জাতিরপিতা বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার বক্তব্যগুলো আমাকে দিন দিন খুবই আকর্ষিত করছে। বিশেষ করে ধর্মীয় দিনগুলোতে তিনি যে আধ্যাত্মিক, আত্মিক, মানবিক ও মানবতার বিষয়গুলো সম্পর্কে আপোষহীনভাবে বক্তব্য দিচ্ছেন; সেটি বিশ্ববাসীর জন্য অবশ্যই অনুসরণযোগ্য। ‘সত্য বল সুপথে চলে ওরে আমার মন’—একজন খাঁটি মানুষই নিরেট সত্য কথা বলার দুঃসাহস রাখেন। যিনি নিজে বলেন, অনুশীলন করেন; তিনিই অপরকে পথও দেখাতে সমর্থ হোন। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু সম্পর্কে যে শেকড়ের কথাগুলো বলেছেন, তা আমাদের হৃদয়-মনকে ছুঁয়ে গেছে। একজন আদর্শ নেতার দর্শনই দেশকে সম্প্রীতি, শান্তি ও সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে; আর এটি করতে গিয়ে দাঁড়াতে হয় ন্যায্যতা ও সত্যের অনুশীলন খুঁটির ওপর। পবিত্র বাইবেলের মীখা পুস্তককেও বলা হয়েছে—“হে মনুষ্য, যাহা ভাল, তাহা তিনি তোমাকে জানাইয়াছেন; বস্তুত ন্যায্য আচরণ, দয়ায় অনুরাগ ও নম্রভাবে তোমার ঈশ্বরের সহিত গমনাগমন, ইহা ব্যতিরেকে সদাপ্রভু তোমার কাছে আর কিসের অনুসন্ধান করেন?’’ (মীখা ৬:৮)
প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট নীতিগুলো আমাদের ধর্ম কথায় মনে করিয়ে দেয়। সাম্প্রতিককালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধর্মীয় অনুষ্ঠান জন্মাষ্টমীতে যে অভয় বাণী ও সাহস সঞ্চারের মনোবৃত্তি জাগিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে অতুলনীয়। দেশের কর্ণধারের নিকট থেকে এরূপ অভয়বাণী, সমঅধিকার ও সমমর্যাদার যে দৃষ্টান্ত ব্যক্ত করেছেন বোধকরি তাতে সামান্য হলেও আমরা আশান্বিত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত সহজ-সরল ও সাবলীলভাবেই দেশের সংখ্যালঘুদের প্রতি বলেছেন, “…এটা আপনাদের জন্মভূমি। তাহলে আপনারা নিজেদেরকে ছোট করে এইভাবে সংখ্যালঘুভাবে দেখবেন কেন? এখানে সকলের সমান অধিকার রয়েছে। আমি সব সময় এটা শুনি, আমার কাছে খারাপ লাগে আপনারা নিজেদেরকে কেন এভাবে খাটো করে দেখবেন। বাংলাদেশ আমাদের সকলের। …আমরা বলি এই দেশ সকলের। আমি আপনাদেরকে বলবো নিজেদের ওই সংখ্যালঘু সংখ্যালঘু না বলে—এই মাটি আপনাদের, এই দেশ আপনাদের। এই জন্মভূমি আপনাদের। …যখন আমরা মুক্তিযুদ্ধে সকলে অংশগ্রহণ করেছে, যখন বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছে, এক ভাইয়ের রক্ত আরেক ভাইয়ের রক্তের সঙ্গে মিশে গেছে। সেই রক্তকে ভাগ করতে যাইনি, ভাগ হতে পারে না। …এই বাংলার মাটিতে যেহেতু আমরা সকলে এক হয়ে বুকের রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, কাজেই এখানে সকল ধর্মের সমান অধিকার থাকবে। …আমাদের শরণার্থীরা যখন ভারতে আশ্রয় নিল, তখন তো তারা দেখেনি কে হিন্দু আর মুসলমান। সকলের পাশে দাঁড়িয়ে সহযোগিতা করেছে। …আমরা সব সময় বিশ্বাস করি, যার যার ধর্ম সে সে পালন করবে। …জাতির পিতা যে সংবিধান আমাদের দিয়েছিলেন, সেই সংবিধানে কিন্তু সেই কথাই বলা হয়েছিল। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। যার যার ধর্ম সে স্বাধীনভাবে পালন করবে। যে কারণে বাংলাদেশের একটা ধর্মীয় (উৎসবে) সকলে এক হয়ে কাজ করতে পারে। আজকে আমরা যে স্লোগান দিচ্ছি—ধর্ম যার যার উৎসব সবার, ধর্ম যার যারা রাষ্ট্র সবার” (সোনার দেশ ৫.৯.২০১৯)।
আমরা ব্যক্তিগতভাবে অনেক সময়ই বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়; অযাচিতভাবে প্রশ্ন করে থাকে, আপনি বিদেশে চলে যাচ্ছেন না কেন? সত্যিই বিষয়গুলো উদ্বেগজনক হলেও চিন্তার খোরাক যোগায়। আমার গ্রামের আশপাশ থেকে অনেকেই স্থানান্তরিত হয়েছেন, আবার কেউ কেউ জানিয়েই গিয়েছেন যে তিনি পার্শ্ববর্তী দেশে গমন করতে যাচ্ছেন! আর এই জায়গাতেই মাননীয় শেখ হাসিনা আমাদেরকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সর্বস্তরের মানুষজন সাক্ষ্য দেয় মহান মুক্তিযুদ্ধে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, আদিবাসী-অন্ত্যজ; নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই কাঁধে কাঁধ মিলে শত্রুসেনার মোকাবেলা করেছে। জেনেছি মুক্তিযুদ্ধকালীন কোনো খ্রিষ্টান বা আদিবাসী যোদ্ধা শহীদ হলে তাঁকে কবরস্থ করার পূর্বে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতার পরবর্তীকালের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গাইতেন। এটিই ছিল চরম দেশপ্রেমের বহিপ্রকাশ। সত্যিই এদিনের যে মমত্ববোধ, ভালোবাসা, সম্প্রীতি এবং মূল্যবোধ ক্রমশই হারিয়ে যাচ্ছে। স্বাধীনতার রক্তস্রোতে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, আদিবাসী-অন্ত্যজ মানুষের রক্ত পৃথক করা অসম্ভব। সুতরাং দেশ যে কারো কোনো গোষ্ঠীর নয়, সেটি পরিষ্কার করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। প্রতিটি মানুষের অধিকার রয়েছে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করার, দেশকে সহযোগিতা করার।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শুধু কথা বলেননি, কাজেও প্রমাণ করেছেন বার বার। পবিত্র সংবিধানে স্পষ্টভাবে যুক্ত করেছেন— ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্টধর্ম ইসলাম, তবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টানসহ অন্যান্য ধর্ম রাষ্ট্র সমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করিবেন।’’ ধর্মরিপেক্ষতার সংবিধানে সামরিক শাসকগণ জুড়ে দিয়েছিলেন একতরফা ধর্মীয় লেবাস। শেখ হাসিনা সরকার সেটি থেকেও আমাদেরকে উত্তরণ করেছেন। জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে বারবার ঘোষণা করেছেন—‘শাসনতন্ত্রে লিখে দিয়েছি যে কোনোদিন আর শোষকেরা বাংলার মানুষকে শোষণ করতে পারবে না ইনশা আল্লাহ। দ্বিতীয় কথা—আমি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। জনগণের ভোটে জনগণের প্রতিনিধিরা দেশ চালাবে, এর মধ্যে কারও কোনো হাত থাকা উচিত নয়। তৃতীয়— আমি বাঙালি। বাঙালি জাতি হিসেবে বাঁচতে চাই সম্মানের সঙ্গে। চতুর্থ— আমার রাষ্ট্র হবে ধর্ম নিরপেক্ষ। মানে ধর্মহীনতা নয়। মুসলমান তার ধর্ম-কর্ম পালন করবে, হিন্দু তার ধর্ম-কর্ম পালন করবে, বুদ্ধিস্ট তার ধর্ম-কর্ম পালন করবে। কেউ কাউকে বাধা দিতে পারবে না। তবে একটা কথা হলো, এই ধর্মের নামে আর ব্যবসা করা যাবে না” (২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে, সিরাজগঞ্জে দেওয়া এক জনসভার ভাষণে)। মূলত আমার জন্মভূমি বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট, মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা থেকেই এখনও ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের দেশত্ববোধকে জাগ্রত করা হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু কন্যার এ কাজটি প্রশংসানীয়যোগ্য।
স্মরণাতীতকাল থেকেই জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে এই ভূখণ্ড শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছে। হাজার বছরের ঐতিহ্যকে লালন করার যে দুঃসাহস মাননীয় প্রধানমন্ত্রী হৃদয়ে উদ্রেক ও পুনর্বার উপস্থাপন করেছেন; সেটি প্রণাম্যযোগ্য। তিনি নতুন শ্লোগান আমাদের দিলেন—“ধর্ম যার যার উৎসব সবার, ধর্ম যার যারা রাষ্ট্র সবার”। তিনি সহসাই বলে থাকেন, ‘আমাদের সব সময় ওইটাই লক্ষ্য থাকবে যে আমাদের প্রত্যেকটা ধর্ম, আমাদের ঈদ বলেন, আপনাদের পূজা বলেন বা বৌদ্ধ পূর্ণিমা বলেন অথবা বড়দিন আমি বলবো পৃথিবীর মধ্যে বাংলাদেশেই মনে হয় এত সুন্দর, এত আন্তরিক পরিবেশে প্রত্যেকটা ধর্মীয় অনুষ্ঠান আমরা মিলেমিশে উদযাপন করি। এখানে কিন্তু আর কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকে না, সবাই মিলেই সবার অনুষ্ঠানে যাই।’ এ সারাদেশে ৩১ হাজার ৩৯৮টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হলো, যা গত বছরের চেয়ে ৪৮৩টি বেশি। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা এবং রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও প্রশাসনের সর্বাত্মক সহযোগিতায় প্রতিটি ধর্মীয় উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পাদিত হওয়ার দৃষ্টান্তও তিনি বিশ্ববাসীকে উপলব্ধি করাতে পেরেছেন। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের মধ্যে অসাম্প্রদায়িকতা, বৈষম্যেহীনতায় মুগ্ধ হয়েই হয়ত জাতির পিতা তাঁকে জাতীয় কবির আসনে আসীন করেছিলেন। কবির ভাষায়—
‘গাহি সাম্যের গান—
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান
যেখানে মিশছে হিন্দু বৌদ্ধ মুসলিম ক্রীশ্চান।
গাহি সাম্যের গান—!
কে তুমি?- পার্সী? জৈন? ইহুদী? সাঁওতাল, ভীল, গারো?
কনফুসিয়াস? চার্বআখ চেলা? ব’লে যাও, বলো আরো!
… … …
এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই।”
[মিথুশিলাক মুরমু : আদিবাসী বিষয়ক গবেষক ও লেখক।]





Users Today : 36
Views Today : 43
Total views : 178005
