পত্রিকা খুললেই প্রত্যেকদিন অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার খবর পাওয়া যায়। সড়ক দুর্ঘটনা, ধর্ষণ, খুন, হত্যা, ছিনতাই ইত্যাদি। কিন্তু এইসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার খবরের শেষ হবে কবে? আদৌ কি শেষ হবে? নাকি এভাবেই চলবে যুগের পর যুগ?
১.
সড়ক দুর্ঘটনা বাংলাদেশে নিত্তনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। গেল দুই ঈদে সড়ক দুর্ঘটনায় অনেক মানুষের প্রাণ রাস্তায় শেষ হয়ে গেছে। অনেক মানুষের প্রাণ হাসপাতালের বেডে ঝুলছে। গত ঈদুল ফিতরের সময়ও একই অবস্থা দেখেছি। সড়ক দুর্ঘটনায় কত শত মানুষের প্রাণ গেল। যার প্রেক্ষিতে গেল ঈদে যাতে সড়ক দুর্ঘটনা না হয় সেই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি ছিল। কিন্তু কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যায়নি। ফলে গেল ঈদেও অনেক মানুষের প্রাণ রাস্তায় নিঃশেষ হয়ে গেল। এইসবের কারণ হিসেবে বলা হয়ে থাকে ফিটনেসবিহীন গাড়ি, রাস্তা ভাঙা, অদক্ষ ড্রাইভিংসহ অনেক কথা। প্রতিবার সড়ক দুর্ঘটনার পর এইসব আলাপ সামনে আসে। তারপরও সমাধান কেন হয় না? তারপরেও ফিটনেসবিহীন গাড়ি কেন রাস্তায় চলাচল করে? ভাঙা রাস্তা কেন সংস্কার করা হয় না? কেন অদক্ষ ড্রাইভার দিয়ে গাড়ি চলবে? এইসব প্রশ্ন বারবার ঘুরপাক খায়। কিন্তু কোনো যথাযথ উত্তর সামনে আসে না। এরপর সড়ক দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি হয়, তদন্ত হয়, প্রতিবেদন জমা হয়, কিন্তু নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। তাহলে কেন এই তদন্ত কমিটি? কেন এই প্রতিবেদন? দেশে সড়ক দুর্ঘটনার পর যত তদন্ত কমিটি হয়েছে, সেই তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করলে আদৌও কি সড়ক দুর্ঘটনা হতো? অবশ্যই হতো না। কিন্তু এইসব কিছুই হয়, সমাধান হয় না। সংবাদপত্রের শিরোনাম পরিবর্তনে কখনো সড়ক দুর্ঘটনা কমবে না। সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করার জন্য প্রয়োজন যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা ও বাস্তবায়ন করা।
২.
পত্রিকার পাতা খুললেই ধর্ষণের খবর চোখে পড়ে। ছোট্ট শিশু থেকে বৃদ্ধ ও মানসিক ভারসাম্যহীন নারীও ধর্ষণের শিকার হয়। কিন্তু এর শেষ কোথায়? এভাবেই যুগের পর যুগ ধর্ষণের খবর গণমাধ্যমে আসে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র কি করে? গ্রাম বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে ধর্ষণ হলে দেখা যায় গ্রামের মেম্বার বা কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির মাধ্যমে সালিশ হয়। কিছু টাকা দিয়ে মিটমাট করার চেষ্টা করা হয়। অনেকাংশে মিটমাট করা হয়। কিন্তু এইটা কি ধর্ষণ প্রতিরোধের উপায়? এইটা ধর্ষণ প্রতিরোধের উপায় হলে বছরের পর বছর ধর্ষণ বেড়েই চলেছে কেন? আর এইটা ধর্ষণ প্রতিরোধের উপায় না হলে কেন এভাবে ধর্ষণের মতো অপরাধের সালিশ করা হচ্ছে? যারা এই সালিশ করে মিটমাট করে দিচ্ছে, সরকার তাদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা গ্রহণ করে না। এই ক্ষেত্রে সরকারের উচিত যারা ধর্ষণের সাথে জড়িত ও যারা সালিশ করে এই অপরাধীদের মুক্তি দিচ্ছে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা। কিন্তু সরকার কোনটা যথাযথভাবে করছে? প্রতিনিয়ত যে ধর্ষণ হচ্ছে, সেই ধর্ষণকারীদেরই গ্রেফতার করে যথাযথভাবে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে ব্যর্থ। দেখা যাচ্ছে যেটা সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশি প্রচার হচ্ছে, সবাই নিন্দা জানাচ্ছে সেইটার ব্যাপারে পদক্ষেপ দেখা যায়। কিন্তু এর অগোচরে হাজারো ধর্ষণের খবর চাপা পড়ে। তাহলে কি ধর্ষণের বিচার পাওয়ার জন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রভাব ছাড়া সম্ভব নয়?
এরপর প্রতিটি ধর্ষণের তদন্ত কমিটি হয়, প্রতিবেদন হয়। তারপরেও কেন ধর্ষণ কমে না? এই তদন্ত কমিটি ও প্রতিবেদন তাহলে সংবাদের শিরোনামেই শেষ। জনগণের চোখে ফাঁকি দেওয়া। এর দায় রাষ্ট্র কীভাবে এড়িয়ে যাবে?
৩.
গত ২৭ মে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে একই দিনে ছয় জন নবজাতকের মৃত্যু হয়। এইটাকে অঘটন বলার কোনো সুযোগ নেই। অবশ্যই হাসপাতালের ত্রুটির জন্যই হয়েছে। কিন্তু এই ত্রুটি তো একদিনে হয়নি। ধীরে ধীরে ত্রুটি ছোটো থেকে বড়ো হয়েছে। কিন্তু কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এইটা অবশ্যই দায়িত্বের প্রতি অবহেলা ছিল। কিন্তু কেন? যেখানে মানুষের জীবন-মৃত্যুর লড়াই, সেখানে অবহেলা কেন? তবে এর দায় যে শুধু হাসপাতালের তা নয়, এর দায় রাষ্ট্রেরও। বাংলাদেশে ১৫ হাজার বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ৬ হাজারের কাছাকাছি নিবন্ধিত। এছাড়া এগুলোর বড়ো অংশরই লাইসেন্স নবায়ন নেই। তাহলে স্বাস্থ্য খাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কাজ কি? নিয়ন্ত্রক সংস্থা গুলোর দায়িত্ব এইসব কিছু তদারকি করা। কিন্তু লাইসেন্স প্রদান করাই যখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজ, তখন এভাবে মানুষের মৃত্যু হওয়াটা স্বাভাবিক। দেশে বর্তমান বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। দেশে যত্রতত্র ক্লিনিক। এইসব ক্লিনিকে কি আদৌও যথাযথ সেবা নিশ্চিত হয়? হয় না। এইসব ক্লিনিকের রিপোর্টও যথাযথ হয় না। ফলে ভুল চিকিৎসা হওয়া স্বাভাবিক। এর শিকার দেশের অশিক্ষিত ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী। সরকারের স্বাস্থ্য নিযন্ত্রক সংস্থার উচিত সরকারিসহ, বেসরকারি হাসপাতালের যথাযথ স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা। সেই সাথে দেশের ক্লিনিক ব্যবসার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া। যেখানে মানুষের বাঁচা-মরার লড়াই, অন্তত সেই জায়গায় উপযুক্ত ও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক।
৪.
দেশে সব সময়েই মাদক, ছিনতাই, খুন ইত্যাদি লেগেই থাকে। এইসব কিছুর বিরুদ্ধে আইন থাকলেও বাস্তবায়ন দেখা যায় না। দেশের বর্তমান অবস্থায় এইসব আইন বাস্তবায়ন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছিনতাই এর খবর প্রতিনিয়ত শোনা যায়। কিন্তু এরপরেও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই। মাদকের ব্যবসা, মাদক গ্রহণ দিনের পর দিন সহজলভ্য হয়ে গেছে। কিন্তু দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই। খুন-হত্যার খবরও প্রায় নিয়মিত শোনা যায়। কিন্তু পদক্ষেপ নেই। এইসব সমস্যার সমাধান কি আদৌও হবে?
দেশে সংঘটিত সকল অপরাধের তদন্ত কমিটি হয়, তদন্ত হয়, প্রতিবেদন জমা হয়। কিন্তু এরপরেও কেন সেই একই অপরাধ সংঘটিত হয়? প্রতিবেদন অনুযায়ী যথাযথ বিচার কেন হয় না? দৃশ্যমান পদক্ষেপ কেন নেওয়া হয় না? তাহলে এই তদন্ত কমিটি, তদন্ত, প্রতিবেদন কেবলই জনগণের চোখে ফাঁকি দেওয়া? এইসব প্রশ্নের জবাব কে দিবে? এর দায় রাষ্ট্র কীভাবে এড়িয়ে যাবে? রাষ্ট্র জাগবে কবে?
মোজাহিদ হোসেন: কলাম লেখক ও শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।





Users Today : 52
Views Today : 74
Total views : 183027
