দ্বিতীয় পর্ব
জীবনে ধাক্কা খায়নি এমন লোকের দেখা পাওয়া অতি বিরল। এই ঈদের সময় এলেই তমালের জীবনে ধাক্কা খাওয়ার ঘটনাটি মনে পড়ে যায়। আজ বাংলাদেশে ঈদ উদ্যাপিত হচ্ছে লন্ডনেও অনেকেই গতকাল ঈদ উদ্যাপন করেছে। ব্রিটিশরা বেশ সুশৃঙ্খল জাতি, ছুটির লিস্টে উল্লেখ না থাকলে সাধারণত এখানে কোনো ছুটি হয় না। এক বাঙালি পরিবার থেকে রাতে খাওয়ার দাওয়াত এসেছিল। আজ ক্লাস নিতে হবে বলে গতকাল রাত জেগে সে লেকচার তৈরি করেছে। অতি প্রত্যুষে উঠেই সে তার লেকচার নোটটি ঝালিয়ে নিচ্ছিলÑমনটা হঠাৎ তার খারাপ হয়ে গেল ঈদের সময় ছুটি নেবার চেষ্টা করেছিল, সম্ভব হয়নি। এখন সে তার ভাইয়ের বিয়ের জন্য খুব ব্যস্ত কিছু দিন আগেও সূচনা এসে দু-সপ্তাহের জন্য বেরিয়ে গেছে। ভাইয়ের বিয়ের শপিং সে এখান থেকেই সেরেছে। তাছাড়া পিএইচডি অধ্যায়নরত শিক্ষার্থীদের ছুটি পাওয়াটা তেমন একটা কঠিন বিষয় নয়। কেবল যার অধীনে গবেষণাটি করা হচ্ছে তাকে রাজি করাতে পারলেই যথেষ্ট। গতবার লন্ডনের বিখ্যাত পেটিকোট লেন থেকে কেনা সবগুলি শার্ট দেশে গিয়ে আবিস্কার করেছে এরমধ্যে অনেকগুলিই মেড ইন বাংলাদেশ ট্যাগ! মা একটা ব্রেড মেকার কিনতে বলেছিল টেসকো থেকে, সেটাও কিনেছে ইতিমধ্যে। এই সমস্ত বিষয়ে তমাল ওকে সাহায্য না করলে তার একার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তবুও যাওয়ার আগে তমালের গলা জড়িয়ে ধরে তৃষিত নয়নে একান্ত অনুরোধ করেছিল, যদি দুদিনের জন্যেও হয় বিয়েতে এলে আমি খুবই খুশি হব। এই অনুরোধটি তমালকে ভাবিয়ে তুলেছে বেশি, সামানেই ভধষষ উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি হয়ে যাবে। তার আগে তমালের ছুটি নেয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ঈদুল আযহার আগেই সূচনার ভাইয়ের বিয়ে সম্পূর্ণ হয়ে যাবে।
প্রথম ধাক্কা খাওয়ার পর থেকে তমাল যখনই বিষয়টি নিয়ে ভেবেছে ততবারই সে মনে মনে হেসেছে। সে নিয়তিতে বিশ^াস না করলেও নিয়তি যে তাকে কোথায় এনে ঠেকিয়েছে, এখন সে তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছে। ধাক্কা খাওয়ার পর প্রথম যেদিন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস নিতে গিয়ে সামনের বেঞ্চে বসা ডানদিকের মেয়েটি সত্যই তার নজর কেড়েছিল। ক্লাস শেষের পরে অনেকের সাথে সেও দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় ছিল কিছু বলার জন্য। তমাল ভেবেছিল, সদ্য সামাপ্ত পাঠ্য বিষয়ের ওপর সে কোনো প্রশ্ন রাখবে। সে প্রশ্ন রেখেছিল বটে, তবে তা পাঠ্য বিষয়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত নয়। সে বেশ ভঙ্গি করে বলেছিল “সেই দিন ওমন করে পালালেন কেন?” এমনতর প্রশ্নের জন্য তমাল মোটেই প্রস্তুত ছিল না। সে উল্টো বিস্ময়ে আপ্লুতনেত্রে বলেছিল, “আমি আবার পালালাম কোথায়?” মেয়েটি উত্তর দিল, “কেন সেদিন পানিতে ডুবে যাওয়া মেয়েটিকে উদ্ধার করার পর পালিয়ে যাননি?” তমাল অবাক চক্ষে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে ব্যাপারটা বুঝতে চেষ্টা করলো। মেয়েটি বলল, “সেদিন ধাক্কাটি জায়গামতো খেয়েছিলেন বলে আমার ভাইঝিটি প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল। আমাদেরকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাবার সুযোগ না দিয়ে আপনি যেভাবে পালিয়ে এলেন কাজটা কি ঠিক হলো!” তমাল স্পষ্টভাবে বুঝলো যে সে ধরা পড়ে গিয়েছে, তাই সে ব্যস্ততার ভান করে আরেকবার পালানোর চেষ্টা করলো। তমালকে পালাবার কোনো সুযোগ না দিয়ে মেয়েটি বলল, “পালেতে চেয়েছিলেন পেরেছেন কি?” তমাল চালাক ছেলে সে তড়িৎ আত্মসমর্পণের সুরে বলল, “সেদিন পালিয়েছিলাম ঠিক, কিন্তু এখন দেখছি পালাতে আর পারলাম কই!” যাওয়ার আগে মেয়েটি বেশ ভদ্রতার সুরেই বলেছিল, “স্যার সেদিন পালিয়েছিলেন, আমরা বহু খোঁজাখুঁজির পর আমরা আপনাকে আর পাইনি, এখন আবার পালিয়ে গিয়ে আমার মতো শিক্ষার্থীদের আপনার মতো শিক্ষকের কাছ থেকে শিক্ষা নেওয়া থেকে বঞ্চিত করবেন না।
তমালের মাথা ভন্ভন্ করে ঘুরছিল, টিচার্স রুমে ফিরে সে এসি ও ফ্যান দুটোই ছেড়ে দিল, শরতের দুপুরকে তার কাছে ভাদ্রমাসের দুপুর বলে মনে হলো। যে নিয়তিকে সে কোনোদিন বিশ^াস করেনি সেই ধাক্কা খাওয়ার নিয়তিকে নিয়ে সে এখন ভাবতে শুরু করলো। সে ভাবছিল যদি সে ঐ ক্লাস বদল করে অন্য ক্লাসে যায় তবে মেয়েটির কাছে তার দুর্বলতা প্রকাশ হয়ে যাবে, তাই সে কিছুই হয়নি ভেবে তার ক্লাস চালিয়ে যাবে। অবসাদ যেন তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলছিল। অবসাদগ্রস্ততা কাটাবার জন্য সে একটি গান শুনে প্রফুল্লতা আনবার চেষ্টা করছেল, হেমন্তের গান ভেসে আসছিল, “এসেছে ফাগুন মাস… এ ব্যথা যে কি যে ব্যথা বুঝেছি আনমনে, সজনি আমি বুঝি বুঝেছি মনে, মনে” । গানটির কথা সুর ও হেমন্তের ভরাট গলা তমালের কাছে একান্ত বাস্তব বলে মনে হলো। একটা অস্থিরতা তমালকে চেপে ধরলো। অফিসে গিয়ে ফাইল খুঁজে তমাল বের করলো মেয়েটির নাম সুমাইয়া আকতার সূচনা। সমস্ত কিছু তার কাছে পাগলামি বলে মনে হল, বুঝতে পারলো নিয়তি তমালকে সূচনাকে ভালো লাগার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে আর চিন্তা-ভাবনা করার চেষ্টা না নিলেও বারবার সূচনার মিষ্টি মুখের প্রশ্নটি “পালাতে পেরেছেন কি” তার মনে ঘুরপাক খেতে লাগলো। সে ভেবে দেখলো যে নিয়তি তার ওপর যেভাবে চেপে বসেছে তমাল ভাবলো সূচনাকে সে কি উত্তরটা দিয়ে আসবেÑ“পালাতে আর পারলাম কই তোমার ধাক্কার কাছে ধরাশায়ী হয়ে তোমার কাছেই ধরা পড়ে গেলাম, এটা ভাবতেই তার মনে হলো যে, এ সে কি আবোল-তাবোল ভাবছে, সে জানে প্রেমে পড়লে বোকা চালাক হয়ে যায়, আর চালাক হয়ে যায় বোকা। তাই তমাল কি সত্যি প্রেমে পড়ে গেছে, সবে তো শুরু আরো দিন তো পড়ে রয়েছে। তাই সে তরিঘরি করে সবাইকে বিদায় জানিয়ে লন্ডনে চলে এসেছিল। এর আগেও দুবার লন্ডনে এসেছে তবে এবার তার বেশ কিছুদিন থাকতে হবে। অনেক চিন্তা চরিত্র করে সে বুঝেছে ভালো লেখাপড়ার জন্য যেখানে সে গবেষণা করছে এত ভালো জায়গা আর নেই। তাই সে প্রচ- উৎসাহ দিয়ে সে তার গবেষণার কাজ শুরু করেছে।
নিয়ম অনুসারে এক বছর পর বিভাগীয় প্রধান কয়েকজন প্রফেসরকে নিয়ে প্রত্যেকটি ছাত্রকে নিয়ে প্রায় ঘণ্টা তিনেকের জন্য বসে। উদ্দেশ্য এই গবেষণারত কাজে অগ্রসর হচ্ছে না কি হচ্ছে তা মূল্যায়ন করা। তমাল বেশ কৃতিত্বের সাথে সেই পরীক্ষায় পাশ করেছে। আমেরিকার সাথে ব্রিটেনের পিএইচডি করার ক্ষেত্রে কিছু ভিন্নতা আছে। আমেরিকার একজন পিএইচডি ছাত্র তিন বছর থেকে শুরু করে সাত আট বছর লাগলেও তাকে পিএইচডি শেষ করার সুযোগ দেওয়া হয় কিন্তু ব্রিটেনে তা নয়। তিন বছর পর ছয় মাসের একটা গ্রেসপিরিয়ড দেওয়া হয়, তার মধ্যে শেষ না হলে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয়। তিন বছর সাড়ে তিন বছরের চেষ্টায় উত্তীর্ণ না হতে পারলে পুরোটাই বিফলে যায়। তাই তমাল আজ খুবই খুশি। কারণ গতকালকে তার সেই মূল্যায়ন ক্লাস শেষ হয়েছে। সব প্রফেসর তার কাজের প্রশংসা করেছেন, উৎসাহ দিয়েছেন আর ভালো ভালো বই লাইব্রেরি থেকে নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। পরিশ্রমের ফল সফল হচ্ছে দেখে তমালের মন বেশ ফুরফুরে ছিল।
মাঝে মধ্যে সূচনার কথা যে তার মনে হয়নি এমনটি নয়, প্রায় মনে করেছিল যে একবার সে ফোন করবে। কিন্তু ফোন করা থেকে সে নিজেকে বিরত রেখেছে এই ভেবে যদি তার বিয়ে হয়ে থাকে। তার মাস্টারস ডিগ্রি তো তার শেষ হয়নি। পড়াশোনার মাঝে তাকে বিরক্ত করাটা ঠিক হবে না। এই সব সাতপাঁচ যখন ভাবছিল ফোনটা বেজে উঠল, হ্যালো বলতেই ঐ প্রান্ত থেকে উত্তর এলো স্যার আপনি কেমন আছেন? পালিয়ে তো চলে এলেন আমার প্রশ্নের উত্তরটা তো এখনো দেননি। আমার প্রশ্নের উত্তর নেওয়ার জন্য পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমি এসে আপনার সাথে দেখা করছি। বলে কি! মেয়েটা আমাকে কি একটু ভাববার সময় পর্যন্ত দিবে না! কি উত্তর দিব আমি তাকে! ভাবনায় ছেদ পড়ে গেল সুকণ্ঠে সূচনার গলার আওয়াজ মে আই কাম ইন স্যার? দরজার দিকে এগুতে না এগুতেই সূচনা ঘরে প্রবেশ করল। সত্য বলতে কি মূল্যায়ন ক্লাসে কৃতকার্যতা ও ঠিক সেই দিনই সূচনার উপস্থিতি তমালকে আনন্দে আতিশয্যে ভাসিয়ে দিল। মনে মনে সে বলল ভাবটা কোনোমতে প্রকাশ করা যাবে না। একগাল হেসে বলল, পালাতে আর দিলে কোথায়, ধাওয়া করে তো এত দূরে এসেছো আমি আর কোথায় যাই। তাহলে এই ঠিকানা তুমি কীভাবে পেলে। আপনি যে কি বলেন স্যার ডিজিটাল যুগে এইটা কি তেমন কোনো একটা সমস্যা। কি জানি আর কতবার পালাবেন। আপনাকে একটা কথা জানাবার জন্য এসেছি, আসার আগে আপনার মাকে গিয়ে সালাম জানিয়ে এসেছি। উনি আমার হাতে নাড়– আর মোয়া পাঠিয়েছেন। আপনি নাকি নাড়– আর মোয়া খেতে পছন্দ করেন। তমালের মন আরও ভরে গেল এইবার সে আর তার নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারলো না। আপনার মা আপনার জন্য প্রতিদিন দোয়া চান আর প্রতি সপ্তাহে একদিন করে রোজা রাখেন। আপনার মায়ের একটা অনুযোগ আপনি তাকে ঠিকমতো চিঠিপত্র দেন না, মায়ের মন তো বেশি কিছু চায় না আমি আমার আব্বার কাছে এসেছি দু-সপ্তাহ পরে চলে যাব। আপনি চাইলে আমি আবার আপনার সাথে দেখো করতে আসতে পারি। খুশিতে তমালের মন এতটাই উদ্ভাসিত হয়েছিল যে সে শুধু এতটুকুই বলল না এইবার আর পালাবার চেষ্টা করব না। দোয়া রেখ যেন কৃতকার্যতার সাথে এইখান থেকে পিএইচডিটা শেষ করতে পারি তোমার আব্বুকে আমার সালাম দিও। সূচনা বলল, আব্বু নিচে গাড়িতে অপেক্ষা করছে আপনি চাইলে দেখা করতে পারেন। তমাল বিস্মিতভাবে বলল, সত্যি চলো নিচে দেখা করতে যাই। যে বিষয়টি দুমিনিট আগেও সে ভাবেনি সূচনার আব্বাকে দেখে সে ভক্তিযোগে সালাম দিল। উত্তর যা পাওয়ার ছিল সূচনা তা পেয়ে গেল। সে কেবল এইটুকু বলল আমার প্রথম বছরের রেজাল্ট মাত্র বেড়িয়েছে, আপনাদের দোয়ায় আমি ভালো করেছি। এখন বেশ কিছু দিন আমার ছুটি রয়েছে। আপনাদের যখন সুযোগ ও সময় হবে একটু ফোন করে আসবেন। বলে সে তার কার্ডটি এগিয়ে দিলো সূচনাকে। এইভাবেই দেশের বাইরে সূচনা ও তমালের প্রথম সাক্ষাৎ শেষ হল।
ঘরে ফিরে তমাল আবার তার নিয়তি নিয়ে ভাবতে শুরু করলো। তার শিক্ষকদের উৎসাহ সূচনার এসে দেখা করা তার মায়ের সাথে সূচনার যোগাযোগ এই সমস্ত কিছু চিন্তা করে বুঝল নিজেকে নিয়তির ওপর ছেড়ে দেয়া ছাড়া তার আর কোনো গতি নেই। তমাল সূচনাকে জানিয়েছিল সপ্তাহ দশ দিনের জন্য সে দেশে আসবে। সে আরও লিখেছিল তুমি যখন পরবর্তী সময়ে লন্ডনে আসো আমাকে জানিয়ে এসো। লন্ডনে আশে পাশে অনেক জায়গায় সুন্দর সুন্দর জায়গা আছে তোমাকে নিয়ে বেড়াবো। মন দিয়ে পড়াশোনা কর যেন সময়মতো একই সাথে তোমার মাস্টারস ডিগ্রি আর আমার পিএইচডি শেষ হয়ে যায়। আল্লাহ হাফেজ।
ড. এলগিন সাহা : কলামিস্ট ও এনজিও ব্যক্তিত্ব।





Users Today : 3
Views Today : 3
Total views : 175447
