এ বছর করোনার প্রকোপ তেমন একটা ছিল না। ফলে উন্মূক্ত স্থানে মুসলমানরা তাদের পবিত্র ঈদুল আজহা যেমন উদ্যাপন করেছেন, তেমনি কোরবানির পরিমাণও গত দু-বছরের তুলনায় এ বছর বেশি ছিল। প্রত্যাশা ছিল, এ বছর কোরবানির চামড়ার মূল্য গত বছরের তুলনায় মানুষ বেশিই পাবে। কারণ একদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ বছর গরুর চামড়ার প্রতি বর্গফুটে গত বছরের তুলনায় ৭ টাকা ও খাসির চামড়ার প্রতি বর্গফুটে ৩ টাকা বৃদ্ধি করেছিল। কিন্তু আশায় গুড়েবালি। মানুষের সে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বরং গত বছরের চেয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চামড়ার দাম বাড়িয়ে দিলেও গত বছরের মতোই গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে। আর খাসির চামড়া তো অনেক জায়গায় মাত্র ১০ টাকায় কেনা বেচা হয়েছে।
মূলত কোরবানির চামড়ার টাকা গরিব, এতিম, অনাথদের মাঝে বিলি-বন্টন হয়ে থাকে। যেমন-ফেতরা, যাকাতের অর্থ গরীব মানুষদের মধ্যে বিলি বন্টন হলেও চামড়ার টাকার সিংহভাগ যায় এতিম-অনাথদের কল্যাণে। যেহেতু গত কয়েকবছর যাবৎ কোরবানির চামড়া অর্থাৎ গরু, ছাগলের চামড়ার মূল্য একেবারেই কম ছিল, সেহেতু কোরবানি বেশি হলেও মূল্য পতনের কারণে এই অর্থ গরিব, এতিমরা বঞ্চিত হলেও চামড়া শিল্পের সাথে জড়িত শিল্পপতিরাই লাভবান হচ্ছেন বছরের পর বছর ধরেই। আমরা জানি, যেকোনো পণ্যের কাঁচামাল যত কমমূল্যে কেনা যাবে সে পণ্যে উৎপাদকরাই বেশি লাভবান হবেন। যদি কোনো কারণে উৎপাদকের কাঁচামাল চড়া দামে কিনতে হয় তাহলে সে পণ্যের দাম যেমন বেশি হবে, তেমনি সে পণ্য বিক্রি করে উৎপাদকরা বেশি লাভবান হতে পারবেন নাÑএটাই বাজার অর্থনীতির সূত্র। স্বভাবতই বলা যায়, যেহেতু চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল চামড়া কম দামে শিল্পপতিরা কিনতে পারছেন, সেহেতু এ শিল্পে জড়িত শিল্পপতিরা বেশি লাভবান হচ্ছেন। আর বাজার অর্থনীতির সূত্রেরও এ ক্ষেত্রে যথেষ্ঠ ব্যতায় ঘটেছে! যেমন যেকোনো পণ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামালের দাম কম হলে পণ্যের উৎপাদান খরচ কমবে এবং বাজারে সে পণ্য কম মূল্যেই সাধরণ ভোক্তারা কিনতে পারবে-এটাই স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, গত কয়েক বছরে চামড়াজাত পণ্য যেমন জুতা, বেল্ট, মানিব্যাগ বা ব্যবহৃত অন্যান্য পণ্যের মূল্য তো কমই ছিল না বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে দ্বিগুণও রয়েছে। অর্থাৎ চামড়াজাত পণ্যের দাম অনেক বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে চামড়াকে ঘিরে শোষণের মাত্রা কয়েকগুণ যে বৃদ্ধি পেয়েছে, তা আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি।
অথচ চামড়ার উৎস গরু, ছাগলের খামারে যারা জড়িত তাদের চড়া দামেই গরুর খাদ্য কিনে গরু, খাসি লালন-পালন করতে হয়। খামারিদের স্বপ্ন থাকে চামড়ার দাম বৃদ্ধি হলে গরুর দামও বৃদ্ধি হবে। যদি খামারিরা গরু, খাসির উপযুক্ত মূল্যে বিক্রি করতে পারতেন, তাহলে আরো বেশি বেশি খামার সৃষ্টি হতো এবং গরু, খাসির চাষাবাদ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেত। কারণ আমিষের চাহিদার একটি বড়ো অংশ গরু, খাসি ও ভেড়ার মাংস দিয়ে পূরণ হয়ে থাকে। যেহেতু দেশে গরু-খাসির খামার সেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে না, সেহেতু সারা বছরে মাংসের ঘাটতি পূরণে বিদেশি গরুর আমদানিও কম-বেশি অব্যাহত রয়েছে। দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, আর জনসংখ্যা বৃদ্ধি হলে মাংসের চাহিদাও বৃদ্ধি পাবেÑএটাই স্বাভাবিক। যে কারণে গরু, খাসির খামারিদের পশুর উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করা সরকারের জন্য অত্যাবশকীয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য সরকারের এ দিকে তেমন কোনো নজর নেই, তেমনি কাঁচামাল কম মূল্যে কিনে বেশি মূল্যে কেন উৎপাদিত পণ্য উৎপাদক গোষ্ঠী বিক্রি করছে, সে দিকেও জবাবদিহিতা নেই। ফলে চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনকারী শিল্পপতিরা ফুলে ফেঁপে কলাগাছ হচ্ছেন। আর লোকসান দিচ্ছেন গরু, খাসির খামারিরা। আর বঞ্চিত হচ্ছে কোরবানির চামড়ার হকদার এতিম, অনাথ, অসহায় গরিব মানুষরা। আর বাস্তবতা হচ্ছে, এটাই পুঁজিবাদি রাষ্ট্র কাঠামোর চরিত্র। যে রাষ্ট্রে শ্রম শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট হবে বৃহৎ জনগোষ্ঠী, আর লাভবান হবেন, গুটিকতক শিল্পপতি বা শিল্প গ্রুপ। এটা যে শুধু চামড়া শিল্পের ক্ষেত্রে বিরাজমান তা নয়, এ প্রতিযোগিতা দেশের প্রতিটি পণ্যের ক্ষেত্রেই বিদ্যমান। বিশেষ করে কৃষি খাতে জড়িত কৃষক, গরু, খাসি, মুরগির চাষাবাদে যারা যুক্ত তাদের হাজারো প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবেলা করে বেঁচে থাকতে হয়। যেমন বর্তমানে টানা বর্ষণ, উপর্যপুরি বন্যার কবলে মুরগির খামারিদের অবস্থা খুবই নাজুক। বিশেষ করে অনেক মুরগির খামার বন্যার পানিতে তলিয়ে গিয়ে অনেক খামারি যেমন নিঃস্ব হয়েছে, তেমনি খামারি ব্যবসার জন্য খুব ছোটো ছোটো ফিড ও মুরগির বাচ্চা সরবরাহকারী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কপালেও হাত পড়েছে। কারণ খামারিরা নিঃস্ব হলে এ প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগকৃত অর্থ খোয়া যাবার সম্ভাবনা বেশি থাকবে। ফলে দেশের তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত মুরগির খামারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত খামার ও ব্যবসায়ীদের অবস্থা এ বছর খুবই নাজুক। অথচ ব্রয়লার মুরগী বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মাংসের চাহিদার একটা বড়ো অংশপূরণ করে আসছে। যে কারণে সরকারকে মুরগির খামারি এবং ছোটো-বড়ো ব্যবসায়ীদের বীমা প্রকল্পের আওতায় আনা জরুরি। স্বল্প প্রিমিয়ামে এ খাতে বীমার ব্যবস্থা করা গেলে ক্ষতিগ্রস্ত খামারি এবং ব্যবসায়ীরা বীমার অর্থ তুলে আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। তা না হলে গরু, খাসি, হাঁস-মুরগির খামারিদের যেমন রক্ষা করা সম্ভব হবে না, তেমনি দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর আমিষের চাহিদা পূরণ করাও কঠিন হয়ে পড়বে। আগেই বলেছি, পুঁজিবাদি রাষ্ট্র কাঠামোর চরিত্র হচ্ছে, ছোটো-মাঝারি ব্যবসায়ীদের মূল্য শোষণ, মূলধন হরণ করে কলা গাছ হয়ে যাওয়ার বাস্তব কত ঘটনা না দেশে ঘটেই চলছে। যার জ্বলন্ত উদাহরণ চামড়া শিল্পের সাথে যুক্ত শিল্পপতিদের কালো থাবা। অতি সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকের প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, ছয় রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকের নিকট খেলাপি ঋণের পরিমাণ এখন দেড় হাজার কোটি টাকা। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকে যে তথ্য প্রকাশ করেছে তা থেকে জানা যায়, চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত চামড়া খাতে ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের স্থিতি ১২ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা যা ১২ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
শিল্পপতিরা বরাবরই ব্যাংক থেকে নানাভাবে সুবিধা পেয়ে থাকেন। এ বছরও বকেয়া ঋণের মাত্র ২ শতাংশ জমা করা সাপেক্ষে চামড়া খাতে জড়িত শিল্পপতিরা নতুন করে ঋণ নেয়ার সুযোগ লাভ করেছেন। যে সুবিধাগুলো তৃণমূল পর্যায়ে খামারি বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ভাগ্যে জোটে না। ফলে নানা প্রতিক‚লতাকে মোকাবিলা করেই খামারি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ব্যবসা পরিচালনা করতে হয়। এরপরেও ক্ষুদ্র চামড়া ব্যবসায়ী ও চামড়ার মৌসুমী ব্যবসায়ীদের অর্থ যথাসময়ে ট্যানারী মালিকরা ফেরত দেন না। ফলে এ খাতের শিল্পপতিদের দিনকাল ভালো চললেও চামড়া ব্যবসায়ীদের চরম দুর্দিন চলছে। ব্যবসায় মন্দার কারণে চামড়ার উপযুক্ত মূল্য থেকে যেমন চামড়া বিক্রেতারা বঞ্চিত হচ্ছেন, তেমনি কোরবানির চামড়ার উপযুক্ত মূল্য না পাওয়ায় হকদার এতিম, অসহায়, দুঃস্থরাও বেশ কয়েক বছর ধরে বঞ্চিত হচ্ছে।
আব্দুল হাই রঞ্জু : কলামিস্ট।





Users Today : 17
Views Today : 18
Total views : 184430
