রাজশাহী জেলার তানোর উপজেলার মুণ্ডুমালা ক্যাথলিক মিশন ‘সাধু জন মেরী ভিয়ান্নী গির্জা’র ইনচার্জ ফাদার প্রদীপ গ্রেগরী একই মিশনের আওতাধীন ও নিকটবর্তী গ্রামের সপ্তম শ্রেণীতে অধ্যয়তরত দরিদ্র ও ক্ষমতাহীন আদিবাসী মেয়েকে দিনের পর দিন উপর্যুপরি ধর্ষণ করেছেন।ধর্মের বাহক হিসেবে ফাদার বা পুরোহিতগণ সম্মানিত ও গুরুজন হিসেবেই সমাদৃত হয়ে থাকেন। অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে পড়া ও নিরক্ষর আদিবাসীরা মিশনের ফাদার যখন কোনো পরামর্শ, সিদ্ধান্ত কিংবা আদেশ প্রদান করে থাকেন; সহজ-সরল ও বিশ্বাসী হিসেবে তার কথাগুলোকে শিরোধার্য হিসেবে গ্রহণ করে থাকেন। একটি মিশনের আওতাধীন বহু গ্রামের উন্নতি-অবনতি, সুনাম-দুর্নাম, শিক্ষার অগ্রগতি কিংবা আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে মিশনের ব্যাপক ভূমিকাও অবলোকন করেছি। তাহলে কেন একজন ধর্মের ঝাণ্ডা ধারণকারী ধর্মযাজক এহেন কুকর্ম করতে আকাঙ্ক্ষী হয়ে থাকেন? কেন নিজেকে ধর্মের আড়ালে আড়াল করে ধর্মীয়, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘৃণ্যতম কাজ করতে উদ্যত হয়েছেন?
বিগত ২৬ সেপ্টেম্বর সকাল ১০ ঘটিকায় আদিবাসী মেয়েটি মিশনের ভিতরে গির্জার আশপাশে ঘাস কাটতে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে যায়। পরিবারের অভিভাবক ও নিকটজনেরা অনেক খোঁজাখুজির পরও হদিস না পাওয়ায় ২৭ সেপ্টেম্বর পুলিশের শরণাপন্ন হন। থানায় জিডি করার পর পুলিশি তৎপরতার মধ্যেই ২৮ তারিখ দুপুরে নিশ্চিত হওয়া গেল যে, নিখোঁজ হওয়া মেয়েটি মিশনের ফাদার প্রদীপ গ্রেগরীর রুমে নজরবন্দি অবস্থায় রয়েছে। অতঃপর স্থানীয় আদিবাসী নেতাদের সহযোগিতায় নদীর জল অনেক দূর গড়িয়েছে। মেয়েটির পরিবারের সাথে সালিশ, অর্থ সহযোগিতার আশ্বাস, ধর্মচ্যুত করার হুমকি, ফাদার প্রদীপের পলায়ন, আত্মগোপন এবং শেষান্তে গ্রেপ্তার ও কারাগারে প্রেরণ। অবশ্য এক্ষেত্রে নীলনক্সার উম্মোচন করেছে প্রিন্টিং ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াগুলো, একজন অন্যায়কারীকে ধরিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছে।
প্রথমত—উত্তরবঙ্গের অনেক সাঁওতাল, মাহালী, মুণ্ডা, কোল, উঁরাওসহ অনেক আদিবাসীরা শতবর্ষ পূর্বেই খ্রিষ্টধর্মকে গ্রহণ করেছেন। এই আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় থাকা মিশনগুলোতে আদিবাসী পুরোহিত না দিয়ে বাংলা ভাষাভাষী পুরোহিতদের দায়িত্ব প্রদান করে মিশনকার্য পরিচালিত হয়ে আসছে। আদিবাসীরা খ্রিষ্ট বিশ্বাসী হলেও ফাদার প্রদীপ সম-মর্যাদা সম্পন্ন খ্রিষ্ট বিশ্বাসী হিসেবে বিবেচনা করতেন কী না আমাদের সন্দেহ হয়! বোধ করি, ফাদার প্রদীপ গ্রেগরী দেখেছেন, আদিবাসী নারীরা প্রতিবেশীদের দ্বারা শ্লীতাহানী, ধর্ষণ, হত্যার মতো বর্বরতম ঘটনার শিকার হলেও পেশী শক্তি, রাজনৈতিক শক্তির দ্বারা আক্রান্ত হয়ে স্থবির হয়ে পড়েন। হয়ত তিনিও নিরীহ-ধর্মভীরু আদিবাসীদের ঠেকাতে পারবেন বলে প্রত্যাশা করেছিলেন। পবিত্র বাইবেল যিনি প্রতিদিন অধ্যয়ন করেন, গির্জার পুলপিট থেকে দৈনিক ধর্মের অমিয় বাণী প্রচার করেন; তিনি কী জানেন না দুর্বল, অসহায়দের পক্ষে ঈশ্বর সদাপ্রভু পক্ষ নিয়ে থাকেন! সত্যিই ঈশ্বর তাঁর বাতাসেই ফাদার প্রদীপকে ধরিয়ে দিয়েছেন। তোমার পাপ তোমাকে ধরবেই ধরবে।
দ্বিতীয়ত—ফাদার প্রদীপ গ্রেগরীর বিষয়ে ইতোপূর্বেও অনেক অভিযোগের বোঝা মিশনকে বহন করতে হয়েছে। ধর্মের প্রদীপ জ্বালানোর দায়িত্ব ব্রত হয়ে মিশন থেকে মিশনের দায়িত্ব পালন করেছেন কিন্তু সত্যিকার অর্থে আলোর ঝলকানি তিনি দেখাতে পারেননি; পেরেছেন সমাজকে অন্ধকার জগতের দৃষ্টান্ত। মুণ্ডামালার মিশনের অপ্রাপ্ত বয়স্ক আদিবাসী মেয়েকে ভুলিয়ে ভালিয়ে তার জীবনের যে ক্ষতি তিনি করেছেন, এটি ক্ষমার অযোগ্য। একটি মেয়ের সম্ভ্রম হারানোর বেদনা জীবনভর বয়ে বেড়াতে হয়। পরিবারে, সমাজের সর্বত্রই হেয় প্রতিপন্ন না হওয়ার জন্যে আমাদের মেয়েরা আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়ে থাকে। ফাদার প্রদীপ শুধু একটি মেয়েকে নয়, পুরো আদিবাসী সমাজকে কলঙ্কিত করে কলুষিত করেছেন। একজন ধর্মযাজক হিসেবে সমগ্র আদিবাসী খ্রিষ্ট বিশ্বাসীদের বিশ্বাসের সাথে ছিনিমিনি খেলেছেন; বিশ্বাস ভঙ্গের নৈতিকতার দায়ভারকে তিনি এড়াতে পারেন না।
তৃতীয়ত—প্রদীপ গ্রেগরীর মতো ফাদারদের জন্যে বরেন্দ্র অঞ্চলে তথা সমগ্র বাংলাদেশে খ্রিষ্টের সুসমাচার প্রচার, প্রসার ও সাক্ষ্য প্রদান চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। মানুষের বিশ্বাসের ভীত একবার নড়ে গেলে সেটিকে কোনো কিছু দিয়েই সংস্কার করা যায় না। ফাদার প্রদীপ গ্রেগরী অতীতের সমস্ত রেকর্ডকে উতরিয়ে নতুন রেকর্ড গড়েছেন। মিশনের অভ্যন্তরে থেকে স্রষ্টার সবচেয়ে ঘৃণিত কাজ ব্যভিচার তিনি করেছেন। অত্র মিশনের আওতায় অনেকগুলো চার্চ রয়েছে, শত—সহস্র খ্রিষ্ট বিশ্বাসী রয়েছেন; ফাদার প্রদীপের স্থানে যিনি স্থলাভিষিক্ত হবেন, তাঁকে ওই চার্চগুলোর খ্রিষ্ট বিশ্বাসীরা কীভাবে গ্রহণ করবে? ফাদারের যে মানদণ্ড, আস্থা, ভক্তি ও ধর্মের প্রতিনিধিত্ব করতেন, সেটিকে তিনি চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে গেছেন। হয়ত-বা হৃদয়ের ক্ষত শুকাবে, হয়তো নয়। নতুন দায়িত্ব নিয়ে আসা ধর্মগুরু খ্রিষ্টবিশ্বাসীদের উদ্দেশ্যে বলবেন, ‘তোমরা খ্রিষ্টকে অনুসরণ করো, খ্রিষ্টের ক্ষমা প্রদর্শন করো।’ স্রষ্টা হিসেবে প্রভু যীশু খ্রিষ্ট ক্ষমার দৃষ্টান্ত দেখিয়েছে সত্যি; কিন্তু শাস্ত্র আমাদেরকে দেখিয়েছে অপরাধীকে তার কৃত অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করতেই হবে।
চতুর্থত—১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে রাজশাহী ডায়োসিসের জন্ম হয়েছে। ডায়োসিসের ব্রুট মেজোরিটিই আদিবাসী জনগোষ্ঠী, তবে বিদ্যা-বুদ্ধি, জ্ঞান-গরিমায় এবং দক্ষতাতেও নন-আদিবাসীরা এগিয়ে থাকায় আদিবাসীরা বৈষম্যের শিকার হয়ে থাকেন বলে একাধিক ব্যক্তিবর্গ তথ্যাদি দিয়েছেন। সাঁওতাল—উঁরাও কিংবা আরো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আদিবাসী গোষ্ঠীর কাছ থেকে নন-আদিবাসীদের আচার-আচরণ, পরিকল্পনা—উদ্যোগ সম্পর্কে সব সময়ই অভিযোগের ডালি টুইটুম্বর হয়ে আছে। প্রভু যীশু খ্রিষ্ট বৈষম্যের বেড়াজালকে ছিন্ন করতে পেরেছিলেন; তিনি অচ্ছুৎ, অস্পৃশ্য শমরিয়দের সাথে মিশেছেন, সুসমাচারের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করেছেন। আদিবাসী পঞ্চদশী মেয়েটির সম্ভ্রম হারানোতে ডায়োসিসের বিশপ, ফাদার কিংবা খ্রিষ্টবিশ্বাসীদের কাছে সুসমাচারের ন্যায্যতাকে প্রত্যাশা করি।
পঞ্চমত—আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় মিশন/সংস্থা কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত আদিবাসী আর্থ-সামাজিক সংগঠনগুলোতে স্থানীয় ফাদার, পুরোহিতদের প্রচ্ছন্ন হাত থাকে। রাজশাহীর তানোর উপজেলার আদিবাসী নেতা ও স্থানীয় সরকারি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মি. কামেল মার্ডীর দ্বিমুখী কথাবার্তায় আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে, তিনিও ধর্মীয় নেতাদের প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়েছেন। ধর্মীয় গুরুরা ধর্মীয় বিষয়াদিতে খ্রিষ্টবিশ্বাসীদের শিক্ষা দেবেন, পরিচর্যা করবেন এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য কিন্তু নিজেদের পরিব্যক্তির বাইরেও যখন প্রভাব খাটিয়ে থাকেন; সেক্ষেত্রে বিপত্তি ঘটে থাকে। মি. কামেল মার্ডী দু-পক্ষকে সামাল দিতে গিয়ে নিজেই ফাঁদে পড়েছেন। অন্যায়কে অন্যায় বলার সৎ সাহস খ্রিষ্টানুসারীরা আমাদেরকে দেখাতে পারেননি।
খ্রিষ্টিয়ান ধর্ম যাজক ফাদার প্রদীপ গ্রেগরী আদিবাসী মেয়েকে মিশনের অভ্যন্তরে আটকে রেখে দিনের পর দিন ধর্ষণ করেছেন। এ কথা চিন্তা করতেই আমার হৃদয়-আত্মা ভেঙে যায়। বরেন্দ্র অঞ্চলের ঊষর ভূমিতে খ্রিষ্টিয়ান ধর্মযাজক কর্তৃক আদিবাসী নারীদের ধর্ষণ, শ্লীলতাহানী কিংবা সামাজিকভাবে অপদস্তের ঘটনা এটি প্রথম নয়। ধর্মকে অবলম্বন করে এই ধর্মের ধ্বজাধারী খ্রিষ্টের আদর্শকে ভুলুণ্ঠিত, কলুষিত এবং বিশ্বাসীদের সরল বিশ্বাসকে অবমাননা করেছে। প্রভু যীশু খ্রিষ্টের সৈনিকের শৃঙ্খলা ভঙ্গের শাস্তি ধর্মীয়ভাবে এবং রাষ্ট্রীয় আইনের আওতায় হওয়া আবশ্যিক। কেউ-ই আইনের ঊর্ধ্বে নয়, অপরাধ করলে তার শাস্তি প্রদানে পরিশুদ্ধ হতে আমাদের প্রত্যেকে আইনের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে।
মিথুশিলাক মুরমু : আদিবাসী বিষয়ক গবেষক ও লেখক।





Users Today : 9
Views Today : 10
Total views : 184453
