সাম্প্রতিকালে প্রায়ই অভিযোগ শোনা যায়, লোভ দেখিয়ে অর্থাৎ টাকা-পয়সা, জায়গা-জমি, চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদির মোহে লালায়িত হয়ে আদিবাসী, প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠী, এমনকি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর দরিদ্র এবং নিরক্ষর শ্রেণীর লোকজন খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হচ্ছে! এটি শুধু বাংলাদেশে নয়, ভারতসহ নেপাল, পাকিস্তান প্রভৃতি দেশে অলিখিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রশ্ন হলো—আসলে কি খ্রিস্টান মিশনারীরা কিংবা চার্চ প্রতিষ্ঠানগুলো লোভ দেখিয়ে থাকে! পবিত্র বাইবেল এ সম্পর্কে কী বলে! পবিত্র বাইবেলে অনুযায়ী, প্রভু যীশু খ্রিষ্টকে বিশ্বাস করার সবচেয়ে বড়ো প্রাপ্তি হলো—
- ঈশ্বরের সঙ্গে পুনর্মিলন;
- পাপের ক্ষমা;
- অনন্ত জীবন;
- অন্তরের শান্তি;
- পবিত্র আত্মার উপস্থিতি;
- নতুন জীবন ও চিরন্তন আশা।
প্রভু যীশু খ্রিষ্ট কবর থেকে পুনরুত্থিত হওয়ার পরই অর্থের সংযোগ সংযোজিত হয়েছে। নগরের অধ্যক্ষেরা সেদিন অর্থের জোরে সত্যি ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করেছে। শাস্ত্রে লেখা আছে, ‘তখন তারা সেই টাকা নিয়ে যেরূপ শিক্ষা পেল, সেরূপ কার্য করল। আর যিহূদীদের মধ্যে সেই জনবর রটে গেল, তা অদ্য পর্যন্ত রয়েছে।’
উপমহাদেশে ৫২ খ্রিষ্টাব্দে প্রভু যীশুর দ্বাদশ শিষ্যদের অন্যতম সাধু থোমা ভারতবর্ষকে সুসমাচার প্রচারক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। সেই হিসেবে খ্রিষ্টধর্মের বয়স এখন একহাজার নয়শত চুয়াত্তর বছর, এটিকে অবশ্যই বিবেচ্য বিষয়। খ্রিস্টান ধর্ম মিথ্যার ওপর নির্ভর করে প্রতিষ্ঠিত হয়নি, হয়েছে সত্যকে প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে। সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে প্রভু যীশু খ্রিষ্টকে ক্রুশারোপিত করা হয়েছে, অতঃপরও তিনি বিচ্যুতি হোননি। স্বার্থকে পুঁজি করে যদি প্রচারাভিযান চালানো হতো, তাহলে ভারতবর্ষের ইতিহাস পাল্টে যেতে বাধ্য হতো। পবিত্র বাইবেলে কোনো জায়গায় নেই যে, যীশুকে বিশ্বাস করলে—অবশ্যই ধনী হয়ে যাবেন, এমন প্রতিশ্রুতি নেই। কখনো অসুস্থ হবেন না, এমন প্রতিশ্রুতি নেই; জীবনে কষ্ট আসবে না, এমন প্রতিশ্রুতিও নেই। বরং অনুসারীদের বিষয়ে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন—‘‘জগতে তোমরা ক্লেশ ভোগ করবে; কিন্তু সাহস রাখো, আমি জগতকে জয় করেছি’’ (যোহন ১৬:৩৩)। অন্যত্র বলেছেন—যদি কেউ আমার অনুসরণ করতে চায়, তবে সে নিজেকে অস্বীকার করুক, নিজের ক্রুশ তুলে নিয়ে আমার অনুসরণ করুক’ (মথি ১৬:২৪)। এখানে ‘যদি কেউ চায়’ এই শব্দগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। প্রভু যীশুর আহ্বান ছিল—স্বেচ্ছার, প্রলোভন নয়; বিনিময়ের নয়।
তাহলে অভিযোগ কেন টিকে আছে? কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা যেতে পারে, যেমন—ক. চার্চ পরিচালিত স্কুল, হাসপাতাল ও উন্নয়ন প্রকল্পকে অনেকেই ধর্মান্তরের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন; খ. কোনো ব্যক্তি প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা পাওয়ার পর ধর্ম পরিবর্তন করলে অনেকের কাছে মনে হতে পারে যে, সুবিধার কারণেই তিনি ধর্মান্তরিত হয়েছেন কিন্তু ব্যক্তির নিজের বিশ্বাস বা সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। গ. ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উত্তেজনার সময় এ ধরনের অভিযোগ বেশি প্রচারিত হয়। খ্রিষ্টধর্মের মূলভিত্তি কোনো ব্যক্তি, গির্জা বা প্রতিষ্ঠানের আচরণ নয়, এর মূল ভিত্তি হলো পবিত্র বাইবেল। তাই যদি কোথাও কোনো ব্যক্তি অনৈতিক কাজ করেন, সেটি বাইবেলের শিক্ষা প্রমাণ করে না। বরং দেখতে হবে, ঈশ্বরের বাক্য কী নির্দেশ দেয়। বিশ্বাসীদের জন্য পবিত্র বাইবেল যে আশীর্বাদগুলোর কথা বলে, সেগুলো হলো—
১. পরিত্রাণ: কারণ ঈশ্বর জগৎকে এমন প্রেম করলেন যে, তিনি তাঁর একমাত্র পুত্রকে দান করলেন, যেন যে কেউ তাঁতে বিশ্বাস করে সে বিনষ্ট না হয় কিন্তু অনন্ত জীবন পায় (যোহন ৩:১৬)।
২. অনন্ত জীবন: যে পুত্রে বিশ্বাস করে, তার অনন্ত জীবন আছে (যোহন ৩:৩৬)।
৩. পাপের ক্ষমা: তাঁর মাধ্যমে প্রত্যেক বিশ্বাসী… ধার্মিক গণ্য হয় (প্রেরিতদের কার্য ১৩:৩৮-৩৯)।
৪. ঈশ্বরের সন্তান হওয়ার অধিকার: যতজন তাঁকে গ্রহণ করল… তিনি তাদের ঈশ্বরের সন্তান হওয়ার অধিকার দিলেন (যোহন ১:১২)।
৫. শান্তি: আমি তোমাদের শান্তি দিয়ে যাচ্ছি; আমার শান্তি তোমাদের দিচ্ছি (যোহন ১৪:২৭)।
৬. পবিত্র আত্মার দান: তোমরা পবিত্র আত্মার দান পাবে (প্রেরিতদের কার্য ২:৩৮)।
৭. নতুন জীবন: যদি কেউ খ্রিস্টে থাকে, তবে সে নতুন সৃষ্টি (২ করিন্থীয় ৫:১৭)।
৮. ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্ক: অতএব বিশ্বাসের দ্বারা ধার্মিক গণ্য হয়ে আমরা… ঈশ্বরের সঙ্গে শান্তি লাভ করেছি (রোমীয় ৫:১)।
৯. প্রার্থনার সাহস: আসুন, আমরা সাহসের সঙ্গে অনুগ্রহের সিংহাসনের কাছে যাই (ইব্রীয় ৪:১৬)।
১০. পুনরুত্থানের আশা: আমিই পুনরুত্থান ও জীবন; যে আমাকে বিশ্বাস করে, সে মরলেও বাঁচবে (যোহন ১১:২৫)।
খ্রিষ্টধর্মে বিশ্বাস কোনো কেনাবেচার বিষয় নয়। বাইবেল ঘোষণা করে, পরিত্রাণ মানুষের উপার্জন নয়, এটি ঈশ্বরের অনুগ্রহ। ‘‘কারণ অনুগ্রহের দ্বারাই তোমরা বিশ্বাসের মাধ্যমে পরিত্রাণ পেয়েছ, এটি তোমাদের নিজেদের থেকে নয়, এটি ঈশ্বরের দান; কর্মের ফলে নয়, যাতে কেউ গর্ব করতে না পারে’’ (ইফিষীয় ২:৮-৯)। যদি পরিত্রাণ ঈশ্বরের দান হয়, তাহলে অর্থ, উপহার, চাকরি বা অন্য কোনো সুবিধার বিনিময়ে তা দেওয়া বা নেওয়া সম্ভব নয়। প্রভু যীশু খ্রিষ্ট কখনো লোভ দেখিয়ে মানুষকে ডাকেননি। তাঁর সেবাকাজের দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনি হাজার হাজার ক্ষুধার্ত মানুষকে খাদ্য দিয়েছেন (মথি ১৪:১৩-২১), অসংখ্য রোগীকে সুস্থ করেছেন, দরিদ্রদের প্রতি করুণা দেখিয়েছেন কিন্তু কখনো বলেননি, ‘‘আগে আমার অনুসারী হও, তারপর সাহায্য পাবে’’। বরং তিনি স্বাধীন ইচ্ছার প্রতি সম্মান দেখিয়েছেন।
সাধু পৌল করিন্থীয় মণ্ডলীকে লিখেছেন—‘‘আমরা অনেকের মতো ঈশ্বরের বাক্য নিয়ে ব্যবসা করি না; বরং আন্তরিকভাবে ঈশ্বরের কাছ থেকে প্রেরিত হয়ে খ্রিষ্টে ঈশ্বরের সামনে কথা বলি’ (২ করিন্থীয় ২:১৭)। অর্থাৎ ঈশ্বরের বাক্যকে ব্যবসা, অর্থ উপার্জন বা ব্যক্তিগত লাভের মাধ্যম বানানো সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। যদি ইতিহাস দেখি, প্রথম শতাব্দীতেই কিছু মানুষ ধর্মকে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম বানানোর চেষ্টা করছিল, তাই প্রেরিত পৌল দৃঢ়তার সাথে তীমথিয়কে লিখেছেন—‘‘যারা মনে করে ধার্মিকতা লাভের উপায়, তাদের থেকে দূরে থাকো।’’ এরপর তিনি আরও বলেন—‘‘কারণ অর্থপ্রেম সব প্রকার অনিষ্টের একটি মূল।’’ এখানে শুধু প্রচারকের জন্য নয়, বিশ্বাস গ্রহণকারীর জন্যও শিক্ষা রয়েছে। যদি কেউ অর্থের জন্য ধর্ম গ্রহণ করেন, তবে সেটিও বাইবেলের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সিমোন জাদুকর নামে একজন ব্যক্তি অর্থ দিয়ে পবিত্র আত্মার শক্তি কিনতে চেয়েছিলেন (রোমীয় ৮ অধ্যায়)। প্রেরিত পিতর তাকে বলেছিলেন—‘‘তোমার অর্থ তোমার সঙ্গে ধ্বংস হোক; কারণ তুমি মনে করেছ ঈশ্বরের দান অর্থ দিয়ে কেনা যায়’’। এই ঘটনা খ্রিষ্টধর্মের মৌলিক সত্য প্রতিষ্ঠা করে, ঈশ্বরের দান বিক্রয়যোগ্য নয়। চার্চের নেতাদের উদ্দেশ্যে পিতর পত্রে লিখেছেন—‘‘ঈশ্বরের পালকে চরাও… জঘন্য লাভের আশায় নয়, বরং আন্তরিক মনে’’ (১ পিতর ৫:২)। অর্থাৎ একজন প্রচারক, পালক বা যাজকের উদ্দেশ্য হতে হবে সেবা, লাভ নয়। একইভাবে প্রেরিত পৌল বলেছেন—‘‘রুপা, সোনা কিংবা পোশাক আমি কারও কাছ থেকে লোভ করিনি’’ (প্রেরিত ২০:৩৩)। যীশুর শিষ্য হওয়ার মানে ত্যাগী জীবন যাপন। যদি খ্রিস্টধর্মের উদ্দেশ্য বস্তুগত লাভ হতো, তাহলে যীশু বলতেন, আমার কাছে এলে ধনী হবে’। কিন্তু তিনি উল্টো বলেছেন—‘‘তোমাদের মধ্যে যে কেউ নিজের সমস্ত কিছুর অধিকার ত্যাগ না করে, সে আমার শিষ্য হতে পারে না’’(লূক ১৪:৩৩)।
পবিত্র বাইবেলের শিক্ষা অত্যন্ত স্পষ্ট। লোভ, অর্থ, চাকরি, উপহার বা অন্য কোনো বস্তুগত সুবিধার বিনিময়ে কাউকে খ্রিস্টান করা না। খ্রিষ্টধর্ম মানুষকে আহ্বান করে সত্য, অনুতাপ, বিশ্বাস ও স্বাধীন বিবেকের পথে। প্রভু যীশু খ্রিষ্ট মানুষকে আকৃষ্ট করেছেন তাঁর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, সত্য, ক্ষমা ও আত্মত্যাগে মাধ্যমে, কখনো লোভের মাধ্যমে নয়। বাংলাদেশের মতো বহু ধর্মীয় সমাজে তাই অভিযোগ নয়, প্রয়োজন সত্য যাচাই, বিদ্বেষ নয়, প্রয়োজন পারস্পারিক সম্মান; আর ধর্মীয় প্রতিযোগিতা নয়, প্রয়োজন মানবমর্যাদা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা কারণ প্রকৃত বিশ্বাস কখনো কেনা যায় না, তা জন্ম নেয় মানুষের হৃদয়ে, ঈশ্বরের সত্যের স্পর্শে।




Users Today : 30
Views Today : 52
Total views : 184145
