হিজরত ইসলামের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ও সুদূরপ্রসারী ঘটনা। এটি শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তর নয় বরং সত্য, ন্যায় ও ঈমানের পথে ত্যাগ, ধৈর্য, সংগ্রাম এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। হিজরতের মাধ্যমে ইসলামের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়, যার ফলশ্রুতিতে মদিনায় একটি আদর্শ ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ৬১০ খ্রিস্টাব্দে আল্লাহর পক্ষ থেকে নবুওয়াত লাভ করেন। তিনি মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান জানান এবং শিরক, কুসংস্কার, অন্যায় ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করেন। কিন্তু মক্কার কুরাইশ নেতারা তাঁর এই দাওয়াত মেনে নেয়নি। বরং তারা রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং তাঁর অনুসারীদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালাতে থাকে।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বলেন, “মানুষ কি মনে করে যে, তারা শুধু ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে এবং তাদের পরীক্ষা করা হবে না?” (সুরা আল-আনকাবুত : ২)
মক্কায় মুসলমানদের ওপর নির্যাতন ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকে। অনেক সাহাবি আবিসিনিয়ায় (বর্তমান ইথিওপিয়া) হিজরত করেন। অন্যদিকে ইয়াসরিব (বর্তমান মদিনা)-এর কিছু মানুষ ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে আকাবার প্রথম ও দ্বিতীয় বাইআতে মহানবী (সা.)-এর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন এবং তাঁকে মদিনায় আমন্ত্রণ জানান।
এদিকে কুরাইশ নেতারা উপলব্ধি করতে পারে যে, ইসলামের প্রসার আর থামানো যাচ্ছে না। তাই তারা দারুন-নাদওয়ায় এক বৈঠকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর স্মরণ করো, যখন কাফিররা তোমাকে বন্দি, হত্যা অথবা নির্বাসিত করার ষড়যন্ত্র করছিল। তারা ষড়যন্ত্র করছিল, আর আল্লাহও পরিকল্পনা করছিলেন; আর আল্লাহই সর্বোত্তম পরিকল্পনাকারী।” (সুরা আল-আনফাল : ৩০)
আল্লাহ তাআলা ওহির মাধ্যমে তাঁর নবীকে এ ষড়যন্ত্রের সংবাদ দেন এবং মদিনায় হিজরতের নির্দেশ দেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত আলী (রা.)-কে নিজের বিছানায় শুইয়ে রেখে গভীর রাতে হজরত আবু বকর (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে মক্কা ত্যাগ করেন।
মক্কার কাফিররা তাঁদের অনুসরণ করতে থাকলে রাসুলুল্লাহ (সা.) ও আবু বকর (রা.) সাওর গুহায় আশ্রয় নেন। সেখানে তিন দিন অবস্থানকালে এক সময় শত্রুরা গুহার মুখ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তখন আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “চিন্তা করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” (সুরা আত-তাওবা : ৪০)
এ আয়াত মুসলমানদের জন্য তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর ভরসার এক চিরন্তন শিক্ষা।
তিন দিন পর তাঁরা মদিনার উদ্দেশে যাত্রা অব্যাহত রাখেন। পথিমধ্যে বহু কষ্ট ও বিপদের সম্মুখীন হলেও আল্লাহ তাঁদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেন। ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মহানবী (সা.) কুবা নামক স্থানে পৌঁছান এবং সেখানে ইসলামের প্রথম মসজিদ ‘মসজিদে কুবা’ প্রতিষ্ঠা করেন। কোরআনে এ মসজিদের প্রশংসা করে বলা হয়েছে, “যে মসজিদের ভিত্তি প্রথম দিন থেকেই তাকওয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত, তা-ই তোমার নামাজের জন্য অধিক উপযুক্ত।” (সুরা আত-তাওবা : ১০৮)
কয়েক দিন পর রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় প্রবেশ করেন। আনসাররা তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায়। তাদের ভালোবাসা ও আত্মত্যাগ ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। মদিনায় পৌঁছে তিনি মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন, মদিনা সনদ প্রণয়ন করেন এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে তোলেন।
পবিত্র কোরআনে মুহাজির ও আনসারদের মর্যাদা সম্পর্কে বলা হয়েছে, “আর যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে এবং যারা আশ্রয় দিয়েছে ও সাহায্য করেছে, তারাই প্রকৃত মুমিন।” (সুরা আল-আনফাল : ৭৪)
আরও ইরশাদ হয়েছে, “যারা নিজেদের ঘরবাড়ি ও সম্পদ থেকে বিতাড়িত হয়েছে, আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে সাহায্য করেছে, তারাই সত্যবাদী।” (সুরা আল-হাশর : ৮)
হিজরতের গুরুত্ব সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “নিশ্চয়ই সব কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক ব্যক্তি তাই পাবে যার জন্য সে নিয়ত করেছে। সুতরাং যার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের জন্য, তার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের জন্যই গণ্য হবে।” (সহিহ আল-বুখারি, হাদিস : ১; সহিহ মুসলিম)
অন্য হাদিসে তিনি বলেন, “মুহাজির সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা পরিত্যাগ করে।” (সহিহ আল-বুখারি, হাদিস : ১০)
আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “তওবা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত হিজরত বন্ধ হবে না, আর সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত না হওয়া পর্যন্ত তওবা বন্ধ হবে না।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ২৪৭৯)
হিজরতের তাৎপর্য
হিজরত শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গমন নয়; এটি সত্য ও ন্যায়ের পথে ত্যাগ, ধৈর্য, ঈমান, আল্লাহর ওপর ভরসা এবং দ্বীনের জন্য আত্মত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এ ঐতিহাসিক ঘটনার স্মৃতিকে কেন্দ্র করেই পরবর্তীকালে হজরত উমর (রা.)-এর খিলাফতকালে হিজরি সনের প্রবর্তন করা হয়।
হিজরতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। প্রথমত, হিজরতের মাধ্যমে ইসলাম নির্যাতিত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পর্যায় থেকে একটি সংগঠিত সমাজ ও রাষ্ট্রে পরিণত হয়। দ্বিতীয়ত, এটি মুসলমানদের জন্য ত্যাগ ও আত্মোৎসর্গের সর্বোচ্চ শিক্ষা। তৃতীয়ত, হিজরত প্রমাণ করে যে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রয়োজন হলে জন্মভূমি, সম্পদ ও স্বার্থও ত্যাগ করতে হয়। চতুর্থত, এটি আল্লাহর ওপর ভরসা, ধৈর্য ও সংগ্রামের অনন্য দৃষ্টান্ত। পঞ্চমত, মুহাজির ও আনসারদের ভ্রাতৃত্ব মানবতার ইতিহাসে সাম্য, সহমর্মিতা ও সামাজিক সংহতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
হিজরতের মাধ্যমে ইসলামের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের ভিত্তি স্থাপিত হয়। এ কারণেই হজরত উমর (রা.) তাঁর খিলাফতকালে হিজরতকে ইসলামী বর্ষপঞ্জির সূচনাবিন্দু হিসেবে গ্রহণ করেন এবং হিজরি সনের প্রবর্তন করেন।
সুতরাং হিজরত শুধু ইতিহাসের একটি ঘটনা নয়; এটি ঈমান, ত্যাগ, ধৈর্য, ভ্রাতৃত্ব, আল্লাহর প্রতি আস্থা এবং সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের এক চিরন্তন প্রেরণা, যা আজও মুসলমানদের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।




Users Today : 38
Views Today : 49
Total views : 180955
