‘টাইম ইজ ব্রেন’। টাকার থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ মস্তিষ্ককে ঠিক রাখতে স্ট্রোকের পর যত দ্রæত সম্ভব হাসপাতালে ভর্তি হয়ে সঠিক চিকিৎসার সাহায্য নেওয়া।
কথা বলতে বলতে আচমকা জিভ অবশ হয়ে গেল, হাত তুলে বোঝানোর চেষ্টা করতে গিয়ে দেখলেন হাত তোলাও অসম্ভব। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আবার সব আগের মতোই স্বাভাবিক। এরপর ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কথা মাথাতেই এল না। প্রতিদিনির কর্ম-ব্যস্ততায় ধীরে ধীরে থিতিয়ে যেতে শুরু করল এই ঘটনা। কয়েকমাস পরে এক বড়োসড় স্ট্রোকের ধাক্কায় একেবারে জীবন নিয়ে শঙ্কা।
কয়েক মিনিট এরকম কথা বলতে না পারা, হাত বা পা অসাড় হয়ে যাওয়া অথবা চোখে অন্ধকার দেখার মতো ঘটনাকে চিকিৎসার পরিভাষায় বলে ‘ট্র্যানসিয়েন্ট ইসকিমিক অ্যাটাক’ বা ‘টিআইএ’। সাধারণভাবে একে মিনি স্ট্রোক বলা যায়। এই সময়ে দ্রæত চিকিৎসকের পরামর্শ না নিলে কিছু দিনের মধ্যেই বড়োসড় ব্রেন স্ট্রোকের আশঙ্কা থাকে। পৃথিবীতে ১ কোটির কিছু বেশি মানুষ ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হচ্ছেন। এদের মধ্যে ৬৫ লক্ষ মানুষ সঠিক সময়ে চিকিৎসার অভাবে মারা যান।
স্ট্রোক আটকাতে অবশ্যই প্রেশার, সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে
স্ট্রোকসহ মস্তিষ্কের নানা জটিল অসুখের চিকিৎসায় ইন্টারভেনশনাল নিউরোলজি ইদানীং গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা নিচ্ছে। এজন্য অবশ্যই রক্তচাপ, সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
স্ট্রোকের চিকিৎসা ও গোল্ডেন আওয়ার
মাথা ব্যথা বা অ্যাসিডিটির মতো সেলফ মেডিকেশন আমাদের মজ্জাগত। কিন্তু টিআইএ বা স্ট্রোকের ক্ষেত্রে এটা-ওটা করতে গিয়ে সময় নষ্ট করলেই মহাবিপদ। প্রাণে বাঁচার ঝুঁকি ক্রমশ কমে তো যাই-ই, প্রাণে বাঁচলেও অবশ হয়ে পড়ে থাকার সম্ভাবনা বাড়ে। তাই স্ট্রোকের লক্ষণ দেখলেই যত দ্রæত সম্ভব হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা করানো প্রয়োজন। স্ট্রোক হওয়ার পর সাড়ে চার ঘণ্টা হলো গোল্ডেন আওয়ার। এর মধ্যে ইন্টারভেনশন পদ্ধতির সাহায্যে মস্তিষ্কের রক্তবাহী ধমনীর রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক করে দিতে পারলে রোগীর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে সময় লাগে না। কিন্তু দেরি হলেই বিপদ। আর এই কারণেই চিকিৎসকদের মতে, ‘টাইম ইজ ব্রেন’। চিকিৎসায় দেরি হলে প্যারালিসিস হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে। সুতরাং স্ট্রোকের লক্ষণ দেখলেই হাসপাতালে ভর্তি করে দেওয়া উচিত। অস্ত্রোপচারের পরিবর্তে ইদানীং হার্টের অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টির মতোই মস্তিষ্কের ধমনীর জমাট বাঁধা রক্তের চাকতিও খুলে দেন নিউরো-ইন্টারভেনশনিস্ট।
স্ট্রোক কেন?
হাই প্রেশার, সুগারসহ নানা রিস্ক ফ্যাক্টর মস্তিষ্কের রক্তবাহী ধমনীর পথ আটকে দেয়। এদিকে রক্তের মধ্যে ভেসে বেড়ানো চর্বির ডেলা আচমকা ধমনীতে আটকে গিয়ে রক্ত চলাচল বন্ধ করে দিতে পারে। ফলে মস্তিষ্কের কোষ অক্সিজেনের অভাবে নিস্তেজ হতে হতে অকেজো হয়ে যায়। এই বিষয়টাই স্ট্রোক। সাধারণত, দু-ধরনের স্ট্রোক হয়। ইসকিমিক আর হেমারেজিক। ইসকিমিক স্ট্রোকে রক্ত চলাচল থেমে যায়। আর হেমারেজিক স্ট্রোকে দুর্বল রক্তনালী ছিঁড়ে গিয়ে রক্তপাত হয়। এ ছাড়া আছে ট্র্যান্সিয়েন্ট ইসকিমিক অ্যাটাক বা টিআইএ। কোনও ছোট রক্তের ডেলা মস্তিষ্কের রক্তবাহি ধমনীতে সাময়িকভাবে আটকে গেলে কিছুক্ষণের জন্য রোগীর বø্যাক আউট হবার ঝুঁকি থাকে। প্রাথমিকভাবে মারাত্মক না হলেও টিআইএ-র পরে বড়ো অ্যাটাকের ঝুঁকি থাকে।
স্ট্রোক বুঝবেন কীভাবে
যদি কথা বলতে বলতে আচমকা জিভ অসাড় হয়ে যায় অথবা অল্প সময়ের জন্যে চোখে অন্ধকার দেখেন অর্থাৎ বø্যাক আউট হয়। কাজ করতে করতে হাত-পা বা শরীরের কোনও একদিক হঠাৎপক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যায়, অথবা চোখে দেখতে সমস্যা হয়।ঝাপছা দৃষ্টি বা ডাবল ভিশন হয়। কথা বলতে অসুবিধে হয় অথবা ঢোক গেলা মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। মুখ থেকে লালা বেরতে থাকে অথবা সম্পূর্ণ জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যায় রোগী।
প্রতিরোধে
■ স্ট্রোক আটকাতে অবশ্যই প্রেশার, সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
■ ওজন স্বাভাবিক রাখা আবশ্যক, নিয়ম করে অন্তত আধ ঘণ্টা একটানা হাঁটা মাস্ট।
■ বাড়িতে রান্না টাটকা সব্জি ও মাছ-মাংস খেতে হবে। বাইরের জাঙ্ক ফুড বা ফাস্ট ফুড রাশ টানতে হবে।
■ ধূমপান, মদ্যপানের মতো বদভ্যাস ছাড়তেই হবে।
■ মাইনর অ্যাটাক বা টিআইএ হওয়ার পর অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
হেলথ ডেস্ক





Users Today : 65
Views Today : 68
Total views : 177319
