আমাদের গল্পের নায়িকা কলাবতীর জীবনের অনেকটা সময়ই কেটেছে পদ্মাপাড়ে। তাই পদ্মার সাথে তার চিরদিনের সখ্য। কলাবতী যেদিন পৃথিবীতে আসে তখন ছিল আষাঢ় মাস। সকাল থেকেই কালো মেঘ করে ছিল। শঙ্কর রায়ের সকাল থেকেই চিন্তা ছিল একটাই, যদি তার স্ত্রীকে হাসপাতালে নিতে হয় তাহলে এই ঝড়ের দিনে কীভাবে নিবে। আগের দিনই শঙ্কর তার বাড়ির কাছের ভ্যানচালক সবুরকে বলে রেখেছিল। সবুর এরমধ্যে সকাল থেকে দুইবার এসে খোঁজ নিয়ে গেছে।এমনিতেই শঙ্কর রায় তার গ্রামের মধ্যে খুব সম্মানিত একজন ব্যক্তি। নিকরচড়া হাই স্কুলের গণিতের শিক্ষক।একারণে স্কুলে তো বটেই তার সাথে প্রাইভেট শিক্ষক হিসেবেও তার খুব সুনাম। যে ছেলে কোনোদিনও অঙ্কে পাস করার কথা স্বপ্নের মধ্যেও কল্পনা করতে পারে না, সেই ছেলেকেও অঙ্কে পাস করানোর রেকর্ড আছে শঙ্কর স্যারের। একারণেই শঙ্কর স্যারকে সবাই এক নামেই চিনে। সেই শঙ্কর স্যারের প্রথম সন্তানের জন্ম হবে বলে কথা, গ্রামের মধ্যে রীতিমতো হৈচৈ পড়ে গেছে। সারাদিন ঝড়-বৃষ্টিতে বাড়ির পেছনের কলাবাগান লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। রাত ১১ টার সময় ফুটফুটে এক শিশুর কান্নায় বাড়িতে সবাই আনন্দে মেতে উঠলো। শঙ্করের মেজো বোন এসে বললো দাদা তোমার মেয়ে হয়েছে। শঙ্কর শুনেই খুশি হয়ে গেল।
শঙ্করের ঠাকুমার কাছে খুব পছন্দের ছিল তার বাড়ির পেছনের কলাবাগান। কারণ তার এই বাড়িতে বিয়ে হওয়ার পর থেকেই সে এই বাগান দেখে আসছে। এই বাগানে সবসময়ই কলাগাছই লাগানো হয়। ঠাকুমা দিগম্বরী দেবীর মতে কলাগাছ বাড়িতে রাখলে গৃহস্থের কল্যাণ হয়। একারণেই মেয়ে শিশু জন্ম নেওয়ার পর দিগম্বরী দেবী মেয়ের নাম রাখেন কলাবতী। কলাবতী ছোট থেকেই তার পরিবারের সবার খুব আদরে বেড়ে উঠতে থাকে। কলাবতীর পড়াশোনায় একেবারেই মন নাই। কলাবতী তখন ক্লাস ফাইভে পড়ছে, হঠাৎ সেদিনই তার বাবার কাছে পড়তে এসেছে তাদেরই পাশের গ্রামের সঞ্জীব দাস। সঞ্জীব তখন ক্লাস এইটে পড়ে। গ্রামের মধ্যে ভালো ছাত্র হিসেবে সঞ্জীবের যথেষ্ট সুনাম আছে। কলাবতী তার বাবার কাছে অনেকবার সঞ্জীবের নাম শুনেছে। সঞ্জীব ক্লাসে বরাবরই প্রথম হয়ে আসছে। তবে সঞ্জীবের বাবা না থাকার কারণে পারিবারিক জীবনে সঞ্জীবের কষ্টের শেষ ছিল না। সামান্য কিছু কৃষি জমি আছে সেখানে সঞ্জীবের মা এবং সঞ্জীব কষ্ট করে চাষাবাদ করে। মেধাবী ছাত্র বলে বিদ্যালয়ের সব শিক্ষকই ওকে খুব স্নেহ করত।কলাবতীর বাবা বিভিন্ন সময়ে টাকা দিয়ে সঞ্জীবকে সাহায্য করেছে। সঞ্জীব খুব শান্ত প্রকৃতির ছেলে। প্রতিদিন সঞ্জীব যখন শঙ্কর স্যারের বাড়িতে আসত তখনই ঘরের ভেতর থেকে একটা কাশির শব্দ পেত। আবার যখন বাড়ি থেকে বের হয়ে যেত তখনও কাশির শব্দ পেত। হঠাৎ একদিন শঙ্কর স্যারের বাড়ি থেকে সঞ্জীব বের হয়েছে, বাড়ির সামনের আম গাছের পেছন থেকে একটা নারী কণ্ঠ ভেসে এলো—এই ছেলে প্রতিদিন তোমাকে ডাকি তবুও তুমি কি শুনতে পাও না? সঞ্জীব গাছের পেছনে গিয়ে দেখল একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কলাবতী বলল, তুমি কি আমাকে চিনতে পারছো না। সঞ্জীব বলল, আপনার নাম তো কলাবতী। আপনি শঙ্কর স্যারের মেয়ে। এটা শুনে কলাবতী হাসিতে গড়িয়ে পড়ল। সঞ্জীব তার বাড়িতে আসার পর অনেকক্ষণ ধরে এটা নিয়ে চিন্তা করলো, সে এমন কি ভুল বলেছে যার জন্য কলাবতী হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ল। সঞ্জীব কোনোকিছু নিয়ে আর চিন্তা না করে সরাসরি পড়ায় মন দিল।
এরপর থেকে প্রায় প্রতিদিনই পড়া শেষ হলেই কলাবতী এসে দাঁড়িয়ে থাকত সঞ্জীবের সাথে দেখা করার জন্য। কিন্তু সঞ্জীব প্রতিদিনই কলাবতীকে এড়িয়ে যেত। দেখতে দেখতে সঞ্জীব এসএসসি পাস করে গেছে, এরপর কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য শহরে চলে যায়। এদিকে কলেজের খরচ চালানোর জন্য সঞ্জীব টিউশনি করা শুরু করে। কলাবতীর অনেকদিন সঞ্জীবের সাথে আর দেখা হয় না। সামনেই পূজা, শপিং করার জন্য কলাবতী তার বান্ধবী সুকন্যাকে নিয়ে শহরে আসে। সুকন্যার বাড়ি সঞ্জীবের বাড়ির পাশে, তাই সুকন্যা যে শহরে যাবে এটা আগ থেকেই সঞ্জীবকে বলে রেখেছিল। শহরে গিয়ে সুকন্যা কলাবতীকে সাথে নিয়ে সঞ্জীবের হোস্টেলে যায়। সঞ্জীব ওদের দুজনকে সাথে নিয়ে শহরে সারাদিন ঘুরে কেনাকাটা করে দেয়। এইচএসসি পাসের পর সঞ্জীব বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। বেশ কিছুদিন ধরে কলাবতী ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করে না। বেশিরভাগ সময়ই পদ্মার পাড়ে গিয়ে বসে থাকে। মেয়ের এ অবস্থা দেখে একদিন শঙ্কর রায় কলাবতীর ঘরে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে এসবের কারণ জিজ্ঞেস করল। কলাবতী অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে তার বাবার কাছে সঞ্জীবের সব কথা খুলে বলল। পরেরদিন সকাল হতেই কলাবতীর বাবা সঞ্জীবের বাড়িতে গেল, সঞ্জীবের মায়ের কাছে কলাবতী আর সঞ্জীবের বিয়ের কথা বললো। সঞ্জীবের মা শর্বরী দেবী বিয়ের কথা শুনেই রাজী হয়ে গেল। ঠিক হলো সঞ্জীবের পড়া শেষ হলেই দুইজনের বিয়ে হবে। শর্বরী দেবী সেদিনই সঞ্জীবের কাছে চিঠি লিখে সব জানিয়ে দিল।
আর্থিক অবস্থা খারাপ হওয়ার কারণে সঞ্জীব প্রতি মাসে বাড়ি আসতে পারত না। আর তখন রাজশাহী থেকে ময়মনসিংহ ফেরিতে যমুনা নদী পাড়ি দিয়ে যেতে অনেক সময় লাগত। একারণেই শুধু পূজার ছুটিতেই সঞ্জীব বাড়িতে আসত। এবারের পুজোর ছুটিতে আসার পরই সঞ্জীবের সাথে কলাবতীর আশীর্বাদের আয়োজন হয়ে গেল। এরপর থেকে কলাবতীর বাবাই সঞ্জীবের সকল খরচ দিতেন। সঞ্জীব এবং কলাবতীর মধ্যে চিঠি লেখালেখি চলতে থাকে। যদিও বেশিরভাগ চিঠিই কলাবতীই লিখত। সঞ্জীব চার মাসে একটা চিঠির উত্তর দিত। তার চিঠির বেশিরভাগ অংশ জুড়েই থাকতো তার শঙ্কর স্যারের কথা। সঞ্জীব তখন শেষ বর্ষে পড়ছে, একদিন কে আর মার্কেট থেকে বের হতেই দেখা হয়ে গেল রীনিতার সাথে। রীনিতা ২য় বর্ষে পড়ছে। রীনিতার কথা সঞ্জীব আগেও তার বন্ধুদের কাছ থেকে শুনেছে। ক্যাম্পাসের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরী বলে রীনিতাকে সবাই চিনত। সঞ্জীবকে দেখেই রীনিতা এসে বলল, আপনার ২য় বর্ষের নোটগুলো আমাকে দিবেন? সঞ্জীবের কাছে নোটস ছিল না। তবুও সঞ্জীব নোটসগুলো দিতে রাজী হয়ে গেল। রাত জেগে সঞ্জীব নোটসগুলো করা শুরু করল। সঞ্জীবের রুমমেট নিলাদ্রি সবকিছু দেখে একদিন সঞ্জীবকে বললো, তোর বিয়ে ঠিক হয়ে আছে কিন্তু তারপরও এসব ঠিক হচ্ছে না। রীনিতার সাথে সঞ্জীবের নিয়মিত দেখা হতো, বোটানিক্যাল গার্ডেন, নদীর পাড়, বিভিন্ন জায়গা। এদিকে কলাবতী শুধু চিঠি লেখে, কোনো উত্তর আসে না। পুজোর ছুটির আগে একদিন চিঠি লিখে সঞ্জীব বলল, সামনে পরীক্ষা, চাকরি না পেয়ে বাড়িতে আসব না। অনার্স শেষ করে মাস্টার্সে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই সঞ্জীব চাকরির জন্য চেষ্টা করা শুরু করলো। মাস্টার্স শেষ হওয়ার সাথে সাথেই সোনালী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসারের চাকরি পেয়ে গেল। কলাবতীর বাবা খবর জানার পর পুরো গ্রামেরই সবাইকে মিষ্টি খাওয়ালো। এদিকে চাকরি পেয়েই সঞ্জীব রীনিতাকে বিয়ের কথা বলল। রীনিতা বললো, তুমি এতদিনেও ঠিক আমাকে চিনতে পারোনি। আমি এত সুন্দরী অথচ তুমি এত গরীব,আর সামান্য একটা চাকরি পেয়ে আমাকে বিয়ের স্বপ্ন দেখছো। আমার তো বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে, সামনে মাসেই আমার বিয়ে। আমার হবু স্বামী সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, ইউএসএ থাকে।
এরপর সঞ্জীব বাড়ি ফিরে এলো। তার পোস্টিং হয়েছে উত্তরবঙ্গে। বাড়িতে আসার পরই শুভ একটা দিনে কলাবতীর সাথে সঞ্জীবের বিয়ে হয়ে গেল। এরপর শুরু হল তাদের সুখী দাম্পত্য জীবন। সঞ্জীব এখন পুরোদমে সংসারী। কলাবতী তার সংসারের প্রতিটি খুঁটিনাটি খোঁজ রাখে। কলাবতী স্বামীকে নিয়ে খুব গর্ব করে যে, সঞ্জীব অন্য কোনো মেয়ের সাথে কথা পর্যন্ত বলে না। এমনকি তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কোনো বন্ধুর সাথে যোগাযোগ পর্যন্ত রাখেনি। সঞ্জীবের ভয় ছিল তার বন্ধুদের সাথে কলাবতীর পরিচয় করিয়ে দিলে ওরা যদি রীনিতার কথা বলে দেয়! একদিন নিলাদ্রি এলো সঞ্জীবের বাড়িতে। নিলাদ্রি রাতে একসাথে খেতে বসে রীনিতার কথা বলে বসলো কলাবতীর কাছে। সঞ্জীব ভাবল এই বুঝি তার সুখের সংসার ভেঙে গেল । কিন্তু সবকিছু শুনে কলাবতীর চোখে জল চলে এলো। কলাবতীকে কাঁদতে দেখে সঞ্জীবের মন ভেঙে গেল। কলাবতী বলল,জানো তো আমি তোমার জন্য কাঁদছি না। কাঁদছি রীনিতার জন্য, সে কতটা হতভাগী যে তোমার ভালোবাসার মর্যাদা বুঝতে পারেনি। সেদিন প্রথম সঞ্জীব উপলব্ধি কর করতে পারল, কলাবতী তার কাছে কতটা মূল্যবান। এত সুখের মধ্যেও কলাবতী বারবার ফিরে যায় একাকী তার চিরচেনা পদ্মার পাড়ে আর তাকিয়ে থাকে নদীর ওপারে।
কুন্তলা ঘোষ : কথাশিল্পী ও কৃষিবিদ।





Users Today : 43
Views Today : 50
Total views : 186416
