১৮৫৫ সালের ৩০শে জুন। বর্তমান ভারতের সাঁওতাল পরগণা, ভগনাডিহির মাঠ থেকে সিধু আর কানু নামের দুই বীর ভাই ঘোষণা করেছিলেন ‘‘আমাদের নিজেদের হাতে শাসন চাই, দিকুদের (বহিরাগত শোষক) গঙ্গা পার করে দাও’’। ব্রিটিশ রাজশক্তি, শোষক জমিদার আর সুদখোর মহাজনদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দেশীয় তীর-ধনুক আর টাঙ্গি হাতে ১০ হাজার আদিবাসী মানুষের সেই জেগে ওঠার নাম ছিল—‘সাঁওতাল হুল’ বা সাঁওতাল বিদ্রোহ। উপমহাদেশের বুকে প্রথম সফল এবং সশস্ত্র এই গণসংগ্রামের দুই মহানায়ক সিধু ও কানু কিন্তু আজ দুই শতকের কাছাকাছি সময় পেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের বুকে দাঁড়িয়ে তাদের স্মরণের ভাষাটা বড্ড মলিন ও বেদনাবিধুর।
ইতিহাসের এক নিষ্ঠুর পরিহাসের মূর্ত প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের দিনাজপুর। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দিনাজপুর-পঞ্চগড় মহাসড়কের কাহারোল উপজেলার ১৩ মাইল নামক স্থানে ঐতিহ্যবাহী তেভাগা চত্বরে স্থাপন করা হয়েছিল সিধু ও কানুর একটি ভাস্কর্য। এটি কেবল সিমেন্ট-পাথরের কোনো কাঠামো ছিল না; এটি ছিল উত্তরবঙ্গের প্রান্তিক আদিবাসী সাঁওতালদের আত্মপরিচয়, হাজার বছরের লড়াই এবং রাষ্ট্রের বুকে তাদের অবদানের একমাত্র দৃশ্যমান স্মারক। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের অস্থির আবহে একদল চিহ্নিত দুষ্কৃতকারী আদিবাসী ইতিহাসের এই বীরদের ভাস্কর্যটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। এই আঘাত কেবল একটি কংক্রিটের মূর্তির ওপর নয়, এটি সমতলের আদিবাসীদের শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা প্রতিবাদের ইতিহাসের ওপর আঘাত ও অবমাননা। তেভাগা ও হুল বিদ্রোহের ঐতিহাসিক মেলবন্ধন ভাস্কর্যটি যেখানে স্থাপন করা হয়েছিল (১৩ মাইল, কাহারোল), স্থানটি ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের (১৯৪৬-৪৭) স্মৃতিবিজড়িত স্থান। ১৯৪৬ সালের বর্গাচাষীদের আন্দোলনে যে কৃষকেরা প্রথম বুকের রক্ত দিয়েছিলেন, তাদের সিংহভাগই ছিলেন সাঁওতাল এবং রাজবংশী সম্প্রদায়ের আদিবাসী। ফলে সিধু-কানুর এই ভাস্কর্যটি একাধারে ১৮৫৫-এর সাঁওতাল হুল এবং ১৯৪৬-এর তেভাগা আন্দোলনের দুই যুগের কৃষক-আদিবাসী বিদ্রোহের এক ঐতিহাসিক মিলন সেতু ছিল, যা ভেঙে ফেলার অর্থ হলো এই অঞ্চলের আদিবাসীদের সামগ্রিক ইতিহাসকে মুছে ফেলার চেষ্টা। ২০২৬ সালের এই হুল দিবসে এসেও সেই ভাঙা ভাস্কর্যটি পুনর্নির্মাণ করা হয়নি, যা বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর চরম নিরাপত্তাহীনতা ও উপেক্ষার এক নগ্ন দলিল। একটি স্বাধীন দেশের জনপদে কেন সাঁওতাল বিদ্রোহের নায়কদের ভাস্কর্য ভাঙার শিকার হতে হয়? সিধু-কানু তো কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন না। তারা ছিলেন এই মাটির মানুষের অধিকার রক্ষার ইতিহাসের আদি পুরুষদের অগ্রগণ্য ব্যক্তিত্ব। যে তেভাগা আন্দোলনের জন্য দিনাজপুর বিখ্যাত, তার প্রথম সারির লড়াকু সেনা ছিলেন এই সাঁওতালরাই।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আধুনিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে তীর-ধনুক নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন সমতলের এই আদিবাসী সন্তানেরা। অথচ আজ স্বাধীন রাষ্ট্রে তাদের বীরত্বের প্রতীককে সুরক্ষিত রাখা যায়নি। এই ভাঙা ভাস্কর্যটি প্রমাণ করে আমরা মুখে যতই বৈষম্যহীন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নতুন বাংলাদেশের কথা বলি না কেন, অবহেলিত আদিবাসীদের কপালে আজও জুটছে অবজ্ঞা ও অবহেলা। আজকের বাংলাদেশে সাঁওতাল ও অন্যান্য আদিবাসী মানুষেরা প্রতিনিয়ত একটি অদৃশ্য ‘হুল’ বা বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। তবে তা অস্ত্র হাতে নয়, টিকে থাকার লড়াইয়ে। পৈতৃক ভূমি থেকে উচ্ছেদ হওয়া, প্রভাবশালী ভূমিগ্রাসীদের অত্যাচার এবং ২০১৬ সালের গাইবান্ধার সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্মে তিন সাঁওতাল হত্যার বিচার না হওয়া সব মিলিয়ে তাদের অস্তিত্ব আজ খাদের কিনারায়। সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্মের জমি উদ্ধার আন্দোলনে তিন সাঁওতাল (মঙ্গল মার্ডী, রমেশ টুডু ও শ্যামল হেমব্রম) পুলিশ ও ভূমিগ্রাসীদের গুলিতে শহীদ হোন, যার সুনির্দিষ্ট বিচার আজও আলোর মুখ দেখেনি। ক্ষমতার পালা বদলেও আদিবাসীদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তনের লক্ষণ দৃশায়িত হচ্ছে না। সমতলের আদিবাসীদের জন্য একটি পৃথক ‘ভূমি কমিশন’ গঠন এবং তাদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতির দীর্ঘদিনের দাবি আজও শুধু ফাইলবন্দি হয়ে আছে। মনে হচ্ছে—সরকারের সদ্ইচ্ছার যথেষ্ট অভাব রয়েছে।
একটি দেশের সংস্কৃতি ও বহুত্ববাদ কতটা সমৃদ্ধ, তা পরিমাপ করা হয় সেই দেশের সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের সম্মানের মানদণ্ডে। অত্যন্ত সহজ উত্তর— বাংলাদেশের আদিবাসীরা সুখে নেই, প্রতিবেশী বৃহত্তর জনগোষ্ঠী কর্তৃক নানান প্রতিকূলতা জীবনের সাথে ওষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। সিধু-কানুর ভাস্কর্য ভাঙার ঘটনা কেবল একটি সম্প্রদায়ের ওপর আঘাত নয়, এটি বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির ওপর আঘাত। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং স্থানীয় প্রশাসনের কাছে আদিবাসী ছাত্র-জনতা বারবার দাবি জানিয়েছেন এই স্মারকটি দ্রুত পুনর্র্নিমাণের জন্য কিন্তু দুঃখের বিষয়, এখনও তা আলোচনার টেবিলেই সীমাবদ্ধ। অধিকার আদায়ের চেতনার প্রতীক সিধু-কানু ভাস্বর্য দুটি দীর্ঘদিন অবহেলা, অযত্নে পড়ে থাকার পর স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মীর তৎপরতায় ভাঙা ভাস্কর্য দুটির অংশগুলো বর্তমানে থানা-পুলিশের হেফাজতে জমা রাখা হয়েছে। ঘটনার পর প্রায় ২ বছর অতিক্রান্ত হতে চলেছে, অতঃপরও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও উদাসীনতার কারণে ভাস্কর্যটি পুনর্র্নিমাণের কোনো সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বেসরকারি উদ্যোগ কিংবা আদিবাসী সংগঠনগুলোর কোনো উৎসাহব্যঞ্জক ভূমিকা দেখা যায় না। উত্তরবঙ্গের একাধিক আদিবাসী সংগঠনগুলো ক্ষোভ প্রকাশ করে দিনাজপুর জেলা প্রশাসকের অফিসের মাধ্যমে স্মারকলিপি পাঠিয়েছেন, আদৌ পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় নাই। ৩০শে জুনের হুল দিবস আমাদের অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে আপসহীন হওয়ার শিক্ষা দেয়।
উত্তরবঙ্গের সমতলের সাঁওতালদের পৈতৃক সম্পত্তি জাল দলিল বা পেশীশক্তি খাটিয়ে দখল করে নেওয়ার প্রবণতা রুখতে আদিবাসীরা দীর্ঘদিন ধরে একটি স্বাধীন ও কার্যকর ‘ভূমি কমিশন’ গঠনের দাবি জানিয়ে আসছেন, যা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। এই দিনে ধামসা-মাদলের ছন্দে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর আনুষ্ঠানিকতা তখনই সার্থক হবে, যখন রাষ্ট্র এই মাটিতে সিধু-কানুর উত্তরসূরিদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেবে। দিনাজপুরের তেভাগা চত্বরে সিধু-কানুর ভাস্কর্যটি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সসম্মানে পুনর্র্নিমাণ করা আজ সময়ের দাবি। ভাঙা ভাস্কর্যটি জোড়া লাগানোর মধ্য দিয়েই প্রমাণিত হবে এই বাংলাদেশ সত্যিই সবার, এখানে কোনো বর্ণ, জাতি বা ধর্ম কাউকে প্রান্তিক করে রাখে না।





Users Today : 49
Views Today : 70
Total views : 183023
