বিবর্তন ডেস্ক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ‘ঘ’ ইউনিটসহ বেশকিছু ভর্তি পরীক্ষায় ডিজিটাল জালিয়াতিতে ব্যবহৃত ডিভাইসগুলো সরবরাহ করা হয়েছে ফার্মগেট এলাকার একটি কোচিং সেন্টার থেকে। এমনকি প্রশ্নের সমাধানও দেয়া হতো ওই কোচিং সেন্টার থেকে। জালিয়াতির ঘটনায় গ্রেফতারকৃতরা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। এসব তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও আলোচনা করেছেন আইন-শৃক্সখলা বাহিনীর সদস্যরা।
মামলার তদন্তকারী সংস্থা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) বলছে, তিন বছর ধরে বিভিন্ন ভর্তি পরীক্ষায় ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করছে জালিয়াত চক্রের সদস্যরা। ফার্মগেটকেন্দ্রিক একটি কোচিং সেন্টার থেকে পরিচালিত হচ্ছে এই জালিয়াত সিন্ডিকেট। কাট আউট পদ্ধতিতে সারা দেশ থেকে কোচিং করতে আসা শিক্ষার্থীদের সংগ্রহ করে এ ডিভাইসের মাধ্যমে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে চক্রের সদস্যরা।
গত ১৯ অক্টোবর বৃহস্পতিবার পরীক্ষায় জালিয়াতিতে সাহায্যের অভিযোগে ছাত্রলীগ নেতা মহিউদ্দিন রানাসহ তিনজনকে গ্রেফতার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। শনিবার তাদের চারদিনের রিমান্ডে নেয় সিআইডি।
সিআইডির দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, আসামিরা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে বিশেষ একটি ইলেকট্রনিক ডিভাইসের (মাস্টার কার্ড সদৃশ) মাধ্যমে পরীক্ষা চলাকালে প্রশ্নের উত্তর বলে দিত। আন্তর্জাতিক ই-কমার্স ওয়েবসাইট অ্যামাজন ডটকম থেকে তারা ডিভাইসটি সংগ্রহ করে। ভারতে ৮ হাজার রুপিতে ডিভাইসটি পাওয়া যায়। যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে এরা শুধু শিক্ষার্থীদের ডিভাইস সরবরাহ করে।
আরেকটি চক্র ডিভাইসের সাহায্যে পরীক্ষার্থীদের কানেক্ট করে উত্তর বলে দিত। এরপর আরো বেশ কয়েকটি স্তর রয়েছে। এক স্তরের লোক অন্য স্তরের লোকদের চিনত না। প্রশ্নপত্র ফাঁস জালিয়াত চক্রের পুরো কার্যক্রম চলত এমন কাট আউট পদ্ধতিতে।
কীভাবে পরীক্ষা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে তারা প্রশ্ন পেত? এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিআইডি কর্মকর্তা বলেন, এ চক্রের সদস্যরা মেধাবী ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং সেন্টারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তারা খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে চার সেটের প্রশ্ন নিয়ে সলভ (সমাধান) করে দিত। শিক্ষার্থীদের ওই ডিভাইসে কানেক্ট করে ‘১-ক, ২-খ’ ক্রম অনুসারে উত্তর বলত। ঢাবি কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরীক্ষার হলে মোবাইল ফোন নেয়া নিষিদ্ধ। কিন্তু ঢাবির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন। আমাদের ধারণা, প্রশ্ন পেয়েই তারা স্মার্টফোন দিয়ে চক্রের সদস্যদের প্রশ্নের ছবি তুলে পাঠান। আর এ প্রশ্নের ছবি তোলার কাজে ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে বলে প্রাথমিক তথ্য পেয়েছেন মামলার তদন্তসংশ্লিষ্টরা।
তদন্ত সূত্রে জানা যায়, মূলত কয়েকটি উপায়ে ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতির কাজ করে একাধিক সংঘবদ্ধ চক্র। চক্রের একটি গ্রæপ বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং সেন্টারগুলো থেকে ভর্তিচ্ছু পরীক্ষার্থী সংগ্রহ করে ও তাদের মধ্যে ডিভাইসগুলো পৌঁছে দেয়। আরেকটি গ্রæপ পরীক্ষার হল থেকে প্রশ্নের ছবি তুলে বাইরে পাঠায়, অন্য গ্রæপ প্রশ্নের সমাধান করে।
সিআইডি জানায়, চক্রটি তিন বছর ধরে ঢাবি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) পরীক্ষার্থীদের জালিয়াতিতে সহায়তা করছে। এর বিপরীতে তারা ২ থেকে ৫ লাখ টাকা নেয়। চক্রটি শিক্ষার্থীদের আসল সার্টিফিকেটের কপি জামানত হিসেবে জমা রেখে ডিভাইসগুলো সরবরাহ করে। পরীক্ষা শেষে শিক্ষার্থীরা ডিভাইস জমা দিয়ে সার্টিফিকেট ফেরত নেয়।
সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার মুহাম্মদ মিনহাজুল ইসলাম জানান, প্রশ্ন জালিয়াতির পুরো কার্যক্রম চলত কাট আউট পদ্ধতিতে, যে কারণে জালিয়াত চক্রের এক স্তরের সঙ্গে অন্য স্তরের যোগাযোগ ছিল না। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে চক্রের অনেক শাখা-প্রশাখা রয়েছে। ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস বন্ধের ¯^ার্থে পুরো চক্রটিকে ধরতে কাজ করছে সিআইডি।
আসামিদের প্রথম দিনের রিমান্ড শেষে সিআইডি জানতে পারে, ঢাবির ‘ঘ’ ইউনিটে ভর্তিচ্ছু অনেক শিক্ষার্থী এ ডিভাইস নিয়েছিল। অনেকে আগের দিন ভয়ে এটি ফেরত দিয়ে দিয়েছে। জালিয়াতির মূল স্পট ফার্মগেট। বিশেষ ডিভাইসটিও আগের রাত এমনকি পরীক্ষা শুরুর ঘণ্টাখানেক আগে সরবরাহ করা হয় ফার্মগেট এলাকা থেকে, এমনকি প্রশ্ন সলভ (সমাধান) করা হয় ফার্মগেট এলাকায় বসে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মহিবুল ইসলাম বলেন, আসামিদের রিমান্ড চলছে। রিমান্ডে চক্রটি সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বলেন, মামলার তদন্তের ¯^ার্থ প্রয়োজনে ‘ঘ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগে সাজাপ্রাপ্ত ১২ জনের যে কাউকে এ মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে।




Users Today : 31
Views Today : 38
Total views : 177923
