মহামান্য হাইকোর্ট রূঢ় সত্য কথা উচ্চারণ করে ওসি, ডিসিদের ভর্ৎসনা করেছেন। জনসাধারণের বিশেষ করে অবহেলিত, প্রান্তিক ও অন্ত্যজ জনগোষ্ঠীর হৃদয়ের অব্যক্ত কথাগুলো যেন অজান্তেই কাকতালীয়ভাবে উদ্ভাসিত হয়েছে। মহামান্য হাইকোর্ট মন্তব্য করেছে, ‘কিছু কিছু ওসি, ডিসি আছেন, যাঁরা নিজেদের জমিদার মনে করেন। তাঁরাই সব, এমন ভাব দেখান। সবার কথা বলছি না, কিছু কিছু ওসি, ডিসি আছেন, এমন। অন্যান্য দেশেও যে নেই তা নয়, তবে আমাদের এখানে বেশি। ভুক্তভোগী (নুসরাত) থানায় যাওয়ার পর তাকে সুরক্ষা দেওয়া হলে, হয়ত ঘটনা এত দূর যেত না। তিনি (ওসি) পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছেন’ (প্রথম আলো ১০.৭.২০১৯)। থানার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ‘অফিসার ইন-চার্জ’ (ওসি) এবং জেলার প্রধান হচ্ছে ‘ডেপুটি কমিশনার’ (ডিসি), তাদের আচার-আচরণ, কার্যাবলী, ক্ষমতা ও তাদের প্রভাব প্রতিপত্তি অর্থাৎ পুরো বিষয়টিকেই তুলনা করা হয়েছে, বিলুপ্ত জমিদার প্রথার সাথে। আমরা একদা জমিদারদের শাসনাধীনে থেকে বিদ্রোহ করেছি, ইতিহাসে এরূপ অনেক বিদ্রোহের লোমহর্ষক বর্ণনা অধ্যয়ন করেছি। জমিদারী প্রথা বিলুপ্তির পর নব্য জমিদারীদের দৌরাত্বে সাধারণ জনগণ, বিশেষ করে আদিবাসীরা সহযোগিতার জন্য, সাহায্য পাওয়ার লক্ষ্যে কিংবা প্রত্যাশায় থানায় যেতে অনাগ্রহ প্রকাশ করে থাকে। মাননীয় হাইকোর্ট স্থানীয় প্রশাসন ও কর্মকর্তাদের চেতনা ও তাদের কর্তব্যবোধ সম্পর্কে পুনর্বার ওয়াকিবহাল করলেন।
ইতিহাসের জমিদারী প্রথায় জমিদারের শক্তিশালী লাঠিয়াল বাহিনী থাকতো। তিনি তাদের খাওয়া-দাওয়া, বাৎসরিক সেলামী দিয়ে তাদেরকে দিনের পর দিন পুষিয়ে রাখতেন; যখনই কোনো বর্গাচাষী সঠিক সময়ে ফসল, খাজনা কিংবা প্রয়োজনীয় কিছু দ্রব্যাদি দিতে অস্বীকার করতেন, তার ওপর নেমে আসতো নির্যাতনের খড়গ। অস্বীকারকারী চাষীকে জোরপূর্বক বেঁধে নিয়ে এসে হাজির করা হতো জমিদারের দরবারে। প্রয়োজনে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরকেও হাজির করা হতো জমিদারের প্রাসাদে। তবে কী বর্তমানের জমিদার’রা এরূপ চরিত্রের অবতারণা করে চলেছেন! কোনো চাষী সুখ-দুঃখে কথা বলতে গেলে কী জমিদাররা কান পেতে শুনতো! বিগত জুনের প্রথম সপ্তাহে নাটোর জেলার নলডাঙ্গা উপজেলার সেনভাগ খ্রিষ্টানপাড়ার মি. মুকুল হেমব্রম (সাঁওতাল) স্থানীয় থানায় অভিযোগ করতে টাইপকৃত আবেদন নিয়ে হাজির হন। অভিযোগে উল্লেখ করেন, ‘মো. আতাউর রহমান (৪০), পিতা- অজ্ঞাত, শ্বশুর- মো. মোকছেদ আলী…আমি জাতিতে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের লোক হওয়ায় বিবাদী আমাকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে অন্যায় অত্যাচার, জুলুম ও নির্যাতন করিয়া আসিতেছে। কিন্তু আমি বিবাদীর ভয়ে অদ্যবধি সকল অত্যাচার সহ্য করিয়া আসিতেছি। এমতবস্থায় অদ্য ইং ০৪-০৬-১৯ তারিখ বেলা আনুঃ ১২:০০ ঘটিকার সময় পূর্ব শত্রুতার জের ধরিয়া বিবাদী মো. আতাউর রহমান তাহার হাতে থাকা ধারালো হাসুয়া লইয়া আমার বসতবাড়ীতে অনধিকার প্রবেশ করিয়া আমাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে এবং আমার সহিত মারমুখী আচরণ করে। আমি বিবাদীকে গালিগালাজ করিতে মানা নিষেধ করিলে সে আমাকে মারিবার জন্য ধাওয়া করিলে আমি আমার প্রাণের ভয়ে আমার বসতবাড়ি পূর্ব মাঠের দিকে দৌড়াইয়া যায় এবং বিবাদী তার হাতে থাকা ধারাল হাসুয়া লইয়া আমার পিছু পিছু ধাওয়া করে। বিবাদী আমাকে মারিতে না পারায় পুনরায় আমার বসতবাড়িতে আসিয়া আমাকে ও আমার পরিবারের লোকজনকে যেখানেই পাইবে সেখানেই মারপিট করতঃ আমার পরিবারসহ খ্রিষ্টান পাড়ার সকল পরিবারের ঘরবাড়িতে আগুন লাগাইয়া আমাদেরকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি প্রদর্শন। বর্তমানে আমি ও আমার পরিবারের লোকজন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।…’ কিন্তু দায়িত্বরত অফিসার ইন-চার্জ আদিবাসী সাঁওতাল মি. মুকুল হেমব্রমের আবেদন সই-স্বাক্ষর-সীল ব্যতিরেকেই রেখে দেন এবং চলে যেতে বাধ্য করেন। মি. মুকুল হেমব্রম-এর সাথে কথা বলে জেনেছি, স্থানীয় থানার ওসি মুকুল হেমব্রমকে থোড়াই পাত্তা দিয়েছেন। একজন অসহায়, নিরুপায় ব্যক্তি যদি থানায় গিয়ে আশ্রয় ও পরামর্শ কিংবা আইনানুযায় কোনো সমাধান পান না; সে সময় ¯্রষ্টার দরবারে প্রার্থনা জানানো ছাড়া আর কিছুই থাকে না।
মাননীয় ডেপুটি কমিশনারগণও আদিবাসীদের কান্নার শব্দকে গুরুত্বারোপ করেন না। অথচ জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে উল্লেখ করেছিলেন, ‘… ভোটের দিনে ধর্ম বর্ণ গোত্র নির্বিশেষে আবালবৃদ্ধবণিতার মধ্যে আনন্দঘন পরিবেশ বিরাজ করে…দল মত নির্বিশেষে সংখ্যালঘু, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, ধর্ম, জাত, বর্ণ ও নারী পুরুষ ভেদে সকলে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। ভোট শেষে নিজ নিজ বাসস্থানে নিরাপদে অবস্থান করতে পারবেন।’ সত্যিকার অর্থে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা কতোটুকু নিরাপদে, নিরাপত্তার সাথে বসবাস করছে; সেটি শুধু অন্তরঙ্গভাবে না মিশলে উপলব্ধি করা যায় না। একদিকে প্রশাসনের অবহেলা এবং রাজনৈতিক কৌশলে কোনঠাসা ও ধর্মীয় উগ্রবাদে দিনগুলো আরো অসহনীয় হয়ে উঠেছে। বিশ্বাস করি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী হয়ত এ লক্ষ্যেই ডিসি’দের সম্মেলনে ৩১টি প্রস্তাবনা উপস্থিত করেছিলেন। উল্লেখযোগ্য হলো-
৪. জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িকতা দূর করে সর্বক্ষেত্রে শান্তিশৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে আরও সর্তকর্তার সঙ্গে এবং কঠোরভাবে দায়িত্ব পালন করা।
২৪. প্রতিবন্ধী, অটিষ্টিক ও পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীল কল্যাণে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করা;
৩১. সাম্প্রদায়িক বজায় রেখে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, হিজড়া, বেদে ও প্রতিবন্ধীদের প্রতি বিশেষ লক্ষ্য রাখা, জলাধার সংরক্ষণের নিমিত্তে খাল খনন ও পুকুর খনন করা এবং পরিকল্পিত নগরায়ণ ও বনায়ন নিশ্চিত করা।
সম্প্রতি ‘পিস রির্সাচ’-এর তালিকায় বাংলাদেশের নাম তিন নম্বরে উঠে এসেছে। বলা হয়েছে, নানাভাবে মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা খর্বের ঘটনা ঘটে বিশ্বজুড়ে। এরমধ্যে নির্দিষ্ট ধর্মের অনুসারী কিছু গোষ্ঠীকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার ফলে অন্যদের ধর্মীয় স্বাধীনতা খর্ব করা হয়। এমন ১০টি দেশের তালিকায় ৩ নম্বরে আছে বাংলাদেশের নাম। এক্ষেত্রে কয়েকটি ঘটনার উদাহরণ টানা হয়েছে। ধর্মীয় অবমাননা করে ফেসবুকে পোষ্ট দেওয়ার অভিযোগে ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বরে রংপুরে কিছু স্থানীয় লোকজন সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করে। এছাড়া যশোর ও চট্টগ্রামে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ওপর হামলার ঘটনাও রয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত সময়োপযোগী ৩১টি প্রস্তাবনা দিয়েছেন, আমাদের ডিসি মহোদয়গণ সেগুলোকে গুরুত্বারোপ, উপলব্ধি ও সে অনুযায়ী উদ্যোগ গ্রহণ করলে সত্যিকার অর্থেই বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় রূপান্তরিত হবে। আর সেখানে থাকবে না আদিবাসী, পিছিয়ে পড়া কিংবা অন্ত্যজ জনগোষ্ঠীর আজাহরি, কান্না কিংবা অভিযোগের টুইটুম্বর ডালি।
।





Users Today : 3
Views Today : 4
Total views : 175448
