইখলাছ, সূরা ক্বদর, আয়াতুল কুরছী বা সূরা তাকাছুর ইত্যাদি মিলিয়ে পড়া অধিক ছওয়াবের কাজ।
শবে বরাত উপলক্ষে এ দেশের মুসলি ধর্মপ্রাণ মানুষের মধ্যে এক অনন্য জাগরণ এবং অতুলনীয় ধর্মীয় অনুভূতি ও চেতনা পরিলক্ষিত হয়। এ রাতে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করাই বান্দার একমাত্র কর্তব্য। তাই সৌভাগ্য আর রিজিক বরাদ্দের, জীবন-মৃত্যুর দিনক্ষণ নির্ধারণের রজনীতে মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর কাছে সর্বপ্রকার গোঁড়ামি ও শিরক থেকে পরিত্রাণ লাভের প্রার্থনা করা উচিত।
বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে করোনাভাইরাস মহামারীতে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আত্রান্ত হচ্ছেন, প্রাণ হারাচ্ছেন। মহান আল্লাহ বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সকল মানুষকে এই মহাবিপদ থেকে রক্ষা করুন। মুসলিম জাহানের সুখ-শান্তি ও কল্যাণের জন্য তাঁর রহমতের দরজা সারা বছরই খুলে রাখেন—এই প্রার্থনা।





Users Today : 23
Views Today : 28
Total views : 177772
