বিগত ২৫ মার্চ ঢাকার আর্চবিশপ কার্ডিনাল প্যাট্রিক ডি. রোজারিও সিএসসি অনুসারী বিশ্বাসীদের আহ্বান জানালেন যেন দেশব্যাপী বিকেল ৫ ঘটিকায় একসঙ্গে প্রভু যীশুর শেখানো প্রার্থনা আকাশের দিকে দু’হাত উত্তোলন করে উচ্চারণ করি। কার্ডিনাল মহামান্য পোপ মহোদয়ের নির্দেশনা ক্যাথলিক বিশ্বাসীদের উদ্দেশ্যে লিখেছেন, ‘‘আজ ২৫ মার্চ প্রভুর দূতসংবাদ পার্বণ। পোপ নির্দেশ দিয়েছেন যেন বিকাল ৫টায় সময়ে, সকলে একই সময়ে, আকাশের দিকে তাকিয়ে, দু’হাত উপরে তুলে বর্তমান করোনা মহামারী থেকে মানুষ রক্ষা পায়, তার জন্য একবার ‘প্রভুর প্রার্থনা’ বলতে। সকলকে আহবান জানাই।’’ শান্তিরাজ প্রভু যীশু খ্রিষ্ট পৃথিবীতে থাকাকালীন সময় শিষ্যদের প্রার্থনা শিখিয়েছিলেন, বলেছিলেন, তোমরা তোমাদের স্বর্গস্থ পিতার কাছে এইভাবে যাঞ্চনা করবে—‘হে আমাদের স্বর্গস্থ পিতঃ, তোমার নাম পবিত্র বলিয়া মান্য হউক, তোমার রাজ্য আইসুক, তোমার ইচ্ছা সিদ্ধ হউক, যেমন স্বর্গে, তেমনি পৃথিবীতেও হউক, আমাদের প্রয়োজনীয় খাদ্য আজ আমাদিগকে দেও; আর আমাদের অপরাধ সকল ক্ষমা কর, যেমন আমরাও আপন আপন অপরাধীদিগকে ক্ষমা করিয়াছি; আর আমাদিগকে পরীক্ষাতে আনিও না কিন্তু মন্দ হইতে রক্ষা কর।’ মহামান্য পোপ মহোদয়ের আকুল আহবানে আমার দেশের শত-সহস্র খ্রিষ্ট বিশ্বাসী করোনা ভাইরাসের হাত থেকে বিশ্ববাসীকে বাঁচার লক্ষে যে যার অবস্থানে থেকে স্রষ্টার কাছে বিনতী জানিয়েছে। স্বর্গস্থ পিতা নিশ্চয়ই নিজ প্রতিমূর্তিতে সৃষ্টি মানুষকে রক্ষার্থে সংহারক দূতকে ক্ষান্ত করবেন, সেই বিশ্বাস, সেই প্রত্যাশা নিয়ে আমরা সকলেই ত্রিভুবনের মালিক ঈশ্বরের কাছে সমর্পিত হয়েছি।
খ্রিষ্ট বিশ্বাসীরা পবিত্র বাইবেল ঘাঁটিয়ে স্রষ্টার রুদ্রমূর্তি ধারণের কারণসমূহ আবিষ্কারের চেষ্টা করে চলেছেন, কারণ আমরা মানুষই। আমরা আমাদের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য অন্যায়, অবিচার, মন্দতা, পাপ পঙ্কিলতাকে আপন করেছি। পবিত্র শাস্ত্রে ঈশ্বর দেখিয়েছেন তিনি সবচেয়ে ঘৃণা করেন—ব্যভিচার, ওজনের রকমফের ইত্যাদি। প্রভু যিশু খ্রিষ্ট ব্যভিচারের সংজ্ঞা দিয়েছেন—কেউ যদি কোনো নারীর দিকে কামদৃষ্টিতেও তাকান, তাহলেই তিনি ব্যভিচারের দোষে দুষ্ট। ঈশ^র ঘৃণা করেন—‘উদ্ধত দৃষ্টি, মিথ্যাবাদী জিহ্বা, নির্দোষের রক্তপাতকারী হস্ত, দুষ্ট সংকল্পকারী হৃদয়, দুষ্কর্ম করিতে দ্রুতগামী চরণ, যে মিথ্যাসাক্ষী অসত্য কথা বলে, ও যে ভ্রাতৃগণের মধ্যে বিবাদের সূত্রপাত করে’ (হিতোপদেশ ৬: ১৭-১৯)। বোধ করি উপরিউক্ত সকলই আমাদের মানুষের চরিত্রের মধ্যে বিদ্যমান। যিশু খ্রিষ্ট মানব সমাজকে আরো সহজ ও সাবলীল নির্দেশনা প্রদান করলেন, তিনি বললেন—‘তুমি তোমার সমস্ত অন্তঃকরণ, তোমার সমস্ত প্রাণ, তোমার সমস্ত শক্তি ও তোমার সমস্ত চিত্ত দিয়া তোমার ঈশ্বর প্রভুকে প্রেম করিবে, এবং তোমার প্রতিবাসীকে আপনার মত প্রেম করিবে (লূক ১০:২৭)। অর্থাৎ সমস্ত কিছুর সারমর্ম তিনি অল্প কথায় প্রকাশ করলেন কিন্তু একটু ভেবে দেখুন; এখানেই সবচেয়ে কঠিন বিষয়টি লুকায়িত রয়েছে। যিশুর অন্যতম শিষ্য যোহন বিশ্লেষণ করেছেন এইভাবে—‘যদি কেহ বলে, আমি ঈশ্বরকে প্রেম করি, আর আপন ভ্রাতাকে ঘৃণা করে, সে মিথ্যাবাদী, কেননা যাহাকে দেখিয়াছে, আপনার সেই ভ্রাতাকে যে প্রেম না করে, সে যাঁহাকে দেখে নাই, সেই ঈশ্বরকে প্রেম করিতে পারে না’ (১ যোহন ৪:২০)।
আমরা নদী-নালা, পাহাড়-পর্বত, সাগর-মহাসগর, প্রতিবেশ-পরিবেশ আকাশমণ্ডলকে দূষিত করে চলেছি। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ হিসেবে বিবেচিত আমরা মানুষ সৃষ্টির সৌন্দর্যকে বিবর্ণ করে তুলেছি কিন্তু কেন, শুধুমাত্র নিজেদের হীন স্বার্থকে চরিতার্থ করার জন্যে, শ্রেষ্ঠত্বকে জাহির করার জন্যে। স্রষ্টা নিজ সৃষ্টির দিকে তাকিয়ে সন্তষ্টি হয়ে বলেছিলেন— ‘সকলই অতি উত্তম’ (আদিপুস্তক ১:৩১)। আমাদের সুস্থ থাকার জন্য খাবারের সূচি তৈরি করে দিয়েছিলেন, সেটিকে গ্রাহ্য করি নাই; আমরা আমাদের সুবিধার্থে নতুন নতুন থিওলজিকে উপস্থাপন করেছি। নিশ্বাস-প্রশ্বাসের নির্মল বায়ুকে আবিষ্কারের নামে আমরা করেছি দূষিত। আমাদের স্মৃতি থেকে স্রষ্টার চিরকালীন বন্দোবস্তকে ডিলিট করেছি। পরিবেশের ভারসাম্যকে রক্ষার্থে পরিবেশ নিজেই মানুষের ওপর দুর্যোগ-দুগর্তি এবং প্রতিশোধের তীব্রতাকে বেছে নিচ্ছে। পরিবেশের এরূপ বৈচিত্র্যপূর্ণ আচরণে আমরা মানব সমাজ সত্যিই হতভম্ব ও অসহায়।
খ্রিষ্ট বিশ্বাসীর সম্মুখে পবিত্র বাইবেলে নোহের জলপ্লাবন, সদোম-ঘমোরার ঘটনা, মহানগর নীনবী ইত্যাদির উদাহরণ জ্বলজ্বল করছে। নোহ ঈশ্বরের প্রিয়পাত্র হওয়ায় মহা জলপ্লাবন থেকে তার পরিবারকে রক্ষা করেছিলেন কিন্তু পৃথিবীর সমস্ত জীবজগত, প্রাণীজগতকে এক জোড়া করে ব্যতিরেকে নিশ্চিহ্ন করেছিলেন। শাস্ত্রে বলা হয়েছে— ‘আর সদাপ্রভু দেখিলেন, পৃথিবীতে মনুষ্যদের দুষ্টতা অত্যাধিক, এবং তাহাদের অন্তঃকরণের চিন্তার সমস্ত কল্পনা নিরন্তর কেবল মন্দ। তাই সদাপ্রভু পৃথিবীতে মনুষ্য নির্মাণ প্রযুক্ত অনুশোচনা করিলেন ও মনঃপীড়া পাইলেন’ (আদিপুস্তক ৬:৫-৬)। ক্ষুব্ধ ঈশ্বর ৪০ দিন-রাত অঝোরে বৃষ্টি নামালেন, তাঁরই সৃষ্টিকে ধ্বংসাবশেষে পরিণত করলেন। নোহের সাথে ঈশ্বর নিয়ম স্থির করলেন— ‘আমি মেঘে আমার ধনু স্থাপন করি, তাহাই পৃথিবীর সহিত আমার নিয়মের চিহ্ন হইবে’ (আদিপুস্তক ৯:১৩)।
সদোম-ঘমোরা পাপভারে ন্যূজ্ব হয়ে পড়েছিল; নিজেদের দৃষ্টিতে যাহা ভালো তাহাই করতেন। ব্যভিচার, লাম্পট্যতা, বহুগামিতা, পুরুষগামিতা ইত্যাদি যেন নিত্যনৈমিত্যিক বিষয়ে পরিণত হয়েছিলো। অব্রাহামের নিকটাত্মীয় লোটের কাছে লোকেরা জানতে চেয়েছিল— ‘অদ্য রাত্রিতে যে দুই ব্যক্তি তোমার বাটীতে আসিল তাহারা কোথায়? তাহাদিগকে বাহির করিয়া আমাদের নিকটে আন, আমরা তাহাদের পরিচয় লইব’ (আদিপুস্তক ১৯:৫)। স্রষ্টা ঈশ্বর নগরের প্রতি রুষ্ট হয়ে গন্ধকযুক্ত অগ্নি বর্ষণ করে সদোম-ঘমোরাকে নিশ্চিহ্ন করলেন।
নীনবী তৎকালীন সময়ে মহানগর হিসেবে খ্যাত ছিল। এই মহানগরের অধিবাসীরা দৌরাত্মপ্রিয়, আত্মপ্রিয় এবং পাপপূর্ণ জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলো। ঈশ^র নবী যোনাকে প্রেরণ করলেন, যোনা ঘোষণা করলেন— ‘আর চল্লিশ দিন গত হইলে নীনবী উৎপাটিত হবে’ (যোনা ৩:৪)। নবী যোনার ঘোষণায় নীবনী মহানগরের রাজা চিন্তিত, আতঙ্কিত এবং সমূহবিপদ আঁচ করতে পেরে নিজেকে ও দেশকে স্রষ্টার নিকট সঁপে দিলেন। তিনি নিজে—আপন সিংহাসন হইতে উঠিলেন, গাত্রের শাল রাখিয়া দিলেন এবং চট পরিধান করিয়া ভস্মে বসিলেন। তিনি সর্বত্র বার্তা প্রেরণ করলেন— ‘মনুষ্য ও গোমেষাদি পশু কেহ কিছু আস্বাদন না করুক, ভোজন কি জল গ্রহণ না করুক; কিন্তু মনুষ্য ও পশু চট পরিধান করিয়া যথাশক্তি ঈশ্বরকে ডাকুক, আর প্রত্যেকজন আপন আপন কুপথ ও আপন আপন হস্তস্থিত দৌরাত্ম্য হইতে ফিরুক। হয়ত, ঈশ্বর ক্ষান্ত হইবেন, অনুশোচনা করিবেন ও আপন প্রজ্বলিত ক্রোধ হইতে নিবৃত্ত হইবেন, তাহাতে আমরা বিনষ্ট হইব না’ (যোনা ৩: ৭-৯)। সেদিন ঈশ্বর সত্যি সত্যিই নীবনী মহানগরকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। স্বর্গস্থ ঈশ্বর মানুষের অনুশোচনা, নিজ দিকে ফিরে আসা, পাপ পথ পরিহার করা কিংবা তাঁর অনুশাসন মেনে চলাতে সন্তষ্টি হোন। পৃথিবীর মানুষ আজ অসহায়, নিরুপায়, নিঃস্ব এবং শক্তিহীন। আর এ সময় আমাদের উপলব্ধি করা দরকার, স্রষ্টা মানুষের কাছে কী প্রত্যাশা করছেন!
খ্রিষ্ট বিশ্বাসীরা পবিত্র বাইবেল থেকে অনুসারীদের সান্ত্বনা দিচ্ছেন—কারণ ঈশ্বর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেনঃ ‘আমার প্রজারা, যাহাদের উপরে আমার নাম কীর্তিত হইয়াছে, তাহারা যদি নশ্বর হইয়া প্রার্থনা করে ও আমার মুখের অন্বেষণ করে এবং তাহাদের কুপথ হইতে ফিরে, তবে আমি স্বর্গ হইতে তাহা শুনিব, তাহাদের পাপ ক্ষমা করিব ও তাহাদের দেশ আরোগ্য করিব’ (২বংশাবলী ৭:১৪)। প্রভু যীশু খ্রিষ্ট অবাধ্য সন্তানের গল্পে উল্লেখ করেছেন, ‘আমি (অবাধ্য সন্তান) উঠিয়া আমার পিতার নিকটে যাইব, তাঁহাকে বলিব, পিতঃ স্বর্গের বিরুদ্ধে এবং তোমার সাক্ষাতে আমি পাপ করিয়াছি; আমি আর তোমার পুত্র নামের যোগ্য নই; তোমার একজন মজুরের মত আমাকে রাখ। পরে সে উঠিয়া আপন পিতার নিকটে আসিল (লূক ১৫:১৮-২০)। সেদিন অবাধ্য সন্তানের পিতা মহাভোজ প্রস্তুত করে সন্তানকে সাদরে গ্রহণ করেছিলেন।
আসুন, আমরা আমাদের কৃত দোষের অনুসন্ধান করি, পাপ স্বীকার করি, অনুশোচনা করি। হয়ত ঈশ্বর পৃথিবীর মানুষের প্রতি দয়া করতে পারেন! নবী যোনার ঘোষণায় নীনবী’র মানুষ পরিবর্তিত হয়েছিল, ‘আর ঈশ্বর অনুশোচনা করিলেন, তাহা করিলেন না’। স্বর্গের ঈশ্বর নিশ্চয়ই নিজ হাতে গড়া মানুষকে এভাবে বিনষ্ট করবেন না!
মিথুশিলাক মুরমু : আদিবাসী বিষয়ক গবেষক ও লেখক।





Users Today : 109
Views Today : 115
Total views : 182666
