জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের জন্যও ইতিমধ্যেই চিন্তার কারণ হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অসময়ে অনাবৃষ্টি, বৃষ্টি, গূর্ণিঝড়সহ অতি গরম আবহাওয়া তৈরি হচ্ছে। এবার এপ্রিলের শুরু থেকে তাপদাহ তারই প্রতিফলন। এবার ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা অনেকদিন ধরে অব্যাহত ছিল। তাপমাত্রাকে সহনীয় পর্যায়ে রাখতে আমাদের সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই। সরকারের একার পক্ষে কাজটি করা দুরূহ, সময় থাকতে যদি পদক্ষেপ না নিলে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে বাংলাদেশ। বিভিন্ন ধরনের দূষণে আক্রান্ত বাংলাদেশ। এছাড়া নতুন করে কিছু দূষণ যুক্ত হয়েছে, তার মধ্যে ইলেকট্রনিক বর্জ্য পরিবেশের জন্য অত্যধিক হুমকির। শত শত টন ইলেকট্রনিক বর্জ্য পড়ে আছে, তা পরিশোধনের জন্য সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনা অপ্রতুল। ঢাকা শহরের ময়লা যেসব জায়গায় ফেলা হয়, এসব বর্জ্য সেখানে ফেললে আশপাশের মানুষ দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হবে। বাংলাদেশে বনভূমির পরিমাণ কমেই চলছে। সরকারি হিসাব বলছে ১৭ শতাংশ, আইএলও বলছে ১১ শতাংশ অথচ পরিবেশ ভারসাম্যের জন্য ২৫ শতাংশ বনভূমি দরকার। বাংলাদেশে পরিবেশ দূষণ অব্যাহত থাকলে সামনে তাপমাত্রা ও গড় বৃষ্টিপাত বেড়ে যাবে, যা দেশের সার্বিক উন্নয়নে ব্যাঘাত সৃষ্টি করবে। উৎপাদিত পণ্যের ধরন পরিবর্তন হয়ে যাবে।
ঢাকা শহরে যানজট সমস্যা এখন তীব্র আর দিনে দিনে সেটা বাড়ছেই। গাড়ির হর্নগুলো তীব্র, যা শুনে বুক ধড়ফড় করে। একসময় বাংলাদেশে ৬০০ এর অধিক নদী ছিল, যা বর্তমানে ২৩০টি। আরও বেশ কয়েকটি নদী বিলীন হয়ে গেছে, কিছু বিলুপ্তির পথে। শহরের আশপাশের নদীগুলো আজ ময়লা ফেলার উত্তম জায়গা। ভূমিদস্যুদের দ্বারা নদী দখল অথবা প্রভাবশালী ব্যক্তির দ্বারা নদী ভরাট করাটা আজ সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। পরিবেশ ধ্বংসকারী এসকল কর্মকা- প্রতিরোধ করতে হবে।
যখন আমাদের আবহাওয়া আরো উত্তপ্ত হবে তখন সমুদ্রের পানি আস্তে আস্তে ওপরের দিকে উঠতে থাকলে বাংলাদেশের বড়ো একটা অংশ প্লাবিত হতে পারে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে সবচেয়ে বড়ো সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারসহ আমাদের অন্যান্য উপকূলীয় এলাকা। বাংলাদেশের জনসংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই জনসংখ্যার জন্য কৃষি জমিতে বাড়িঘর নির্মাণ বাড়ছে। ফলে হ্রাস পাচ্ছে কৃষি জমি। গাছগাছালি কেটে ফেলতে হচ্ছে। অন্যদিকে শিল্প কারখানা স্থাপন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ইটভাটার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় ইট ভাটার কালো ধোয়া পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে। এর প্রভাব আমাদের শ্বাস কষ্টসহ শরীরের এলার্জির সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। নানা ধরনের রোগব্যাধি বেড়ে যাচ্ছে দিন দিন। কল কারখানার বর্জ্যগুলি নদীতে চলে যাচ্ছে, ফলে পানি দূষিত হচ্ছে। আবার এই পানি আমরা ব্যবহারের কারণে শরীরে নানা ধরনের রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ছে।
বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় বিশ্বের উন্নত দেশগুলো এক হতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের এখনো জলবায়ুর পরিবর্তন ব্যাপক আকার নেয়নি তবে এখন এর থেকে উত্তরণের জন্য সচেষ্ট না হলে আগামীতে অনেক বড়ো সংকটের মুখোমুখি হতে হবে। ইটভাটার জন্য মাটি সংগ্রহের কারণে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষি জমি কমে যাওয়া, কার্বন ডাই অক্সাইড বেড়ে যাওয়া, পলিথিন এবং অন্যান্য বর্জ্য, শিল্পকারখানার বর্জ্য, পশু পাখি কমে যাওয়া, বনাঞ্চল কমে যাওয়া ছাড়াও বহুবিধ সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি আমরা। আগে জৈব সার ব্যবহারের জন্য আমাদের জমিগুলো উর্বর থাকত। এখন রাসায়নিক সার ব্যবহারে সাময়িকভাবে উপকার পেলেও জমির উবরর্তা দিন দিন কমছে। নদ-নদী, খাল, ডোবা ভরাট করায় পানির প্রবাহ কমে যাচ্ছে। এতেও পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে নদী ভাঙন ব্যাপক আকার ধারণ করছে।
পৃথিবী বিখ্যাত ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন ষড়যন্ত্রে জর্জরিত। বনের গাছ কাটা, হঠাৎ করেই বনের একপাশ পুড়ে যাওয়া, তেলবাহী জাহাজ ডুবে যাওয়া সুন্দরবনকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। সুন্দরবন আমাদের জন্য অনেক বড়ো এক সম্পদ। বাংলাদেশের জলবায়ুর প্রভাব মোকাবেলায় বেশি করে বনাঞ্চল বাড়াতে হবে এবং অল্প জায়গা ব্যবহার, বহুতল বিল্ডিং এবং শিল্পকারখানা স্থাপন করতে হবে। যাতে পরিবেশের কোনো ক্ষতি না হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। শিল্পকারখানার বর্জ্য পরিশোধন করে তা নির্দিষ্ট স্থানে জমা রাখতে হবে এবং এই বর্জ্য থেকে রিসাইকেলিং করে কীভাবে অন্যকাজে লাগানো যায় এবং নতুন নতুন উদ্ভাবন প্রযুক্তি কাজে লাগাতে হবে। কল-কারখানার কালো ধোয়া পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করে। এজন্য এখন থেকে গ্রিন ফ্যাক্টরির উদ্যোগ নিতে হবে। যাতে করে পরিবেশের কোনো ক্ষতি না হয়। প্লাস্টিক জাতীয় বর্জ্য এবং পলিথিনের ব্যবহার কমাতে হবে। এই প্লাস্টিক জাতীয় বর্জ্য সহজে নষ্ট হয় না, যার কারণে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হয়। সৌর বিদ্যুৎ পরিবেশের কোনো ক্ষতি করে না বিধায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে হবে।
ট্যানারি বর্জ্য পরিশোধনের ব্যবস্থা করতে হবে। ট্যানারির বর্জ্য যাতে করে খাল-বিল নদী-নালায় না যায় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। ট্যানারি বর্জ্য খাল-বিল নদী নালায় চলে গেলে নানান রোগ-ব্যাধি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই ট্যানারির বর্জ্য পরিশোধন করে ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে হবে।
শিল্প কল কারখানা করতে লক্ষ রাখতে হবে যেন কৃষি জমি নষ্ট না হয়। অল্প জায়গা ব্যবহার করে শিল্পকারখানা তৈরি করতে হবে। শিল্পকারখানার আশেপাশে গাছগাছালি লাগানো বা থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষি জমি ধ্বংস না করে বহুতল বিল্ডিং নির্মাণ করতে হবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সর্বশেষ সংশোধিত ২০১০) এর ৭নং ধারার ক্ষমতাবলে জলাশয় ভরাট, পাহাড়-টিলা ধ্বংস, কৃষি জমির ক্ষতি, নদীর পানি দূষণসহ পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থা দূষণকারী ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের কাছে ক্ষতিপূরণ ধার্য ও আদায় করতে পারবে। যারা পরিবেশ দূষণ করছে তাদের শাস্তি দিতে পারবে।
বাংলাদেশ সংবিধান ১৮(ক) মতে, রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়নকল্পে প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং নিরাপত্তা বিধান নিশ্চিত করবে। এরই ধারাবাহিকতায় সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। যেমন- ETP কার্যকর, পরিবেশ পর্যায়ে অবদানের জন্য প্রধানমন্ত্রী ‘জাতীয় পরিবেশ পদক’ প্রদান করছেন। ২০২১ সালকে কেন্দ্র করে আরও কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন, যেমন ইটভাটায় আধুনিক প্রযুক্তি, ঢাকার বায়ুমান পরীক্ষার জন্যContinutous Air Monitori Station এর মাধ্যমে দূষণের মান নিয়ন্ত্রণ ও বিশ্লেষণ, বন্ধু চুলা উল্লেখযোগ্য। বৈশি^ক উষ্ণতা মোকাবেলা বিশে^র অন্যান্য দেশের মতো বাংরাদেশকেও আরো বেশি সচেতন ও উদ্যোগী হতে হবে। সবার সচেতনায় বদলে যেতে পারে পরিবেশ দূষণের কারণগুলো।





Users Today : 18
Views Today : 18
Total views : 177421
