
খ্রিষ্টিয়ান পরিবারে জন্ম হওয়ার সুবাধে শিশু বয়স থেকেই পবিত্র বাইবেলের সত্যি ঘটনা, আশ্চার্য কাজ, উপমা বা দৃষ্টান্ত শিশু হৃদয়কে প্রবলভাবে নাড়া দিতো। সানডে স্কুলের শিক্ষকগণ ছবি দেখিয়ে দেখিয়ে আমাদেরকে অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে ঘটনাগুলোকে উপস্থাপন করতেন। বিশেষ করে সদাপ্রভুর কাছ থেকে মোশি যখন ১০ আজ্ঞা গ্রহণ করে পাহাড়ের পাদদেশ থেকে নিচের দিকে নেমে আসছিলেন। পবিত্র বাইবেলে এ সম্পর্কে সবিস্তর বর্ণনা পাওয়া যায়। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, বাংলাদেশ কর্তৃক প্রণীত তৃতীয় শ্রেণীর ‘খ্রিষ্টধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা’র ষষ্ঠ অধ্যায়ে ‘ঈশ্বরের দশ আজ্ঞা’র সাথে পবিত্র বাইবেলের দশ আজ্ঞা সাদৃশ্য সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অগ্রসরমান পাঠকদের জ্ঞাতার্থে নিচে তুলে ধরা হলো—
ক. পাঠপুস্তকে বর্ণিত ১০ আজ্ঞা
১. তুমি আপন প্রভু ঈশ্বরকে পূজা করবে, কেবল তাঁরই সেবা করবে।
২. ঈশ্বরের নাম অনর্থক নিবে না।
৩. বিশ্রামবার (রবিবার) বিশ্রাম করে তা শুদ্ধভাবে পালন করবে।
৪. পিতামাতাকে সম্মান করবে।
৫. নরহত্যা করবে না।
৬. ব্যভিচার করবে না।
৭. চুরি করবে না।
৮. মিথ্যা সাক্ষ্য দেবে না।
৯. পরস্ত্রী/পরপুরুষে লোভ করবে না।
১০. পরদ্রব্যে লোভ করবে না।
খ. ২০০৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত পবিত্র বাইবেল—জুবিলী বাইবেল (বাংলাদেশ কাথলিক বিশপ সম্মিলনী) যা সাধু বেনেডিক্ট মঠের অনুবাদে বর্ণিত ১০ আজ্ঞা—
১. আমার প্রতিপক্ষ কোন দেবতা যেন তোমার না থাকে;
২. তুমি তোমার জন্য খোদাই করা কোন প্রতিমূর্তি তৈরি করবে না, উপরে সেই আকাশে, নিচে এই পৃথিবীতে ও পৃথিবীর নিচে জলরাশির মধ্যে যা কিছু রয়েছে, তার সাদৃশ্যেও কোন কিছুই তৈরি করবে না। তুমি তেমন বস্তুগুলির উদ্দেশে প্রণিপাত করবে না, সেগুলির সেবাও করবে না;
৩. তোমার পরমেশ্বরর প্রভুর নাম তুমি অযথা নেবে না, কারণ যে কেউ তাঁর নাম অযথা নেয়, প্রভু তাকে শাস্তি থেকে রেহাই দেবেন না;
৪. সাব্বাৎ দিনের কথা এমনভাবে স্মরণ করবে, যেন তার পবিত্রতা অক্ষুণ্ন রাখ;
৫. তোমার পিতা ও তোমার মাতাকে গৌরব আরোপ করবে, তোমার পরমেশ্বর প্রভু তোমাকে যে দেশভূমি দিচ্ছেন, সেই দেশভূমিতে তুমি যেন দীর্ঘজীবী হও;
৬. নরহত্যা করবে না;
৭. ব্যভিচার করবে না;
৮. অপহরণ করবে না;
৯. তোমার প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দেবে না;
১০. তোমার প্রতিবেশীর ঘরের প্রতি লোভ করবে না; প্রতিবেশীর স্ত্রী, তার দাস-দাসী, তার বলদ-গাধা, তার কোন কিছুরই প্রতি লোভ করবে না।
পবিত্রতম পিতা ঈশ্বর নিজ হাতে দু’টি পাথরে আজ্ঞাগুলো লিপিবদ্ধ করেছেন, একটিতে তাঁর প্রতি পবিত্রতা রক্ষা; অপরটিতে মানুষ মানুষের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে আজ্ঞা দিয়েছেন। সদাপ্রভু আদেশের সাথে প্রতিজ্ঞাও ব্যক্ত করেছেন। ‘তোমার পিতা ও মাতাকে গৌরব আরোপ করবে’ এবং ‘নরহত্যা করবে না’—এটি হত্যার বিরুদ্ধে জীবনের পবিত্রতা ঘোষণা করছে। ‘ব্যভিচার করবে না’—এটি বিবাহের পবিত্রতা ও সংসার রক্ষা করছে। ‘অপহরণ করবে না’—এটিতে চুরির বিরুদ্ধে সম্পত্তির স্বত্ত্বাধিকার প্রকাশ করছে। ‘মিথ্যা সাক্ষ্য দেবে না’—এখানে মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের প্রকাশ করে। ‘লোভ করবে না’—খারাপ ইচ্ছা থেকে অন্তরকে রক্ষা করা। আমরা বিশ্লেষণ করে দেখেছি, পাঠ্যপুস্তকে দশমতম আজ্ঞাকে ভেঙে দু’টিতে পরিণত করা হয়েছে। সত্যিই কী আমরা পিতা পরমেশ্বরের প্রদত্ত আজ্ঞার ওপর হস্তক্ষেপ করতে পারি! অবশ্যই না। আমাদের কোমল হৃদয়ের অধিকারী শিশু শিক্ষার্থীদের পবিত্র বাইবেলের আলোকেই শিক্ষা দেওয়া আবশ্যিক; ভ্রান্তি শিক্ষা বর্জনে আমরা নিঃসন্দেহে একটি বিশুদ্ধ প্রজন্ম পাবো।
২
তৃতীয় শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তকের অষ্টম অধ্যায়ে ‘মুক্তিদাতার জন্ম’ সম্পর্কেও পবিত্র বাইবেলের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। বইয়ের ৩৩ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে—‘পূর্বদেশের তিনজন পণ্ডিত আকাশে এই উজ্জ্বল তারাটি দেখতে পেয়েছিলেন।…অবশেষে তাঁরা বেথলেহেম নগরে এসে পৌঁছালেন। গোয়াল ঘরের উপরে এসে তারাটি থামল। প-িতেরা গোয়াল ঘরের ভিতরে গিয়ে যাবপাত্রে শোয়ানো শিশুটিকে দেখতে পেলেন। উপহারগুলো দিয়ে তাঁরা যীশুকে প্রণাম জানালেন।’ পবিত্র বাইবেলের সুসমাচারগুলোতে কোথাও তিনজন প-িতের কথা বলা হয়নি, বরং বলা হয়েছে—‘পূর্বদেশ হইতে কয়েকজন পণ্ডিত যিরূশালেমে’ (মথি ২:১); এসেছিলেন। ‘চতুর্থ পণ্ডিত’ পুস্তক অধ্যয়ন করে বোঝা যায়, বেশ অনেকজন পণ্ডিত যীশুকে প্রণাম করতে রওনা হয়েছিলেন। দীর্ঘ পথ পরিভ্রমণ করতে গিয়ে কেউ কেউ পৌঁছিয়েছেন কেউবা পথিমধ্যে পিছিয়ে পড়েছিলেন। আমরা বরাবরই প্রিন্টিং ছবিগুলোতে তিনজন প-িতের উপস্থিতি দেখেছি এবং সেটিকেই যদি প্রাধান্য দিই; বোধকরি মঙ্গলজনক হবে না। পবিত্র বাইবেলে বলা হয়েছে—কয়েকজন পণ্ডিত। পবিত্র বাইবেলকে বেইস করেই শিশু মনে সত্যিটা সংগ্রোথিত করাতে হবে।
অতঃপর প-িতেরা পৌঁছালে শিশু যীশুকে ‘গৃহমধ্যে গিয়া শিশুটিকে তাঁহার মাতা মরিয়মের সহিত দেখিতে পাইলেন’ (মথি ২:১১)। পবিত্র বাইবেলে বর্ণিত বর্ণনার সাথে পাঠ্যপুস্তকের বর্ণনার ফারাক আমাদেরকে ভাবিত করে তুলেছে। দয়া করে আমরা আমাদের ধর্মগ্রন্থ পবিত্র বাইবেলের আলোকে বর্ণনা করি।
৩
সম্প্রতিকালে পাঠ্যপুস্তকগুলোতে ‘বানান’ রীতি বেশ পরিবর্তন হয়েছে। বানানের ক্ষেত্রে সমতা বিধানের জন্য অনুসৃত হয়েছে বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রণীত বানানরীতি। পবিত্র বাইবেলে ‘খ্রীষ্ট’ শব্দটি পাঠ্যপুস্তকে ‘খ্রিষ্ট’ বানান করা হচ্ছে। মনে করুন, এভাবে যদি একজন শিক্ষার্থী একাধিকবার পরীক্ষায় পবিত্র বাইবেলে ‘খ্রীষ্ট’ বানানটি লিখে, সেক্ষেত্রে মার্কস্ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই বেশি। যিনিই পরীক্ষার খাতা দেখবেন, ক্লাসের বইয়ের বানান রীতিই অনুসরণ করবেন; এভাবেই পরীক্ষার নম্বর কমে আসে। এ নিয়ে দু’একজনের কাছ থেকে অভিযোগও শ্রবণ করেছি। এ বিষয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই আমলে নিতে হবে।
পাঠ্যপুস্তকের প্রসঙ্গ কথাতে প্রফেসর নারায়ণ চন্দ্র সাহা, চেয়ারম্যান, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, বাংলাদেশ লিখেছেন— ‘…খ্রিষ্টধর্ম ও নৈতিক শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে পাঠ্যপুস্তকটি এমনভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে যেন আমাদের শিক্ষার্থীরা ভালো ও মন্দের মধ্যেকার পার্থক্য বুঝতে শেখে, মন্দকে পরিহার করে ও ভালোকে গ্রহণ করার মাধ্যমে চরিত্রবান ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়ে উঠে। ঈশ্বরকে, অতঃপর সৃষ্ট সকল প্রাণী ও প্রকৃতিকে তাদের নিজ নিজ প্রকৃতি অনুযায়ী চিনতে ও ভালোবাসতে পারে।’ সত্যিকার মানুষ হতে হলে সত্যকে জানা, সঠিক বিষয়টি অবধান করা এবং অনুসরণ করা। হ্যাঁ, সত্যিই পবিত্র বাইবেলকে কেন্দ্রে রেখে আমরাও আমাদের ছেলেমেয়েদের ধর্ম সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান, চরিত্র গঠন, দেশপ্রেম ও প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্বশীল হতে উদ্বুদ্ধ করি। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, বাংলাদেশ-এর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টিতে গুরুত্বারোপ করলে কৃতজ্ঞ হবো।
মিথুশিলাক মুরমু : গবেষক ও কলামিস্ট।





Users Today : 7
Views Today : 9
Total views : 185245
